খুঁজুন
                               
, ,
           

কক্সবাজারে একের পর এক উন্নয়ন ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর, বাজেট নিয়ে বিরোধী দলের সমালোচনার কড়া জবাব

বিশেষ সংবাদদাতা/কক্সবাজার প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬, ৬:৫৯ অপরাহ্ণ
কক্সবাজারে একের পর এক উন্নয়ন ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর, বাজেট নিয়ে বিরোধী দলের সমালোচনার কড়া জবাব

‘প্রধানমন্ত্রীর আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম’ স্লোগানে স্লোগানে দিনমান মুখর ছিল গোটা কক্সবাজার। শনিবার (১৩ জুন) বিমানবন্দরে অবতরণের পর থেকে সড়ক পথে নিজেই গাড়ি চালিয়ে একেকটি কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পথে পথে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের ঢল, আনন্দ আর উদ্দীপনা। বাবার দেখানো পথেই ৪৮ বছর পর কোদাল দিয়ে ‘পাতলী খাল’ পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন থেকে শুরু করে ব্যস্ত কর্মসূচিতে ছিল ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক পরিদর্শন, মাছুমঘাট সংরক্ষিত বনে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন, পেকুয়া উপজেলায় ২০২৪ সালের জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহীদ মো. ওয়াসিম আকরামের কবর জিয়ারত এবং তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎসহ পথসভা ও জনসভা। জনসভাগুলোতে নানা বয়সী হাজারো মানুষের ভিড়। মিছিল আর জনস্রোতে কানায় কানায় পূর্ণ জনসভা। একের পর এক উন্নয়ন ঘোষণায় উপস্থিত জনতার মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা যায়। বিশেষ করে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে ৬ লেনে উন্নীত করার ঘোষণা কক্সবাজারবাসীর বহুদিনের স্বপ্ন পূরণের বার্তা হিসেবে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

‘পাতলী খাল’ পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন শেষে এক পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বাজেট প্রসঙ্গে বিরোধী দলের সমালোচনার কড়া জবাব দিয়েছেন। দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে বিরোধী দল প্রস্তাবিত বাজেটের বিরোধিতা করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘বিরোধী দল বলছে যে এই গণবিরোধী বাজেট তারা মানে না। উপস্থিত জনগণের উদ্দেশে প্রশ্ন রেখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আপনাদের কাছে আমি প্রশ্ন রেখে যেতে চাই, যেই বাজেটে ট্যাক্স কমানো হয়, সেই বাজেটও বিরোধী দল মানে না। যেই বাজেটে মদের দাম বাড়ানো হয়, যেই বাজেটে সিগারেটের দাম বাড়ানো হয়, সেই বাজেটও বিরোধী দলের পছন্দ নয়। তাহলে এবার বিরোধী দলের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছেন?’ সন্ধ্যায় সরকারপ্রধান স্থানীয় চকরিয়া পৌর বাস টার্মিনাল মাঠে স্থানীয় বিএনপি আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে কক্সবাজারবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে ৪ লেন থেকে ৬ লেনে উন্নীত করার ঘোষণা দেন।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কক্সবাজার সফর
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের মধ্যে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কক্সবাজার সফর করলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘদিন পর তার এই সফর ঘিরে চকরিয়া-পেকুয়া ও কক্সবাজার জুড়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ছিল ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। শনিবার (১৩ জুন) সকাল ৯টা ৫০ মিনিটের দিকে বৃষ্টিস্নাত কক্সবাজারে পৌঁছেন প্রধানমন্ত্রী। সকাল থেকেই মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে বৃষ্টি হচ্ছিল জেলাজুড়ে। সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে পাশে বসিয়ে নিজেই গাড়ি চালিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর এমন ব্যতিক্রমী উপস্থিতি বিমানবন্দর ও আশপাশে উপস্থিত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। গাড়িতে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এবং সালাহউদ্দিন আহমদের স্ত্রী হাসিনা আহমেদ।

