খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (খুমেক) শয্যাসংকট দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে। ৫০০ শয্যার এ হাসপাতালে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসছেন দুই থেকে আড়াই হাজারেরও বেশি রোগী। অতিরিক্ত রোগীর চাপে শয্যা না পেয়ে ওয়ার্ডের মেঝে, বারান্দা, সিঁড়ির পাশ এমনকি চলাচলের পথেও বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে রোগীদের। এতে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা এবং স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান ভরসা এ হাসপাতাল। রোগীর চাপ সামলাতে হাসপাতালটির শয্যাসংখ্যা ২৫০ থেকে বাড়িয়ে ৫০০ করা হলেও বাস্তব পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। প্রয়োজনের তুলনায় অবকাঠামো, চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবল কম থাকায় প্রতিদিনই ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা।
মেঝে-বারান্দায় চলছে চিকিৎসা
হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, শয্যা না পেয়ে শত শত রোগীকে মেঝে ও বারান্দায় তোশক কিংবা পাটি বিছিয়ে থাকতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও সিঁড়ির পাশ ও মানুষের চলাচলের পথেও রোগীদের অবস্থান করতে দেখা যায়। এতে রোগীদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ছে।
কলারোয়া থেকে সন্তানকে চিকিৎসা করাতে আসা আসমা বেগম বলেন, তাঁর সন্তান হাম রোগে আক্রান্ত। দুই দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি করলেও অনেক চেষ্টা করেও একটি শয্যা পাননি। বাধ্য হয়ে বারান্দার মেঝেতেই সন্তানের চিকিৎসা করাচ্ছেন তিনি।
দৌলতপুর থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে আসা ফিরোজও শয্যা না পেয়ে বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনি জানান, হাসপাতালে অবস্থানকালে তাঁদের দুটি মুঠোফোন চুরি হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, হাসপাতাল এলাকায় চোর ও দালালদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ নেই।
চিকিৎসার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ
রোগী ও তাঁদের স্বজনদের অভিযোগ, শয্যা না থাকায় অনেককে ঠান্ডা ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে মেঝেতে থাকতে হচ্ছে। গুরুতর অসুস্থ রোগীদেরও কখনো কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা বারান্দায় অপেক্ষা করতে হয়। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা রোগীদের জন্য এ পরিস্থিতি আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
অতিরিক্ত রোগীর চাপে চিকিৎসাসেবার পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হচ্ছে। শয্যাসংকটের পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা, রোগীদের নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণ সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আড়াই হাজার রোগীর সেবা দেওয়া কঠিন
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, ৫০০ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে আড়াই হাজার রোগী ভর্তি থাকেন। রোগীর সংখ্যা কিছুটা বেশি হলে সীমিত সামর্থ্যে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হলেও দুই হাজারের বেশি রোগীর নিয়মিত সেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সুজাত আহমেদ বলেন, ‘আমরা রোগীদের ফিরিয়ে দিতে পারি না। মানবিক কারণে সবাইকে ভর্তি নিতে হয়। কিন্তু ৫০০ শয্যার জন্য বরাদ্দকৃত ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং চিকিৎসক-নার্স দিয়ে আড়াই হাজার রোগীর সেবা দেওয়া প্রায় অসম্ভব।’
তিনি আরও জানান, অতিরিক্ত রোগীর চাপের কারণে হাসপাতালের বিদ্যমান অবকাঠামো ও চিকিৎসা উপকরণ দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে চিকিৎসাসেবার মান বজায় রাখাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
দুই হাজার শয্যার দাবি
হাসপাতালের বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবল নিয়োগের ওপর জোর দিয়েছেন উপপরিচালক ডা. সুজাত আহমেদ।
তাঁর মতে, হাসপাতালটিকে দুই হাজার শয্যায় উন্নীত করা এবং সে অনুযায়ী ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জনবল নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় বিপুলসংখ্যক রোগীকে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হবে না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রোগীর চাপ সামলাতে শুধু শয্যাসংখ্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; এর সঙ্গে চিকিৎসক-নার্স নিয়োগ, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নয়নও নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষের চিকিৎসার প্রধান আশ্রয়স্থলটিতে রোগীদের দুর্ভোগ কমানো কঠিন হবে।
কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]