খুঁজুন
                               
, ,
           

পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্রের ঝঙ্কার: স্বাধীন দেশে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর দৌরাত্ম্য আর কতকাল?

এম মহাসিন মিয়া:
প্রকাশিত: সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৫৫ অপরাহ্ণ
পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্রের ঝঙ্কার: স্বাধীন দেশে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর দৌরাত্ম্য আর কতকাল?

প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র্য ও সৌন্দর্যের লীলাভূমি স্বাধীন বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ পার্বত্য চট্টগ্রাম আজ আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর লাগামহীন দৌরাত্ম্যে বিভীষিকাময় এক জনপদে পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতা অর্জনের দীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও এই ভূখণ্ডের একটি বিশেষ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ আজও শান্তির বদলে প্রতিনিয়ত গানপাউডার আর বারুদের গন্ধ শুঁকে দিনাতিপাত করছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের অনবদ্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ঢেকে দিয়েছে অবৈধ অস্ত্রের মহড়া, আধিপত্য বিস্তারের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম এবং পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনগণকে জিম্মি করে রাখার অপকৌশল। পাহাড়ে শান্তিশৃঙ্খলা ও দেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখতে রাষ্ট্র ও সরকারের পক্ষ থেকে যুগে যুগে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হলেও সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর অনড় অবস্থান, অপতৎপরতা এবং সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা কায়েমের অশুভ আকাঙ্ক্ষার কারণে প্রত্যাশিত স্থায়িত্ব লাভ করেনি পার্বত্য অঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশ। ফলে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সার্বভৌম ভূখণ্ডে এমন সশস্ত্র নৈরাজ্য আর কতকাল বহাল থাকবে, তা আজ গোটা জাতির কাছে এক মস্ত বড় প্রশ্ন ও চরম উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‎
‎সম্প্রতি খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার পানছড়িতে ঘটে যাওয়া এক রক্তক্ষয়ী ঘটনা পাহাড়ে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর উগ্রতা ও আধিপত্য বিস্তারের চিত্রকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার চেঙ্গি ইউনিয়নের তারাবন এলাকায় গত ৫ সেপ্টেম্বর- ২০২৬ তারিখে পাহাড়ি দুটি প্রধান আঞ্চলিক দল, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস-মূল) এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-মূল) এর মধ্যে এক ভয়াবহ সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। সকালের দিকে জেএসএস ক্যাডারদের মহড়া ও ফাঁকা গুলির পর বিকেলে তা রূপ নেয় মুখোমুখি এক রক্তক্ষয়ী গোলাগুলিতে। বিবর্ণ চাকমার নেতৃত্বাধীন ২৫-৩০ জনের জেএসএস দল এবং সুমেন চাকমার পরিচালনায় ৩৫-৪০ জনের সুসজ্জিত ইউপিডিএফ বাহিনীর মধ্যে একটানা আড়াই ঘণ্টাব্যাপী আক্ষরিক অর্থেই যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই দুই পক্ষের মধ্যকার প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ রাউন্ড অনবরত গুলিবিনিময়ের ফলে পুরো তারাবন ও জগা পাড়া এলাকা মুহূর্তে এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। কোনো প্রাণহানি নিশ্চিত না হলেও অনবরত বিকট গুলির শব্দে অবরুদ্ধ সাধারণ মানুষের মনে এক বিভীষিকাময় ভীতি তৈরি হয়েছিল।
‎