পথে পথে নেতাকর্মীদের ঢল, বাবার স্মৃতিবিজড়িত পাতলী খাল পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন
প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষ্যে কক্সবাজার বিমানবন্দরে বিএনপি নেতাকর্মীদের ঢল নামে। কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছালে দলীয় নেতাকর্মীরা তাদের ফুলেল শুভেচ্ছা জানান। দীর্ঘ দুই দশক পর তারেক রহমানের এই সফর ঘিরে পুরো জেলায় উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে। প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে এক পলক দেখার জন্য ভোর থেকেই বৃষ্টিস্নাত বিমানবন্দরের অবস্থান নেয় নেতাকর্মীরা। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে কক্সবাজার বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকা।

সকাল ১০টা ৫৩ মিনিটে সড়কপথে তিনি সদর উপজেলার পিএমখালী ইউনিয়নে বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ‘পাতলী খাল’ পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করেছেন। বৃষ্টির মধ্যেই কোদাল দিয়ে পাতলী খাল পুনঃখনন কাজ শুরু করেন। পরে তিনি খালের পাড়ে একটি খেজুরগাছের চারা লাগান। পুনঃখনন উপলক্ষে খালের পাড়ে পাতলী গ্রামবাসীরা জড়ো হন। তাঁরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেখতে সকাল থেকে বৃষ্টির মধ্যেই অপেক্ষায় ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী এসে পৌঁছালে খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রামবাসী তাঁকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। তাঁরা ‘প্রধানমন্ত্রীর আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম’ বলে স্লোগান দেন।

খাল খননের সময় উপস্থিত ছিলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী, প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, বেসরকারি বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক এবং ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মো. হেলাল উদ্দিন, পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম, কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল ও চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান।

পাতলী খাল ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান পিএমখালীতে এসে ৪৮ বছর আগে ১৯৭৯ সালের নভেম্বর মাসে কোদাল দিয়ে পাতলী খাল খননকাজের সূচনা করেছিলেন। সেই সময়ে রাষ্ট্রপতি খালের পারে একটি খেজুরগাছও রোপণ করেন। গাছটি এখনো আছে। এই খাল পুনঃখননে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ উপকৃত হবে বলে জানান পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় প্রকৌশলীরা।

বিরোধী দলের উদ্দেশ্য দেশের মধ্যে অস্থিতিশীলতা ও অশান্তি তৈরি করা, মানুষকে বিভ্রান্ত করা
‘পাতলী খাল’ পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন শেষে এক পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, ‘বিএনপির রাজনীতি ক্ষমতার জন্য নয়, মানুষের জন্য। সরকার দেশের ২০ কোটি মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সরকার ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।’ এ সময় উপস্থিত জনতার উদ্দেশে তিনি বলেছেন, ‘সরকার গঠন করতে সক্ষম হলে দেশের জন্য কাজ করব— এমন প্রতিশ্রুতি আমরা দিয়েছিলাম। আজ সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথেই এগিয়ে যাচ্ছি। পাতলী খাল পুনঃখনন শুধু একটি প্রকল্প নয়, এটি কৃষি, সেচ ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।’

প্রধানমন্ত্রীর দাবি, খালটি পুনঃখনন হলে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন এবং বছরে প্রায় ১২ হাজার মেট্রিক টন কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। তারেক রহমান উল্লেখ করেন, সদ্য ঘোষিত জাতীয় বাজেটে কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি জেলায় ৮ থেকে ১০ হাজার কৃষককে কৃষি কার্ড দেওয়া হবে। এসব কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের নগদ আড়াই হাজার টাকা প্রণোদনা দেওয়া হবে। ‘বিএনপির রাজনীতি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর রাজনীতি। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। তাই কৃষকদের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে এবং তাদের উৎপাদন ব্যয় কমাতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে’, যোগ করেন তিনি।

