দক্ষ নার্স তৈরি হচ্ছে না দেশে
প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ নার্স তৈরি হচ্ছে না। সরকারি ও বেসরকারি নার্সিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্মত প্রশিক্ষণের অভাব, শিক্ষক সংকট, রাজনৈতিক প্রভাব, বদলি বাণিজ্য ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনায় পুরো খাতই যেন এক অদৃশ্য সংকটে পড়েছে। এখানে নার্সদের সুযোগ-সুবিধা সীমিত। আবার কাজের চাপও বেশি। নানা সংকটে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ নার্সেস অ্যাসোসিয়েশন (বিএনএ) সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে ৮২ শতাংশ নার্স ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের (বিএনএমসি) নিবন্ধিত নার্সের সংখ্যা প্রায় ১ লক্ষ ১৭ হাজার। এর মধ্যে সরকারি চাকরি করেন প্রায় সাড়ে ৪৭ হাজার নার্স, বাকিদের অনেকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। আর বিদেশে কর্মরত আছেন ১৫ হাজার নার্স। সংগঠনটির তথ্য বলছে, নিবন্ধিত নার্সদের মধ্যে ৪০ হাজারের বেশি বেকার। প্রতিবছর প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী নার্সিং পাস করলেও সরকারি চাকরি পান প্রায় এক হাজার। বেসরকারি খাতে চাকরি পান দেড় থেকে দুই হাজার। অনেকে বিদেশে পাড়ি জমান, আর বড় একটি অংশ থেকে যান বেকার।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন নার্সিং ইনস্টিটিউট ও কলেজে শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষক সংখ্যা অত্যন্ত কম। কোথাও কোথাও প্রয়োজনীয় ল্যাব নেই, নেই পর্যাপ্ত ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের সুযোগ। আবার অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক শিক্ষা না দিয়েই শুধু পরীক্ষামুখী পাঠদান চলছে। রোগীদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার আচরণ করতে হবে তা নিয়ে খুব একটা পড়ানো হয় না। এতে সনদধারী নার্স তৈরি হলেও গড়ে উঠছে না দক্ষ জনবল।
নার্সদের অভিযোগ, উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নিচের (ব্যতিক্রম ইউনিয়ন উপকেন্দ্র) স্তরে তাদের জন্য পর্যাপ্ত পদ নেই। আবার প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন পদও সৃষ্টি করা হয় না। ফলে অনেক নার্সকে দীর্ঘ সময় পদোন্নতি ছাড়া চাকরি করতে হয়। নার্সদের চেয়ে কম ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ ও একাডেমিক যোগ্যতা থাকার পরও সাব–অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (সাকমো) রোগীর চিকিৎসা দিতে পারেন এবং ব্যবস্থাপত্রে ওষুধ লিখতে পারেন; কিন্তু নার্সরা তা পারেন না। বাংলাদেশে একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে একজন চিকিৎসকের বিপরীতে একজনেরও কম নার্স রয়েছে।
জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র স্টাফ নার্স লাভলী আক্তার বলেন, ‘হাসপাতালে রোগীর সবচেয়ে কাছে থাকেন নার্সরা। হাসপাতালে রোগীকে রিসিভ করার পর থেকে সেবার সবকিছুই করতে হয় নার্সদের। রোগীর সার্বক্ষণিক সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন নার্সরা।
সোসাইটি ফর নার্সেস সেফটি অ্যান্ড রাইটস (এসএনএসআর)-এর একটি জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে সরাসরি রোগীর সেবাদানকারী প্রায় ৯৯ শতাংশ নার্স মনে করছেন তারা কর্মক্ষেত্রে ক্ষমতায়নের পরিবর্তে অবমূল্যায়িত হচ্ছেন। জরিপে অংশ নেওয়া ৯৪ শতাংশ নার্স মানসিক বিষণ্নতায় ভুগছেন। পাশাপাশি অধিক দায়িত্ব ও কাজের চাপ কিন্তু কম বেতনে কাজ করছেন প্রায় ৯২ শতাংশ নার্স।
সোসাইটি ফর নার্সেস সেফটি অ্যান্ড রাইটসের মহাসচিব ও নার্সেস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ন্যাব) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাব্বির মাহমুদ তিহান বলেন, নার্সদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে বাজেট বৃদ্ধি এবং কার্যকর সমাধানের ওপর জোর দিতে হবে।
কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের সভাপতি ড. আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, বিভিন্ন দেশে বিশেষজ্ঞ নার্স আছে। আমাদের দেশে সেরকম নেই। যেমন কেউ বক্ষব্যাধির ওপর বিশেষজ্ঞ, কেউ কিডনির ওপর বিশেষজ্ঞ। তারা ওই ধরনের রোগী ম্যানেজমেন্ট করে থাকেন, আমাদের দেশে সেরকম নেই। কোনো কোনো নার্সের ব্যবহার নিয়ে অভিযোগ শোনা যায়। রোগীদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করতে হবে এগুলো সেভাবে পড়ানো হয় না। এ বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে পড়াতে হবে।
কালের আলো/এম/এএইচ


আপনার মতামত লিখুন
Array