খুঁজুন
                               
, ,
           

নজরুলের ১২৭তম জন্মবার্ষিকীতে নানা আয়োজন

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬, ১২:২৭ অপরাহ্ণ
নজরুলের ১২৭তম জন্মবার্ষিকীতে নানা আয়োজন

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী আজ। বাংলা সাহিত্য, সংগীত ও সাম্যের চেতনায় তিনি আজও বাঙালির অনুপ্রেরণার অন্যতম প্রতীক। বিদ্রোহ, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার এই মহান কবিকে স্মরণ করতে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে ময়মনসিংহের ত্রিশাল, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, মানিকগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কবিতা আবৃত্তি, নজরুলসংগীত পরিবেশনা ও স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

এবারের জন্মবার্ষিকী ঘিরে সরকারিভাবে ব্যাপক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে, যার অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী আগামী এক বছরকে ঘোষণা করেছেন ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে।

রোববার (২৪ মে) রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জাতীয় কবিকে স্মরণ করে বিভিন্ন আয়োজন করা হয়েছে। ময়মনসিংহের ত্রিশালে কবির স্মৃতিবিজড়িত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ও নজরুল একাডেমি প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক উৎসবের মধ্য দিয়ে জাতীয় পর্যায়ের মূল অনুষ্ঠানটি উদযাপিত হচ্ছে, যেখানে গতকাল শনিবার (২৩ মে) উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী এক বছরকে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

এ ছাড়া রাজধানীর বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ও নজরুল ইনস্টিটিউটসহ মানিকগঞ্জের তেওতা এবং কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন জেলা প্রশাসন ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে সেমিনার, নজরুল পুরস্কার প্রদান, পুস্তক প্রদর্শনী, স্মৃতি চারণ এবং বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

১৮৯৯ সালের ২৪ মে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে আধুনিকতার অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাকে। কবিতা, গান, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ও সাংবাদিকতাসহ সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় তিনি রেখে গেছেন তার প্রতিভার অনন্য স্বাক্ষর।

কবির শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্যের জীবনের পরতে পরতে জড়িয়ে ছিল চরম অভাব ও অবিরাম সংগ্রাম। জীবিকার তাগিদে তাকে একদা রুটি বানানোর দোকান থেকে শুরু করে লেটোর দলেও যোগ দিতে হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯১৭ সালে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনের সৈনিক হিসেবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেন।

সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকা অবস্থাতেই করাচি সেনানিবাসে বসে নজরুল তার সাহিত্যচর্চা পুরোদমে শুরু করেন। ১৯১৯ সালের মে মাসে ‘সওগাত’ পত্রিকায় তার প্রথম গদ্য রচনা ‘বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী’ প্রকাশিত হয়। মূলত এখান থেকেই তার আনুষ্ঠানিক সাহিত্যিক জীবনের সূত্রপাত ঘটে। করাচিতে বসেই তিনি ‘হেনা’, ‘ব্যথার দান’, ‘মেহের নেগার’ ও ‘ঘুমের ঘোর’র মতো বেশ কিছু বিখ্যাত গল্প রচনা করেন।

১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে কুমিল্লা থেকে কলকাতা ফেরার পথে নজরুল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে দুটি বৈপ্লবিক কর্মের জন্ম দেন। এর একটি হলো কালজয়ী ‘বিদ্রোহী’ কবিতা এবং অন্যটি ‘ভাঙ্গার গান’ সংগীত। এই সৃষ্টি দুটি বাংলা কবিতা ও গানের চিরচেনা ধারাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল। বিশেষ করে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার অভাবনীয় জনপ্রিয়তার কারণে তিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে দেশজুড়ে পরিচিতি লাভ করেন।

১৯২২ সালে নজরুলের প্রথম এবং সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতা-সংকলন ‘অগ্নিবীণা’ প্রকাশিত হয়। এই কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের পরপরই এর প্রথম সংস্করণ শেষ হয়ে যায় এবং এটি বাংলা কাব্যের জগতে এক অভূতপূর্ব পালাবদল নিয়ে আসে। এই গ্রন্থের ‘প্রলয়োল্লাস’, ‘আগমনী’, ‘খেয়াপারের তরণী’ ও ‘কামাল পাশা’র মতো সাড়া জাগানো কবিতাগুলো বাংলা কবিতার মোড় চিরতরে ঘুরিয়ে দেয়। একই বছর তার গল্প সংকলন ‘ব্যথার দান’ ও প্রবন্ধ-সংকলন ‘যুগবাণী’ প্রকাশিত হয়।