নারী শিক্ষার প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘বাংলাদেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া নারীদের শিক্ষার পথ উন্মুক্ত করেছিলেন। আমরা সেই ধারাবাহিকতায় স্নাতক ও ডিগ্রি পর্যন্ত নারীদের শিক্ষার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করার উদ্যোগ নিয়েছি।’ তিনি আরও যোগ করেন, নারী শিক্ষার প্রসারে উপবৃত্তি কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হবে, যাতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েরাও উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে সরকার ফ্যামিলি কার্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি মন্তব্য করেন, ‘গ্রামের সাধারণ মানুষ যাতে সহজে স্বাস্থ্যসেবা পায়, সেজন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। স্বল্পমূল্যে ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে কাজ চলছে।’

এবারের বাজেটের পরে এখন পর্যন্ত কোনো জিনিসের দাম বাড়েনি
পথসভায় প্রধানমন্ত্রী জানান, হার্টের রিং এবং কিডনি ডায়ালাইসিসে ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণ ও ওষুধের ওপর আরোপিত কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। যাতে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমে আসে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘খবরের কাগজগুলোয় দেখলাম, এবারের বাজেটের পরে এখন পর্যন্ত কোনো জিনিসের দাম বাড়েনি। কারণ, চাল, ডাল, তেল, নুনসহ সকল প্রয়োজনীয় জিনিসের ওপর যে ট্যাক্স ছিল, বর্তমান সরকার ৬০টি পণ্যের ওপর থেকে তা তুলে নিয়েছে। এর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য একটাই, দেশের মানুষ যাতে ভালো থাকতে পারে।’

তারেক রহমান আরও বলেন, ‘তাদের (বিরোধী দল) লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানো নয়। তাদের উদ্দেশ্য একটাই, দেশের মধ্যে অস্থিতিশীলতা ও অশান্তি তৈরি করা, মানুষকে বিভ্রান্ত করা।’ এ দেশ আমাদের সবার মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই দেশই আমাদের প্রথম ঠিকানা। এই দেশই আমাদের শেষ ঠিকানা। সে জন্যই আমরা বলি এই দেশকে গড়লে আমরাই ভালো থাকব, আমাদের সন্তানেরা শান্তিতে থাকতে পারবে।’ বিএনপি জনগণের জন্য রাজনীতি করে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপির সব ক্ষমতার উৎস হচ্ছে জনগণ। বিএনপি সরকার দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে চায়।

পথসভায় সভাপতিত্ব করেন সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুল মাবুদ। এতে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, পানিসম্পদমন্ত্রী শহিদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম এবং কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান কাজল।

আরেকটি নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণ, স্ত্রীকে নিয়ে ঘুরে দেখেন সাফারি পার্ক
এরপর সেখান থেকে আবারও নিজে গাড়ি চালিয়ে ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে যান প্রধানমন্ত্রী। এ সময় পুরো সড়কজুড়ে হাজার হাজার স্থানীয় সাধারণ মানুষ এবং দলীয় নেতাকর্মীরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ফুল ছিটিয়ে ও হাত নেড়ে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণ বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল। সাফারি পার্কের মূল ফটকের সামনে মালুমঘাট সংরক্ষিত বনে একটি নাগলিঙ্গম গাছের চারা রোপণের মধ্য দিয়ে আগামী পাঁচ বছরে দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরে তিনি সাফারি পার্কের স্মারক বইয়ে স্বাক্ষর করেন। এর মধ্যে দিয়ে আরেকটি নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণের দ্বার উন্মোচন করেন। একইসঙ্গে স্মারক বইয়ে স্বাক্ষর করেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানও। স্ত্রীকে নিয়ে সাফারি পার্ক ঘুরে দেখেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদসহ অন্যান্য মন্ত্রী-সংসদ সদস্যরা ১১ প্রজাতির গাছের চারা রোপণ করেন।

