খুঁজুন
                               
, ,
           

সেনাবাহিনীর শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে ধরা পড়লো শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদ

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৭ মে, ২০২৫, ১১:২৪ অপরাহ্ণ
সেনাবাহিনীর শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে ধরা পড়লো শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদ

কালের আলো রিপোর্ট:

বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০১ সালের ২৫ ডিসেম্বর ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম এবং তাঁদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে। এই তালিকায় প্রথম নামই ছিল ঢাকার অপরাধ জগতের ত্রাস সুব্রত বাইনের। সেভেন স্টার গ্রুপের এই প্রধানের নামে ইন্টারপোলেও নোটিশ দেওয়া হয়। এরপর সুব্রত ঢাকা ছেড়ে কলকাতায় ঘাঁটি গাড়েন। এরপর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সুকৌশলে দেশে ফিরে আসেন। সুব্রত বাইনের সঙ্গে আলোচনায় ছিলেন তাঁরই শিষ্য আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী মোল্লা মাসুদ। গুরু-শিষ্য মিলে পরিচয় গোপন করে কুষ্টিয়ার সোনার বাংলা মসজিদ এলাকার একটি বাড়িতে থাকতে শুরু করেন।

মঙ্গলবার (২৭ মে) ভোর ৫টা ১৫ মিনিটে কুষ্টিয়া শহরের সোনার বাংলা রোডের সেই বাড়িতে তিন ঘণ্টার এক শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদকে গ্রেপ্তার করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকার হাতিরঝিল এলাকা থেকে তাদেরই সহযোগী শুটার আরাফাত ও শরিফকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে ৫টি বিদেশি পিস্তল, ১০ টি ম্যাগজিন, ৫৩ রাউন্ড গুলি ও একটি স্যাটেলাইট ফোন উদ্ধার করা হয়।

এদিন বিকেলে রাজধানীর বনানীর সেনাসদরে আয়োজিত একটি সংবাদ সম্মেলনে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সামিউদ্দৌলা চৌধুরী বলেন, ‘কুষ্টিয়া ও হাতিরঝিল এলাকা থেকে অস্ত্রসহ শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদ ও দুজন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এটি আমাদের সেনাবাহিনীর দক্ষতা, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং জাতির প্রতি দায়িত্ববোধের একটি প্রশংসনীয় দৃষ্টান্ত।

তিনি বলেন, ‘ভোর পাঁচটা থেকে শুরু হওয়া কুষ্টিয়া এবং ঢাকার হাতিরঝিলে পরিচালিত সাঁড়াশি অভিযানে ৪৬ স্বতন্ত্র পদাতিক ব্রিগেডের একটি ইউনিট, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সফলভাবে দুইজন শীর্ষ তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী এবং তাদের দুইজন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে।’

আইএসপিআর পরিচালক আরও বলেন, ‘এই চক্রটি দেশের বিভিন্ন এলাকায় হত্যা, চাঁদাবাজি ও নাশকতা চালিয়ে আসছিল। সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদ ২০০১ সালে সরকার ঘোষিত তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ও সেভেন স্টার গ্রুপের মূল পরিকল্পনাকারী। এই অভিযান ছিল দীর্ঘদিনের গোয়েন্দা তথ্য ও পরিকল্পনার ফসল। অভিযানটি কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ও সংঘর্ষ ছাড়াই পরিচালিত হয়। যা আমাদের সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।’ এই অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় ও সহায়তা করেছে সেনা সদর, সামরিক অপারেশন পরিদপ্তর, ৫৫ ডিভিশন, ১৪ স্বতন্ত্র ইঞ্জিনিয়ার বিগ্রেড, ৭১ মেকানাইজ বিগ্রেড ও এনএসআই।

