বিদেশি বিনিয়োগে ৫১ শতাংশ দেশীয় মালিকানা চান বিশেষজ্ঞরা
দেশের সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর, জ্বালানি ও অন্যান্য কৌশলগত অবকাঠামো খাতে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৫১ শতাংশ দেশীয় মালিকানা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে বাধ্যতামূলক প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৯ মে) রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ আয়োজিত ‘কৌশলগত সম্পদে দেশীয় বিনিয়োগের অগ্রাধিকার’ শীর্ষক নীতিনির্ধারণী গোলটেবিল আলোচনায় এসব মতামত তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক সাকিব আনোয়ার।
আলোচনায় অংশ নেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, সংসদ সদস্য ফজলে হুদা বাবুল, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, ক্যাব সভাপতি আবু আলম শহীদ খান, সাবেক সচিব শফিক জামান, বিসিকের সাবেক পরিচালক আবু তাহের খান, ঢাকা স্ট্রিমের উপদেষ্টা সম্পাদক হাসান মামুন, ঢাকা স্ট্রিমের প্রধান নির্বাহী কর্নেল (অব.) মো. সোহেল রানা, সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চের সমন্বয়ক সবুজ এইচ চৌধুরী, এটিজেএফবি’র সাধারণ সম্পাদক বাতেন বিপ্লব এবং সংস্থাটির কর্মসূচি পরিচালক ইকতান্দার হোসাইন হাওলাদার।
মূল প্রবন্ধে সাকিব আনোয়ার বলেন, দেশে অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের নামে প্রকৃতপক্ষে দেশীয় অর্থ ও ঋণের ব্যবহার হচ্ছে।
তিনি পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, বিদেশি অপারেটরের ১৭০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের মধ্যে ১০০ মিলিয়ন ডলার এসেছে দেশীয় ও আঞ্চলিক ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ থেকে। ফলে এটিকে পুরোপুরি বিদেশি বিনিয়োগ হিসেবে দেখানো বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তিনি আরো বলেন, সমান সুযোগ এবং নীতিগত সহায়তা পেলে দেশীয় উদ্যোক্তারাও আন্তর্জাতিক মানের সেবা দিতে সক্ষম। এর উদাহরণ হিসেবে তিনি চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি পরিচালনায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সিডিডিএলের সাফল্যের কথা উল্লেখ করেন।
তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটি আগের অপারেটরের তুলনায় ৪৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেশি উৎপাদনশীলতা অর্জন করেছে।
আলোচনায় বলা হয়, দেশীয় প্রতিষ্ঠান এমজিএইচ গ্রুপ বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় প্রতি কনটেইনারে বেশি রাজস্ব দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে নিজস্ব অর্থায়নে লালদিয়ায় একটি পরিবেশবান্ধব টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগও গ্রহণ করেছে।
বক্তারা অভিযোগ করেন, অনেক ক্ষেত্রে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে না। তারা বলেন, আন্তর্জাতিক দরপত্র ছাড়াই লালদিয়া ও পানগাঁও টার্মিনালের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করা হয়েছে, যা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
গোলটেবিল আলোচনায় আরো বলা হয়, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং সেবা পেতে বিদেশি কোম্পানিগুলো উচ্চ পর্যায়ে তদবির চালালেও দেশীয় লজিস্টিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরকারের কার্যকর সংলাপের অভাব রয়েছে।
বক্তারা বলেন, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো খাতে বিদেশি আধিপত্য বাড়তে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং দেশীয় সক্ষমতা বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বক্তারা আরো বলেন, বিদেশি বিনিয়োগের বিরোধিতা নয়, বরং যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
তারা বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ এমনভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত যাতে দেশের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হয় এবং স্থানীয় শিল্পখাত শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
আলোচনায় ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার উদাহরণ তুলে ধরে বক্তারা বলেন, এসব দেশে কৌশলগত খাতে দেশীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা নিশ্চিত করা হলেও বিদেশি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয়নি। বরং এই নীতির মাধ্যমে শক্তিশালী স্থানীয় শিল্পভিত্তি এবং দক্ষ জনবল তৈরি হয়েছে।
গোলটেবিলের শেষপর্বে বক্তারা কৌশলগত অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত দরপত্রে দেশীয় কোম্পানির সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, প্রযুক্তি হস্তান্তর বাধ্যতামূলক করা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন বন্দর নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠনের সুপারিশ করেন।
কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ


আপনার মতামত লিখুন
Array