৬০ শতাংশের বেশি মানুষের ভিটামিন ডির ঘাটতি
দেশের ৬০ শতাংশের বেশি মানুষের ভিটামিন ডির ঘাটতি আছে। এটি একটি জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানান চিকিৎসকরা। দেশে ভিটামিন ডি-স্বল্পতায় ভুগছে এমন শিশুর সংখ্যাও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। অন্য বয়সী মানুষ বিশেষ করে নারী ও বয়স্করাও ভিটামিন ডি-স্বল্পতায় ভুগছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভিটামিন ডি এক ধরনের অণুপুষ্টি কণা বা মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট। এ কণা মানুষের সামান্য পরিমাণে দরকার হয়, কিন্তু প্রতিদিনই তা দরকার। মানুষের চাহিদার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ভিটামিন ডি আসে খাদ্য থেকে; বাকি ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশের উত্স সূর্যের আলো। ভিটামিন ডির ঘাটতির কারণে শিশুদের রিকেট রোগ হয়; এতে হাড় নরম ও দুর্বল হয়ে পড়ে, শিশুর পায়ের হার বেঁকে যায়। বয়স্করা ‘অস্টিওম্যালাসিয়া’ রোগে আক্রান্ত হন। যার কারণে হাড়ে ব্যথা হয় ও মাংসপেশি দুর্বল হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন ভিটামিন ডি-এর অভাবে বয়স্ক নারী-পুরুষ ‘অস্টিওপোরোসিসে’ আক্রান্ত হন। এতে হাড় পাতলা হয়, হাড় ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। এসব মানুষের উদ্বেগ ও বিষণ্নতা বেশি দেখা দেয়। ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি একটি জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানান চিকিৎসকরা।
দেশের এই বিপুলসংখ্যক মানুষের মধ্যে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতির কারণে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে সুষম খাবারের ঘাটতি রয়েছে। মানুষ খাবার খাচ্ছে, কিন্তু আমরা যেটাকে সুষম খাবার বলি, যেখানে— ক্যালোরি, নিউট্রিশন, প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ—সবমিলিয়ে থাকবে, খাবারের সেই জায়গাটায় ঘাটতি রয়েছে। কেউ কেউ কার্বোহাইডেড বেশি খাচ্ছে, কেউ আবার প্রয়োজন মতো খাচ্ছেও না। পাশাপাশি বিভিন্ন ভিটামিনের চাহিদা পূরণ করে যেসব খাবার, সেখানেও ঘাটতি আছে—এটা একটা কারণ। আর একটা কারণ হচ্ছে, শরীরে খাবার ঠিকমতো শোষণ না হওয়া—একটাও একটা কারণ। তিনি বলেন, আমাদের দেশে রোদ যথেষ্ট এবং মানুষ সেই রোদের সংস্পর্শেও আসে। তবে যেসব খাবারে ভিটামিন ডি আছে সেগুলো পরিমাণ মতো না খাওয়ার কারণে ডি এর ঘাটতি বাড়ছে।
বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ ভিটামিন ডি-এর অভাবজনিত ঝুঁকিতে থাকা সত্ত্বেও এই দিকটি উপেক্ষিত রয়ে গিয়েছে। ক্রান্তীয় অঞ্চলে অবস্থিত বলে বাংলাদেশ প্রচুর রৌদ্রালোক পায়। কিন্তু তারপরেও ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি থাকার পেছনে অন্যান্য ফ্যাক্টর নিশ্চয় রয়েছে। দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রায় ৮০ শতাংশ শিশু ভিটামিন ডি-এর অভাবে ভুগছে। আরেক গবেষণায় দেখা যায়, গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী এক-ছয় মাস বয়সি শিশুদের এক-তৃতীয়াংশই ভিটামিন ডি-এর অভাবে ভুগছে। শূন্য থেকে এক বছর বয়সি ৩১.৯ শতাংশ শিশুদের রক্তে ২৫ হাইড্রক্সি ভিটামিনের মাত্রা ডেফিশিয়েন্ট অর্থাৎ ২০ ন্যানোগ্রাম/মিলিলিটারের নিচে এবং ৫২.২ শতাংশ শিশুদের মাঝে ইনসাফিশিয়েন্ট অর্থাৎ ২০-৩০ ন্যানোগ্রাম/মিলিলিটার।
দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সি শিশুদের মাঝে ডেফিশিয়েন্ট এবং ইনসাফিশিয়েন্ট এর হার যথাক্রমে ৩৮.২ শতাংশ এবং ৫০ শতাংশ। উপরন্তু দেখা গিয়েছে, ১২ থেকে ১৬ বছর বয়সিদের মাঝে এই ডেফিশিয়েন্সি ৪৬.৮ শতাংশ এবং ইনসাফিশিয়েন্সি ৫১.৯ শতাংশ। ‘বাংলাদেশি জনগণের মাঝে ভিটামিন ডি-এর অবস্থা’—নামক একটি গবেষণা বলছে, ৮৬ শতাংশ মানুষের হাইপোভিটামিনোসিস ডি রয়েছে।
কোনো অঞ্চলে জনসংখ্যার ২.৫-এর বেশি মানুষের সিরাম ২৫-এর ঘনত্ব ২৫-৩০-এর নিচে থাকলে জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম বিবেচনা করা প্রয়োজন হয় বলে পরামর্শ দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হু। আর যদি সমগ্র জনগোষ্ঠী বা জনসংখ্যার উপগোষ্ঠীতে প্রকোপতা ২০ শতাংশ বা তার বেশি হয় তখন জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম গ্রহণ অপরিহার্য বলে মত দেয় সংস্থাটি। তা ছাড়া বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ভারত, পাকিস্তান এবং ফিনল্যান্ডে খাদ্যে ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধ করা হয়েছে।
ভারত ২০১৮ সাল থেকে ভোজ্যতেলসহ ৫টি খাদ্যপণ্যে ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধ করেছে। ফিনল্যান্ড ২০০৩ সালে তা শুরু করে। আর বাংলাদেশে ২০১৩ সালে ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ আইন ও ২০১৫ সালে বিধিমালা তৈরি করে। সেখানে সয়াবিন, পামতেল ও সকল ধরনের উদ্ভিজ্জ ভোজ্যতেলে নির্ধারিত মাত্রায় ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বর্তমানে প্রয়োজন ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধকরণ।
কালের আলো/এম/এএইচ


আপনার মতামত লিখুন
Array