দুপুর দেড়টায় কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলায় নবগঠিত পেকুয়া পৌরসভার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পরে দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শেষে উপস্থিত জনতার উদ্দেশে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী। জনতার উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘২৫ বছর পূর্বে মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া পেকুয়া উপজেলার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। আজ তারই দল বিএনপি সরকার ফের এই পৌরসভার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে। এর মাধ্যমে একটি কথা বারবার প্রমাণিত হয় যে বিএনপি যখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকে, তখন জনগণের জন্য কাজ করে, দেশের কল্যাণে কাজ করে।’ প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য, ‘বিএনপি ক্ষমতায় থাকুক আর নাই থাকুক, বিএনপির প্রধান বিষয় দেশ ও মানুষের স্বার্থ। আর এটিই বিএনপির একমাত্র লক্ষ্য ও প্রতিজ্ঞা।’ এ সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমসহ মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

শহীদ ওয়াসিমের গ্রামের বাড়িতে প্রধানমন্ত্রী, ২০ লক্ষ টাকার সঞ্চয়পত্র প্রদান
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট এলাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন মো. ওয়াসিম। তিনি চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম-আহ্বায়ক ছিলেন। ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম। পাঁচ সন্তানের মধ্যে ওয়াসিম ছিল দ্বিতীয়। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে চট্টগ্রাম বিভাগের প্রথম শহীদ মো. ওয়াসিম আকরামের কবর জিয়ারত করেন প্রধানমন্ত্রী। এদিন বিকেলে নিজে গাড়ি চালিয়ে কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলায় শহীদ মো. ওয়াসিমের গ্রামের বাড়িতে যান প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও তার সহধর্মিণী হাসিনা আহমেদ। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানায়, কবর জিয়ারত শেষে প্রধানমন্ত্রী শহীদ ওয়াসিমের বাবা-মা ও ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের প্রতি সহমর্মিতা জানান। পরে শহীদ পরিবারের সদস্যদের হাতে ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে ৪ লেন থেকে ৬ লেনে উন্নীত করার ঘোষণা
শনিবার (১৩ জুন) সন্ধ্যায় চকরিয়া পৌর বাস টার্মিনাল মাঠে স্থানীয় বিএনপি আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে কক্সবাজারবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে ৪ লেন থেকে ৬ লেনে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে লবণচাষিদের উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকার শিগগিরই একটি নির্ধারিত মূল্য ঘোষণা করবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। তারেক রহমান বলেছেন, ‘২৫ বছর আগে আমি যে কক্সবাজার দেখে গিয়েছিলাম, আজও সেই সড়কের খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। অথচ কক্সবাজারের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে। কয়েকদিনের মধ্যেই মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হবে। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠবে এই অঞ্চল। তাই চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে অন্তত ৬ লেনে উন্নীত করা সময়ের দাবি।’

তিনি জানান, ‘মহাসড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজ দ্রুত শুরু হবে। এটি বাস্তবায়িত হলে পর্যটন, বাণিজ্য ও শিল্প খাতে নতুন গতি সঞ্চার হবে।’ লবণচাষিদের দুর্দশার প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘বছরের পর বছর পরিশ্রম করেও অনেক সময় লবণচাষিরা ন্যায্য দাম পান না। খুব শিগগিরই একটি মূল্য নির্ধারণ করে দেব, যাতে কোনো কৃষক লোকসানের শিকার না হন।’

‘দেশের উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং কৃষি ও লবণ খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে’, যোগ করেন তিনি। সম্প্রতি ঘোষিত জাতীয় বাজেট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য, ‘দুই দিন আগে আমরা যে বাজেট উত্থাপন করেছি, তা দেশের সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর কর কমানো হয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বিশেষ উদ্যোগ রাখা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘যারা এই বাজেটের বিরোধিতা করছে, তারা মূলত বেকারদের কর্মসংস্থানের বিরোধিতা করছে। যারা সিগারেট ও মদের ওপর কর বৃদ্ধিরও বিরোধিতা করে, তারা জনগণের জন্য রাজনীতি করে না।’ তারেক রহমানের ভাষায়, এটি জনগণের বাজেট, উন্নয়নের বাজেট এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি দায়িত্বশীল বাজেট।

