অনন্ত আম্বানিকে অধ্যাপক নিয়োগে প্রশ্ন
ভারতের শিল্পগোষ্ঠী রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের নির্বাহী অনন্ত আম্বানিকে টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে ‘প্রফেসরশিপ অব প্র্যাকটিস’ দিয়েছে যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়। গত ১৪ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়টি তাঁর নিয়োগের ঘোষণা দেয়। সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য, প্রাণী কল্যাণ ও পরিবেশ রক্ষায় কাজ এবং রিলায়েন্স গ্রুপের পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মান দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়।
তবে অনন্ত আম্বানির প্রতিষ্ঠিত গুজরাটের বন্য প্রাণী সংরক্ষণকেন্দ্র ভান্তারায় প্রাণী সংগ্রহ ও আমদানি নিয়ে আগে ওঠা বিভিন্ন প্রশ্নের কারণে এই নিয়োগ নিয়ে পরিবেশবিদ ও শিক্ষাবিদদের একাংশ আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁদের কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং যথাযথ যাচাই-বাছাই হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
সংরক্ষণকাজের স্বীকৃতি হিসেবে নিয়োগ
নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, অনন্ত আম্বানিকে দেওয়া ‘প্রফেসরশিপ অব প্র্যাকটিস ইন সাসটেইনেবিলিটি’ তাঁর প্রচলিত একাডেমিক গবেষণার পদ নয়; বরং বাস্তব ক্ষেত্রে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে, অনন্তের ভান্তারা উদ্যোগের কাজ তাদের বৈশ্বিক সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্যবিষয়ক গবেষণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ভান্তারা আহত, নির্যাতিত ও বিপন্ন প্রাণীর উদ্ধার, পুনর্বাসন ও সুরক্ষায় কাজ করে বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে।
অনন্ত আম্বানি অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়নকে ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ভান্তারায় দেড় লাখের বেশি প্রাণী
৩১ বছর বয়সী অনন্ত আম্বানি রিলায়েন্স গ্রুপের নির্বাহী পর্ষদে পরিচ্ছন্ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিভাগের নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ভান্তারা ভারতের গুজরাটের জামনগরে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ একর এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভান্তারায় ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি প্রাণী রয়েছে। এর মধ্যে সিংহ, চিতাবাঘ, কুমিরসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী রয়েছে। ভান্তারা নিজেদের বন্য প্রাণী উদ্ধার, পুনর্বাসন ও সংরক্ষণকেন্দ্র হিসেবে পরিচয় দেয়।
তবে বিপুলসংখ্যক প্রাণী বিভিন্ন দেশ থেকে ভান্তারায় আনার প্রক্রিয়া নিয়ে আগে থেকেই প্রশ্ন উঠেছে।
প্রাণী আমদানি নিয়ে কী প্রশ্ন
জার্মান সংবাদপত্র সুড্ডয়চে সাইটুং-এর ২০২৫ সালের এক অনুসন্ধানে ভান্তারায় প্রাণী আনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের রুট ব্যবহারের বিষয়টি উঠে আসে। এরপর প্রাণী আমদানির নথিপত্র ও বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী সংগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
পরবর্তী সময়ে বিপন্ন প্রজাতির আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা সাইটিস (CITES) ভান্তারায় প্রাণী আমদানির বিষয়ে তথ্য অনুসন্ধান করে। প্রতিবেদনে কিছু আমদানির অনুমতিপত্র নিয়ে উদ্বেগের কথা বলা হয় এবং বিপুলসংখ্যক প্রাণী আমদানির ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।
তবে বিষয়টির আইনগত অবস্থান নিয়ে ভিন্ন তথ্যও রয়েছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে হওয়া তদন্তে ভান্তারার পরিচালকদের কোনো অনিয়মের জন্য দায়ী করা হয়নি বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে CITES-সংক্রান্ত সুপারিশ নিয়েও ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের আপত্তি ছিল।
অর্থাৎ প্রাণী আমদানি নিয়ে প্রশ্ন ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের উদ্বেগ থাকলেও ভান্তারার বিরুদ্ধে অবৈধ বন্য প্রাণী পাচারের অভিযোগ আদালতের তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