কাজী নজরুল ইসলাম কেবল দ্রোহের কবিই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একাধারে সুরস্রষ্টা ও সংগীতজ্ঞ। তিনি প্রায় চার হাজার গান রচনা ও সুরারোপের মাধ্যমে বাংলা সংগীত জগৎকে এক বিশাল সমৃদ্ধি উপহার দেন। পাশাপাশি, তার রচিত ‘খুকী ও কাঠবিড়ালি’, ‘লিচু-চোর’ কিংবা ‘খাঁদু-দাদু’র মতো শিশুতোষ কবিতাগুলো বাংলা শিশুসাহিত্যে অত্যন্ত নান্দনিক ও জনপ্রিয় সংযোজন হিসেবে টিকে আছে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে কবিকে সপরিবারে স্বাধীন বাংলাদেশে আনা হয় এবং তাকে বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয়। দীর্ঘদিনের অসুস্থতা শেষে ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকায় এই মহান কবি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।

সাহিত্য বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিশ্বে যখন বৈষম্য, জাতিগত বিদ্বেষ ও ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা মারাত্মক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন কাজী নজরুল ইসলামের সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার দর্শন নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তার জীবন ও সৃষ্টি কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অন্যতম প্রেরণার উৎস হয়ে আছে।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:১৫ অপরাহ্ণ
জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে আগামী ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে রওনা হবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সফরে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন ভিশন ও অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো তুলে ধরবেন।

সফরকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফরের প্রাথমিক উদ্দেশ্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেওয়া। সেখানে বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে সাইডলাইনে অনেক বৈঠক হয়ে থাকে।

প্রধানমন্ত্রী কখন যাবেন এবং কার কার সঙ্গে বৈঠক করবেন, তা যথাসময়ে জানানো হবে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, কোনো কিছুই গোপন রাখা হবে না।

এদিকে দ্বিপক্ষীয়ভাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের আগ্রহ রয়েছে বলেও জানান হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, দিল্লির সঙ্গে ঢাকা নতুন ও কার্যকর সম্পর্ক তৈরি করতে চায়।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বেসামরিক মানুষ হত্যার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সীমান্তে হত্যা ও মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি কূটনৈতিক চ্যানেলে আলোচনা চলছে।

এ ছাড়া পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে ব্রিটেনসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে সরকার কাজ করছে বলেও জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

লিফট এড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে ষষ্ঠ তলায় প্রধানমন্ত্রী, বার্তা কি শুধু ‘সাদামাটা’ চলাফেরার?

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
প্রকাশিত: রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:০০ অপরাহ্ণ
লিফট এড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে ষষ্ঠ তলায় প্রধানমন্ত্রী, বার্তা কি শুধু ‘সাদামাটা’ চলাফেরার?

বাংলাদেশ সচিবালয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে যোগ দিতে লিফট ব্যবহার না করে সিঁড়ি বেয়ে ষষ্ঠ তলায় উঠেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সচিবালয়ের কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বৈঠকটি শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি এ তথ্য জানিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ে পৌঁছানোর পর ষষ্ঠ তলায় ওঠার সময় লিফটের পরিবর্তে সিঁড়ি ব্যবহার করেন। তাঁর সঙ্গে থাকা কর্মকর্তা ও নিরাপত্তারক্ষীরাও সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠেন। একটি সরকারি বৈঠকে যোগ দেওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রীর এমন সিদ্ধান্ত আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ ঘটনা হলেও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিসরে এটি আলাদা করে নজর কেড়েছে।

কারণ, একজন সরকারপ্রধানের প্রতিটি প্রকাশ্য আচরণই অনেক সময় তাঁর কাজের ধরন ও জনসম্পৃক্ততার প্রতীকী বার্তা বহন করে। লিফট এড়িয়ে সিঁড়ি ব্যবহারকে তাই কেবল ব্যক্তিগত অভ্যাস হিসেবে দেখার পাশাপাশি তাঁর সরল ও সরাসরি কর্মপদ্ধতির একটি ইঙ্গিত হিসেবেও দেখছেন অনেকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে দেশের কৃষি খাতের সার্বিক পরিস্থিতি, মন্ত্রণালয়ের চলমান কার্যক্রম, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং কৃষকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তায় কৃষির গুরুত্ব বিবেচনায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের এ বৈঠককে নীতিনির্ধারণী দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য, বাজার ব্যবস্থাপনা, কৃষি উপকরণের প্রাপ্যতা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব—এসব প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরেই কৃষি খাতের বড় চ্যালেঞ্জ। বৈঠকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।

এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর সামনে মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা নানাবিধ তথ্য ও প্রস্তাব তুলে ধরছেন এবং সেখান থেকে কী ধরনের নির্দেশনা আসছে, সেটিই বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়, মাঠপর্যায়ে সেই সিদ্ধান্ত কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপরই কৃষকদের প্রত্যাশা পূরণের বিষয়টি নির্ভর করবে। সিঁড়ি বেয়ে ষষ্ঠ তলায় ওঠার ঘটনাটি তাই দিনের আলোচিত একটি দৃশ্য। ভিআইপি প্রটোকল মেনে সাধারণত সচিবালয়ে লিফট ব্যবস্থা সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হলেও প্রধানমন্ত্রী সরাসরি সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যান এবং হেঁটে ষষ্ঠ তলায় পৌঁছান। আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো—কৃষি খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ।

দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর বিদেশে নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফেরার পর থেকেই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাজে একের পর এক প্রথাভাঙা কর্মকাণ্ড করছেন তারেক রহমান। বিশেষ করে বিমানবন্দর থেকে জনসমাবেশে যাওয়া কিংবা ব্যক্তিগত যোগাযোগের ক্ষেত্রে তিনি একাধিকবার প্রথাগত ভিআইপি প্রটোকল এড়িয়ে বাসে যোগ দিচ্ছেন। ঢাকায় চলাচলেও অতীতের প্রধানমন্ত্রীর মতো থাকে না রাস্তায় কড়াকড়ি। চলার পথে নিয়মিতই পথচারীদের সঙ্গে করেন সালাম বিনিময়।

কালের আলো/এম/এএইচ

ইউরোপের স্বপ্নে ঘরে ফেরে লাশ

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
প্রকাশিত: রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:২২ অপরাহ্ণ
ইউরোপের স্বপ্নে ঘরে ফেরে লাশ

বিদেশে গিয়ে পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করার আশায় প্রতি বছর বিপজ্জনক সমুদ্রপথে পাড়ি জমাচ্ছেন বাংলাদেশি তরুণদের একটি অংশ। ইউরোপে পৌঁছানোর আশ্বাসে দালালদের হাতে লাখ লাখ টাকা তুলে দিয়ে শুরু হয় এই যাত্রা। অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই নৌযান, খাদ্য ও পানির সংকট, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং পাচারকারীদের নির্যাতনের কারণে পথেই অনেকে মারা যাচ্ছেন। অনেকে নিখোঁজ থাকছেন বছরের পর বছর। যারা গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন, তাদের একটি অংশও পাচারকারীদের হাতে জিম্মি হয়ে মুক্তিপণের শিকার হচ্ছেন।সাগরপথে অবৈধভাবে ইউরোপ বা মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সময় প্রতিবছর কত বাংলাদেশি মারা যাচ্ছেন, তার নির্ভরযোগ্য সরকারি হিসাব নেই।

বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরেই এ ধরনের ঘটনায় বাংলাদেশিদের মৃত্যু অর্ধ সহস্রাধিক হতে পারে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, উদ্ধার না হওয়া মরদেহ এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের কারণে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সমুদ্রপথে বাড়ছে প্রাণহানি
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) ‘মিসিং মাইগ্রেন্টস প্রজেক্ট’-এর তথ্য অনুযায়ী, ভূমধ্যসাগর ও পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন রুট দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার সময় প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক অভিবাসী মারা যান বা নিখোঁজ হন। এসব রুটে বাংলাদেশিরাও উল্লেখযোগ্যসংখ্যায় রয়েছেন। আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগরের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এসব সমুদ্রপথে ৫৯৮ জন মারা যান। ২০২৫ সালে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়ায় ৮৬০ জনে। এক বছরের ব্যবধানে মৃত্যু ও নিখোঁজের সংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

আইওএমের হিসাবে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে সাড়ে ৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রায় বের হন। তাদের মধ্যে ৮৯০ জনের বেশি মারা যান। এসব তথ্য পুরোপুরি বাংলাদেশিদের মৃত্যুর হিসাব নয়; তবে বাংলাদেশ ও আশপাশের অঞ্চল থেকে অনিয়মিত সমুদ্রপথে যাত্রার ঝুঁকির মাত্রা এতে স্পষ্ট হয়।

চলতি বছরের এপ্রিলেও আন্দামান সাগরে একটি নৌকাডুবির ঘটনায় রোহিঙ্গা শরণার্থী ও বাংলাদেশি নাগরিকসহ প্রায় ২৫০ জন নিখোঁজ হন। ১৪ এপ্রিল প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) এ তথ্য জানায়।

