উত্তরাঞ্চলের আকাশে ডানা মিলবে বিমান, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ও পাইলট প্রশিক্ষণেও নতুন সম্ভাবনা
আর কোন আশ্বাস বা প্রতিশ্রুতি নয়। এবার স্বপ্ন হচ্ছে সত্যি। উত্তরাঞ্চলের আকাশে ডানা মিলবে বিমান। অবসান ঘটছে উত্তরবঙ্গের মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষার। বগুড়ার আকাশে শোনা যাবে যাত্রীবাহী বিমানের শব্দ। দেশের উত্তরাঞ্চলে যোগাযোগ ও অর্থনীতির সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচনে বগুড়ায় গড়ে তোলা হবে বিশ্বমানের বিমানবন্দর। বগুড়া এয়ারফিল্ডকেই আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দরে উন্নীত করবে সরকার। একই সঙ্গে এখানে বিমানবাহিনীর একটি পূর্ণাঙ্গ ঘাঁটি স্থাপন এবং পাইলট তৈরির জন্য একটি ফ্লাইং একাডেমি প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত ধরে বড় একটি মাইলফলক স্থাপন করতে যাচ্ছে সরকার।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম, প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত ও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বগুড়া এয়ারফিল্ড ও সংশ্লিষ্ট এলাকা পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁনও উপস্থিত ছিলেন। তিনি এদিন একটি বড় সুসংবাদও দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘বগুড়ার স্ট্র্যাটেজিক ইম্পর্টেন্স বা কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেশি। এখানে একটি অত্যাধুনিক বিমানঘাঁটি স্থাপনের প্রাথমিক অনুমোদন সরকার দিয়েছে।’
তিনি আরও জানান, সরকার নতুন জঙ্গি বিমান কেনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে এবং সেই আধুনিক জঙ্গি বিমানগুলো বগুড়া ঘাঁটিতেই মোতায়েন করা হবে। এটি জাতীয় আকাশসীমা সুরক্ষায় সামরিক সক্ষমতা আরও সুদৃঢ় করবে। বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট এর উদ্যোগে একটি ফ্লাইং একাডেমি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনায় বাংলাদেশ বিমান বাহিনী সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করবে বলেও বিমান বাহিনী প্রধান আশ্বাস প্রদান করেন।
- তিন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও বিমান বাহিনী প্রধানের বগুড়া এয়ারফিল্ড পরিদর্শন
- উত্তরাঞ্চলের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত ধরে বড় একটি মাইলফলক স্থাপন করতে যাচ্ছে সরকার
- বগুড়ায় বিমানবাহিনীর একটি পূর্ণাঙ্গ ঘাঁটি স্থাপন এবং পাইলট তৈরির জন্য একটি ফ্লাইং একাডেমি প্রতিষ্ঠার ঘোষণা
- বিমানবন্দরটি হবে উত্তরবঙ্গের অর্থনীতির গতিপথ বদলে দেওয়ার বড় হাতিয়ার
- জাতীয় আকাশসীমা সুরক্ষায় সামরিক সক্ষমতাকে করবে আরও সুদৃঢ়
পরিদর্শন শেষে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম বলেছেন, ‘উত্তরাঞ্চলে কোনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নেই। তাই বগুড়াকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এখানে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি ফ্লাইং একাডেমি চালু করে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পাইলট তৈরি করা হবে। পাশাপাশি কৃষি, শিল্প ও পর্যটনের সম্ভাবনাময় এ অঞ্চলের উন্নয়নে আধুনিক অবকাঠামো অত্যন্ত জরুরি। বগুড়া এয়ারফিল্ডকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উন্নীত করা হলে উত্তরাঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।’

বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি আর বগুড়াবাসীর দাবি অনুযায়ী এখানে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হবে। আমরা কোনো দীর্ঘসূত্রতায় যাব না, দ্রুততম সময়ে বাণিজ্যিক বিমান উড্ডয়ন নিশ্চিত করতে বেবিচককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। স্থানীয় উন্নয়নে জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন।
ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী বগুড়াকে উত্তরবঙ্গের প্রথম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক কার্গো সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যাতে এই অঞ্চলের উৎপাদিত কৃষিপণ্য এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের মালামাল সরাসরি বিদেশে রপ্তানি করা যায়। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, আন্তর্জাতিকমানের এই বিমানবন্দরের জন্য ১০ হাজার ৫০০ ফুটের একটি রানওয়ে তৈরির সিদ্ধান্ত হয়েছে। যার ফিজিবিলিটি স্টাডি দ্রুত শুরু হবে। বিমানবন্দর ও ঘাঁটি এলাকায় ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্তদের বাজারমূল্যের তিনগুণ অর্থ প্রদান করা হবে। এখানে আন্তর্জাতিক, অভ্যন্তরীণ বিমান ও কার্গো বিমান উঠানামা করবে। এই অঞ্চলের কৃষি, শিল্প থেকে উৎপাদিত পণ্য আমরা রপ্তানি করতে পারবো।
এ সময় বগুড়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা, বগুড়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেনসহ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক এবং সংশ্লিষ্ট সামরিক ও বেসামরিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও কৃষকদের নতুন স্বপ্নের হাতছানি
জানা যায়, ১৯৯৫ সালে বিএনপি সরকার আমলে বগুড়া বিমানবন্দর স্থাপনে ২২ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদনে বগুড়া সদর উপজেলার এরুলিয়া এলাকায় বগুড়া-নওগাঁ সড়কের পাশে ১০৯ দশমিক ৮১ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে প্রকল্পের আওতায় রানওয়ে, কার্যালয় ভবন ও কর্মকর্তাদের আবাসিক ভবন, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ, রাস্তা নির্মাণসহ সকল অবকাঠামো নির্মাণ শুরু হয়। ২০০০ সালে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার দু’ যুগেরও বেশি সময় পরেও বগুড়ার আকাশে ডানা মেলেনি বিমান।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা মোতাবেক বগুড়ায় আন্তর্জাতিকমানের বিমানবন্দর গড়ে তুলতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। সরকারের মন্ত্রী, দুই প্রতিমন্ত্রী ও বিমান বাহিনী প্রধানের বগুড়া এয়ারফিল্ড ও ও সংশ্লিষ্ট এলাকা পরিদর্শনের স্থানীয় ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও কৃষকদের মাঝে এখন নতুন স্বপ্নের আনাগোনা।

বগুড়া বিমানবন্দর মানে শুধু যাতায়াত নয়, এটি হতে হবে উত্তরবঙ্গের অর্থনীতির গতিপথ বদলে দেওয়ার বড় হাতিয়ার। বগুড়া চেম্বার অব কমার্সের শীর্ষ নেতারা মনে করেন, ‘আন্তর্জাতিকমানের এই বিমানবন্দর চালু হলে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে, রপ্তানি সহজ হবে, ব্যবসায়ীরা দ্রুত কাজ শেষ করতে পারবেন।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বগুড়ার আলু, সবজি, আম ও লিচুর বিদেশি বাজার থাকলেও সরাসরি কার্গো ফ্লাইট না থাকায় কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত দাম পান না। বিমানবন্দর চালু হলে ঢাকাকেন্দ্রিক ঝামেলা কমবে। পরিবহন খরচ ও সময় দুটোই কমে আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় মাদ্রাসা শিক্ষক মাওলানা আব্দুল ওয়াহাব মাদানী বলেন, ‘চিকিৎসা ও উচ্চশিক্ষার জন্য প্রতিদিন বগুড়া থেকে অসংখ্য মানুষ ঢাকায় যাতায়াত করেন। বিমান চলাচল শুরু হলে এই যাত্রা সহজ হতো। পাশাপাশি মহাস্থানগড়সহ বগুড়ার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থানে পর্যটকের সংখ্যা বহুগুণ বাড়তে পারতো। স্থানীয় হোটেল, রেস্তোরাঁ ও পরিবহন খাতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বদলে যাবে বগুড়াসহ গোটা উত্তরবঙ্গ।’
কালের আলো/এমএএএমকে


আপনার মতামত লিখুন
Array