মীর মহিউদ্দিনের তিনতলা বাড়িতেই থাকতেন সুব্রত বাইন ও মাসুদ
কুষ্টিয়া পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সোনার বাংলা মসজিদ সড়কের মীর মহিউদ্দিনের তিনতলা বাড়ি। একদিন আগেও বাড়িটি তেমন পরিচিত ছিল না। মঙ্গলবার (২৭ মে) সেনাসদস্যরা ভোরে চারটি গাড়ি নিয়ে অভিযান চালিয়ে ভবন ঘিরে ফেলেন এবং নিচতলা থেকে দুজনকে আটক করেন। তখনও কেউই জানতো না আটকৃত দু’জন দেশের অপরাধজগতের শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদ। দীর্ঘদিন ধরেই যাদের প্রভাব রাজধানীর রাজপথ থেকে শুরু করে সরকারি প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। বহু বছর ধরে তাঁরা পালিয়ে থাকলেও দেশে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের ঘটনায় ঘুরেফিরে আলোচনায় উঠে আসেন। অত:পর তিন ঘণ্টাব্যাপী শ্বাসরুদ্ধকর এক অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয় সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদকে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে মুখ না খুললেও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে আসে আতঙ্ক ও চমকে ওঠার চিত্র। বাড়ির নিচতলায় প্রায় দেড় মাস ধরে ভাড়া থাকা দুজনের পরিচয় জানার পর এলাকায় ভয় ও উৎকণ্ঠার আবহ ছড়িয়ে পড়ে। সেই মেসের কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে নিচতলায় এক দাড়িওয়ালা অপরিচিত ব্যক্তিকে থাকতে দেখা যাচ্ছিল। তিনি দিনে একবার শুধু খাওয়ার সময় বাইরে বের হতেন। অভিযানের সময় সেনাসদস্যরা শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট দুটি কক্ষে বসিয়ে রাখেন এবং বারবার বলেন, ‘তোমাদের কোনো ভয় নেই।’

 

এক শিক্ষার্থী বলেন, সকাল ৮টার দিকে একটি কালো মাইক্রোবাস আসে। তখন সেনাসদস্যরা একজন দাড়িওয়ালা ব্যক্তিকে হাতকড়া পরিয়ে এবং অন্য এক যুবককে হাত বেঁধে গাড়িতে তোলেন। অভিযান শেষে একজন সেনা কর্মকর্তা শিক্ষার্থীদের বলেন, ‘এখন বললে ভয় পাবে। পরে মিডিয়ার মাধ্যমে সব জানতে পারবে।’

যেভাবে উত্থান শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের
রাজধানীর আন্ডারওয়ার্ল্ডে আলাদা প্রভাব রয়েছে সেভেন স্টার গ্রুপের। এই ‘সেভেন স্টার’ বাহিনীর প্রধান ছিলেন সুব্রত বাইন। পুলিশের খাতায় তাঁর পুরো নাম ত্রিমাতি সুব্রত বাইন। বহুদিন ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড কাঁপিয়ে ভারতের কারাগারে কিছু দিন বন্দী ছিলেন। সুব্রত বাইনের আদি নিবাস বরিশালের আগৈলঝাড়া থানার জোবারপাড় গ্রামে। তাঁর বাবা বিপুল বাইন ছিলেন একটি এনজিওর গাড়িচালক। মা কুমুলিনি আর তিন বোন মেরি, চেরি ও পরীকে নিয়ে ঢাকার মগবাজারের ভাড়া বাসায় থাকতেন। সুব্রত বাইন বড় সন্তান। ১৯৬৭ সালে জন্ম, হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে।

বরিশালে অক্সফোর্ড মিশন স্কুল নামে খ্রিষ্টান মিশনারি স্কুলে পড়াশোনা করেন সুব্রত বাইন। সেখানে হোস্টেলে থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। সেখানে ভালো না করায় তাঁকে ঢাকায় শেরেবাংলা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে এসএসসি। এরপর সিদ্ধেশ্বরী কলেজে ভর্তি হতে গিয়ে সেখানকার এক নেতার সঙ্গে পরিচয়। কলেজে ভর্তি হওয়া আর হয়নি তাঁর। তখন থেকে বইয়ের বদলে হাতে ওঠে অস্ত্র।

খুব অল্প দিনেই মগবাজারে একটি সন্ত্রাসী চক্র গড়ে ওঠে সুব্রতর নেতৃত্বে। ১৯৯৩ সালের দিকে মধুবাজার বাজারে সবজিবিক্রেতা খুন হলে পুলিশের তালিকায় তাঁর নাম ওঠে। এর কিছুদিন পর মগবাজারের বিশাল সেন্টার নির্মাণের সময় চাঁদাবাজি নিয়ে গোলাগুলি হয়। এরপরই সুব্রত বাইনের নাম গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়। সুব্রত বাইন পরে বিশাল সেন্টারের দোকান মালিক সমিতির নেতাও হন। সেই পরিচয়ে চাঁদাবাজি শুরু করেন।

