খুঁজুন
                               
, ,
           

বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করার পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬, ৫:৫৬ অপরাহ্ণ
বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করার পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

সরকার দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বুধবার (১০ জুন) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্য মো. মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার এক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী এ কথা জানান।

এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ সরকার দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজীকরণে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক গৃহীত প্রধান পদক্ষেপগুলো হলো, আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তর থেকে আমদানি ও রপ্তানি নিবন্ধন প্রক্রিয়া অনলাইনের মাধ্যমে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রদান করা হচ্ছে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির জন্য রপ্তানি নীতি হালনাগাদ করা হয়েছে এবং আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬–২০২৯ হালনাগাদকরণের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, যাতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সহজে বাজারে প্রবেশ করতে পারেন। রপ্তানির উদ্দেশ্যে আমদানির ক্ষেত্রে অশুল্ক বাধা দূর করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বন্ডেড ও নন-বন্ডেড সব প্রতিষ্ঠানকে এফওসি ভিত্তিতে আমদানির সুযোগের আওতা আরও সম্প্রসারিত করা হচ্ছে।

আমদানি সহজীকরণের লক্ষ্যে মূল্য পরিশোধ পদ্ধতি সহজ করা হচ্ছে এবং সকল আমদানিকারকের জন্য মূল্যসীমা নির্বিশেষে এলসি ব্যতীত চুক্তির মাধ্যমে আমদানির সুযোগ রাখা হচ্ছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার চুক্তি বাস্তবায়ন ও ট্রেড ফ্যাসিলিটেশনের মাধ্যমে বাণিজ্য প্রক্রিয়া দ্রুত ও স্বচ্ছ করার জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বাণিজ্য সহজীকরণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এছাড়া বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নয়ন এবং শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপগুলো হলো—বিনিয়োগ উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহের একীভূতকরণ: বিনিয়োগকারীদের জন্য সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা হ্রাস ও সেবার দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশিপ অথরিটি (পিপিপিএ) এবং বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ একীভূতকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগকারীরা একটি একক প্ল্যাটফর্ম থেকে সমন্বিত সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। একই সঙ্গে নীতিগত অসামঞ্জস্য ও সেবার পুনরাবৃত্তি কমবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া সহজ হবে।

মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর সঙ্গে নিয়মিত ও নীতিগত সমন্বয়: বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, ব্যবসা পরিচালনার প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ এবং নীতিগত সমস্যার দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে সরকার আন্তঃসংস্থা সমন্বয় জোরদার করেছে। এ উদ্দেশ্যে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে নিয়মিত সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিশেষ করে বিডা ও এনবিআরের মধ্যে মাসিক সভার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের কর-সংক্রান্ত সমস্যা ও নীতিগত বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সমাধান গ্রহণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং বিভিন্ন শিল্পখাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়মিত পরামর্শ সভা ও মতবিনিময় কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এর ফলে বেসরকারি খাতের বাস্তব অভিজ্ঞতা, চ্যালেঞ্জ এবং সুপারিশসমূহ সরাসরি নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় প্রতিফলিত হচ্ছে।

মূলধন ও বিনিয়োগ প্রত্যাবর্তন, প্রক্রিয়া সহজীকরণ: বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগ পরিবেশ আরও আকর্ষণীয় করার লক্ষ্যে সরকার মূলধন ও বিনিয়োগ প্রত্যাবর্তন (Capital Repatriation) প্রক্রিয়া সহজীকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বর্তমানে শেয়ার বিক্রয়, ব্যবসা হস্তান্তর বা ব্যবসা বন্ধ করার পর বিনিয়োগকৃত মূলধন ও অর্জিত অর্থ বিদেশে প্রেরণের ক্ষেত্রে অনেক বিনিয়োগকারী মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা এবং অতিরিক্ত দলিলপত্রের প্রয়োজনীয়তার কারণে বিলম্ব ও অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হন।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের সমন্বয়ে গঠিত মূলধন প্রত্যাবর্তন-সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি বিদ্যমান প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে একগুচ্ছ সংস্কার প্রস্তাব প্রণয়ন করেছে, যা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। প্রস্তাবিত সংস্কারের মাধ্যমে মূল্যায়ন, যাচাই ও অনুমোদন প্রক্রিয়া আরও সহজ, স্বচ্ছ, দ্রুত এবং পূর্বানুমানযোগ্য করা হবে। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা ও কাগজপত্রের পরিমাণ হ্রাস করে বিনিয়োগকারীদের জন্য অর্থ প্রত্যাবর্তনের প্রক্রিয়াকে আরও বিনিয়োগবান্ধব করা হবে।

লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজীকরণ: বিনিয়োগ কার্যক্রমের সূচনা আরও দ্রুত, সহজ ও পূর্বানুমানযোগ্য করতে সরকার লাইসেন্সিং ও অনুমোদন প্রক্রিয়ার ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এর আওতায় বিনিয়োগ-সংক্রান্ত সকল অনুমোদন, নিবন্ধন ও লাইসেন্স সেবাকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল সিঙ্গেল-উইন্ডো প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনা হচ্ছে, যেখানে সংশ্লিষ্ট সকল সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান আন্তঃসংযুক্ত থাকবে।

বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে গিয়ে অনেক উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী প্রায়ই জানতে পারেন না কোন সেবার জন্য কোন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে, কোথায় আবেদন করতে হবে কিংবা কীভাবে নির্ধারিত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। এই তথ্যগত ও প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা দূর করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)-এর সহযোগিতায় ‘বাংলাবিজ’ প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে। এ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তারা বিভিন্ন সরকারি সেবা, অনুমোদন, নিবন্ধন, লাইসেন্স ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার তথ্য একক ডিজিটাল মাধ্যমে জানতে ও আবেদন করতে পারেন।

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ম্যানুয়াল প্রক্রিয়া হ্রাস, শতভাগ অনলাইনভিত্তিক সেবা নিশ্চিতকরণ এবং প্রতিটি সেবার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হবে।

তারেক রহমান বলেন, সেইসাথে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধিতে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এর অংশ হিসেবে লজিস্টিক প্রক্রিয়া সহজীকরণ, বন্দর ও পরিবহন অবকাঠামোর আধুনিকায়ন এবং নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহ দ্রুত কার্যকর করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

পাশাপাশি দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ব্যয় ও সময় কমানোর লক্ষ্যে নতুন বন্দর অবকাঠামো নির্মাণ ও বিদ্যমান সুবিধার সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। লালদিয়া টার্মিনাল চলতি বছর কার্যক্রম শুরু করার লক্ষ্যে প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং বে-টার্মিনাল প্রকল্পের বাস্তবায়ন দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। একই সঙ্গে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণকাজ অগ্রসর হচ্ছে, যা সম্পন্ন হলে বৃহৎ জাহাজ সরাসরি বাংলাদেশের বন্দরে নোঙর করতে পারবে এবং দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

কালের আলো/এসআর/এএএন

পুলিশের অধীনে নতুন বিশেষায়িত ইউনিট, বিলুপ্ত হচ্ছে র‍্যাব

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ৯:৩৬ অপরাহ্ণ
পুলিশের অধীনে নতুন বিশেষায়িত ইউনিট, বিলুপ্ত হচ্ছে র‍্যাব

র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীনে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) নামে নতুন একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

সোমবার (১৭ আগস্ট) সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার ১৭তম বৈঠকে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের ভেটিং সাপেক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রস্তাবিত আইনের আওতায় বিদ্যমান র‍্যাব বিলুপ্ত করে পুলিশ বাহিনীর অধীনে এসআরবি প্রতিষ্ঠা করা হবে। নতুন ইউনিটের কার্যক্রম ও কাঠামো আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে।

এ ছাড়া নাগরিকদের অভিযোগ এবং এসআরবির সদস্যদের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ বা সংক্ষোভ নিষ্পত্তির জন্য একটি বহুপক্ষীয় অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।

আইনের খসড়ায় র‍্যাবের জনবল, আদেশ, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, সুযোগ-সুবিধা, তহবিল, সম্পত্তি, হিসাব, রেকর্ডসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সম্পদ এসআরবির কাছে হস্তান্তরের বিধান রাখা হয়েছে।

নতুন বিধিমালা প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান র‍্যাব-সংক্রান্ত বিভাগীয় কার্যধারার বিধিমালা প্রয়োজনীয় অভিযোজনসহ বহাল রাখার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

নারীবান্ধব গণপরিবহনের পথে বাংলাদেশের নতুন যাত্রা

আহসান হাবিব বরুন:
প্রকাশিত: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ৯:২৭ অপরাহ্ণ
নারীবান্ধব গণপরিবহনের পথে বাংলাদেশের নতুন যাত্রা