‎পানছড়ির উত্তাপ প্রশমিত হতে না হতেই ৬ সেপ্টেম্বর- ২০২৬ তারিখে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটির সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় পর্যটন উপত্যকা সাজেকে ইউপিডিএফ (প্রসীত) ও জেএসএস (সন্তু) গ্রুপের সশস্ত্র ক্যাডারদের বিপজ্জনক মহড়া ও মুখোমুখি অবস্থান পাহাড়ের পরিস্থিতিকে আরও থমথমে করে তোলে। দেশের শীর্ষতম পর্যটন কেন্দ্র সাজেক উপত্যকার নোয়াপাড়া, ৮নং পাড়া, কিচিংপাড়া ও ব্রীজপাড়ার মতো স্পর্শকাতর ও ঘনবসতিপূর্ণ স্থানগুলোতে ইউপিডিএফের প্রায় নব্বইজন এবং জেএসএস গ্রুপের সত্তর-আশিজন ক্যাডার ভারি অস্ত্রশস্ত্রসহ কৌশলগত অবস্থান নেয়। ইউপিডিএফের পক্ষে সুমন চাকমা, কহেন চাকমা ও পরান্টু চাকমা এবং জেএসএসের পক্ষে বিক্রম চাকমা ও মুচং চাকমার মতো শীর্ষ সশস্ত্র কমান্ডারের সরাসরি নেতৃত্বে শতাধিক ক্যাডারের এমন মহড়া যে কোনো মুহূর্তে এক ভয়াবহ রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছিল। একদিকে সাধারণ স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে জীবনভীতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন, অন্যদিকে সাজেকে বেড়াতে আসা অগণিত পর্যটকদের নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। মূলত পাহাড়ে পর্যটন শিল্পকে ধ্বংস করা এবং সাধারণ মানুষকে চাপে রাখার কৌশল হিসেবেই সাজেকের মতো জায়গায় সশস্ত্র ক্যাডাররা এই অবস্থান নিয়েছিল।
‎
‎পাহাড়জুড়ে কায়েম করা এই নৈরাজ্যের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় সুপরিচিত পর্যটন এলাকা রিসাং ঝর্ণা সংলগ্ন অঞ্চলে ইউপিডিএফ (প্রসীত) বাহিনীর অতর্কিত গুলিবর্ষণে। গভীর রাতে নিরবতা ভঙ্গ করে সেনাবাহিনীর মাটিরাঙ্গা জোনের অন্তর্ভুক্ত সাপমারা আর্মি ক্যাম্পের কয়েক কিলোমিটার উত্তরে এই সশস্ত্র দলটি প্রথম দফায় ১০-১২ রাউন্ড এবং পরবর্তী দফায় গভীর রাত ১২টা থেকে ৩টার মধ্যে আরও প্রায় ৩০ রাউন্ড ফাঁকা গুলি বর্ষণ করে গা ঢাকা দেয়। সর্বমোট ৪০-৪২ রাউন্ড ভারী অস্ত্রের গুলি চালিয়ে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন এবং পর্যটন খাতে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর মূল উদ্দেশ্য। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি রিসাং ঝর্ণার মতো জায়গায় ঘুরতে আসা পর্যটকদের মনে এই জাতীয় রাতের আঁধারে গুলিবর্ষণ গভীর আতঙ্কের জন্ম দেয়। শান্ত জনপদ মাটিরাঙ্গায় এমন প্রকাশ্য অস্ত্রের ঝঙ্কার প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের জীবন বা এলাকার অর্থনৈতিক অগ্রগতির তোয়াক্কা না করে এই সশস্ত্র দলগুলো কেবল নিজেদের কায়েমী স্বার্থ হাসিল এবং সাধারণ মানুষকে সার্বক্ষণিক ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে বন্দি করে রাখতে চায়।
‎
‎সাম্প্রতিক পার্বত্য চট্টগ্রামের এই তিনটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা কোনো আকস্মিক অগ্নিকাণ্ড নয়, বরং এটি তাদের দীর্ঘদিনের সুপরিকল্পিত আধিপত্য বিস্তারের ছকেরই অংশ। জেএসএস-মূল, ইউপিডিএফ-মূল, ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক, জেএসএস-সংস্কার সহ বিভিন্ন উপশাখায় বিভক্ত এই সংগঠনগুলো মুখে তাঁদের জুম্ম জনগণের অধিকার আদায়ের কথা বললেও বাস্তবে তারা সন্ত্রাসী কার্যক্রমেই লিপ্ত। নিজেদের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক প্রভাববলয় বা ‘টার্ফ’ ধরে রাখা এবং চাঁদাবাজির রুট সচল রাখার জন্য তারা একে অপরের বিরুদ্ধে চরম শত্রুতায় লিপ্ত হয়। গোষ্ঠীগত এই দ্বন্দ্বের বলি হতে হয় নিরীহ পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীকে, যাদের দৈনন্দিন কাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষি কাজ হুমকির মুখে পড়ে। নিজেদের মধ্যে অঞ্চল ভাগাভাগি এবং আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে পুরো পাহাড়ের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ভেস্তে যাচ্ছে। তথাকথিত অধিকার আদায়ের নামে নিজেদের জাতির মানুষের বুক খালি করা এবং সার্বিক জনজীবনকে অচল করে দেওয়া ছাড়া এই আঞ্চলিক দলগুলোর আর কোনো জনকল্যাণমুখী ভূমিকা সাধারণ মানুষের চোখে পড়ে না।
‎
