মা হওয়ার পর একজন নারীর জীবনে বদলে যায় অনেক কিছু। বদলায় জীবনযাপন, দায়িত্ব, ঘুমের সময়, মানসিকতার সঙ্গে বদলে যায় শরীরও। কিন্তু সেই স্বাভাবিক পরিবর্তনই যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রশ্ন ওঠে—একজন নারীকে কেন সন্তান জন্ম দেওয়ার পরও আগের শরীরের মাপে ফিরে যাওয়ার হিসাব দিতে হবে?
এই প্রশ্নই এবার জোরালোভাবে তুলেছেন বলিউড অভিনেত্রী পরিণীতি চোপড়া। সন্তান জন্মের পর নারীদের শরীরের পরিবর্তন, ওজন বৃদ্ধি কিংবা স্ট্রেচমার্ক নিয়ে কটাক্ষের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন তিনি। এমনকি নতুন মায়েদের শরীর নিয়ে ট্রোলিংকে ‘একেবারেই অশিক্ষিত’ মানসিকতা বলে মন্তব্য করেছেন অভিনেত্রী।
সম্প্রতি ‘জুম’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রসব-পরবর্তী শরীর নিয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি এবং নারী অভিনয়শিল্পীদের প্রতি বাড়তি নজরদারি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন পরিণীতি। নিজের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরে তিনি প্রশ্ন করেন—গর্ভধারণের ফলে শরীরে যে পরিবর্তন আসে, সেটিকে কেন সৌন্দর্যের নেতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হবে?
‘সন্তান জন্ম দেওয়ার পর স্ট্রেচমার্ক থাকলে অভিনন্দন জানানো উচিত’
পরিণীতির মতে, একজন নারীর শরীরে সন্তান জন্মের পর যে পরিবর্তন আসে, সেটিকে লুকানোর বা দ্রুত মুছে ফেলার বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়।
অভিনেত্রী উদাহরণ দিয়ে বলেন, কেউ জিম করে শরীরে পেশি তৈরি করলে মানুষ সেটিকে ইতিবাচকভাবে নেয়। কেউ সমুদ্রসৈকতে গিয়ে ত্বক তামাটে করে ফিরলে সেটিও স্বাভাবিকভাবে দেখা হয়। তাহলে সন্তান জন্মের পর একজন নারীর শরীরে পরিবর্তন এলে সেটিকে কেন নেতিবাচকভাবে দেখা হবে—এই প্রশ্নই তার।
পরিণীতির ভাষায়, “একজন নারীর দিকে তাকিয়ে যখন বলা হয়, ‘ওহ মাই গড, তুমি কি সন্তান জন্ম দিয়েছ?’ আর সে যখন বলে, ‘হ্যাঁ, আমার স্ট্রেচমার্ক দেখো, আমি সন্তান জন্ম দিয়েছি’, তখন আমার মনে হয়—‘বাহ, অভিনন্দন! তোমার সন্তান কেমন আছে?’”
তার প্রশ্ন, “এটা কখন নেতিবাচক হয়ে গেল?”
‘ছয় মাস পরই আগের চেহারায় ফিরতে হবে—এমন চাপ কেন?’
সন্তান জন্মের কয়েক মাসের মধ্যেই নারীদের আগের শারীরিক গঠনে ফিরে যাওয়ার প্রত্যাশাকেও প্রশ্ন করেছেন পরিণীতি।
তার মতে, মা হওয়ার পর একজন নারীর শরীরকে সময় দেওয়া প্রয়োজন। সন্তান জন্মের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে শরীর আগের মতো না হওয়ায় তাকে নিয়ে মন্তব্য করা বা চাপ তৈরি করা কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “কে আপনাকে অধিকার দিয়েছে একজন প্রসব-পরবর্তী নারীকে বলার—‘তোমার সন্তান হওয়ার ছয় মাস হয়ে গেছে, এবার আগের অবস্থায় ফিরে আসো’? আমি এটাকে একেবারেই অশিক্ষিত মানসিকতা মনে করি।”
পরিণীতির বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে একটি বিষয়—সন্তান জন্ম দেওয়া কোনো নারীর শরীরের ‘ত্রুটি’ তৈরি করে না। বরং শরীরে থাকা প্রতিটি পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে মাতৃত্বের অভিজ্ঞতা।
নিজের স্ট্রেচমার্ককে ‘সুন্দর’ মনে করেন পরিণীতি
নিজের শরীরের পরিবর্তন নিয়েও ইতিবাচক অবস্থানের কথা জানিয়েছেন এই অভিনেত্রী।
তিনি বলেন, “আমি আমার স্ট্রেচমার্কের দিকে তাকিয়ে ভাবি—আমি জানি কেন এগুলো হয়েছে। কারণ আমি একটি সন্তান জন্ম দিয়েছি। আমার কাছে এটা খুবই সুন্দর।”
তার প্রশ্ন, “কখন এবং কীভাবে শরীরের এই পরিবর্তন বা স্ট্রেচমার্ক নেতিবাচক হয়ে গেল, সেটাই আমার কাছে অদ্ভুত লাগে।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যারা নতুন মায়েদের শরীর নিয়ে মন্তব্য করেন, তাদের এসব কথা গুরুত্ব না দেওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি। তার মতে, অন্যের শরীর নিয়ে মন্তব্য করার পরিবর্তে মানুষের নিজের জীবন নিয়েই ব্যস্ত থাকা উচিত।
নারী-পুরুষের ক্ষেত্রে কেন আলাদা মাপকাঠি?