১৯৯১-এর নির্বাচনে তিনি বিএনপির হয়ে মগবাজার এলাকায় কাজ করেন। এতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর খুব কাছের লোক হয়ে যান। মগবাজারের মধুবাগ মাঠে একবার তাঁর জন্মদিনের উৎসবও হয়। ওই উৎসবে বিএনপির অনেক নেতা হাজির হওয়ার পর সুব্রত বাইন রাতারাতি ‘তারকা সন্ত্রাসী’ বনে যান। ওই সময় যুবলীগের লিয়াকত মগবাজার এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতেন। লিয়াকতের কবল থেকে এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে বিএনপিপন্থীরা সুব্রতকে সমর্থন দেন। এরপর ১৯৯৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ট্রিপল মার্ডারে নেতৃত্ব দেন সুব্রত। এ ছাড়া মগবাজারের রফিক, সিদ্ধেশ্বরীর খোকনসহ বেশ কয়েকজন তাঁর হাতে খুন হন। ওই সময় রমনা, মগবাজার, কারওয়ান বাজার ও মধুবাগ এলাকায় গোলাগুলি ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। অবস্থা এমন হয়েছিল যে হতাহতের খবর না পেলে পুলিশও ঘটনাস্থলে যেত না। এভাবে খুব অল্প সময়ে রাজধানীর দক্ষিণাংশের একটি বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ চলে আসে সুব্রত বাইনের হাতে। তাঁর বিরুদ্ধে সে সময় কমপক্ষে ৩০টি মামলা ছিল। এর মধ্যে ১৯৯১ সালে আগারগাঁওয়ে জাসদ ছাত্রলীগের নেতা মুরাদ খুনের ঘটনায় তাঁর যাবজ্জীবন সাজা হয়।

১৯৯৭ সালে নয়াপল্টন এলাকার একটি হাসপাতাল থেকে গোয়েন্দা পুলিশের এসি আকরাম হোসেন গ্রেপ্তার করেন সুব্রত বাইনকে। বছর দেড়েক জেলে থাকার পর জামিনে বেরিয়ে যান। সুব্রত জেলে থাকার সময় তাঁর স্ত্রী লুসি গ্রুপেরই এক সদস্যের প্রেমে পড়েন। জেল থেকে বেরিয়ে ঘটনা জানার পর সুব্রত নিজেই লুসিকে সেই যুবকের সঙ্গে বিয়ে দেন। লুসির দুই সন্তান ছিল। পরে ১৯৯৯ সালে কুমিল্লায় বিউটি নামের এক নারীকে বিয়ে করেন সুব্রত। তবে বিয়ের কয়েক বছর পর বিউটিকে ডিভোর্স দেন।

বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০১ সালের ২৫ ডিসেম্বর ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম এবং তাঁদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে। এই তালিকায় প্রথম নামই ছিল সুব্রত বাইনের। তাঁর নামে ইন্টারপোলেও নোটিশ দেওয়া হয়। এরপর সুব্রত ঢাকা ছেড়ে কলকাতায় ঘাঁটি গাড়েন। পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার জামেলা নামে এক নারীকে বিয়ে করেন। সেই ঘরে একটি মেয়ে আছে। ভারতে গিয়ে সেখানে জমি কিনে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য যাবতীয় নথিপত্র তৈরি করেন সুব্রত। সুব্রতর ছোট বোন চেরির স্বামী অতুল জানান, সুব্রতর ভারতীয় নাগরিকত্বের সব কাগজপত্র আছে। এরপরও অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে ২০০৮ সালের ১১ অক্টোবর কলকাতা পুলিশ তাঁকে আটক করে। তবে বেশি দিন জেলে থাকতে হয়নি। জামিন পেয়ে দুবাই চলে যান। সেখান থেকে ফিরে কলকাতার এক চিত্রনায়িকার কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করেন। সেই ফোন কলের সূত্র ধরে ২০০৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর কলকাতা পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্স তাঁকে ধাওয়া করে।

টাস্কফোর্সের তাড়া খেয়ে সুব্রত নেপালের সীমান্ত শহর কাঁকরভিটায় ঢুকে পড়েন এবং নেপালি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। প্রথমে তাঁকে পূর্ব নেপালের ভাদ্রপুর এবং পরে ঝুমকা কারাগারে নেওয়া হয়। ২০১২ সালের ৮ নভেম্বর সেই কারাগারে ৭৭ ফুট লম্বা সুড়ঙ্গ কেটে পালিয়ে যান। আবার কলকাতায় আসার কয়েক দিন পর ২৭ নভেম্বর বউবাজার এলাকা থেকে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। এরপর থেকে তিনি কলকাতার জেলেই ছিলেন।