‎পার্বত্য অঞ্চলে সশস্ত্র দলগুলোর টিকে থাকার প্রধান রসদ এবং অর্থায়নের মূল উৎস হলো এক ভয়াবহ চাঁদা আদায় ও তোলাবাজি নেটওয়ার্ক। পাহাড়ের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে জেলা শহর পর্যন্ত প্রতিটি বাজার, যানবাহন, জুমচাষ, বাঁশ কাটা, ফল বিক্রি এমনকি সাধারণ চাকরিজীবীদের বেতন থেকেও নিয়মিত জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করা হয়। কোনো সাধারণ নাগরিক বা ব্যবসায়ী যদি এই অবৈধ চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে তার কপালে জোটে অমানসিক নির্যাতন, অপহরণ কিংবা নির্মম হত্যাকাণ্ড। শুধু চাঁদা আদায়ই নয়, পাহাড়ের গহীন অরণ্যকে ব্যবহার করে অবৈধ অস্ত্রের কারবার, মাদক চোরাচালান এবং সীমান্ত পারের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সাথে গোপন যোগসাজশের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করছে এই সংগঠনগুলো। এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ কালো টাকা দিয়েই তারা আধুনিক ও ভারী সব অস্ত্রশস্ত্র ক্রয় করছে, যা দিয়ে দিন দিন তারা নিজেদের সামরিক শক্তি বাড়িয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ জানানোর দুঃসাহস দেখাচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষ আজ নিজস্ব ভূখণ্ডে থেকেও এক প্রকার মুক্তিপণ দিয়ে জীবনযাপনের চরম অপমানজনক পরিস্থিতি সহ্য করতে বাধ্য হচ্ছে।
‎
‎গুম, খুন এবং অপহরণ পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর এক প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কোনো ব্যক্তি যদি এই সংগঠনগুলোর মতাদর্শের বাইরে গিয়ে স্বাধীন মতামত প্রকাশ করে কিংবা তাদের চাঁদা দাবির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়, তাকে রাতের আঁধারে তুলে নিয়ে যাওয়া এখন পাহাড়ে নিত্যদিনের ঘটনা। অসংখ্য পাহাড়ি তরুণকে জোরপূর্বক ক্যাডার দলে রিক্রুট করা হচ্ছে এবং তা না মানলে পুরো পরিবারকে ভিটেমাটি ছাড়া করার হুমকি দেওয়া হয়। মানবাধিকারের বুলি ছড়ানো দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এনজিও সংস্থা পাহাড়ে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বা সেনাবাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে সোচ্চার হলেও, আঞ্চলিক সন্ত্রাসী দলগুলোর হাতে অগণিত নিরীহ মানুষের এই নির্মম গুম ও খুনের ঘটনায় অদ্ভুত নীরবতা পালন করে। এই সন্ত্রাসী দলগুলো সাধারণ পাহাড়িদের ভয় দেখিয়ে এমন এক স্তব্ধতার সংস্কৃতি তৈরি করেছে, যেখানে প্রতিবাদের কোনো ভাষা অবশিষ্ট থাকে না। স্বজনহারা পরিবারগুলোর আর্তনাদ পাহাড়ের উপত্যকাগুলোতে প্রতিধ্বনি হলেও সন্ত্রাসী ক্যাডারদের রক্তচক্ষু ও প্রতিশোধের ভয়ে কেউ পুলিশ বা আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সাহস পর্যন্ত পায় না।
‎
‎বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পার্বত্য অঞ্চলের রয়েছে বিপুল সম্ভাবনাময় ভূমিকা, বিশেষ করে পর্যটন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহারে। কিন্তু সাজেক, রিসাং ঝর্ণা, পানছড়ি বা বান্দরবানের মতো আকর্ষণীয় এলাকাগুলোতে প্রতিনিয়ত সশস্ত্র সংঘাত ও গোলাগুলির খবর ছড়িয়ে পড়ায় পর্যটন খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশি-বিদেশি পর্যটকরা যখন পাহাড়ে নিজেদের জীবন ও নিরাপত্তার হুমকি অনুভব করেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তারা এসব স্থান ভ্রমণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। ফলে পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য, হোটেল-রিসোর্ট শিল্প এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের রুটি-রুজির ওপর নেমে আসে চরম বিপর্যয়। শুধু পর্যটনই নয়, এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে পাহাড়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যেমন, রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ এবং বিদ্যুৎ সংযোগ সম্প্রসারণের কাজ বারবার থমকে যায়। ঠিকাদারদের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি এবং চাঁদা না দিলে নির্মাণকাজে নিয়োজিত কর্মীদের অপহরণ বা হত্যা করার মাধ্যমে পুরো অঞ্চলের উন্নয়ন থমকে দেওয়ার অপচেষ্টা করে চলেছে এই গোষ্ঠীগুলো। ফলে পার্বত্য অঞ্চলকে মূল অর্থনীতির ধারার সাথে যুক্ত করা চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