দক্ষিণ এশিয়ার মেগাসিটিগুলোর নগর-জীবনের সবচেয়ে বড় এবং সুদূরপ্রসারী চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো নারীবান্ধব ও নিরাপদ গণপরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা, যা বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যা এবং জনসংখ্যার ঘনত্বের নিরিখে অন্যতম ব্যস্ত এক প্রান্তর, সেখানে নারীদের জন্য প্রতিদিনের গণপরিবহন ব্যবহার যেন এক নিরন্তর সংগ্রাম। কর্মক্ষেত্রে নারীদের বিপুল অংশগ্রহণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে তাদের চালিকাশক্তি হওয়ার সত্ত্বেও, সড়কে তাদের যাতায়াতের বাস্তবতা বহু বছর ধরেই চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ভোগান্তিতে আচ্ছন্ন। ঠিক এই প্রেক্ষাপটে, নবনির্বাচিত বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) রাজধানীতে চালু করতে যাচ্ছে নারীদের জন্য বিশেষ ‘পিংক বাস সার্ভিস’। নারী চালক ও নারী কন্ডাক্টর দ্বারা পরিচালিত এই উদ্যোগটি আপাতদৃষ্টিতে একটি যুগান্তকারী সামাজিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তবে নীতি-বিশ্লেষণ ও আন্তর্জাতিক নগর-পরিবহন ব্যবস্থার অভিজ্ঞতার আলোকে প্রশ্ন থেকে যায়—এই ‘গোলাপি বাস’ কি ঢাকার পরিবহন খাতের গভীরে গেড়ে বসা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য ও নিরাপত্তা সংকটের একটি পূর্ণাঙ্গ সমাধান, নাকি নিছকই একটি প্রতীকী সংস্কার?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণের একটি ধারা লক্ষ করা যাচ্ছে। ১৬ আগস্ট পাঠানো বিআরটিসির সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ১৮ আগস্ট তেজগাঁওয়ের বিআরটিসি ট্রাক ডিপো প্রাঙ্গণে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম আনুষ্ঠানিকভাবে এই বাস সার্ভিসের উদ্বোধন করবেন। এই অনুষ্ঠানে সরকারের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারকদের উপস্থিতিও স্পষ্ট করে যে, নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাদের নারী ক্ষমতায়ন ও নিরাপদ যাতায়াতের প্রতিশ্রুতি দ্রুত দৃশ্যমান করতে আগ্রহী।

রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই পদক্ষেপ অত্যন্ত কৌশলগত। ইশতেহারের একটি স্পষ্ট প্রতিশ্রুতিকে ক্ষমতার সূচনালগ্নেই নীতিগত পদক্ষেপে রূপান্তর করা জনমনে ইতিবাচক বার্তা পাঠায়। তদুপরি, এই সার্ভিসে চালক ও কন্ডাক্টর হিসেবে নারীদের পদায়ন কেবল নারীদের জন্য পৃথক আসন নিশ্চিত করছে না, বরং পরিবহন খাতের ঐতিহ্যগত পুরুষকেন্দ্রিক শ্রমবাজারে নারীদের সরাসরি অন্তর্ভুক্তির এক বলিষ্ঠ দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে।

একটি নিরাপদ শহর গড়ে তোলার প্রধান শর্ত হলো এর গণপরিবহনে নারীদের অবাধ ও হয়রানিমুক্ত চলাচলের স্বাধীনতা। তবে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ও স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সাম্প্রতিক গবেষণা চিত্রটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক:

একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার গণপরিবহনে যাতায়াতকারী নারীদের ৮৫ থেকে৯০ শতাংশের বেশি জীবনে কোনো না কোনো সময় শারীরিক বা মৌখিক হয়রানির শিকার হয়েছেন। ভিড়ের সুযোগে স্পর্শকাতর আচরণ, অশালীন মন্তব্য এবং চালক বা সহকারী দ্বারা নিগ্রহের ভয় প্রতিনিয়ত নারী যাত্রীদের তাড়া করে ফেরে।

সাধারণ বাসগুলোতে নারীদের জন্য মাত্র কয়েকটি সংরক্ষিত আসন থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুরুষ যাত্রীরা বাসের অনভিপ্রেত ভিড়ের মধ্যে এসব আসন দখল করে রাখেন অথবা সেখানে বসতে চাওয়া নারীদের মানসিকভাবে হেনস্তা করা হয়।

চলাচলের অনিরাপত্তা নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক জীবনে অংশগ্রহণের সুযোগকে সীমিত করে দেয়। অনেক নারী নিরাপত্তাহীনতার কারণে ভালো কর্মসংস্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হন অথবা যাতায়াতের জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে সিএনজি অটোরিকশা বা রাইড-শেয়ারিংয়ের ওপর নির্ভরশীল হন।

