দুর্নীতিমুক্ত পার্বত্য অঞ্চল গড়ে তোলার ঘোষণা প্রতিমন্ত্রী মীর হেলালের
ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন বলেছেন, নির্বাচনের আগে পার্বত্য তিন জেলায় যেরকম দুর্নীতি, অনিয়ম, লুটপাট ও অবহেলা করা হয়েছে, জনগণের নির্বাচিত বর্তমান সরকারের সময়ে তা আর ইনশাআল্লাহ হতে দেওয়া হবে না। পাহাড়ি-বাঙালি মিলে যারা এই বাংলাদেশকে একটি ‘রংধনু জাতি’ হিসেবে বিশ্বের বুকে পরিচিত করে তুলেছেন, তাদের আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।
শনিবার (২৭ জুন) রাজধানীর বেইলি রোডে অবস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্স অডিটোরিয়ামে ‘পাহাড়ি ফলের ঘ্রাণ, বৈচিত্র্যময় প্রাণ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য ‘পাহাড়ি ফল মেলা ২০২৬’।
ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বের কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলাল আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সবার আগে বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যকে সার্থক করতে পাহাড় ও সমতলের মানুষের সমন্বয়ে পার্বত্য অঞ্চলের জীবনমান ও অবকাঠামোগত উন্নয়নকে আমরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করে যাবো। অতীতে বিভিন্ন স্কিমের নাম করে তিন পার্বত্য জেলায় এক হাজার ৭৪টি নামকাওয়াস্তে বা ছোট ছোট প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল, যা কোনো বাস্তবসম্মত উন্নয়ন আনেনি।
ভবিষ্যতে এ ধরনের অনর্থক স্কিম দেওয়া-নেওয়ার হার কমিয়ে আনা হবে এবং বাস্তবসম্মত ও গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে প্রকৃত উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে।
পার্বত্য অঞ্চলের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো খাতের আমূল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলাল তার বক্তব্যে বলেন, স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নের লক্ষ্যে স্কুলগামী কন্যাশিক্ষার্থী, প্রসূতি মা ও বৃদ্ধদের ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রতি উপজেলায় নারীদের জন্য আরও একটি করে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে।
আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা যাতে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে, সেজন্য ই-লার্নিং শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল বলেন, দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের সুপেয় পানির সংকট দূর করতে সারফেস ওয়াটারকে (উপরিভাগের পানি) কাজে লাগিয়ে প্রতিটি অঞ্চলে সুপেয় পানির সুব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, পাহাড়ি কৃষকদের উৎপাদিত ফল ও কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব ‘ইকো-ফ্রেন্ডলি মিনি কোল্ড স্টোরেজ’ নির্মাণ করা হবে, যা কৃষকরা সমবায়ের বা সমিতির মাধ্যমে পরিচালনা করবেন। এ ছাড়া অবিক্রিত ফলগুলো দিয়ে ‘ড্রাই ফুড’ তৈরি করে দেশি-বিদেশি আন্তর্জাতিক বাজারে বিপণনের ব্যবস্থা করা হবে।
তিনি আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের কফি অত্যন্ত উচ্চমানের হওয়ায় কফি চাষকে আরও আকর্ষণীয় করতে কৃষকদের বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হবে। জুম চাষিরা যাতে একই জমিতে আরও বেশি ফসল ফলিয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারেন, সেজন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।
তিনি বলেন, পাহাড়ি পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্র্যান্ডিং করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় অধিবাসীদের সম্পৃক্ত করে ‘ইকো ট্যুরিজম’ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো হবে।
পার্বত্য জেলাগুলোতে ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও তথ্য কমপ্লেক্স গড়ে তোলা প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের কল্যাণে ডরমিটরি স্থাপন, তিনটি জেলায় মাল্টিপারপাস ক্রীড়া ও সংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র, রাঙামাটিতে একটি ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলায় আধুনিক ‘তথ্য কমপ্লেক্স’ গড়ে তোলা হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার সংসদ সদস্য আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, বান্দরবান পার্বত্য জেলার সংসদ সদস্য সাচিং প্রু এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মিসেস মাধবী মার্মা। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মনিরুল ইসলাম।
এ ছাড়াও অনুষ্ঠানে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) অনুপ কুমার চাকমা, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কৃষিবিদ কাজল তালুকদার, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক থানজামা লুসাই, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরাসহ মন্ত্রণালয় ও পরিষদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
তিন দিনব্যাপী আয়োজিত এ মেলায় বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি পার্বত্য জেলার দুর্গম অঞ্চল থেকে আগত মোট ৩০টি স্টল অংশ নিয়েছে। মেলা প্রাঙ্গণে পাহাড়ের সুস্বাদু মৌসুমি ফল আম, আনারস, কাঁঠাল, কলার পাশাপাশি দুর্লভ বুনো রক্তফল (রসকো), রাম্বুটান ও বুনোবেলের মতো বাহারি কেমিক্যালমুক্ত ফলের সমাহার ঘটেছে।
মেলাটি আগামী ২৯ জুন পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত থাকবে।
প্রতি সন্ধ্যায় মেলা প্রাঙ্গণে থাকছে পার্বত্য অঞ্চলের নৃগোষ্ঠীর স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনায় ঐতিহ্যবাহী মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
কালের আলো/এসআর/এএএন


আপনার মতামত লিখুন
Array