খুঁজুন
                               
, ,
           

দক্ষ চালক তৈরিতে জোর, নিরাপদ সড়কের পথে বিআরটিসির বড় কর্মসূচি

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:১৭ অপরাহ্ণ
দক্ষ চালক তৈরিতে জোর, নিরাপদ সড়কের পথে বিআরটিসির বড় কর্মসূচি

দেশে সড়ক দুর্ঘটনা কমানো, পেশাদার চালকের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের কর্মীদের সম্ভাবনা বাড়ানোর লক্ষ্যে বড় পরিসরে চালক প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে পরিচালিত দুটি কর্মসূচির আওতায় মোট ৬৮ হাজার চালককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নতুন চালক তৈরি করার পাশাপাশি পেশায় নিয়োজিত চালকদের দক্ষতা হালনাগাদ করার উদ্যোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ উদ্যোগ শুধু চালক তৈরির একটি কর্মসূচি নয়; বরং সড়ক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বিদেশে শ্রমবাজার সম্প্রসারণের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

  • দুই প্রকল্পে ৬৮ হাজার চালককে প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা
  • কর্মরত চালকদের জন্য থাকছে রিফ্রেশার প্রশিক্ষণ
  • আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষ চালকের চাহিদা কাজে লাগানোর পরিকল্পনা

দুই প্রকল্পে প্রশিক্ষণ পাবেন ৬৮ হাজার চালক
বিআরটিসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশ রোড সেফটি প্রজেক্টের (বিআরএসপি) আওতায় ৬০ হাজার চালককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এর মধ্যে ৪০ হাজার তরুণকে নতুন করে পেশাদার চালক হিসেবে গড়ে তোলা হবে। অন্যদিকে, পেশায় আগে থেকেই যুক্ত ২০ হাজার চালককে রিফ্রেশার প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ দেওয়া হবে।

২০২৬ সালের মে মাসে শুরু হওয়া এই কার্যক্রম চলবে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত। বিআরটিসির চারটি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এবং ২৩টি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। বিআরটিসির প্রাক্কলন ও কাজের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ (আইসিডব্লিউএস) বিভাগের মহাব্যবস্থাপক ফাতেমা বেগমের মতে, এই উদ্যোগ দক্ষ চালক তৈরির পাশাপাশি দেশের সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে।

অন্যদিকে, এডিবির অর্থায়নে স্কিলস ফর ইন্ডাস্ট্রি কম্পিটিটিভনেস অ্যান্ড ইনোভেশন প্রোগ্রামের (এসআইসিআইপি) আওতায় আরও আট হাজার নতুন চালককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। ফলে দুটি কর্মসূচি মিলিয়ে মোট প্রশিক্ষণ লক্ষ্যমাত্রা দাঁড়াচ্ছে ৬৮ হাজারে।

দক্ষতার পাশাপাশি নিরাপদ চালনার ওপর জোর
চালক প্রশিক্ষণের প্রচলিত ধারণা সাধারণত গাড়ি চালানো শেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু বিআরটিসির এই কর্মসূচিগুলোতে চালনার কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি নিরাপদ ড্রাইভিং, যানবাহনের প্রাথমিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং যান্ত্রিক ত্রুটি শনাক্ত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষ করে কর্মরত পেশাদার চালকদের জন্য রিফ্রেশার প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে গাড়ি চালালেই একজন চালকের সব দক্ষতা হালনাগাদ থাকে, এমন নয়। ট্রাফিক পরিস্থিতি, নিরাপত্তাবিধি, যানবাহনের প্রযুক্তি এবং সড়কে ঝুঁকি মোকাবিলার কৌশল সম্পর্কে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।

বিআরএসপি প্রকল্পে নতুন চালক তৈরির পাশাপাশি অভিজ্ঞ চালকদের প্রশিক্ষণের অন্তর্ভুক্তি তাই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন চালকদের দক্ষ করে তোলার পাশাপাশি বর্তমানে সড়কে চলাচলকারী চালকদের আচরণ ও সক্ষমতার উন্নয়নও জরুরি।

মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে সুযোগ তৈরির লক্ষ্য
এডিবির অর্থায়নে পরিচালিত এসআইসিআইপি কর্মসূচিতে বিদেশে কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে চালক হিসেবে কাজের সুযোগ বাড়াতে প্রশিক্ষণার্থীদের ইংরেজি ও আরবি ভাষায় যোগাযোগের দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই কর্মসূচিতে প্রশিক্ষণের মেয়াদ ৩৬০ ঘণ্টা। এতে আত্মরক্ষামূলক ড্রাইভিং, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ, যান্ত্রিক ত্রুটি শনাক্তকরণ এবং পেশাদার চালক হিসেবে প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক দক্ষতা শেখানো হয়।

বিআরটিসির তথ্য অনুযায়ী, এসআইসিআইপি কর্মসূচির কার্যক্রম শুরু হয় ২০২৪ সালের ১ জুলাই। প্রথম পর্যায়ের প্রশিক্ষণ শুরু হয় ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি। ইতোমধ্যে চারটি ধাপে ২ হাজার ৮৫০ জন প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন। পঞ্চম ধাপে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন আরও ৬৫০ জন।

প্রশিক্ষণ সফলভাবে শেষ করা ব্যক্তিদের সরকার স্বীকৃত সনদ এবং বিনা মূল্যে পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে। নিয়মিত উপস্থিতির ভিত্তিতে প্রশিক্ষণার্থীরা যাতায়াত ও টিফিন ভাতাও পাচ্ছেন।

ভাষাগত দক্ষতা যুক্ত করার বিষয়টি এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে চালকের কাজ পেতে শুধু গাড়ি চালাতে জানাই যথেষ্ট নয়; নিয়োগকর্তার নির্দেশনা বোঝা, ট্রাফিক আইন অনুসরণ, যাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও প্রয়োজন।

নারী চালক তৈরিতে নতুন সম্ভাবনা
বিআরটিসির চালক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি নারী যাত্রীদের হয়রানি প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরির জন্য রাখা হয়েছে জেন্ডার অ্যাকশন প্ল্যান।

নারীদের ড্রাইভিং পেশায় উৎসাহিত করা এবং ‘পিঙ্ক বাস’ সেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যেও দক্ষ নারী চালক তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুরুতে নারী প্রশিক্ষণার্থীদের আগ্রহ তুলনামূলক কম থাকলেও বর্তমানে এই পেশায় আসার প্রবণতা বাড়ছে।

গণপরিবহনে নারী চালকের অংশগ্রহণ বাড়লে নারীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে নারী যাত্রীদের জন্য পরিবহনসেবায় অংশগ্রহণ ও স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধির সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে এসব লক্ষ্য অর্জনে প্রশিক্ষণের সুযোগের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, বৈষম্যহীন পরিবেশ, উপযুক্ত কর্মঘণ্টা এবং নিয়োগের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

আগের অভিজ্ঞতা এবার কতটা কাজে লাগবে?
চালক প্রশিক্ষণে বিআরটিসির পূর্ব অভিজ্ঞতাও রয়েছে। সংস্থাটি এর আগে স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রামের (এসইআইপি) আওতায় অন্তত ৪৭ হাজার ৫০০ জনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চলমান বিআরএসপি প্রকল্পে প্রথম দফায় প্রায় ৬ হাজার ৪০০ জন নতুন চালকের প্রশিক্ষণ শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় দফায় প্রায় ৬ হাজার ৬০০ জনের প্রশিক্ষণ চলছে। কর্মরত পেশাদার চালকদের রিফ্রেশার প্রশিক্ষণও শিগগিরই শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রশিক্ষণের পর ফল নিশ্চিত চ্যালেঞ্জ
৬৮ হাজার চালককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ দেশের পরিবহন খাত ও শ্রমবাজারের জন্য সম্ভাবনাময়। কিন্তু বিপুলসংখ্যক প্রশিক্ষণার্থীকে স্বল্প সময়ে প্রশিক্ষণ দিতে গিয়ে মানের ক্ষেত্রে আপস করা হলে প্রত্যাশিত সুফল ব্যাহত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া দরকার।

প্রথমত, প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোর অবকাঠামো, প্রশিক্ষক, যানবাহন এবং ব্যবহারিক অনুশীলনের মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, লাইসেন্স দেওয়ার আগে চালকের বাস্তব দক্ষতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি। তৃতীয়ত, প্রশিক্ষণ শেষে দেশীয় পরিবহন প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থত, প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের কর্মসংস্থান ও দক্ষতার অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করা দরকার। পাশাপাশি নারী প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তা এবং পেশাগত বাধা দূর করার উদ্যোগ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। বিআরটিসির কর্মকর্তারা আগ্রহী চালকদের নিকটস্থ প্রশিক্ষণকেন্দ্রে যোগাযোগ করে নিবন্ধনের তথ্য জানার পরামর্শ দিয়েছেন।

