দেশে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা
মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা সামরিক উত্তেজনার প্রভাব ধীরে ধীরে বাংলাদেশের শিল্প ও জ্বালানি খাতে চাপ তৈরি করতে শুরু করেছে। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় দেশে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দেশে তীব্র গ্যাসসংকটে বৃহত্তম পরিবেশবান্ধব ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার পিএলসি কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। গত বুধবার বিকেল থেকে সরকারি নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে দুই হাজার ৮৪০ মেট্রিক টন উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন এই কারখানার সার উৎপাদন বন্ধ করা হয় বলে জানান কারখানার মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. ফখরুল আলম। এ নিয়ে দেশে পাঁচটি সার কারখানা বন্ধ হলো। বন্ধ কারখানাগুলোর মধ্যে আরো রয়েছেÑচট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি, যমুনা ফার্টিলাইজার কম্পানি, আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কম্পানি এবং বেসরকারিভাবে পরিচালিত কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কম্পানি।
এদিকে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে জ্বালানি ব্যবহারে রেশনিং শুরু করেছে, বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ কমিয়েছে এবং বিকল্প উৎস থেকে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সংগ্রহের উদ্যোগ জোরদার করেছে। জ্বালানি খাত বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব শুধু জ্বালানি বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে নাÑশিল্প ও উৎপাদন খাতেও তার প্রতিফলন দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন বা শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। শিল্প উদ্যোক্তাদেরও একই ধরনের আশঙ্কা। তারা বলছেন, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে শিল্প উৎপাদন ধীর হয়ে যাবে এবং রফতানি খাতও চাপের মুখে পড়তে পারে।
দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমের খবর ও অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বাংলাদেশে জ্বালানি ও রপ্তানি খাতে সরাসরি আঘাত হেনেছে। অল্প কিছু দিনের মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতিতেও এর প্রভাব দেখা যাবে বলেও আশঙ্কা করছেন দেশের অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও খাত সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দূরে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের আঁচ সরাসরি বাংলাদেশের সীমান্তে আঘাত না করলেও অর্থনীতিতে এর প্রভাব মারাত্নক। যা ইতোমধ্যে দেখা যেতে শুরু করেছে। ঢাকার ফিলিং স্টেশনগুলোতে গত বৃহষ্পতিবার রাত থেকে তেলের সরবরাহ কমে আসতে দেখা গেছে। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে দেখা গেছে যানবাহনগুলোকে। তাছাড়া তেল সমৃদ্ধ ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ববাজারেরও দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। বিশ্লেষকরা বলছেন, জ্বালানি তেলের এই দাম বৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে একটি চেইন রিঅ্যাকশন তৈরি করবে।
আবার বাংলাদেশের মতো দেশে জ্বালানি তেল বা গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধিতে বাস-ট্রাকের ভাড়া যেমন বাড়তে পারে, তেমনি বৃদ্ধি পেতে পারে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ এবং সারের দামও। ফলে কৃষি উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বাড়ার আশঙ্কা থাকে, যার প্রভাব পড়তে পারে চাল, ডাল ও সবজির বাজারেও। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে পারে আমদানি করা ভোজ্যতেল, গম কিংবা চিনির দাম। যার ধারাবাহিক প্রভাব পড়তে পারে অন্যান্য প্রয়োজনীয় কিংবা সৌখিন পণ্যে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত পৌছাতে আর খুব বেশি দেরি নেই।
অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান বলেন, মূলত আমদানি নির্ভর দেশ হওয়ায় বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। এ কারণেই বিকল্প উৎস এবং আর্থিক সংস্থানের বিষয়ে আগেভাগেই প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলছেন, ‘আমাদের জ্বালানি মজুদের যে তথ্য পাচ্ছি, সেই অনুযায়ী, ডিজেল আছে দুই সপ্তাহ, কেরসিন ছাড়া আর সবগুলোই তো দুই সপ্তাহ থেকে ছয় সপ্তাহের বেশি নাই। আমাদের অবশ্যই বিকল্প কোনো জায়গা থেকে কেনা যায় সেটি ঠিক করতে হবে। এছাড়া পণ্য আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে যেসব রপ্তানিকারক এরই মধ্যে সমস্যায় পড়েছেন, তাদের পাশেও সরকারের দাঁড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন সেলিম রহমান।
এদিকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর দেওয়া তথ্যে বলা হচ্ছে, ইরানের ড্রোন আঘাত হেনেছে আরব আমিরাতের মজুদ রাখা জ্বালানি ট্যাঙ্কারে। নিজেদের বেশ কয়েকটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি স্থাপনায় ইরানি হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর জানিয়েছে কাতার। হামলা হয়েছে সৌদি আরবের তেল শোধনাগারেও। সমুদ্র পথে পণ্য পরিবহনে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালী ইতোমধ্যে বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড। তারা সতর্ক করেছে যে, হরমুজ প্রণালী কেউ পার করার চেষ্টা করলে তাকে গুলি করে হত্যা করা হবে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে জ্বালানি মূল্যে।
কালের আলো/এম/এএইচ


আপনার মতামত লিখুন
Array