স্বপ্ন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলে দালাল
বিদেশে যাওয়ার আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে সক্রিয় রয়েছে মানব পাচারকারী ও অভিবাসী চোরাচালান চক্র। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা, সিলেট, সুনামগঞ্জ, শরীয়তপুর ও মাদারীপুরের তরুণদের একটি অংশ এসব ঝুঁকিপূর্ণ রুটে যাওয়ার ক্ষেত্রে বেশি যুক্ত হচ্ছে। দালালরা অনেক সময় বৈধ চাকরি, ভিসা কিংবা নিরাপদ বিদেশযাত্রার কথা বলে পরিবারের কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা নেয়। পরে যাত্রাপথ পরিবর্তন করে অবৈধ রুটে পাঠানো হয়। সমুদ্রযাত্রায় নৌযানে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মানুষ তোলা, পর্যাপ্ত খাবার ও পানির ব্যবস্থা না থাকা এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস উপেক্ষা করার মতো কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।

শুধু দুর্ঘটনাই নয়, পথিমধ্যে পাচারকারীদের হাতে অপহরণ ও নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে। বিদেশে পৌঁছানোর পরও অনেককে আটকে রেখে দেশে থাকা পরিবারের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। অর্থ না দিলে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে।

মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে
মানব পাচার প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে দালাল ও পাচারকারীদের গ্রেপ্তার করছে। তবে এসব অভিযানের পরও পুরো চক্রের কার্যক্রম বন্ধ হচ্ছে না। কারণ, মাঠপর্যায়ের দালালদের একটি অংশ গ্রেপ্তার হলেও অর্থদাতা, নিয়ন্ত্রক ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ রক্ষাকারীদের বড় একটি অংশ শনাক্ত বা গ্রেপ্তারের বাইরে থেকে যাচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, মানব পাচারের মামলায় সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে যুক্ত হয় মামলার দীর্ঘসূত্রতা, বাদী ও সাক্ষীদের ভয়ভীতি এবং অনেক ক্ষেত্রে আদালতের বাইরে আপস-মীমাংসার প্রবণতা। ফলে মামলা হলেও সব ক্ষেত্রে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এতে পাচারকারী চক্রের ওপর কার্যকর চাপ তৈরি হচ্ছে না। একজন দালাল গ্রেপ্তার হলেও তার জায়গায় অন্য ব্যক্তি যুক্ত হয়ে একই রুটে নতুন করে লোক পাঠানোর সুযোগ পাচ্ছে।

ফিরে আসাদের বয়ানে ভয়াবহতা
ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রা থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতায় উঠে আসে পাচারচক্রের কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক। তাদের কেউ দিনের পর দিন সমুদ্রে খাবার ও পানির সংকটে ছিলেন, কেউ অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই নৌযানে দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে ভেসেছেন। আবার কারও ক্ষেত্রে ছিল পাচারকারীদের মারধর ও জিম্মি করে রাখার ঘটনা।

ফিরে আসা ব্যক্তিদের অনেকের পরিবার বিদেশ যাওয়ার জন্য জমি, বসতভিটা বা অন্যান্য সম্পদ বিক্রি করেছে। যাত্রা ব্যর্থ হলে সেই পরিবারগুলোকে ঋণের বোঝা বহন করতে হয়। আর কেউ নিখোঁজ হলে পরিবারকে একই সঙ্গে আর্থিক ক্ষতি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হয়।

বৈধ পথের বিকল্প তৈরি জরুরি
সিআইডি বিদেশে কর্মসংস্থান, অভিবাসন ও ভ্রমণের ক্ষেত্রে সরকার অনুমোদিত বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণের জন্য জনগণকে পরামর্শ দিয়েছে। মানব পাচার, জাল ভিসা, অভিবাসী চোরাচালান বা এ ধরনের অপরাধের তথ্য জানা থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে সিআইডিকে জানানোর আহ্বানও জানিয়েছে সংস্থাটি।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সচেতনতামূলক প্রচার চালিয়ে এই প্রবণতা ঠেকানো সম্ভব নয়। বিদেশে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার পেছনে থাকা কর্মসংস্থানের সংকট, দারিদ্র্য, দ্রুত আয় করার প্রত্যাশা এবং দালালদের প্রতারণার বিরুদ্ধে একযোগে ব্যবস্থা নিতে হবে। বৈধ অভিবাসনের সুযোগ ও তথ্য সহজলভ্য করার পাশাপাশি প্রতিটি পর্যায়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ জরুরি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পাচারচক্রের নিচের স্তরের সদস্যদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অর্থের উৎস, যোগাযোগব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা। কারণ, সমুদ্রপথে একজন তরুণের মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; এর পেছনে রয়েছে সংগঠিত একটি অপরাধচক্র। সেই চক্রের মূল হোতাদের বিচারের আওতায় না আনা গেলে ঝুঁকিপূর্ণ সাগরযাত্রা এবং মৃত্যুর এই ধারাবাহিকতা থামানো কঠিন।

কালের আলো/এম/এএইচ