জনসভায় প্রধানমন্ত্রী আরও ঘোষণা দেন, আগামী বাজেটে দেশের ৪২ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি ৪০ লাখ কৃষকের হাতে কৃষি কার্ড তুলে দেওয়া হবে। তার মতে, কৃষক, শ্রমিক, নিম্নআয়ের মানুষ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। আমরা চাই রাষ্ট্রের সুবিধা সরাসরি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাক। স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানালেন, দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে পর্যায়ক্রমে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হবে। এতে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী নিজ এলাকায় উন্নত চিকিৎসা সুবিধা পাবে। জেলা শহরের হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমবে।

বক্তব্যের একপর্যায়ে তারেক রহমান বললেন, এসব উদ্যোগ কোনো বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত নয়। এগুলো আমাদের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ। আমি বলেছিলাম—‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’। আজ আমরা সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছি। সভায় বক্তব্য দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে ৬ লেনে উন্নীত করা ছিল নির্বাচনী অঙ্গীকার। প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণায় কক্সবাজারবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি পূরণের পথ সুগম হলো।’ চকরিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি এনামুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভায় জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শামীম আরা স্বপ্না এমপি বক্তব্য দেন। এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এক নজরে দেখার জন্য কক্সবাজারের রামুর প্রত্যন্ত গ্রাম গর্জনিয়া থেকে অনেক দূরের চকরিয়ায় এসে বৃষ্টি-গরম উপেক্ষা করে সকাল থেকেই অপেক্ষা করছিলেন বৃদ্ধ আবুল হোসেন। তিনি বলেন, ‘ছোট বেলায় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে দেখেছি। তিনি দেশের জন্য অনেক কিছু করেছিলেন। এরপর তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলও পেয়েছি। এখন তাদের ছেলে তারেক রহমান সরকার প্রধান। আমরা চাই, বাবা-মায়ের দেখানো পথে দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যাক প্রধানমন্ত্রী।’ শুধু আবুল হোসেনই নয়, শনিবার (১৩ জুন) চকরিয়ার বাস টার্মিনাল এলাকায় উপজেলা বিএনপি আয়োজিত প্রধানমন্ত্রী জনসভায় ভিড় জমানো নানা বয়সের হাজারো মানুষের প্রত্যাশাও ছিল এক এবং অভিন্ন।

কালের আলো/জেএন/এমকে

অপরাধ তদন্তের পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা পেল এপিবিএন

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৪০ অপরাহ্ণ
অপরাধ তদন্তের পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা পেল এপিবিএন

জাতীয় সংসদে ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল, ২০২৬’ পাস হয়েছে। এর মাধ্যমে ১৯৭৯ সালের পুরোনো অধ্যাদেশ বাতিল করে এপিবিএনের জন্য নতুন আইন প্রণয়ন করা হলো। নতুন আইনে বাহিনীটির দায়িত্ব ও ক্ষমতার পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।

নতুন আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—প্রথমবারের মতো এপিবিএনকে ফৌজদারি অপরাধের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের স্পষ্ট ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ন্যূনতম সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) পদমর্যাদার কর্মকর্তারা ফৌজদারি কার্যবিধি ও পুলিশ রেগুলেশনস অনুসরণ করে তদন্ত পরিচালনা করতে পারবেন।

আইন অনুযায়ী, সন্ত্রাসবাদ, মাদক ও মানব পাচার, ধর্ষণ, অপহরণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, সাইবার অপরাধ, গুম এবং জমি দখলের মতো গুরুতর অপরাধ প্রতিরোধে এপিবিএন সরাসরি ব্যবস্থা নিতে পারবে।

এ ছাড়া রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রের নির্ধারিত ভিআইপিদের নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও বিমানবন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্বও বাহিনীটির ওপর থাকছে।

