আগুনে প্রাণহানি, পাহাড়ি সড়কে ডাকাতি, সৈকতে ছিনতাই ও ডুবে মৃত্যু; অনুমোদনহীন স্থাপনা ও ঝুঁকিপূর্ণ বিনোদন কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে প্রতিবছর ৮০ থেকে ৯০ লাখ পর্যটক ছুটে আসেন কক্সবাজারে। দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, পাহাড় আর নীল জলরাশির আকর্ষণে মুখর থাকে দেশের প্রধান এই পর্যটন গন্তব্য। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি, পাহাড়ি সড়কে ডাকাতি, সৈকতে ডুবে মৃত্যু এবং ঝুঁকিপূর্ণ বিনোদন কার্যক্রমে দুর্ঘটনার ঘটনায় পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অনুমোদনহীন স্থাপনা, পর্যাপ্ত উদ্ধারসেবার অভাব এবং নজরদারির দুর্বলতা দূর করা না গেলে পর্যটনশিল্পের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
গত ১৭ অক্টোবর উখিয়ার ইনানীর পাটোয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুনে ১০ জনের মৃত্যু নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে এনেছে। তিনতলা কাঠের স্থাপনাটিতে আগুন ছড়িয়ে পড়লে প্রাণ হারান ভেতরে থাকা ১০ জন। প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা অনুমোদন ছিল না। এর আগে সতর্কতা বা নোটিস দেওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। অগ্নিকাণ্ডে অবহেলার অভিযোগে ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। রিসোর্টের ম্যানেজারকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ড চাওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা চিহ্নিত হওয়ার পরও সেখানে পর্যটকদের অবস্থানের সুযোগ ছিল কীভাবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শুধু পরিদর্শন ও নোটিস নয়, নিয়ম ভঙ্গকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকার মতে, জেলার বিভিন্ন এলাকায় হোটেল-রিসোর্টের অনুমোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দুই শতাধিক স্থাপনা পরিদর্শন ও নোটিস দেওয়ার বিষয়টি সামনে এলেও কতটি প্রতিষ্ঠান নিয়ম মেনেছে, কতটির কার্যক্রম বন্ধ হয়েছে এবং কতটিতে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে, তার স্বচ্ছ হিসাব প্রয়োজন।
পাহাড়ি সড়কে ডাকাতি, শহরে ছিনতাইয়ের অভিযোগ
রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের শোক কাটতে না কাটতেই ১৯ অক্টোবর ঈদগাঁও-ঈদগড়-বাইশারী সড়কের হিমছড়ি ঢালায় একই দিনে দুই দফা ডাকাতির ঘটনায় আতঙ্ক ছড়ায়। সকালে সিএনজিচালিত অটোরিকশার এক যাত্রীর মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরে দুপুরে অস্ত্রধারীদের তৎপরতায় কয়েকটি যানবাহনের যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা ও মূল্যবান জিনিসপত্র লুটের অভিযোগ ওঠে। ভুক্তভোগীদের কেউ ১ লাখ ২০ হাজার, কেউ দেড় লাখ টাকা হারিয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
পরে অভিযান চালিয়ে লুট হওয়া মালামাল ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি দুজনকে আটকের তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। তবে দিনের আলোয় এমন ঘটনার কারণে সড়কটির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত কক্সবাজারে ডাকাতির ১৪টি, দস্যুতার ২৩টি এবং চুরির ১৬০টি মামলা হয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে ডাকাতির মামলা ছিল ১৬টি, দস্যুতার ২৫টি এবং চুরির ১৫৭টি। অর্থাৎ ডাকাতি ও দস্যুতার মামলা কমলেও চুরির মামলা বেড়েছে।
এ ছাড়া কক্সবাজার শহরে পর্যটকদের ছিনতাই, হয়রানি ও প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। অপরিচিত এলাকায় যাতায়াত ও হোটেল খোঁজার জন্য অনেক পর্যটক অটোরিকশা ও টমটমচালকদের ওপর নির্ভর করেন। এই সুযোগে কাউকে নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া বা হয়রানির অভিযোগও পাওয়া যায়। তবে সব ঘটনা থানায় নথিভুক্ত না হওয়ায় প্রকৃত পরিস্থিতি নিরূপণ কঠিন।
সৈকতে ডুবে তিন বছরে ৪০ জনের মৃত্যু
কক্সবাজারের প্রধান আকর্ষণ সমুদ্রসৈকত হলেও গোসল করতে নেমে প্রাণ হারাচ্ছেন পর্যটকেরা। প্রবল স্রোত, সমুদ্রের তলদেশের গর্ত, গুপ্তখাল এবং ঢেউয়ের আচরণ সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে অনেকে বিপদে পড়েন। বিস্তীর্ণ সৈকতের সব এলাকায় সমানভাবে উদ্ধারসেবা না থাকায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
সি-সেফ লাইফগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কক্সবাজার শহরের সৈকতের নির্দিষ্ট এলাকায় ডুবে ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালে ১২ জন, ২০২৫ সালে ২০ জন এবং ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আটজন মারা যান। একই সময়ে সমুদ্রে বিপদে পড়া ৪৭৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
সংস্থাটির হিসাবে, ২০১৫ সাল থেকে ২০২৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে ডুবে ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে অন্তত ১ হাজার ৭৭ জনকে।
প্রায় ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকতের মধ্যে লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টের প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকায় উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এর মধ্যে নিরাপদে গোসলের জন্য লাইফগার্ডের আওতাভুক্ত এলাকা প্রায় দেড় কিলোমিটার। সি-সেফের ২৭ জন লাইফগার্ডকর্মী পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করেন।