কলকাতায় থাকার সময় সেখানে বসেই ঢাকার অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করতেন সুব্রত বাইন। সড়ক ও জনপথের বড় বড় ঠিকাদারি কাজ ভাগাভাগি করতেন। সেই চাঁদার টাকায় নদীয়ায় ৫০ বিঘা জমিসহ এক বাগানবাড়ি কেনেন। এ ছাড়া ঢাকা ও কলকাতার ব্যবসায়ীদের টাকা আদায়ের কাজটি তিনি করতেন। কলকাতার ব্যবসায়ীদের পাওনা টাকা ঢাকার কোনো ব্যবসায়ীর কাছে আটকে গেলে সুব্রতর লোকজন আদায় করে দিত।

পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের পরিবার আগে থাকত রাজধানীর মগবাজারে। পরে তাঁরা গাজীপুরের পুবাইল হারবাইদ নয়াপাড়ায় পাঁচ কাঠা জমি কিনে বাড়ি করেন। এখন সেখানেই থাকেন সুব্রত বাইনের বাবা বিপুল বাইন ও মা কুমুলিনি বাইন। এক ভাই তিন বোনের মধ্যে সুব্রত সবার বড়। তিন বোন মেরি বাইন, চেরি সুপর্ণা বাইন ও সুপ্রভা পরির বিয়ে হয়েছে। চেরি ঢাকার এক হাসপাতালে আর পরি একটি ক্রিশ্চিয়ান সংস্থায় কাজ করেন।

মোল্লা মাসুদের ‘গুরু’ সুব্রত বাইন
ঢাকার অপরাধজগতের একসময়কার শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ছিলেন মোল্লা মাসুদের ‘গুরু’। সুব্রত বাইন অনেক আগেই ধর্ম পরিবর্তন করে ভারতে গা ঢাকা দিয়েছিলেন। অপরদিকে মাসুদও সরকারের ঘোষিত তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের একজন। এমন পরিস্থিতিতে সুব্রত বাইনের গ্রেফতারের পর পরই মাসুদের নাম নতুন করে আলোচনায় আসায় জল্পনা তৈরি হয়। মতিঝিল-গোপীবাগের ত্রাস হিসেবে একসময় পরিচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী মোল্লা মাসুদের বিরুদ্ধে রয়েছে অন্তত ৩০টিরও বেশি মামলা। এর মধ্যে রয়েছে-বিএনপি নেতা কামাল মজুমদারের ভাগনে মামুন হত্যা, পুরান ঢাকার ‘মুরগি মিলন’ হত্যাকাণ্ড, খিলগাঁওয়ের তিলপাপাড়ায় ট্রিপল মার্ডার এবং রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজির অসংখ্য অভিযোগ। তিনি মূলত ঢাকার বড় ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করতেন এবং সেই টাকা হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে পৌঁছে যেত। মগবাজারের একটি বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এমনকি ঈদ মৌসুমে পশুর হাট পর্যন্ত তার নিয়ন্ত্রণে থাকত।

কালের আলো/এমএএএমকে

গ্যাসের দাম বাড়ালে আমরা পেট্রোবাংলা ঘেরাও করব: নাহিদ ইসলাম

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬, ২:৪১ পূর্বাহ্ণ
গ্যাসের দাম বাড়ালে আমরা পেট্রোবাংলা ঘেরাও করব: নাহিদ ইসলাম

সরকারকে পাঁচ বছর অতিক্রম করার সুযোগ দেওয়া হবে না জানিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‌‌সরকার যদি মনে করে এভাবে পাঁচ বছর অতিক্রম করবে, এই সুযোগ দেওয়া হবে না। দেশের পরিস্থিতি খুবই খারাপ। দেশের ৭০ শতাংশ মানুষের রায় অস্বীকার করে কোনো সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না।

টিকে থাকতে হলে দমন-পীড়ন, নির্যাতন করে টিকে থাকতে হয়, যেটা আমরা শেখ হাসিনার সরকারের সময় দেখেছি।

এ সময় তিনি সরকারের জ্বালানিনীতিরও সমালোচনা করে বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে আমরা অবশ্যই পেট্রোবাংলা ঘেরাও করব। ঢাকা শহরের মানুষও দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসবে।

শুক্রবার (৩১ জুলাই) রাতে আহত আলিফ চৌধুরীকে দেখতে রাজধানীর জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে গিয়ে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, হবিগঞ্জে হামলার শিকার কিশোর আলিফের একটি চোখের দৃষ্টি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে এবং অন্য চোখও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেই চোখে দৃষ্টি ফেরার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। অন্য চোখও কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তা এখনও নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না চিকিৎসকরা। চিকিৎসকদের বোর্ড সভার পর আলিফের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা যাবে।