এই জটিল বাস্তবতায় নারীবান্ধব ‘পিংক বাস সার্ভিস’ চালু হওয়া অবশ্যই একটি স্বস্তির নিঃশ্বাস। সম্পূর্ণ নারী পরিচালিত বাস সার্ভিস নারীদের জন্য এমন একটি ‘সেফ স্পেস’ বা নিরাপদ অঞ্চল তৈরি করবে, যেখানে অন্তত বাস ভ্রমণের পুরো সময়টাতে তাদের কোনো যৌন হয়রানি বা সামাজিক হেনস্তার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন থাকতে হবে না।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রধান শহরগুলোতে নারীদের জন্য পৃথক পরিবহন সার্ভিস চালুর সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। মেক্সিকো সিটি, টোকিও, কায়রো, জাকার্তা এবং পার্শ্ববর্তী ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে নারীদের জন্য বিশেষ বাস বা ট্রেন কোচ চালু করা হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করলে দুটি স্পষ্ট ধারা দেখা যায়:

১.স্বল্পমেয়াদে, নারীদের জন্য তৈরি এই ধরনের বিচ্ছিন্ন বা পৃথক ব্যবস্থা দারুণ ইতিবাচক ফল দেয়। নারী যাত্রীরা মানসিকভাবে নিরাপদ বোধ করেন এবং তাদের ওপর যৌন হয়রানির হার তাৎক্ষণিকভাবে কমে যায়। বিশেষ করে নারী চালক ও কন্ডাক্টর থাকার ফলে কর্মসংস্থানের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।

২.আন্তর্জাতিক নগর-বিজ্ঞানী ও জেন্ডার গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, কেবল ‘পিংক বাস’ বা ‘অনলি উইমেন’ সার্ভিস দিয়ে পুরো শহরের নিরাপত্তা সংকট দূর করা সম্ভব নয়। যদি সাধারণ ও মূলধারার গণপরিবহনে পুরুষদের মানসিকতা এবং আইনি প্রয়োগ ব্যবস্থা উন্নত না হয়, তবে এই বিশেষ সার্ভিস উল্টো নারীদের ‘বিচ্ছিন্ন’ করে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করে। মূলধারার বাসগুলো পুরুষদের একচেটিয়া অধিকারে পরিণত হতে পারে এবং সেখানে নারীদের যাতায়াত আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

এদিকে ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় বিআরটিসির অতীতের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এ ধরনের বিশেষ বা ছকভাঙা উদ্যোগ সূচনাতেই থেমে যাওয়ার এক ধরনের ঝোঁক থাকে। ইতোপূর্বেও নারীদের জন্য ‘লেডিস বাস’ চালু হয়েছিল, কিন্তু পর্যাপ্ত বাস না থাকা, নির্দিষ্ট রুটে সময়সূচি বজায় রাখতে না পারা এবং সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলো ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়ে। সুতরাং এই নতুন পিংক বাস সার্ভিসের সাফল্য নির্ভর করবে কয়েকটি প্রধান চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলার ওপর:

১.সীমিত সংখ্যক বাস ও রুট দিয়ে বিশাল ঢাকার নারী জনসংখ্যার চাহিদা মেটানো অসম্ভব।
পর্যাপ্ত বাস বরাদ্দ নিশ্চিত করা এবং প্রধান প্রধান কর্মজীবী রুটে ফ্রিকোয়েন্সি বাড়ানো।
২.ভারী যানবাহন চালনায় নারী চালকের স্বল্পতা এবং তাদের পেশাগত নিরাপত্তা। বিআরটিসির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ও উন্নত ট্রেনিং একাডেমি গড়ে তোলা এবং তাদের বিশেষ ভাতা নিশ্চিত করা।
৩.ঢাকার তীব্র যানজটে বাসের নির্দিষ্ট শিডিউল ধরে রাখা কঠিন। ডেডিকেটেড বাস লেইন (BRT) বা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বিশেষ অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা।
৪.কারিগরি ত্রুটি ও বিআরটিসির প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি। আধুনিক ডিপো সুবিধা এবং নিয়মিত গণতদারকির মাধ্যমে বাসের গুণমান ধরে রাখা।

আমি মনে করি,পিংক বাস সার্ভিসকে নিছক একটি প্রতীকী রাজনৈতিক সাফল্য থেকে একটি দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই নীতি সংস্কারে রূপান্তর করতে হলে সরকারকে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে:

পিংক বাসকে মূলধারার গণপরিবহন ব্যবস্থার একটি সহায়ক শাখা হিসেবে দেখতে হবে, একমাত্র সমাধান হিসেবে নয়। মূলধারার সাধারণ বাসগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, চালক ও কন্ডাক্টরদের জন্য নারীবান্ধব আচরণের ওপর বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ এবং যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা (যেমন: মোবাইল কোর্ট বা জরুরি হেল্পলাইন ৯৯৯-এর দ্রুত কার্যকারিতা) সুনিশ্চিত করতে হবে। কেবল বাস নারীবান্ধব হলেই চলবে না; বাস স্টপেজ, ফুটপাত এবং বাস সংযোগস্থলগুলোকে পর্যাপ্ত আলো, নিরাপত্তা কর্মী ও সিসিটিভির আওতায় এনে সার্বিকভাবে নিরাপদ করে তুলতে হবে।

পরিশেষে বলতে চাই,সরকারের এই নতুন উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় এবং ইতিবাচক এক দিকনির্দেশনা। তবে এটি যেন কেবল উদ্বোধনী বিজ্ঞাপনের চাকচিক্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর তদারকি এবং অবকাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে এই ‘পিংক বাস সার্ভিস’ যদি ঢাকার বুকে সফলভাবে সচল রাখা যায়, তবেই তা বাংলাদেশের পরিবহন ইতিহাসে জেন্ডার সমতা ও নাগরিক নিরাপত্তার এক নতুন স্বর্ণযুগের সূচনা করবে ইনশাল্লাহ।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

জ্বালানি সংকট নিরসনে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে : নজরুল ইসলাম খান

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ৯:২০ অপরাহ্ণ
জ্বালানি সংকট নিরসনে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে : নজরুল ইসলাম খান

জ্বালানি সংকট নিরসনে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর চেষ্টার কোনও ত্রুটি নেই।

সোমবার (১৭ আগস্ট) তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সরকারের ১৮০ দিন পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন।

নজরুল ইসলাম খান বলেন, আমাদের জ্বালানি আমদানি নির্ভর। খনিজ সম্পদ উন্নয়নে বাপেক্স প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জিয়াউর রহমান। কিন্তু বিগত ১০-১৫ বছরে এ প্রতিষ্ঠানটিকে অকার্যকর করে ফেলা হয়েছে। জ্বালানি সমস্যা সমাধান সহজে শেষ করা যায় না। তারপরও সরকার পাইপলাইন হয়ে জ্বালানি আনার চেষ্টা করছে। এমনকি মিয়ানমারের সঙ্গেও আলোচনা হচ্ছে। এ খাতে সরকার ৪০ হাজার কোটি টাকার মতো অতিরিক্ত বরাদ্দ দিয়েছে; যা আমাদের দেশের জন্য অনেক বড় ব্যাপার।

বিএনপির এই নেতা বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের যে ডকুমেন্টস রাজনৈতিক দলগুলোকে দেওয়া হয়েছিল। আমরা মনে করি, প্রতিটি রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে সংবিধান সংস্কারের জন্য সংশোধনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এখন সংশোধন শব্দটি মানা হচ্ছে না। তিনি বলেন, জুলাই সনদে বলা হয়েছে, যারাই ক্ষমতায় যাবে, তারাই নিজেদের নোট অব ডিসেন্টের বিষয়টি নির্বাচনের আগে জনগণের সামনে তুলে ধরবেন। সে অনুযায়ী, জনগণ যাদের রায় দেবে, তারা তাদের মতো জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে। এরপরও প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, এ ক্ষেত্রে যদি বড় ধরনের সিদ্ধান্ত হয়, সেটাতো আলোচনা করা হবে। আমরা মনে করি গণতন্ত্রে আলোচনার কোনও বিকল্প নেই।

তিনি বলেন, বর্তমান একটি ঐতিহাসিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতা। তাই সরকার নির্বাচনি ইশতেহার ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছে।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাবেক পুলিশপ্রধান বেনজীরকে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করা হচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সরকারের প্রতি কূটনীতিক তৎপরতা চলছে। তিনি যাতে সেখানে আউনি সুবিধা না পান, সেভাবে দেশটির সরকারকে অনুরোধ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে বলতে চাই সরকার তাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, ৬ মাসে যা করতে পেরেছেন, তা হয়তো খুব বেশি কিছু নয়। তবে তা একেবারেই কমও নয়। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সরকারকে সহযোগিতা করেছেন। যারা বিরোধিতা করেছেন, তারা হয়তো সহযোগিতার অংশ হিসেবেই করেছেন।

আরও উপস্থিত ছিলন, রুহুল কবির রিজভী, ইসমাইল জবিউল্লাহ, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, পপ্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান, প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, জাহিদুল ইসলাম রনি প্রমুখ।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