রাজনীতির মাঠে একই সুরের দুটি দৃশ্য। একটি শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের নান্দাইলের চৌরাস্তা। আর দ্বিতীয়টি বিকেলে জামালপুর শহর। দুই মঞ্চ, দুই জেলা—কিন্তু তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এমপির বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল একটি বার্তাই—দেশকে অস্থিতিশীল করার কোনো চেষ্টাই মেনে নেওয়া হবে না। তাঁর বক্তব্যে একইসঙ্গে এসেছে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে সতর্কবার্তা, অতীত সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচার, অর্থ পাচারের প্রসঙ্গ এবং দেশের উন্নয়ন-স্থিতিশীলতা ধরে রাখার দৃঢ় প্রত্যয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে দুই দফা রাজপথের কর্মসূচিতে প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে বারবার ফিরে এসেছে একটি শব্দ—স্থিতিশীলতা।
- নান্দাইল ও জামালপুরে পৃথক সমাবেশ-মিছিল
- শেখ হাসিনাকে সতর্কবার্তা
- বিচারের প্রত্যয় ও প্রতিরোধের ঘোষণা
‘ডিসেম্বরে নয়, এখনই আসুন’
এদিন দুপুরে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের নান্দাইল চৌরাস্তা চত্বরে উপজেলা ও পৌর বিএনপির আয়োজনে পরিকল্পিত সন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টার প্রতিবাদে বিক্ষোভ-পূর্ব সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন ইয়াসের খান চৌধুরী। শুরুতেই কঠোর সীমারেখা টেনে বলেন, ‘দেশকে অস্থিতিশীল করার যেকোনো অপচেষ্টা কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ডে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’ এরপর শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে তাঁর সরাসরি বক্তব্য, ‘নৈরাজ্যকারী শেখ হাসিনা আবারও দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য ডিসেম্বরে দেশে আসার পাঁয়তারা করছেন। আমরা বলতে চাই, ডিসেম্বরে না এসে এখনই আসুন। সাবধান হয়ে যান, অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করবেন না। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

’ইতিহাস টেনে বর্তমানের বার্তা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ভিডিও তৈরি ও হুমকি দিয়ে দেশের উন্নয়নের ধারা বাধাগ্রস্ত করা যাবে না বলেও মন্তব্য করেন প্রতিমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে ফিরে আসে ইতিহাসের চারটি বাঁক—১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান। তাঁর ভাষ্যে, এসব আন্দোলন দমিয়ে রাখা যায়নি। গত ১৭ বছর জনগণের ভোটের অধিকার হরণ করা হয়েছিল অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের জনগণ বিএনপির ওপর আস্থা রেখে তাদের ক্ষমতায় এনেছে।’ বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
‘প্রত্যেককে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে’
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের গত ১৭ বছরের শাসনামল প্রসঙ্গে ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, ‘নিরীহ মানুষের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন, খুন, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। মা-বোনদের সন্তানদের গুলি করে হত্যার অভিযোগও রয়েছে। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের প্রত্যেককে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।’
সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মিজানুর রহমান লিটন, সদস্য সচিব এনামুল কাদির, যুগ্ম আহ্বায়ক বাবু পল্লব রায়, পৌর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম ফকির, সদস্য সচিব রফিকুজ্জামান ভূঁইয়া মনি, পৌর বিএনপি নেতা হাসনাত মাহমুদ তালহাসহ বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। পরে প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল পৌর শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
জামালপুরে ‘হাজার হাজার কোটি’র অভিযোগ
নান্দাইলের রাজপথের উত্তাপ পেরিয়ে বিকেলে জামালপুর শহরে জেলা বিএনপি কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত সমাবেশে যোগ দেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী। এবার তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে আসে অর্থ লুটপাট ও বিদেশে পাচারের অভিযোগ। তিনি বলেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার বিভিন্ন সেতু ও ওভারপাস নির্মাণসহ বিভিন্ন প্রকল্পের নামে জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে বিদেশে পাচার করেছে। প্রতিমন্ত্রীর ভাষায়, ‘লুটপাটের মাধ্যমে অর্জিত জনগণের সম্পদ তারা বিদেশে পাচার করেছে। এখন তারা দেশে অস্থিতিশীলতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে।’
‘জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ’
জামালপুরের মঞ্চেও ফিরে আসে সেই একই সতর্কতা। তিনি বলেন, ‘দেশে কোনো ধরনের সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও অস্থিতিশীলতার সুযোগ দেওয়া হবে না। যারা দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।’ দেশের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা বাধাগ্রস্ত করতে যেকোনো ষড়যন্ত্র ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান ইয়াসের খান চৌধুরী।
জেলা বিএনপির সভাপতি ও সংসদ সদস্য ফরিদুল কবীর তালুকদার শামীমের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শাহ মো. ওয়ারেছ আলী মামুন, সংসদ সদস্য এ কে এম সুলতান মাহমুদ বাবু, জেলা পরিষদের প্রশাসক সিরাজুল হক, জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি লোকমান আহমেদ খান লোটন, সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক খন্দকার আহসানুজ্জামান রুমেল, সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি শফিউর রহমান সাফি, সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন মিলন, সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুল ইসলাম খান সাজিব, পৌর বিএনপির সভাপতি লিয়াকত আলী ও সাধারণ সম্পাদক শাহ আবদুল্লাহ আল মাসুদ। সমাবেশ শেষে মিছিলটি শহরের প্রধান সড়ক ঘুরে তমালতলায় গিয়ে শেষ হয়।
কালের আলো/এমএএএমকে
আপনার মতামত লিখুন
Array