কালের আলো/ওয়াইএ/এমকে

সাত বছরেও চালু হয়নি দিনাজপুরের সেতু

দিনাজপুর সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:১৭ অপরাহ্ণ
সাত বছরেও চালু হয়নি দিনাজপুরের সেতু

নদীর ওপর দাঁড়িয়ে আছে ২৫০ মিটার দীর্ঘ সেতু। দুই পাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমাতে নির্মাণ করা হয়েছিল এটি। কিন্তু সেতু আছে, নেই সংযোগ সড়ক। ফলে নির্মাণের সাত বছর পেরিয়ে গেলেও সেতুটি ব্যবহার করতে পারছেন না স্থানীয় বাসিন্দারা। এখনো পুনর্ভবা নদী পারাপারে তাঁদের ভরসা ডিঙি নৌকা। সম্প্রতি নৌকাডুবিতে এক কৃষকের মৃত্যুর পর সেতুটি চালুর দাবি আরও জোরালো হয়েছে। দিনাজপুরের ঘুঘুডাঙ্গা-বসন্তপুর সেতুর এমন পরিস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দুই পাড়ের বাসিন্দারা। তাঁদের প্রশ্ন, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতু যদি ব্যবহারই করা না যায়, তাহলে মানুষের কী উপকার হলো?

নৌকাডুবিতে কৃষকের মৃত্যুর পর বাড়ছে উদ্বেগ
দিনাজপুরের বিরল উপজেলার ধর্মপুর গ্রামের কৃষক আফজাল হোসেনের বয়স হয়েছিল ৬০ বছর। প্রতিদিন ডিঙি নৌকায় পুনর্ভবা নদী পার হয়ে নিজের জমিতে কৃষিকাজ করতে যেতেন তিনি। গত রোববার নদী পার হওয়ার সময় নৌকাডুবিতে তাঁর মৃত্যু হয়। স্থানীয়দের মতে, সেতুর সংযোগ সড়ক তৈরি করে সেটি চালু করা হলে নদী পারাপারে এমন ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব হতো। আফজালের মৃত্যুর ঘটনা আবারও সামনে এনেছে এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের যাতায়াত দুর্ভোগ ও নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি।

সাত বছরেও পূর্ণতা পায়নি নির্মাণকাজ
দিনাজপুর সদর উপজেলার ঘুঘুডাঙ্গা, বিরল উপজেলার বসন্তপুরসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল পুনর্ভবা নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের। সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), দিনাজপুর। চলতি বছরের জুলাইয়ে সেতুর মূল নির্মাণকাজ শেষ হয়। কিন্তু দুই পাশে সংযোগ সড়ক না থাকায় এখনো এটি যানবাহন ও সাধারণ মানুষের চলাচলের উপযোগী হয়নি। ফলে দীর্ঘ অপেক্ষার পরও সেতুর সুফল পাচ্ছেন না স্থানীয় বাসিন্দারা।

২২ কোটি টাকার সেতু পড়ে আছে অচল
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২৫০ মিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ২২ কোটি ৫৭ লাখ ৮১ হাজার টাকা। সেতুটির উচ্চতা ১১ মিটার। নির্মাণকাজ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশন। তবে সেতুর দুই পাশে সংযোগ সড়ক নির্মাণের ব্যবস্থা না থাকায় পুরো অবকাঠামোটি এখনো ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটি স্থানীয় মানুষের যাতায়াতের দুর্ভোগ দূর করতে পারছে না।

সংযোগ সড়ক নিয়ে প্রশ্ন স্থানীয়দের
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হলেও এখন সংযোগ সড়কের বরাদ্দ না থাকার কথা বলা হচ্ছে। তাঁদের অভিযোগ, সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা ও কাজ শুরুর সময়ই সংযোগ সড়কের বিষয়টি নিশ্চিত করা উচিত ছিল।

