মেধাবীদের শিক্ষকতায় টানতে ঢেলে সাজছে শিক্ষাব্যবস্থা
শিক্ষকতা কোনো ‘উপায়হীন বিকল্প’ নয়; দেশের সবচেয়ে মেধাবী মানুষটি যাতে কর্মজীবনের শুরুতেই শিক্ষকতাকে প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নেন, সেই লক্ষ্যেই শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে শিক্ষকদের বেতন ও অবসরভাতা পেতে অফিসে অফিসে ঘোরাঘুরি বন্ধ করে যথাসময়ে ব্যাংকের মাধ্যমে প্রাপ্য অর্থ পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারকে শিক্ষকের প্রতিদ্বন্দ্বী না বানিয়ে শিক্ষকতার সক্ষমতা বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারেরও ঘোষণা দিয়েছেন সরকারপ্রধান।
সোমবার (০৫ অক্টোবর) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে নিজ নিজ মেধা ও যোগ্যতায় নির্বাচিত দেশের বিভিন্ন স্তরের ১০১ জন গুণী শিক্ষককে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়া হয়। তাঁদের প্রত্যেককে ২ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র দেওয়া হয়।
- ‘উপায়হীন বিকল্প’ নয় : প্রধানমন্ত্রী
- বেতন-পেনশনে হয়রানি বন্ধের নির্দেশ
- ‘এআই হবে শিক্ষকের শক্তি’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শিক্ষকতা পেশা কখনোই ‘উপায়হীন বিকল্প’ বা একটি সাধারণ চাকরির মতো হতে পারে না। শিক্ষা-দীক্ষায় সবচেয়ে মেধাবী মানুষটি যাতে কর্মজীবনে শিক্ষকতাকে প্রথম অগ্রাধিকার হিসেবে বেছে নিতে আগ্রহী হন, সরকার শিক্ষাব্যবস্থাকে সেভাবেই ঢেলে সাজাচ্ছে।’ শিক্ষকতার পেশাগত মর্যাদা পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি শিক্ষকদের সামাজিক অবস্থানকেও গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে—শিক্ষককে শুধু শ্রেণিকক্ষের কর্মী হিসেবে নয়, রাষ্ট্র ও সমাজ নির্মাণের অন্যতম প্রধান কারিগর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

রাষ্ট্রের ভাবমূর্তির সঙ্গে শিক্ষকের মর্যাদা
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্র ও সমাজে শিক্ষকদের মর্যাদার সঙ্গে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি জড়িত। সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকলে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিও বাড়ে। জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষকদের দৃশ্যমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দিবসের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অন্তত একজন করে শিক্ষককে বাধ্যতামূলকভাবে আমন্ত্রণ জানানোর নির্দেশনার কথাও জানান তিনি। এ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে শিক্ষকতার সামাজিক মর্যাদাকে আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির সঙ্গে যুক্ত করার একটি বার্তা দিয়েছেন সরকারপ্রধান।
বেতন-পেনশনে আর ঘুরতে হবে না
শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্নে কড়া অবস্থান নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অবসরভাতা পেতে প্রশাসনিক জটিলতা ও হয়রানির বিষয়টি সামনে এনে তিনি সংশ্লিষ্টদের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একজন শিক্ষককে তার বেতন কিংবা অবসরভাতার জন্য কষ্ট করে অফিসে ঘোরার প্রয়োজন নেই।
যথানিয়মে যথাসময়ে তার প্রাপ্য অর্থ ব্যাংকের মাধ্যমেই তার কাছে পৌঁছে দিতে হবে। আমি ইতোমধ্যে এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছি।’ শিক্ষকদের মর্যাদা নিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতি তখনই বাস্তব অর্থ পাবে, যখন কর্মরত শিক্ষক যেমন নিয়মিত বেতন পাবেন, তেমনি অবসরের পরও তাঁর প্রাপ্য অর্থ পেতে কোনো ধরনের প্রশাসনিক ভোগান্তিতে পড়তে হবে না।
প্রযুক্তি হবে শিক্ষকের শক্তি
এআইয়ের দ্রুত বিস্তারের যুগে শিক্ষকতার ভবিষ্যৎ নিয়েও সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রযুক্তিকে শিক্ষকতার বিকল্প হিসেবে দেখা হবে না; বরং প্রযুক্তি শিক্ষকের সক্ষমতা বাড়াবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রযুক্তিকে আমরা শিক্ষকের বিকল্প হিসেবে দেখতে চাই না, বরং প্রযুক্তি হবে শিক্ষকের শক্তি।’
এই লক্ষ্যেই ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একজন শিক্ষক তাঁর ট্যাবের মাধ্যমে ডিজিটাল লেসন প্ল্যান, প্রশ্নব্যাংক এবং শিক্ষার্থীর শেখার অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে পারবেন। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম সম্প্রসারণ ও ফ্রি ওয়াই-ফাই সুবিধা বাড়ানোর কথাও জানান তিনি। প্রযুক্তির ব্যবহারকে কেবল ডিজিটাল সরঞ্জাম সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষকের পাঠদান ও মূল্যায়ন সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করাই এ উদ্যোগের বড় দিক।