তিনি বলেন, আমি সিলেট থেকে এসেছি। গত কয়েক দিনে সিলেটে কী ঘটেছে, তা সবাই জানেন। তিন দিন হয়ে গেল, কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে আলিফের খোঁজ নেওয়া হয়নি। সরকারি বাহিনীর হামলার শিকার হয়েছে, এটি ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট। হবিগঞ্জ সদর থানা ছাত্রদলের সদস্যসচিব হামলায় জড়িত ছিল। আমরা অনেকের বিরুদ্ধে মামলাও করেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সাংগঠনিক বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, সরকার বার্তা দিচ্ছে যে তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় থাকা ছাত্রদল-যুবদলের সন্ত্রাসীরা চাইলে দিনের আলোয় হামলা করতে পারে, মানুষকে হত্যা করতে পারে, চোখ উপড়ে ফেলতে পারে, কিন্তু তার বিচার হবে না। আমরা যখন এই ঘটনার প্রতিবাদে কর্মসূচি দিচ্ছি, তখনও সরকারি দল বাধা দিচ্ছে। হবিগঞ্জে আমরা দেখেছি দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রায় এক হাজার সন্ত্রাসী জড়ো হয়েছিল। পুলিশ কিছুই করেনি। একটি সভ্য সমাজে এটা কল্পনাও করা যায় না।

সরকারি দলের জনপ্রতিনিধিদের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, জি কে গউসের অনুসারী যে ব্যক্তি আলিফের ওপর হামলা করেছে এবং সারজিস আলমের গাড়িতেও হামলা চালিয়েছে, অন্য কোনো গণতান্ত্রিক দেশে হলে তিনি এতক্ষণে ক্ষমা চাইতেন, পদত্যাগ করতেন অথবা দল থেকে বহিষ্কৃত হতেন।

প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা করে তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো বক্তব্য নেই। প্রধানমন্ত্রী স্কুল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছবি তোলায় ব্যস্ত থাকলেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কোনো বক্তব্য দিচ্ছেন না।

অভিভাবকদের উদ্দেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, আজকে আলিফের চোখ গেছে, কালকে আপনার সন্তানেরও চোখ যেতে পারে। কারণ এই সন্ত্রাসী বাহিনীকে যদি প্রতিরোধ করা না যায়, তারা পুলিশ মানে না, বিচার মানে না। আপনার সন্তানও এই সরকারের কাছে নিরাপদ নয়।

তিনি আরও বলেন, শুধু সিলেট নয়, কুড়িগ্রাম, সাভার, কেরানীগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এনসিপি, ছাত্রশক্তি ও যুবশক্তির কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে সরকার বিরোধী মতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দমনের চেষ্টা করছে।

আলিফের উদ্ধৃতি দিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, আলিফ আমাকে বলেছে, কাঁটা গলায় বিঁধে যাওয়ার আগেই কাঁটা তুলে ফেলতে হয়। বিঁধে গেলে অনেক ক্ষতি হয়।

সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, যদি সরকার মনে করে এভাবে পাঁচ বছর পার করবে, সেই সুযোগ দেওয়া হবে না। দেশের ৭০ শতাংশ মানুষের রায় অস্বীকার করে কোনো সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না। টিকে থাকতে হলে দমন-পীড়নের পথেই থাকতে হয়, যেমনটি শেখ হাসিনার সরকারের সময় দেখা গেছে।

এ সময় তিনি সরকারের জ্বালানিনীতিরও সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ১৬ টাকা থেকে ২৫ টাকা এবং সিএনজির গ্যাসের দাম ৪২ টাকা থেকে ৬৫ টাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে দ্রব্যমূল্য আরও বাড়বে, শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে।

সরকার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই দফায় দফায় বিদ্যুৎ, গ্যাস ও এলপিজির দাম বাড়িয়েছে। আবাসিক গ্যাসের দামও বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছে। মানুষ গ্যাস না পেলেও নিয়মিত বিল দিচ্ছে।

নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, দেশে বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে, শিল্পকারখানা বিদ্যুৎ সংকটে রয়েছে এবং ব্যবসায়ীরা প্রশাসনিক হয়রানি ও চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোক নিয়োগ দিয়ে সরকার রাষ্ট্রযন্ত্রকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

গ্যাসের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে পেট্রোবাংলা ঘেরাও কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে আমরা অবশ্যই পেট্রোবাংলা ঘেরাও করব। ঢাকা শহরের মানুষও দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসবে।