স্থানীয় বাসিন্দা আকবার আলী প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘সেতু নির্মাণের উদ্দেশ্য যদি মানুষের যাতায়াত সহজ করা হয়, তাহলে সংযোগ সড়ক ছাড়া সেটি কতটা কাজে আসছে?’ সেতুর প্রকল্পের কাজ শেষ করার নির্ধারিত সময়সীমা, সংযোগ সড়ক নির্মাণে বিলম্বের কারণ এবং কবে নাগাদ পুরো সেতু চলাচলের উপযোগী হবে—এসব প্রশ্নের জবাব চান স্থানীয়রা। দ্রুত সংযোগ সড়ক নির্মাণ করে সেতুটি চালুর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

বরাদ্দ না থাকায় আটকে আছে সংযোগ সড়ক
এলজিইডির দিনাজপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আলী হোসেন জানান, সেতু নির্মাণের সময় সংযোগ সড়কের জন্য কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। এ কারণে মূল সেতুর কাজ শেষ হলেও সেটি চালু করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চাহিদা পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে সংযোগ সড়কের কাজ শুরু করা হবে। তবে কবে নাগাদ সেতুটি পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

একাধিকবার পরিদর্শনের পরও মেলেনি সমাধান
দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম জানান, তিনি চার থেকে পাঁচবার সেতুটি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, সেতুর সংযোগ সড়কসহ পূর্ণাঙ্গ প্রাক্কলন তৈরি না করায় এলজিইডি কাজ শেষ করতে পারছে না। বিষয়টি সভায় উপস্থাপন করা হয়েছে এবং এ নিয়ে কাজ চলছে উল্লেখ করে তিনি শিগগির অগ্রগতি হওয়ার আশা প্রকাশ করেন। তবে স্থানীয়দের কাছে এখন আশ্বাসের চেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে সেতুটি চালু করা। কারণ, সংযোগ সড়ক নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত নদীর দুই পাড়ের মানুষের দুর্ভোগ ও ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার বন্ধ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

ছাগল-ঘরের টাকায় শুরু, রায়হানের সাফল্যগাথা

নীলফামারী সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০৮ অপরাহ্ণ
ছাগল-ঘরের টাকায় শুরু, রায়হানের সাফল্যগাথা

একসময় অভাবের কারণে ঠিকমতো খাবার জুটত না। পড়াশোনার খরচ চালাতেও হিমশিম খেতে হতো। সেই দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার স্বপ্ন নিয়ে মায়ের দুটি ছাগল ও বাবার একটি টিনের ঘর বিক্রির টাকায় পুরোনো কম্পিউটার কিনেছিলেন রায়হান মিয়া। সেই কম্পিউটারই বদলে দিয়েছে তাঁর জীবনের গতিপথ। ফ্রিল্যান্সিং করে এখন তিনি কোটিপতি। গড়েছেন তিনতলা বাড়ি, কিনেছেন জমি ও গাড়ি। শুধু নিজের ভাগ্য বদলেই থেমে থাকেননি, গ্রামের তরুণদেরও বিনা মূল্যে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার মাগুড়া ইউনিয়নের পারেরহাট গ্রামের রায়হান মিয়ার বয়স এখন ৩৩ বছর। ছয় ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় তিনি। তাঁর বাবা অলিয়ার রহমানের পক্ষে অভাবের সংসার চালানোর পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগানো কঠিন ছিল। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেই নিজের স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা চালিয়ে গেছেন রায়হান।

অভাবের সংসার থেকে ঢাকায় পড়াশোনা
২০০৭ সালে এসএসসি পাস করার পর কম্পিউটার বিষয়ে পড়াশোনার জন্য ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন রায়হান। সেখানে কম্পিউটার বিভাগে পড়ার পাশাপাশি টিউশনি করে নিজের খরচ চালাতেন। অনেক সময় টিউশনির আয় দিয়েও প্রয়োজন মেটানো কঠিন হয়ে পড়ত। কখনো কখনো খাবার জোগাড় করাও ছিল তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে আর্থিক সংকট তাঁকে থামাতে পারেনি। কম্পিউটার ও প্রযুক্তি বিষয়ে আগ্রহ থেকেই ফ্রিল্যান্সিংয়ের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন তিনি। কিন্তু কাজ শেখার পর নিজের একটি কম্পিউটার কেনার সামর্থ্য ছিল না।

মায়ের ছাগল ও বাবার ঘর বিক্রির টাকা
২০১১ সালে ডিপ্লোমা শেষ করে বাড়ি ফেরেন রায়হান। তখন ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ শুরু করতে একটি কম্পিউটার কেনা জরুরি হয়ে পড়ে। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অবস্থার কারণে সেই টাকা জোগাড় করা সম্ভব হচ্ছিল না।

