মোটরযান থেকে উচ্চগতির রেল, জাপানি বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী
বাংলাদেশের পাঁচটি অগ্রাধিকার খাতে বিনিয়োগের জন্য জাপানি কোম্পানিগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। খাতগুলো হলো মোটরযান উৎপাদন, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ সহযোগিতা, রেলপথ ও সরবরাহব্যবস্থা এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উৎপাদনশিল্প। দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) স্থানীয় সময় বিকালে টোকিওর জাপান বৈদেশিক বাণিজ্য সংস্থার (জেট্রো) হলে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরাম সংলাপে মূল বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
৩০–৫০ বছরের অংশীদারত্ব গড়ার আহ্বান
তারেক রহমান বলেন, আগামী ৩০ থেকে ৫০ বছরের সহযোগিতা ও অংশীদারত্বের লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ ও জাপানকে এগিয়ে যেতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩৫০টি জাপানি কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে দেশটিতে জাপানের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের পরিমাণ এখনও ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের কম। ফলে বিদ্যমান অর্থনৈতিক সম্পর্কের সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানোর উল্লেখযোগ্য সুযোগ রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নয়ন সহযোগিতার পাশাপাশি বাণিজ্য সম্প্রসারণ, শিল্পকারখানা স্থাপন ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে আরও শক্তিশালী বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগ অংশীদারত্বে রূপান্তরের সময় এসেছে।
বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদ
দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের তথ্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, সর্বশেষ অর্থবছরে জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিল ১৩৬ কোটি মার্কিন ডলার। একই সময়ে জাপান থেকে বাংলাদেশ ২১৬ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়াতে নতুন সুযোগ অনুসন্ধানের আহ্বান জানান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, চলতি বছর বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো দেশের এটিই প্রথম এ ধরনের চুক্তি। এর আওতায় বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। অন্যদিকে, ইস্পাত, মোটরযানের যন্ত্রাংশ ও ইলেকট্রনিক উপাদানসহ জাপানি পণ্য বাংলাদেশে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা পাবে।
চুক্তিটি দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে নতুন সুযোগ তৈরি করবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তরুণ শ্রমশক্তি ও বড় বাজারে বিনিয়োগের সম্ভাবনা
বাংলাদেশের বাজার ও শ্রমশক্তির সম্ভাবনা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ১৮ কোটিরও বেশি মানুষের বাজার, গড়ে ২৭ বছর বয়সী তরুণ শ্রমশক্তি এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ১০টি ভোক্তা অর্থনীতির একটি হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে জাপানি কোম্পানিগুলো উৎপাদন, প্রযুক্তি ও শিল্প খাতে বিনিয়োগ করতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মোটরযান উৎপাদন ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ
মোটরযান উৎপাদন খাতে বাংলাদেশের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, চলতি মাসের শুরুর দিকে টয়োটা বাংলাদেশে একটি যানবাহন উৎপাদন কারখানা স্থাপনের কাজ শুরুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। ২০২৯ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন শুরুর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। উদ্যোগটিকে স্বাগত জানিয়ে টয়োটাকে সরকারের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি। পাশাপাশি এ খাতে অন্য জাপানি কোম্পানিগুলোরও বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন।
জ্বালানি খাতে জাপানি কোম্পানিগুলোকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) অবকাঠামো, দক্ষ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সামগ্রিক জ্বালানি খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। এসব পরিকল্পনায় বিনিয়োগের সুযোগ অনুসন্ধান করতে পারে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো। এ ক্ষেত্রে জাপানের জ্বালানি কোম্পানি জেরা (জেইআরএ)-এর সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।
প্রযুক্তি, মহাকাশ ও স্যাটেলাইটে সহযোগিতা
মহাকাশবিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও স্যাটেলাইট প্রকৌশলে জাপানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন তারেক রহমান। এসব ক্ষেত্রে জাপানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতার সুযোগ অনুসন্ধান করতে চায় বাংলাদেশ।
প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও শিল্প সক্ষমতা বাড়াতে দুই দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