তিনি আরও বলেন, ১২টি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোক বসানো হয়েছে। পদবঞ্চিত নেতাদের মূল্যায়ন করতে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। এই পাঁচ মাসেই সরকারের অগণতান্ত্রিক ও সন্ত্রাসী চরিত্র জনগণের সামনে উন্মোচিত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, তিনি দল পরিচালনায় ব্যর্থ হয়েছেন, তাই ১৮ কোটি মানুষের দেশ পরিচালনাও তার পক্ষে সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, সরকার আলিফের পাশে নেই। আমরা সরকারের কাছে বিচার, ক্ষতিপূরণ বা সহানুভূতি প্রত্যাশা করি না। কিন্তু সারা বাংলাদেশের মানুষ, গণঅভ্যুত্থানের শক্তি এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো আলিফের পাশে আছে। আমরা জনগণকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানাই। সরকারের সন্ত্রাসী ও দমন-পীড়নের আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।

কালের আলো/জেএন/এমএসআইপি 

ফের এনসিপির গাড়িবহরে হামলা, আহত পাটওয়ারী

সিলেট প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬, ১২:০৭ পূর্বাহ্ণ
ফের এনসিপির গাড়িবহরে হামলা, আহত পাটওয়ারী

নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীর গাড়িবহরে আবারও হামলার ঘটনা ঘটেছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর গাড়িবহরে আবারও হামলার ঘটনা ঘটেছে।

সিলেটের জৈন্তাপুরে জুলাই পদযাত্রা শেষে শুক্রবার (৩১ জুলাই) রাতে ফেরার পথে এ হামলা হয়। হামলায় গাড়ির কাঁচ ভাঙচুর করা হলে ভাঙা কাঁচে আহত হন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও তার সঙ্গে থাকা আরও একজন। তাদের দুজনের হাত কেটে রক্তপাত হয়।

এনসিপির পক্ষ থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জৈন্তাপুরে দলটির জুলাই পদযাত্রার শেষ কর্মসূচি শেষে ফেরার পথে একদল হামলাকারী গাড়িবহরে হামলা চালায়। এতে কয়েকটি গাড়ির কাঁচ ভেঙে যায় এবং ভাঙা কাঁচে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীসহ দুজন আহত হন।

হামলার পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী লেখেন, ‘তারেক রহমান, আমাকে রক্তাক্ত করে আপনি একটি ভয়াবহ ভুল করেছেন। আপনি সন্ত্রাসের পথে গেলেন।’

তিনি আরও লেখেন, জৈন্তাপুর পদযাত্রার শেষ কর্মসূচি শেষ করে ফেরার পথে তার গাড়িবহরে হামলা চালানো হয়েছে এবং এতে তিনি রক্তাক্ত হয়েছেন।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

তারেক রহমানের ব্যতিক্রমী নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের রূপরেখা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬, ১১:৩৭ অপরাহ্ণ
তারেক রহমানের ব্যতিক্রমী নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের রূপরেখা

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারের যে তাগিদ তৈরি হয়েছিল, তার ওপর ভর করে অনুষ্ঠিত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দেশবাসী আশা করেছিল, একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। আর সেই নতুন অধ্যায়ের মূল কাণ্ডারি হিসেবে আবির্ভূত হন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগের নির্বাসিত জীবন শেষে ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে তিনি যখন স্বদেশের মাটিতে পা রাখেন, তখন তাঁর কণ্ঠে ছিল এক দৃঢ় অঙ্গীকার “আই হ্যাভ এ প্ল্যান” (আমার একটি পরিকল্পনা আছে)।

লক্ষ জনতার অভূতপূর্ব অভ্যর্থনার জবাবে তিনি উপহার দিয়েছিলেন এক রাষ্ট্র পুনর্গঠনের পথ নকশা। আজ সরকার গঠনের চার-পাঁচ মাস পার হওয়ার পর যদি পুরো দৃশ্যপট পর্যালোচিত হয়, তবে দুটি বিপরীতমুখী স্রোত পরিলক্ষিত হয়: একদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত সততা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞাময় নেতৃত্ব; অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে এবং প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহলের সেই পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা।

বিগত ৫৬ বছরের বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি ও স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানের শাসনামলটুকু বাদ দিলে সরকারপ্রধানদের জীবনযাত্রা, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং সিদ্ধান্তের মধ্যে এমন আমূল পরিবর্তন খুব কমই দেখা গেছে। কিন্তু তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রতিটি পদক্ষেপে গভীর দেশপ্রেম ও পরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছেন।