নতুন আইনে স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রোটেকশন ব্যাটালিয়ন, মাউন্টেন ব্যাটালিয়ন ও এয়ারপোর্ট ব্যাটালিয়নের মতো বিশেষায়িত ইউনিটগুলোকে এপিবিএনের একক কাঠামোর অধীনে পরিচালনার বিধান রাখা হয়েছে।

তদন্তের প্রয়োজনে এপিবিএন নিজস্ব ডিটেনশন সেল, ব্যারাক ও জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্র পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারবে। পাশাপাশি বাহিনীর সদর দপ্তরে সাইবার সেল ও গবেষণা ইউনিট গড়ে তোলার বিধান রাখা হয়েছে।

এপিবিএন পুলিশের একজন অতিরিক্ত মহাপরিদর্শকের (অ্যাডিশনাল আইজিপি) নেতৃত্বে পরিচালিত হবে এবং আইজিপির সার্বিক তদারকিতে থাকবে। প্রয়োজনে পুলিশ বাহিনীর বাইরে থেকেও আইনজীবী, মনোবিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও বিচারকদের মতো বিশেষজ্ঞদের চুক্তিভিত্তিক বা প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া যাবে। তবে বাহিনীতে যুক্ত হওয়ার পর সব সদস্যের জন্য প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

এদিকে নতুন আইনে এপিবিএনের বিচারিক কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। পুরোনো অধ্যাদেশের ‘পুলিশ-প্রধান আদালত’ ব্যবস্থার পরিবর্তে এপিবিএন বিশেষ ও আপিল আদালতে অসামরিক বিচার বিভাগের সদস্যদের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

আইন অনুযায়ী, সংক্ষিপ্ত এপিবিএন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে এবং বিশেষ এপিবিএন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট আপিল আদালতে আবেদন করা যাবে।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

র‍্যাবের জায়গায় এসআরবি, সংসদে আইন পাস

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:২৮ অপরাহ্ণ
র‍্যাবের জায়গায় এসআরবি, সংসদে আইন পাস

র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) বিলুপ্ত করে পুলিশের আওতাধীন ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) নামে নতুন বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের বিধান রেখে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে বিরোধী দলের আপত্তির মধ্যেই কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়। বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

এর আগে ৩ সেপ্টেম্বর বিলটি সংসদে উত্থাপনের পর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) কমিটির প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন করেন চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি।

বিলটির ওপর বিরোধী দল সাতটি আপত্তি জানায়। তাদের বক্তব্য, র‍্যাব বিলুপ্ত করে নতুন বাহিনী গঠনের আগে জাতীয় পর্যায়ে যথাযথ পরামর্শ, স্বাধীন নজরদারি ও শক্তিশালী জবাবদিহির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। র‍্যাবের জনবল, সম্পদ ও রেকর্ড সরাসরি এসআরবিতে হস্তান্তর, গ্রেপ্তার ও আটকের ক্ষমতা এবং অভিযোগ তদন্তের কাঠামো নিয়েও তারা আপত্তি তোলে।

বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, র‍্যাব বিলুপ্ত করে নতুন নামে একই ধরনের বাহিনী গঠন জনগণ ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা পূরণ করবে না। তিনি বিলটি পাস না করার আহ্বান জানান।

পাস হওয়া আইনে জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাসবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন এবং পুলিশ বাহিনীকে সহায়তার জন্য এসআরবি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। ইউনিটটির সদর দপ্তর হবে ঢাকায়। একজন মহাপরিচালকের নেতৃত্বে পরিচালিত হবে এসআরবি।

আইনে এসআরবিকে বেআইনি অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার, মাদক ও সাইবার অপরাধ দমন, গুম ও ভূমিদস্যুতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, মানবপাচার ও অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আদালত, সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শকের নির্দেশে ফৌজদারি অপরাধ তদন্তও করতে পারবে ইউনিটটি।

