সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক এখন গলার কাঁটা
‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ এখন রীতিমতো গলার কাঁটা। কার্যক্রম পূর্ণমাত্রায় চালু না হওয়া, প্রত্যাশিত আর্থিক স্থিতিশীলতা না আসা এবং অংশীদার ব্যাংকগুলোর একে একে সরে দাঁড়ানোর আগ্রহ-সব মিলিয়ে এই বৃহৎ উদ্যোগটি ভেঙে যাওয়ার শঙ্কা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। এখাখানে সমাধানের চেয়ে চ্যালেঞ্জ বেশি।
জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর একীভূতকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে জোরালো ভূমিকা রাখেন। গত বছরের ২১ ডিসেম্বর পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক দুর্বল ব্যাংক- এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ গঠন করা হয়। মূল লক্ষ্য ছিল ভঙ্গুর ব্যাংকগুলোকে এক ছাতার নিচে এনে পুনর্গঠন করা, তারল্য সংকট কাটিয়ে ওঠা এবং গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। বর্তমান গভর্নরও ব্যাংক সংস্কারের বিষয়ে একমত হলেও এখনো এ ব্যাপারে কোনো কার্যকরী উদ্যোগ নিতে পারেননি। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে পাঁচ ব্যাংকে ৪০ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও তা দিতে বিলম্ব হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই একীভূত উদ্যোগ শুরু থেকেই ছিল উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, একীভূত হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট পাঁচটি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪৮ শতাংশ থেকে ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত। মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। মোট ঋণ প্রায় ১ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশই অনাদায়ী। এমন পরিস্থিতিতে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একত্রিত করলেও সমস্যার মূল কাঠামো পরিবর্তন না হলে টেকসই সমাধান পাওয়া কঠিন, এমনটাই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
অর্থনীতি বিশ্লেষক মো. মাজেদুল হক মনে করেন, সরকার দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সহায়তায় বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দিলেও কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যায়নি। তার মতে, আস্থা সংকট কাটাতে হলে স্বচ্ছ ও সক্ষম উদ্যোক্তাদের হাতে ব্যাংক পরিচালনার দায়িত্ব দিতে হবে এবং দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো জরুরি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একীভূতকরণের প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচ ব্যাংকে এরই মধ্যে বড় ধরনের মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। নতুন ব্যাংকের মূলধন হচ্ছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দেবে ২০ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চাঁদার টাকায় গড়ে ওঠা বাংলাদেশ ব্যাংকের আমানত বীমা তহবিল থেকে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা শেয়ারে রূপান্তরিত করা হবে। বাকি সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকে শেয়ারে রূপান্তরিত করা হবে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা। বর্তমানে ব্যাংকটিতে প্রায় ৯১ লাখ ৫০ হাজার হিসাব রয়েছে। কর্মীর সংখ্যা ১৫ হাজারের বেশি। অর্থাৎ এই ব্যাংকের ভবিষ্যৎ সরাসরি বিপুলসংখ্যক গ্রাহক ও কর্মীর জীবনের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু বাস্তবতা হলো- অনেক শাখায় গ্রাহকের উপস্থিতি কমেছে, নতুন আমানত জমার প্রবণতা হ্রাস পেয়েছে, টাকা উত্তোলনে সীমাবদ্ধতা থাকায় ভোগান্তি বাড়ছে, বারবার নীতিগত পরিবর্তনে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
কালের আলো/এম/এএইচ


আপনার মতামত লিখুন
Array