তিনি রাষ্ট্রীয় তকমা ও অহেতুক আড়ম্বর ত্যাগ করে অত্যন্ত সাদামাটা পোশাক ও যাপনচিত্র বেছে নিয়েছেন। ভিআইপি সংস্কৃতির নামে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমানো এবং সরকারি খরচে লাগাম টেনে ধরে যে ব্যয় সাশ্রয়ী পদক্ষেপ তিনি নিয়েছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন।

প্রতিপক্ষের সমালোচনা সহ্য করার বিরল উদারতা তিনি দেখাচ্ছেন। কোনো প্রতিহিংসামূলক রাজনীতি নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও ভিন্নমতের প্রতি তাঁর আচরণ অত্যন্ত শৃঙ্খলিত ও গণতান্ত্রিক।

সাধারণ মানুষ আজ তাঁর মাঝে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছায়া দেখতে পাচ্ছেন। জিয়াউর রহমান যেভাবে খাল খনন কর্মসূচি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দরজায় পৌঁছে গিয়েছেন, তারেক রহমানও তাঁর নির্দেশিত পথেই আধুনিক ও সময়োপযোগী এক নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা বাস্তবায়ন করছেন।

তাঁর এই সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি এবং সততা প্রতিটি দেশপ্রেমিক, গণতান্ত্রিক ও শান্তিকামী মানুষের হৃদয়ে গভীর প্রশান্তি যোগাচ্ছে। দীর্ঘকাল ধরে বঞ্চিত ও অবহেলিত মানুষগুলো তাঁর নেতৃত্বের মাঝে নতুন আশার আলো দেখছে।

দেশ পুনর্গঠনে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের যে প্রবল আকাঙ্ক্ষা, তা বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী মাঠপর্যায়ে প্রত্যাশিত সমর্থন ও গতি পাচ্ছেন না। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় বিরোধী দল সরকারের সমালোচনা করবে বা ত্রুটি খুঁজবে—এটাই স্বাভাবিক নিয়ম।

দীর্ঘদিনের লালিত অপসংস্কৃতি, তোষামোদি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের যে ঐতিহ্য দেশে তৈরি হয়েছিল, সেই চক্রটি তারেক রহমানের বৈষম্যহীন ও আইনের শাসনের মডেলকে মেনে নিতে পারছে না। কারণ, দেশে সত্যিকারের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের ব্যক্তিগত সুবিধা এবং চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি,দখল,ঘুষ-দুর্নীতির রাজত্ব চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।

সম্প্রতি কুমিল্লায় একটি আলোচনা বৈঠকে কুমিল্লার এসপি মহোদয়ের একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সচেতন মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। সেখানে এক বিএনপি নেতার প্রশ্নের জবাবে তিনি খোলাখুলিই বলেন, “আমি আপনার আগে ছাত্রদল করে এসেছি। আপনারা কাউকে পছন্দ না হলেই ফ্যাসিস্ট বা জামায়াত বলে আখ্যা দেন।” এটি কেবল কোনো একক জেলার চিত্র নয়; সারাদেশের সিভিল প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীতে আজ এই একই প্রবণতা দৃশ্যমান।

একদল সুবিধাভোগী কর্মকর্তা ও দলীয় প্রভাবশালী নেতা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য দক্ষ, সৎ ও মেধাবী কর্মকর্তাদের ওপর রাজনৈতিক ‘ট্যাগ’ লাগিয়ে দিচ্ছেন।

এমনকি যেসব কর্মকর্তা ছাত্রজীবনে সরাসরি ছাত্রদলের সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন—কলেজ উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। পরবর্তীতে কর্মজীবনে যারা সৎ, পেশাদার ও পরহেজগার  হিসেবে চাকরিজীবন পার করেছেন—তাদেরকেও দুর্নীতির বাধা মনে করে হেনস্তা করা হচ্ছে। রাজনৈতিক ট্যাগ দেয়ার অপচেষ্টা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে ভুল তথ্য ও কুৎসা রটিয়ে নীতিবান কর্মকর্তাদের দূরে সরিয়ে রেখে পুরো সিস্টেমে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করাই এই গোষ্ঠীর মূল উদ্দেশ্য। তবে আশা জাগানিয়া বিষয় হলো, প্রধানমন্ত্রী অনেক ক্ষেত্রেই এসব বিষয় আমলে নিচ্ছেন না।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করতে চাই। সম্প্রতি চট্টগ্রামে সংঘটিত দুটি আলোচিত চাঁদাবাজির ঘটনায় সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি দেখা গেছে:

একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ব্ল্যাকমেইল করে এবং শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে কোটি টাকার চেক লিখে নেওয়ার ঘটনায় যুক্তদের রেহাই দেওয়া হয়নি।

অন্য একটি ইন্টারনেট কোম্পানির অফিসে ঢুকে কোটি টাকা চাঁদা দাবি ও তাণ্ডব চালানোর মূলহোতাদের দ্রুততার সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এমনকি শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের মতো অপরাধীরা যখন ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, পুলিশ তাদের ধরে আইনের আওতায় এনেছে। বিএনপি সমর্থিত কেউ জড়িত থাকলেও ছাড় না দেওয়ার এই বার্তা প্রমাণ করে যে, প্রধানমন্ত্রীর নিয়তে কোনো গলদ নেই।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর ডিএফপি অডিটোরিয়ামে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় আয়োজিত জুলাই শহীদ দিবসের আলোচনা সভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা যে কোনো বিচারে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে আমি মনে করি।

এখানে দ্বিধাহীন চিত্তে বলতে চাই যে,সমসাময়িক রাজনীতিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মত এতটা পরিচ্ছন্ন ইমেজের রাজনীতিবিদ খুব বেশি আছে বলে আমার জানা নেই।

“চার-পাঁচ মাসে কিছুই বদলায়নি। একইভাবে ঘুষখোররা ঘুষ খাচ্ছে। ভালো পরিকল্পনা আগের মতোই আটকে দিচ্ছে। আমি সত্যিকার অর্থে পরিবর্তন দেখতে চেয়েছিলাম। তারেক রহমান ছাড়া আর কারও মধ্যে পরিবর্তন ঘটেনি। তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।”

স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর এই বক্তব্য একদিকে যেমন এক নির্মম সত্যের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ, অন্যদিকে এটি সরকারের ভেতরে লুকিয়ে থাকা গভীর সংকটের ইঙ্গিত বলেই মনে হচ্ছে।

এই জটিল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য এবং তোষামোদকারী চক্রকে রুখে দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্দেশ্যে একটি কঠোর প্রশাসনিক কাঠামো অনুসরণের পরামর্শ:

প্রধানমন্ত্রী এমন একটি কঠোর নির্দেশনা জারি করতে পারেন যে, কোনো কর্মকর্তা বা নেতার নামে যদি তাঁর কাছে কোনো নেতিবাচক তথ্য দেওয়া হয় এবং তদন্তে তা ভুল বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রমাণিত হয়, তবে তথ্য প্রদানকারীকে একটি ‘মাইনাস পয়েন্ট’ দেওয়া হবে।

কোনো ব্যক্তি—তিনি প্রধানমন্ত্রীর যত নিকটবর্তীই হোন না কেন—যদি পরপর দুই বা তিনবার সরকারকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে ভুল বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য প্রদান করেন, তবে তাকে অবিলম্বে সরকারের সকল পদ ও দায়িত্ব থেকে স্থায়ীভাবে ছাঁটাই করতে হবে। এই কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে অশুভ গ্রুপিং, লবিং এবং মিথ্যার ওপর ভর করে সুবিধা নেওয়ার রাজনীতি অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে বলে আশা করা যায়।

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর এবং জুলাই অভ্যুত্থানের মতো একটি ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পরও যদি মানুষের জীবনমানের মৌলিক উন্নতি না হয়, তবে তা দেশের জন্য চরম দুর্ভাগ্যজনক। চব্বিশের তরুণরা রক্ত দিয়েছিল ক্ষমতার হাতবদলের জন্য নয়; তারা রক্ত দিয়েছিল ব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য। তারেক রহমান তাঁর সততা, পোশাক, মেধা ও দূরদর্শিতা দিয়ে নিজের পরিবর্তন প্রমাণ করেছেন। কিন্তু একটি দেশ কেবল এক একক ব্যক্তির পরিশ্রমে বদলাতে পারে না। দলের ভেতর থাকা তথাকথিত নেতাদের বুঝতে হবে, পুরোনো ভোগবাদী ও তোষামোদের রাজনীতি বজায় রাখলে তা কেবল দলকেই নয়, পুরো দেশকেই অতলে ডুবিয়ে দেবে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্বীকারোক্তিকে আক্ষেপ হিসেবে না দেখে, একে সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীকে এখনই দল ও প্রশাসনের ভেতরের দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও কঠোর অবস্থান নিতে হবে। তবেই জুলাই শহীদদের স্বপ্ন সার্থক হবে এবং তারেক রহমানের পরিকল্পনা অনুযায়ী একটি বৈষম্যহীন, সৎ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।