সি-সেফ লাইফগার্ডের সুপারভাইজার সাইফুল্লাহ সিফাত বলেন, বিপদের মুহূর্তে দ্রুত উদ্ধার, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং হাসপাতালে নেওয়ার সমন্বিত ব্যবস্থা জরুরি। কয়েক মিনিটের বিলম্বও প্রাণহানির কারণ হতে পারে। পর্যটকের চাপের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উদ্ধারসেবার পরিধি ও জনবল বাড়ানো প্রয়োজন।
অনুমোদনহীন প্যারাসেইলিংয়েও প্রাণহানি
সমুদ্রসৈকতে গোসলের পাশাপাশি প্যারাসেইলিংয়ের মতো বিনোদন কার্যক্রমেও নিরাপত্তার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। গত ১ আগস্ট দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে সাগরে পড়ে মারা যান খুলনার পর্যটক শৌভিক রায়। ঘটনার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ওই সময়ে প্যারাসেইলিং পরিচালনার অনুমোদন ছিল না। প্রতিকূল আবহাওয়ায় কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশনা অমান্য করে তা চালানোর অভিযোগও ওঠে।
একই প্রতিষ্ঠানের প্যারাসেইলিং কার্যক্রমে গত ১০ বছরে অন্তত ১৯ জন পর্যটক আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের কেউ রশি ছিঁড়ে সাগরে পড়েছেন, কেউ ঝাউবাগানে আটকে পড়েছেন, আবার কেউ বালুচরে পড়ে আহত হয়েছেন।
ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টুয়াক) উপদেষ্টা মফিজুর রহমানের অভিযোগ, প্রশাসনিক তদারকি ছাড়াই অনভিজ্ঞ লোকজন দিয়ে প্যারাসেইলিং পরিচালনা করা হচ্ছে। সংগঠনটির সভাপতি আনোয়ার কামালের মতে, এ ধরনের বিনোদন কার্যক্রম আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তাব্যবস্থা মেনে পরিচালনা করা জরুরি।
সড়ক ও রেলপথেও উদ্বেগ
পর্যটকের নিরাপত্তা শুধু হোটেল, সৈকত কিংবা বিনোদনকেন্দ্রে সীমাবদ্ধ নয়; যাতায়াতের পথও নিরাপদ হওয়া প্রয়োজন। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কক্সবাজার জেলার মহাসড়কে ১০৬টি দুর্ঘটনায় ১৩৪ জন নিহত হন। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬১টি দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৭৪ জনের। এ ছাড়া রেলপথে পাথর নিক্ষেপের ৫০টি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে, যাতে শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল গেস্ট হাউস অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলেন, নিরাপত্তাহীনতার প্রভাব পর্যটন ব্যবসায়ও পড়ে। ইনানীর অগ্নিকাণ্ডের পর মেরিন ড্রাইভের পাশের কিছু রিসোর্টে বুকিং কমে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। যদিও শহরের হোটেলগুলোতে পর্যটকের উপস্থিতি বাড়ার তথ্যও রয়েছে, তবু নিরাপত্তা নিয়ে নেতিবাচক ধারণা ছড়িয়ে পড়লে পুরো পর্যটন গন্তব্যের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সমন্বিত নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, পর্যটনকে নিরাপদ করতে বিচ্ছিন্ন অভিযান কিংবা দুর্ঘটনার পর তদন্ত যথেষ্ট নয়। অনুমোদনহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ হোটেল-রিসোর্টের তালিকা প্রকাশ, অগ্নিনিরাপত্তা যাচাই, নিয়ম ভাঙলে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে টহল বাড়ানো এবং সৈকতে লাইফগার্ডের পরিধি সম্প্রসারণ জরুরি।
তিনি আরও বলেন, জেলা প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তর ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। নিয়মিত পরিদর্শন ও মাঠপর্যায়ে কার্যকর নজরদারি ছাড়া শুধু নির্দেশনা দিয়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়।
সামাজিক সংগঠন আমরা কক্সবাজারবাসীর সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিনের মতে, পর্যটন এলাকায় নিয়মিত পুলিশি টহল, হোটেল-মোটেল জোন ও নির্জন সড়কে সিসিটিভি নজরদারি, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি পথে নিরাপত্তাচৌকি এবং সৈকতে পর্যাপ্ত উদ্ধারকর্মী নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি হোটেল-রিসোর্টের অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তা নিয়মিত যাচাই এবং ঝুঁকিপূর্ণ বিনোদন কার্যক্রমে প্রশিক্ষিত কর্মী ও মানসম্মত সরঞ্জাম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
পর্যটকেরা যাতে সহজে জানতে পারেন কোন হোটেল বা রিসোর্ট অনুমোদিত, কোন বিনোদন কার্যক্রম বৈধ এবং কোথায় লাইফগার্ডের সহায়তা পাওয়া যায়, সে ব্যবস্থাও গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, সমুদ্রের সৌন্দর্য দেখতে এসে কোনো পর্যটক যেন প্রাণ হারিয়ে কিংবা আতঙ্কের স্মৃতি নিয়ে বাড়ি ফিরতে বাধ্য না হন, সে লক্ষ্যে কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবস্থাপনাকে ঢেলে সাজানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের সঙ্গে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকা জড়িত। তাই পর্যটকের জীবন রক্ষা, নিরাপদ যাতায়াত, অনুমোদিত স্থাপনা নিশ্চিত করা এবং দ্রুত উদ্ধারসেবা চালুর মাধ্যমে পর্যটকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারলেই কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের দীর্ঘমেয়াদি বিকাশ টেকসই হবে।
কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]