শেষ পর্যন্ত ছেলের স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে আসেন মা ময়না বেগম। নিজের দুটি ছাগল বিক্রি করে ছয় হাজার টাকা দেন তিনি। অন্যদিকে বাবা অলিয়ার রহমান তিনটি টিনের ঘরের একটি বিক্রি করে পান ২০ হাজার টাকা। মা-বাবার দেওয়া মোট ২৬ হাজার টাকা দিয়ে একটি পুরোনো কম্পিউটার কেনেন রায়হান। সেই কম্পিউটার নিয়েই শুরু হয় তাঁর ফ্রিল্যান্সিংয়ের যাত্রা। সীমিত সুযোগ-সুবিধা আর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিয়মিত কাজ শেখা ও দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যান তিনি।

প্রথম কাজেই বাড়তি ১০০ ডলার
২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এক গ্রাহকের কাছ থেকে ৪৮০ ডলারের একটি কাজ পান রায়হান। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করায় গ্রাহক তাঁকে অতিরিক্ত ১০০ ডলারও দেন। প্রথম কাজের এই অভিজ্ঞতা তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। রায়হানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অনলাইন মার্কেটপ্লেস আপওয়ার্কে তাঁর মোট আয় চার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। মাসে তাঁর আয় প্রায় পাঁচ লাখ টাকা। একসময় যে পরিবারের পক্ষে নিত্যপ্রয়োজন মেটানো কঠিন ছিল, সেই পরিবারে এখন আর্থিক সচ্ছলতা এসেছে। ফ্রিল্যান্সিংয়ের আয়ে তিনি তিনতলা বাড়ি নির্মাণ করেছেন, জমি ও গাড়িও কিনেছেন।

ফ্রিল্যান্সিংয়ের পাশাপাশি গড়েছেন খামার
অনলাইন কাজের পাশাপাশি কৃষি ও খামারভিত্তিক উদ্যোগেও যুক্ত হয়েছেন রায়হান। মাছ চাষের পাশাপাশি গড়ে তুলেছেন গরুর খামার। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, খামারে বর্তমানে ৩৫টি গাভি রয়েছে। সেখান থেকে প্রতিদিন প্রায় ২০০ লিটার দুধ উৎপাদিত হয়। এ ছাড়া নিজ গ্রামে একটি মাদ্রাসা ও এতিমখানাও প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি। নিজের আর্থিক উন্নতির পাশাপাশি এলাকার মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা করছেন রায়হান।

তরুণদের বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ
নিজের অভিজ্ঞতা অন্যদের কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেন ২০১৮ সালে। ওই বছর ‘সাদিয়া আইটি ফার্ম’ প্রতিষ্ঠা করে গ্রামের তরুণদের বিনা মূল্যে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেন তিনি। রায়হানের দাবি, তাঁর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে কয়েকজন তরুণ এখন মাসে এক থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন। তাঁদের একজন রিপন হোসেন জানান, রায়হানের দেওয়া প্রশিক্ষণ ও অনুপ্রেরণা তাঁকে স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করেছে।

ফ্রিল্যান্সিংয়ে পেয়েছেন পুরস্কার
ফ্রিল্যান্সিং খাতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২১ সালে বেসিস আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ড এবং ২০২৩ সালে রাইজিং ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন রায়হান। নিজের শুরুর দিনগুলোর কথা মনে করে তিনি বলেন, পরিবারের ত্যাগ ও নিজের পরিশ্রম তাঁকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে। এখন তাঁর লক্ষ্য, নিজের সাফল্যের পাশাপাশি আরও তরুণ-তরুণীকে দক্ষ করে গড়ে তোলা এবং তাঁদের স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করা। মায়ের দুটি ছাগল ও বাবার একটি ঘর বিক্রির টাকায় কেনা পুরোনো কম্পিউটার থেকে শুরু হওয়া রায়হানের এই পথচলা এখন অনেক তরুণের কাছে অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছে।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

চা পাতার বদলে বাঁশপাতা, চমক দুই শিক্ষার্থীর

রংপুর সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৫৮ পূর্বাহ্ণ
চা পাতার বদলে বাঁশপাতা, চমক দুই শিক্ষার্থীর