নিয়োগ নিয়ে শিক্ষাবিদদের আপত্তি
নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তের পর কয়েকজন শিক্ষাবিদ ও পরিবেশকর্মী প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন।
ভারতের ইতিহাসবিদ ও পরিবেশবিষয়ক লেখক রামচন্দ্র গুহ এই নিয়োগকে ‘রহস্যজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর বক্তব্য, পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা আরও অনেক গবেষক ও বিশেষজ্ঞ রয়েছেন, যাঁদের অবদানও এমন স্বীকৃতির যোগ্য।
তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টি অনন্ত আম্বানিকে নিয়োগের আগে কতটা যাচাই-বাছাই করেছে, সে প্রশ্নও তুলেছেন। তাঁর মতে, সিদ্ধান্তটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরেও আপত্তি
শুধু বাইরের পরিবেশবিদ বা শিক্ষাবিদ নন, নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীদের মধ্যেও এই নিয়োগ নিয়ে আপত্তির কথা উঠে এসেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড কলেজ ইউনিয়ন শাখার সভাপতি অধ্যাপক ম্যাট পেরি জানিয়েছেন, পরিবেশগত উদ্বেগের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কর্মী নিয়োগটির বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন।
সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লায়লা মেহতাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, সরকারি অর্থায়ন কমে যাওয়ার সময়ে ধনী ব্যক্তি ও করপোরেট অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণায় প্রভাব ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্তব্য কী
নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয় অবশ্য তাদের সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, অনন্ত আম্বানিকে দেওয়া অধ্যাপক পদটি তাঁর বন্য প্রাণী সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, প্রাণী কল্যাণ ও পরিবেশগত দায়িত্বশীলতার কাজের স্বীকৃতি।
এ ছাড়া রিলায়েন্স গ্রুপের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে তাঁর কাজও এই স্বীকৃতির বিবেচনায় ছিল বলে বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে।
সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয় আরও জানিয়েছে, অনন্ত আম্বানি বা তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এই অধ্যাপক পদ দেওয়ার বিনিময়ে অনুদান নেওয়া হয়নি।
ভান্তারার নতুন পদক্ষেপ
প্রাণী আমদানি নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই ভান্তারা গত আগস্টে তাদের কার্যক্রমে নতুন করে পরিবর্তনের ঘোষণা দেয়। প্রতিষ্ঠানটি সাবেক এক CITES প্রধানকে কার্যক্রম তদারকির সঙ্গে যুক্ত করে এবং আগামী বছরের জুন পর্যন্ত বন্য প্রাণী আমদানি বন্ধ রাখার কথা জানায়।
ভান্তারা ও আম্বানি পরিবার এর আগে বন্য প্রাণী পাচার বা অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য, প্রাণীদের উদ্ধার, পুনর্বাসন ও যত্ন নেওয়াই তাদের মূল লক্ষ্য।
নতুন করে আলোচনায় একাডেমিক স্বীকৃতি
অনন্ত আম্বানির অধ্যাপক নিয়োগের ঘটনাটি তাই একদিকে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়নে তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থানকে সামনে এনেছে, অন্যদিকে ভান্তারার প্রাণী সংগ্রহ ও আমদানি নিয়ে আগে ওঠা প্রশ্নগুলোও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
গত এপ্রিল অনন্ত আম্বানি ‘ভান্তারা ইউনিভার্সিটি’ চালু করেন। প্রতিষ্ঠানটি বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও পশুচিকিৎসাবিজ্ঞানে বৈশ্বিক পর্যায়ের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে নিজেদের উদ্যোগকে তুলে ধরছে।
নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক চললেও বিশ্ববিদ্যালয়টি বলছে, সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ক্ষেত্রে অনন্ত আম্বানির কাজের স্বীকৃতি হিসেবেই এই সম্মান দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সমালোচকেরা নিয়োগের মানদণ্ড, যাচাই-বাছাই এবং ভান্তারাকে ঘিরে থাকা প্রশ্নগুলোর বিষয়টি সামনে আনছেন।
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array