এ ছাড়া এসআরবির সদস্যদের কোনো স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা থাকবে। তবে এসব ক্ষমতা ফৌজদারি কার্যবিধি ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োগ করতে হবে। গ্রেপ্তার ব্যক্তি ও জব্দ করা আলামত অনতিবিলম্বে নিকটবর্তী থানার হেফাজতে হস্তান্তরের বিধান রাখা হয়েছে।

শৃঙ্খলা ভঙ্গের জন্য বরখাস্ত, অপসারণ, বাধ্যতামূলক অবসর, পদাবনতি, পদোন্নতি বন্ধসহ বিভিন্ন শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। তবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কোনো সদস্যকে শাস্তি দেওয়া যাবে না। বিভাগীয় আদেশের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে আপিলের সুযোগও থাকবে।

আইনে সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত ও অভ্যন্তরীণ সংক্ষোভ নিরসনে অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। কমিটিতে এসআরবি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর, বিচার বিভাগ এবং মানবাধিকার বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তির প্রতিনিধিত্ব থাকবে।

আইন কার্যকর হওয়ার সঙ্গে র‍্যাব গঠনসংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট বিধান রহিত হবে। একই সঙ্গে র‍্যাবের জনবল, ক্ষমতা, সম্পদ, তহবিল, সম্পত্তি, নথিপত্র ও রেকর্ড এসআরবির অনুকূলে স্থানান্তর ও ন্যস্ত করার বিধান রাখা হয়েছে।

বিরোধী সদস্যরা অবশ্য র‍্যাবের পুরোনো নথি ও রেকর্ড হস্তান্তর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, গুমসহ গুরুতর অপরাধের মামলায় এসব নথি গুরুত্বপূর্ণ আলামত হতে পারে। তাই হস্তান্তরের আগে নথি ও আলামতের তালিকা তৈরি এবং সেগুলো সংরক্ষণের পৃথক বিধানের দাবি জানান তারা।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

ক্যালিফোর্নিয়ায় ছিল রাশিয়ার উপনিবেশ, আজও দাঁড়িয়ে ফোর্ট রস

ভ্রমণ ডেস্ক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৫৯ অপরাহ্ণ
ক্যালিফোর্নিয়ায় ছিল রাশিয়ার উপনিবেশ, আজও দাঁড়িয়ে ফোর্ট রস

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে আজও দাঁড়িয়ে আছে রাশিয়ার এক বিস্মৃত উপনিবেশের স্মৃতি—ফোর্ট রস। ১৮১২ থেকে ১৮৪২ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩০ বছর এই অঞ্চলের একটি অংশ রুশ সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। সেই সময় এটি ‘রাশিয়ান আমেরিকা’র অংশ হিসেবে পরিচালিত হতো। সোনোমা থেকে সান ফ্রান্সিসকোর দিকে প্রায় দুই ঘণ্টার পথ এগোলেই দেখা মেলে ছোট্ট একটি অর্থোডক্স গির্জা ও কাঠের দুর্গসদৃশ স্থাপনার। রুশ ভাষায় যার নাম ‘ক্রেপস্ত রস’।

আলাস্কার খাদ্যসংকট থেকেই ক্যালিফোর্নিয়ায় রুশদের আগমন

১৬০০ ও ১৭০০-এর দশকে রুশ পশম ব্যবসায়ীরা সাইবেরিয়া পেরিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে পৌঁছান। পরে আলাস্কায় রুশ বসতি গড়ে ওঠে। তবে সেখানে কৃষিকাজ কঠিন হওয়ায় খাদ্যসংকট ছিল বড় সমস্যা। ১৮০৬ সালে রুশ-আমেরিকান কোম্পানির পরিচালক নিকোলাই রেজানোভ সান ফ্রান্সিসকো উপসাগরে আসেন। আলাস্কার খাদ্যসংকট মোকাবিলায় ক্যালিফোর্নিয়ার উষ্ণ ও কৃষির উপযোগী পরিবেশ তাঁকে আকৃষ্ট করে। এরপর উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ায় স্থায়ী ঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনা নেয় রুশরা। ১৮১২ সালে তৈরি হয় ফোর্ট রস। শুরুতে সেখানে ২৫ জন রুশ ও প্রায় ৮০ জন স্থানীয় আলাস্কান শিকারি ছিলেন।

বহুজাতিক জনপদে পরিণত হয়েছিল ফোর্ট রস

সময়ের সঙ্গে ফোর্ট রস শুধু সামরিক ঘাঁটি না থেকে বহুজাতিক বাণিজ্যিক ও উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হয়। ১৮৩০-এর দশকে সেখানে প্রায় ৪০০ মানুষ বসবাস করতেন। রুশ ও আলাস্কানদের পাশাপাশি স্থানীয় কাশায়া পোমো ও কোস্ট মিউক জনগোষ্ঠীর মানুষও সেখানে বসবাস করতেন। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিয়ে ও পারিবারিক সম্পর্কও গড়ে উঠেছিল। ফিনল্যান্ড ও হাওয়াই থেকেও দক্ষ কারিগরেরা সেখানে কাজ করতে আসতেন।

জাহাজ, কাচ ও ইট তৈরির কেন্দ্র

ফোর্ট রসে কৃষির পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের উৎপাদন কর্মকাণ্ড চলত। এখানে ক্যালিফোর্নিয়ার প্রথম সমুদ্রগামী জাহাজ নির্মিত হয়। তৈরি করা হতো ইট ও কাচ। ছিল বাতাসচালিত কলও। ক্যালিফোর্নিয়ার ওয়াইন শিল্পের ইতিহাসেও ফোর্ট রসের নাম রয়েছে। ১৮১৭ সালে বর্তমান সোনোমা কাউন্টিতে রুশরা প্রথম আঙুরগাছ রোপণ করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় আঙুর দিয়ে তারা অল্প পরিমাণে ওয়াইনও তৈরি করত।

কেন টিকল না রুশ উপনিবেশ?

বাণিজ্যিক ও কৃষি কর্মকাণ্ড চললেও ফোর্ট রস শেষ পর্যন্ত রুশদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। এটি যথেষ্ট লাভজনক হয়ে ওঠেনি এবং আলাস্কার বসতিগুলোতেও পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। অতিরিক্ত শিকারের কারণে সমুদ্রভোঁদড়ের সংখ্যা কমে যায়। পাশাপাশি উপকূলের কুয়াশা ও ইঁদুরের উপদ্রবে কৃষি উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হয়। ১৮৩৯ সালে হাডসনস বে কোম্পানি রুশ আলাস্কায় খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহে রাজি হলে ক্যালিফোর্নিয়ায় রুশ কৃষি ও উৎপাদনকেন্দ্র রাখার প্রয়োজন আরও কমে যায়। ১৮৪১ সালে সুইস অভিবাসী জন সাটার রুশদের কাছ থেকে ফোর্ট রসের ভবন ও অন্যান্য সম্পদ কিনে নেন। এর মধ্য দিয়েই ক্যালিফোর্নিয়ায় রুশ উপনিবেশের অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।

ইতিহাসের পাতায় রয়ে গেছে রুশদের ছাপ

রুশরা চলে গেলেও ফোর্ট রস ও আশপাশের অঞ্চলে তাদের উপস্থিতির চিহ্ন রয়ে গেছে। সান ফ্রান্সিসকোর রুশ হিল, রুশ রিভার ও বডেগা বে—এসব নামেও সেই ইতিহাসের প্রতিফলন দেখা যায়। আজ ফোর্ট রস তুলনামূলক নির্জন হলেও কাঠের দুর্গ, অর্থোডক্স গির্জা ও পুরোনো স্থাপনাগুলো ক্যালিফোর্নিয়ার ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে আছে। প্রায় দুই শতাব্দী আগে ক্যালিফোর্নিয়ার এই উপকূলে রাশিয়ার যে ছোট্ট উপনিবেশ গড়ে উঠেছিল, তার গল্প আজও ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে এক বিস্ময়কর অধ্যায়।

কালের আলো/এসএ