চা তৈরির জন্য সাধারণত চা গাছের পাতার কথাই সবার আগে মনে আসে। তবে চায়ের বিকল্প উপাদান হিসেবে বাঁশপাতা ব্যবহারের নতুন সম্ভাবনা দেখিয়েছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) দুই শিক্ষার্থী। বাঁশপাতা থেকে পরিবেশবান্ধব চা উৎপাদনের উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক ধারণা উপস্থাপন করে জাতীয় পর্যায়ের এক প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করেছেন তাঁরা।

বিজয়ী দুই শিক্ষার্থী হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের ১৪তম ব্যাচের মাইদুল ইসলাম মাহিদ ও আজিজুল ইসলাম। তাঁদের এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হবে এক লাখ টাকার তহবিল। গত বুধবার (২৮ অক্টোবর) রাজধানীর মোহাম্মদপুরে আয়োজিত প্রতিযোগিতায় ২৩৯টি দলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তাঁরা এ সাফল্য অর্জন করেন।

২৩৯ দলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সেরা
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাঁশপাতার সম্ভাবনাময় ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব পণ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এ উদ্যোগের পরিকল্পনা করেন মাইদুল ইসলাম মাহিদ। পরে সহপাঠী আজিজুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য আবেদন করেন তিনি।

প্রাথমিক বাছাইপর্বে উত্তীর্ণ হওয়ার পর তাঁরা বুটক্যাম্পে অংশ নেন। সেখানে নিজেদের ব্যবসায়িক ধারণা আরও পরিমার্জন করে চূড়ান্ত পর্বে উপস্থাপন করেন। শেষ পর্যন্ত ২৩৯টি দলের মধ্যে তাঁদের ধারণাটি বিচারকদের কাছে সেরা হিসেবে বিবেচিত হয়। বিজয়ী শিক্ষার্থীরা জানান, প্রতিযোগিতার বিচারক প্যানেলে ইউনিলিভার, গ্রিন ভয়েস, দ্য আর্থ সোসাইটি ও ব্রিটিশ হাইকমিশনের প্রতিনিধিরা ছিলেন।

বাঁশপাতার গুণাগুণ কাজে লাগানোর পরিকল্পনা
মাইদুল ইসলাম মাহিদ বলেন, বাংলাদেশে বাঁশপাতা ব্যবহার করে চা উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়ে তাঁরা চিন্তাভাবনা করছিলেন। বিশ্বজুড়ে এ ধরনের সম্ভাবনাময় পণ্যের বাজার রয়েছে। সেই ভাবনা থেকেই আজিজুলকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিযোগিতায় আবেদন করেন। পরে নির্বাচিত হয়ে বুটক্যাম্পে অংশ নেন এবং শেষ পর্যন্ত প্রথম স্থান অর্জন করেন। তিনি আরও বলেন, বাঁশ পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাকৃতিক সম্পদ। বাঁশপাতায় সিলিকা, পটাশিয়ামসহ বিভিন্ন উপাদান ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। এসব সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে তাঁরা পরিবেশবান্ধব চা বাজারে আনতে চান।

বাণিজ্যিক সম্ভাবনার পাশাপাশি প্রয়োজন গবেষণা
উদ্যোক্তাদের ধারণা, বাঁশপাতার চা স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের জন্য বিকল্প পানীয় হিসেবে বাজারে সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। পরিবেশবান্ধব পণ্য হিসেবে এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে বাঁশপাতার চায়ের পুষ্টিগুণ, স্বাস্থ্যগত উপকারিতা এবং নিয়মিত পান করার নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে আরও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের উপযোগিতা, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলোও যাচাই করতে হবে।

শিক্ষার্থীদের অর্জনে গর্বিত বিভাগ
দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. আবু রেজা মো. তৌফিকুল ইসলাম বলেন, পরিবেশবান্ধব চা তৈরির উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক ধারণা উপস্থাপন করে জাতীয় পর্যায়ে প্রথম স্থান অর্জন করায় বিভাগের দুই শিক্ষার্থীকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন তাঁরা। তাঁদের এই গৌরবময় অর্জন বিভাগের জন্য অত্যন্ত আনন্দ ও গর্বের। বাঁশপাতা থেকে চা তৈরির এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রচলিত চায়ের বাইরে নতুন একটি বিকল্প পণ্য বাজারে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে তরুণদের উদ্ভাবনী উদ্যোগের নতুন দৃষ্টান্তও তৈরি হতে পারে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি