পাহাড়ে শান্তি, উন্নয়ন ও সম্প্রীতিই হোক সবার অঙ্গীকার
প্রতি বছর ৯ আগস্ট বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী প্রাচীন জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, জীবনধারা এবং অধিকার নিয়ে আলোচনা হয় এই দিনে। বাংলাদেশেও দিবসটি ঘিরে নানা আলোচনা ও বিতর্ক সামনে আসে, বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে।
বাংলাদেশ একটি বৈচিত্র্যময় দেশ। এই দেশের সমাজ ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে নানা জনগোষ্ঠী, ভাষা, ঐতিহ্য ও জীবনধারার সমন্বয়ে। সমতলের মানুষের পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীরও রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক বৈশিষ্ট্য। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান- এই তিন পার্বত্য জেলায় বসবাসকারী চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, বম, খুমি, খিয়াংসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বাংলাদেশের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীগুলোর পরিচয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহার নিয়ে বাংলাদেশে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। বাংলাদেশের সরকারি অবস্থান অনুযায়ী, এসব জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ না বলে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সরকারের যুক্তি হলো, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর আগমন, বসতি স্থাপন এবং ঐতিহাসিক বিকাশের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাদের পরিচয় নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অনেকেই নিজেদের এই অঞ্চলের ঐতিহাসিক অধিবাসী হিসেবে বিবেচনা করেন এবং ‘আদিবাসী’ পরিচয়কে তাদের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক অস্তিত্বের অংশ হিসেবে দেখেন। এই পরিচয়ের প্রশ্নটি শুধু একটি শব্দের বিতর্ক নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, আবেগ, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতা।
তবে পরিচয়ের এই বিতর্কের বাইরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো- তারা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং উন্নয়নের অধিকার সমান। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা বুঝতে হলে শুধু পরিচয়ের বিষয়টি দেখলে হবে না; দেখতে হবে এই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা, অর্থনৈতিক সুযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার চিত্রও। পাহাড়ি এলাকার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় আলাদা। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা এবং প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার কারণে সেখানে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
তারপরও গত কয়েক দশকে পার্বত্য অঞ্চলে সড়ক যোগাযোগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুৎ এবং বিভিন্ন অবকাঠামো খাতে উন্নয়ন হয়েছে। তবে এই উন্নয়ন আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন, যাতে পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষও দেশের অন্যান্য এলাকার মতো সমান সুযোগ ও সুবিধা পায়। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন শুধু রাস্তা, সেতু বা ভবন নির্মাণের নাম নয়। প্রকৃত উন্নয়ন হলো মানুষের আস্থা অর্জন, তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিকল্পনা গ্রহণ করা।
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, পোশাক, উৎসব ও ঐতিহ্য বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সম্পদের অংশ। একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মানুষের নিজস্ব সংস্কৃতি সংরক্ষণের সুযোগ থাকা উচিত। একই সঙ্গে জাতীয় উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় মূলধারার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পথও আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা যায়, ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলো নিজেদের ঐতিহ্য ধরে রেখেও জাতীয় উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশেও এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব, যেখানে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব পরিচয় ও সংস্কৃতি বজায় রেখে দেশের অগ্রযাত্রার অংশীদার হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে কিছু কঠিন অধ্যায় রয়েছে। অতীতের সংঘাত, অবিশ্বাস এবং নিরাপত্তাজনিত সমস্যাগুলো এই অঞ্চলের মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু কোনো দেশই অতীতের সমস্যাকে স্থায়ী বিভাজনের কারণ হতে দিতে পারে না। ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে হলে প্রয়োজন পারস্পরিক আস্থা, সহনশীলতা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। এখানে রাষ্ট্রের যেমন দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি দায়িত্ব রয়েছে সব পক্ষের। সরকারকে যেমন উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও দেশের সামগ্রিক স্বার্থ ও জাতীয় ঐক্যের বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। পার্বত্য অঞ্চলে কোনো ধরনের সহিংসতা বা অস্থিতিশীলতা কারও জন্যই কল্যাণ বয়ে আনে না। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ থাকলে সরকার যেমন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে পারবে, তেমনি স্থানীয় মানুষও অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে এগিয়ে যেতে পারবে।
প্রয়োজন এমন একটি পরিবেশ, যেখানে পাহাড়ি ও বাঙালি- সব সম্প্রদায়ের মানুষ পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার ভিত্তিতে বসবাস করবে। কারণ উন্নয়ন এবং সম্প্রীতি একে অপরের পরিপূরক। পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই অঞ্চলের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীও বাংলাদেশের সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের বিচ্ছিন্ন করে নয়, বরং সম্মানের সঙ্গে জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত করাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ।
বিশ্ব আদিবাসী দিবসের আলোচনায় তাই শুধু পরিচয়ের বিতর্ক নয়, সামনে আসা উচিত আরও বড় একটি প্রশ্ন- কীভাবে পার্বত্য অঞ্চলের প্রতিটি মানুষ শান্তি, নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারে। পরিচয়ের ভিন্নতা যেন বিভেদের কারণ না হয়। বরং বাংলাদেশের বৈচিত্র্যকে শক্তিতে পরিণত করে পার্বত্য চট্টগ্রামকে শান্তি, উন্নয়ন ও সম্প্রীতির একটি উদাহরণ হিসেবে গড়ে তোলাই হওয়া উচিত সবার লক্ষ্য।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

আপনার মতামত লিখুন
Array