শুধু প্রসব-পরবর্তী শরীর নিয়েই নয়, বলিউডে নারী ও পুরুষ শিল্পীদের জন্য আলাদা সামাজিক মাপকাঠি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন পরিণীতি।
তার মতে, বিয়ের পর কোনো নারী অভিনয়শিল্পী যদি একটু অগোছালো বা ‘মেসি’ ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেন, তখনও তাকে নিয়ে নানা মন্তব্য শুরু হয়। কিন্তু একই ধরনের চরিত্রে কোনো পুরুষ অভিনয় করলে বিষয়টি নিয়ে সাধারণত এতটা আলোচনা হয় না।
এই দ্বৈত মানসিকতার বিরুদ্ধেই সরব হয়েছেন তিনি। তার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে, নারী অভিনয়শিল্পীদের ব্যক্তিগত জীবন, শরীর, বিয়ে, মাতৃত্ব—প্রতিটি বিষয় নিয়েই যেন বাড়তি বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়।
ক্যাটরিনাকে ঘিরে ট্রোলিংয়ের প্রসঙ্গও উঠে এসেছে
পরিণীতির এই মন্তব্যের সময় স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসেছে আরেক বলিউড অভিনেত্রী ক্যাটরিনা কাইফের প্রসঙ্গ।
সন্তান জন্মের পর সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে ক্যাটরিনার উপস্থিতির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তার চেহারা ও ওজন নিয়ে নানা মন্তব্য করেন কিছু নেটিজেন। বিষয়টি নিয়ে বলিউডের কয়েকজন তারকাও ক্যাটরিনার পাশে দাঁড়ান। সালমান খানও প্রকাশ্যে এই ধরনের মন্তব্যের সমালোচনা করেছেন।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই পরিণীতির বক্তব্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে। কারণ তিনিও সন্তান জন্মের পর কাজে ফিরেছেন এবং নিজের শরীরের পরিবর্তন নিয়ে জনসমক্ষে কথা বলতে পিছপা হননি।
মা হওয়ার পর নতুন কাজে ফিরলেন পরিণীতি
২০২৫ সালে ছেলে নীরের মা হন পরিণীতি চোপড়া। মাতৃত্বের পর এবার অভিনয়ে ফিরেছেন তিনি। তার নতুন থ্রিলার সিরিজ ‘শক: ট্রাস্ট নো ওয়ান’ ২৪ সেপ্টেম্বর নেটফ্লিক্সে মুক্তি পেয়েছে। এটি মা হওয়ার পর তার প্রথম প্রজেক্ট।
সিরিজটির গল্প আবর্তিত হয়েছে এক মাকে ঘিরে, যার সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর দীর্ঘ নয় বছর ধরে সে সত্যের সন্ধান চালিয়ে যায়। যতই সময় গড়ায়, ততই সামনে আসতে থাকে নানা গোপন তথ্য ও সম্পর্কের জটিলতা।
রেনসিল ডি’সিলভা ও সিদ্ধার্থ পি. মালহোত্রার নির্মিত এই সিরিজে পরিণীতির সঙ্গে অভিনয় করেছেন জেনিফার উইঙ্গেট, তাহির রাজ ভাসিন, সোনি রাজদান, সুমিত ব্যাসসহ আরও অনেকে।
‘মা হওয়ার পর শরীর বদলাবে, এটাই স্বাভাবিক’
পরিণীতির বক্তব্য শুধু নিজের শরীর নিয়ে নয়, বরং সন্তান জন্মের পর প্রতিটি নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও একটি বড় প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে।
একজন নারী সন্তান জন্ম দেওয়ার পর তার শরীরে ওজন বাড়তে পারে, স্ট্রেচমার্ক দেখা দিতে পারে, আগের মতো শারীরিক গঠন নাও থাকতে পারে—এসবই মাতৃত্ব-পরবর্তী পরিবর্তনের অংশ। সেই পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে কটাক্ষ বা দ্রুত আগের চেহারায় ফিরে যাওয়ার চাপ তৈরি করার বদলে একজন নতুন মাকে সময় ও সম্মান দেওয়া উচিত—এটাই মূলত বলতে চেয়েছেন পরিণীতি।
তার নিজের ক্ষেত্রেও শরীরের পরিবর্তনকে তিনি কোনো নেতিবাচক বিষয় হিসেবে দেখছেন না। বরং স্ট্রেচমার্ককে সন্তান জন্ম দেওয়ার স্মৃতি হিসেবেই দেখছেন।
আর তাই তার প্রশ্নটি খুব সরল—যে শরীর একটি নতুন প্রাণকে পৃথিবীতে এনেছে, সেই শরীরের পরিবর্তনকে কেন লজ্জার বিষয় হিসেবে দেখা হবে?
মাতৃত্বের পর নিজের অভিজ্ঞতা থেকে পরিণীতি যে বার্তা দিয়েছেন, তা শুধু বলিউডের নারী তারকাদের জন্য নয়; বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের শরীর নিয়ে মন্তব্য করা প্রত্যেকের জন্যই একটি ভাবনার জায়গা তৈরি করেছে।
কালের আলো/জেএন
আপনার মতামত লিখুন
Array