ছয় প্রধান শহরকে যুক্ত করে উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্কের পরিকল্পনা
রেলপথ ও সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশালসহ দেশের প্রধান শহরগুলোকে যুক্ত করে দেশব্যাপী উড়ালপথে উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে সরকার। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের প্রস্তুতিতে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর কারিগরি ও বিনিয়োগ সহায়তা চান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, প্রস্তাবিত রেল নেটওয়ার্কের জন্য জাতীয় রেল নেটওয়ার্কের মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাহিদা বিশ্লেষণ, রুটের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে জাপানের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা বাংলাদেশের পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং ভবিষ্যৎ অবকাঠামো উন্নয়নে কাজে লাগতে পারে।
কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল
কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উৎপাদনশিল্পে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের ফসল, ফলমূল ও শাকসবজি উৎপাদিত হয়। এসব কৃষিপণ্যকে কেন্দ্র করে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। এ খাতের সম্ভাবনা যাচাই করতে জাপানি কোম্পানিগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে অবস্থিত বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। সুমিতোমো করপোরেশন জাপানি মানদণ্ড অনুসরণ করে এ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছে। সেখানে বিনিয়োগের মাধ্যমে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করতে পারে।
ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে সরকারের অঙ্গীকার
বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনায় জাপানি কোম্পানিগুলোর উদ্বেগের বিষয়েও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ অবকাঠামো এবং শুল্ক ছাড় ও করব্যবস্থায় পূর্বানুমানযোগ্যতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে বলে জানান তিনি।
বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের কথা সরকার শুনেছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ব্যবসা পরিচালনার জন্য বিনিয়োগকারীদের নিশ্চয়তা প্রয়োজন। তাঁদের আস্থা অর্জন, ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন, বিদ্যমান সমস্যার সমাধান এবং বিনিয়োগের উপযোগী পরিস্থিতি তৈরি করা সরকারের দায়িত্ব।
জাপানি ভাষা ও কারিগরি দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্ব
দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ এবং দক্ষতা উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রতিবছর বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের জন্য জাপানে যান। পরে দেশে ফিরে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগান।
এ প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করতে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জাপানি ভাষা শেখানোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার। কারিগরি দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি লাখ লাখ তরুণকে জাপানি ভাষায় দক্ষ করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। জাপানি ভাষায় দক্ষ বাংলাদেশি পেশাজীবীরা দুই দেশের কর্মসংস্থানের চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
যৌথ বিনিয়োগ ও সহযোগিতার প্রত্যাশা
বাংলাদেশে শিল্পকারখানা স্থাপন, নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ সৃষ্টি এবং দুই দেশের যৌথ অগ্রযাত্রায় অংশ নিতে জাপানি কোম্পানিগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তোলার সময় জাপান পাশে ছিল। এখন শিল্পায়ন ও নতুন সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে আরও শক্তিশালী অংশীদারত্বে রূপান্তরের সময় এসেছে।
এর মাধ্যমে দুই দেশের জনগণের জন্য পারস্পরিক সুযোগ ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় জেট্রো এবং জাপান-বাংলাদেশ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিটির (জেবিসিসিইসি) যৌথ আয়োজনে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশ ও জাপানের ব্যবসায়ী নেতারা অংশ নেন এবং বিনিয়োগের সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন।
অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন জেট্রোর প্রেসিডেন্ট সুসুমু কাতাওকা। অতিথি বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পবিষয়ক সংসদীয় উপমন্ত্রী শিনজি ওয়াকায়ামা। এ সময় সমঝোতা স্মারক বিনিময়ের পাশাপাশি বিনিয়োগ ও সহযোগিতামূলক প্রকল্পের ঘোষণা দেওয়া হয়।
বাংলাদেশে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার বিষয়ে বক্তব্য দেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাংলাদেশে বিনিয়োগ সহজ করতে গৃহীত সংস্কার ও নতুন উদ্যোগগুলো তুলে ধরেন ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক।
কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]