রাশিয়ায় বাংলাদেশি পণ্যের বাণিজ্য বাধা দূর করার তাগিদ
রাশিয়ার বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ সহজ করা এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণের তাগিদ দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এ লক্ষ্যে পণ্যের সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়া সহজ করা, বাজারে প্রবেশের বাধা চিহ্নিত করা এবং বিভিন্ন খাতে যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) মস্কোয় রাশিয়ান ফেডারেশনের চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির কাউন্সিলের সাংগঠনিক বৈঠকে এসব বিষয় উঠে আসে। বৈঠকে রাশিয়া-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের কার্যক্রম, দুই দেশের বাণিজ্যিক সহযোগিতা এবং ব্যবসায়ীদের সমস্যা সমাধানের বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়।
ব্যবসায়ীদের চাহিদা অনুযায়ী কাজ করবে কাউন্সিল
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন রাশিয়ান ফেডারেশনের চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পাদালকো। তিনি বলেন, উদ্যোক্তাদের বাস্তব চাহিদার ভিত্তিতেই রাশিয়া-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের কার্যক্রম পরিচালিত হওয়া উচিত।
তার মতে, রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের জন্য বাংলাদেশের বাজারসংক্রান্ত বিশ্লেষণ তৈরি, সম্ভাবনাময় ব্যবসায়িক খাত চিহ্নিত করা এবং বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাধাগুলো খুঁজে বের করা কাউন্সিলের প্রধান কাজ হবে। বাংলাদেশে ব্যবসা করতে আগ্রহী রুশ কোম্পানিগুলোকে ব্যক্তিগত পর্যায়েও সহায়তা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। পাদালকো আরও বলেন, কাউন্সিল রাশিয়া-বাংলাদেশ আন্তঃসরকার কমিশনের সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন প্রস্তাব একত্র করে বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও যৌথ প্রকল্প বাস্তবায়নে যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলো সরকারি পর্যায়ে তুলে ধরবে।
ঐতিহাসিক বন্ধুত্বকে বাণিজ্যে কাজে লাগানোর প্রত্যাশা
রাশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বৈঠকে দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের কথা স্মরণ করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, নতুন এই প্ল্যাটফর্ম দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতা বাড়াতে সহায়ক হবে। কাউন্সিলের কার্যক্রমে বাংলাদেশ দূতাবাস সব ধরনের সহায়তা দিতে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি। ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়ানো এবং সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে যৌথ উদ্যোগ গড়ে তোলার মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও কার্যকর অর্থনৈতিক সহযোগিতায় রূপ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে বৈঠকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের বাণিজ্যিক গুরুত্ব
রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দ্বিতীয় এশিয়া বিভাগের প্রধান ভ্যাচেস্লাভ এরমোলায়েভ বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পর বাংলাদেশ রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। দুই দেশের সহযোগিতার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে তিনি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেন। তবে বাণিজ্য বাড়ানোর ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের জটিলতা এবং পণ্য তালিকা সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। ব্যবসায়িক লেনদেন সহজ করা এবং আরও বেশি ধরনের পণ্য দুই দেশের বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা গেলে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হতে পারে বলে বৈঠকে আলোচনা হয়।
জ্বালানি থেকে তথ্যপ্রযুক্তি, সম্ভাবনাময় একাধিক খাত
রুশ অর্থনৈতিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের প্রধান আনাস্তাসিয়া রোমানোভা বলেন, বিজনেস কাউন্সিল গঠনের ফলে ব্যবসায়ীদের নির্দিষ্ট চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে আন্তঃসরকার কমিশনের কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করা সম্ভব হবে।
সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে তিনি জ্বালানি, রসায়ন, কৃষি-শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তির কথা উল্লেখ করেন। অন্যদিকে, রাশিয়া-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মিয়া সাত্তার জ্বালানি, কৃষি, ডিজিটাল প্রযুক্তি, পরিবহন অবকাঠামো এবং হালকা শিল্পে সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তুলে ধরেন। সম্ভাব্য উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র ও শস্য গুদাম নির্মাণ এবং ঢাকায় রাশিয়ার সাবেক ট্রেড রিপ্রেজেন্টেশনের জায়গায় একটি শিল্পপার্ক গড়ে তোলা। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ ও শিল্প সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। তবে প্রস্তাবগুলো এখনো সম্ভাব্য উদ্যোগ হিসেবেই আলোচনায় রয়েছে।
পোশাক ও খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে নতুন সুযোগ
মিয়া সাত্তার জানান, রুশ কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যে বাংলাদেশের পোশাক কারখানার সঙ্গে কাজ করছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক ও খাদ্যসামগ্রী আমদানি করছে রাশিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো।
রাশিয়া ও ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়নের বাজারে প্রবেশের জন্য বাংলাদেশি মাছ ও সামুদ্রিক খাদ্য সরবরাহকারীদের অ্যাক্রেডিটেশন বা অনুমোদন পাওয়ার কাজও চলছে বলে জানান তিনি। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে সংশ্লিষ্ট পণ্যগুলোর রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বাংলাদেশি পণ্যের বাণিজ্য সম্প্রসারণে বড় বাধা হিসেবে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেন মিয়া সাত্তার। তার মতে, পণ্যের মান যাচাই ও সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা না গেলে রাশিয়ার বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সার্টিফিকেশন জটিলতা কমানোর প্রস্তাব
বাণিজ্য সম্প্রসারণের বাধা দূর করতে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে মান নিয়ন্ত্রণের সমন্বয় এবং সনদের পারস্পরিক স্বীকৃতির বিষয়ে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছেন মিয়া সাত্তার। তার মতে, পণ্যের মান যাচাই ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া সহজ হলে রপ্তানিকারকদের সময় ও ব্যয় কমতে পারে। এতে রাশিয়ার বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ থাকবে। তিনি আরও বলেন, রাশিয়ার ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের কাছে বাংলাদেশকে প্রায়ই শুধু বস্ত্রশিল্প ও রূপপুর প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়। এই ধারণা বদলাতে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতের পণ্য ও ব্যবসায়িক সম্ভাবনা তুলে ধরা জরুরি। এ লক্ষ্যে একটি সমন্বিত তথ্য পোর্টাল চালু, খাতভিত্তিক ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদল বিনিময় এবং রুশ চেম্বার ও রাশিয়ান এক্সপোর্ট সেন্টারের সহায়তায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন তিনি।
নিয়মিত ব্যবসায়িক যোগাযোগে গুরুত্ব
মিয়া সাত্তার বলেন, শুধু একটি ফোরাম গঠন করাই যথেষ্ট নয়; বরং দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিয়মিত ব্যবসা-টু-ব্যবসা বা বিটুবি যোগাযোগ প্রয়োজন। এ জন্য কাউন্সিলের অধীনে স্থায়ী খাতভিত্তিক ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি। এসব গ্রুপের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানে কাজ করা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন। বৈঠকে ‘প্রডইনটর্গ’-এর জেনারেল ডিরেক্টর আলেকজান্ডার সিরতসেভ বাংলাদেশে রুশ সার ও শস্য সরবরাহের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কৃষি-শিল্পবিষয়ক একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের প্রস্তাব দেন।
নভেম্বরে ঢাকায় ব্যবসায়ীদের বৈঠকের প্রস্তুতি
বৈঠকে রাশিয়া-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টরেট এবং ২০২৬-২৭ সালের প্রস্তাবিত কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়। স্তানিস্লাভ সিমাকোভকে কাউন্সিলের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের প্রস্তাব পাঠানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
আগামী নভেম্বরে আন্তঃসরকার কমিশনের বৈঠকের ফাঁকে ঢাকায় দুই দেশের ব্যবসায়ীদের নিয়ে একটি বৈঠক আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানে রাশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশনের মহাসচিব ভ্লাদিমির পোলজকভ, এসএমই করপোরেশনের ইভজেনিয়া ইগোরোভা, রাশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট তাতিয়ানা বেলকেভিচ এবং নোভাটেকের সালতানাত সাকামবায়োভাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]