‘কেন’ ও ‘কীভাবে’ প্রশ্নের শিক্ষা
মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে শিক্ষার্থীর চিন্তা ও অনুসন্ধানী মনোভাব গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, শিক্ষার্থীর মনে ‘কেন’ এবং ‘কীভাবে’—এমন প্রশ্ন জাগিয়ে তুলতে হবে। শিখন কৌশল হিসেবে আনন্দময় শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবার প্রথমবারের মতো ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের হাতে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ শিরোনামের নতুন বই তুলে দেওয়ার কথা জানান তিনি।
পর্যায়ক্রমে অন্য শ্রেণিতেও বইটি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও মুখস্থনির্ভর পদ্ধতি থেকে বের করে শিক্ষার্থীর কৌতূহল, সৃজনশীলতা ও চিন্তাশক্তিকে গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
চাকরির জন্য নয়, মানুষ তৈরির শিক্ষা
কর্মমুখী শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করলেও প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন, শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল কর্মসংস্থান নয়। নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনকেও তিনি শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শুধু কর্মসংস্থানই শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য নয়, বরং নৈতিকতা ও চরিত্র গঠন শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। জ্ঞান যদি নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত না হয়, তাহলে সেই জ্ঞান সমাজের কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণের কারণ হতে পারে।’ অর্থাৎ দক্ষ জনশক্তি তৈরির পাশাপাশি দায়িত্বশীল, নৈতিক ও মানবিক নাগরিক গড়ে তোলার বিষয়টিও শিক্ষা সংস্কারের কেন্দ্রে রাখতে চান তিনি।
শহর-গ্রামের বৈষম্য কমানোর লক্ষ্য
শিক্ষা খাতকে সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ড্রপআউট হলেও যেন কোনো শিক্ষার্থী বেকার না থাকে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেন তিনি। একই সঙ্গে শহর ও গ্রামের শিক্ষায় বৈষম্য দূর করে সব শিক্ষার্থীকে সমান সুযোগ ও মানসম্মত শিক্ষা দেওয়ার লক্ষ্য তুলে ধরেন সরকারপ্রধান। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার অবকাঠামো, প্রযুক্তি, শিক্ষকতার মান এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প দক্ষতা তৈরির সুযোগ—সবকিছুকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
১০১ গুণী শিক্ষক পেলেন রাষ্ট্রীয় সম্মাননা
বিশ্ব শিক্ষক দিবসে জাতি গঠনে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দেশের বিভিন্ন স্তরের ১০১ জন গুণী শিক্ষককে সম্মাননা দেওয়া হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ১০ জন, মাধ্যমিক পর্যায়ে ২০ জন, কলেজ পর্যায়ে ২৫ জন, সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০ জন, চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ জন, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ জন, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ জন এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪ জন এ সম্মাননা পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচিত আরও ৬ জন শিক্ষকও সম্মাননার আওতায় রয়েছেন।
প্রাথমিক পর্যায়ের ১০ জনের মধ্যে সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৮ জন ও মাদ্রাসার ২ জন রয়েছেন। মাধ্যমিক পর্যায়ের ২০ জনের মধ্যে সাধারণ মাধ্যমিকের ১০ জন, কারিগরি শিক্ষার ৫ জন এবং মাদ্রাসার ৫ জন। কলেজ পর্যায়ে সাধারণ শিক্ষার ১৫ জন, কারিগরি শিক্ষার ৫ জন এবং মাদ্রাসার ৫ জন শিক্ষক সম্মাননা পেয়েছেন। সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ জনের মধ্যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮ জন এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ জন শিক্ষক রয়েছেন। চিকিৎসা শিক্ষায় ৫ জন চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় ও ৫ জন চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে সম্মাননা দেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. সেলিম ভূঁইয়া এমপি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, শিক্ষক প্রতিনিধি এবং সম্মাননাপ্রাপ্ত শিক্ষকরাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
কালের আলো/এমএএএমকে

আপনার মতামত লিখুন
Array