‎
‎স্বাধীন বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কোনো অবস্থাতেই নিজের ভূখণ্ডের একটি নির্দিষ্ট অংশে সমান্তরাল সশস্ত্র শাসন বা সন্ত্রাসী ক্যাডারদের রাজত্ব মেনে নিতে পারে না। পাহাড়ের অখণ্ডতা রক্ষা, সাধারণ জনগণের মৌলিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং দেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থে এখনই এই আঞ্চলিক দলগুলোর বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির শর্তাবলি যারা বছরের পর বছর ধরে লঙ্ঘন করে আসছে এবং অবৈধ অস্ত্র সমর্পণ না করে উল্টো তা দিয়ে রাষ্ট্রকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সময় এসেছে। পাহাড়ে আস্তানা গড়া প্রতিটি অবৈধ অস্ত্রের জোগানদাতা ও ক্যাডারদের চিরুনি অভিযানের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনতে হবে। সার্বভৌম রাষ্ট্রে কোনো বিশেষ অঞ্চলকে অপরাধীদের নিরাপদ অভয়ারণ্যে পরিণত হতে দেওয়া যায় না, এবং এ বিষয়ে কোনো প্রকার শিথিলতা বা আপসকামিতা মেনে নেওয়ার সুযোগ নেই।
‎
‎সবমিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় ও উপত্যকাগুলোতে স্থায়ী শান্তি, সম্প্রীতি ও প্রগতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে হলে সশস্ত্র দলগুলোর দৌরাত্ম্য চিরতরে বন্ধ করতে হবে। পাহাড়ে বসবাসরত পাহাড়ি ও বাঙালি, উভয় জনগোষ্ঠীর শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষ আজ সশস্ত্র দলগুলোর হাত থেকে মুক্তি পেতে ব্যাকুল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের উচিত অবিলম্বে পার্বত্য অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদার করা, সকল অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সমন্বিত যৌথ অভিযান জোরদার করা এবং চাঁদাবাজি-অস্ত্র ব্যবসা বন্ধে কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো। একই সাথে পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ যুবসমাজকে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর প্রলোভন ও ভয়ভীতি থেকে মুক্ত করে মূলধারার শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। রাষ্ট্রকে পরিষ্কার বার্তা দিতে হবে যে, সার্বভৌম বাংলাদেশে ক্ষমতার একমাত্র উৎস জনগণ ও সংবিধান, কোনো অবৈধ অস্ত্রের নলের মুখ নয়। সরকারের সমউপযোগী, কঠোর ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তই কেবল পারে পার্বত্য অঞ্চল থেকে সশস্ত্র সহিংসতার কালো ছায়া দূর করে দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে এবং পাহাড়িদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।
‎
‎লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
‎ইমেইল: mmohasinmiah013@gmail.com

আকাশে উঠল টেসলার রোডস্টার? উড়ন্ত গাড়ির দাবি নিয়ে যত প্রশ্ন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৫৫ পূর্বাহ্ণ
আকাশে উঠল টেসলার রোডস্টার? উড়ন্ত গাড়ির দাবি নিয়ে যত প্রশ্ন

বিজ্ঞানের কল্পকাহিনিতে দেখা উড়ন্ত গাড়ি কি এবার বাস্তবে আসতে চলেছে? টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কের নতুন রোডস্টার স্পোর্টস কারের প্রদর্শনী ঘিরে এমন প্রশ্নই উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে স্পেসএক্সের একটি স্থাপনায় গাড়িটির বিশেষ প্রযুক্তি প্রদর্শন করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এতে থ্রাস্টার ব্যবহার করে গাড়িটিকে সাময়িকভাবে শূন্যে তোলা, মাঝআকাশে ঘোরানো এবং মাটিতে অবতরণের কৌশল দেখানোর কথা বলা হয়েছে। তবে এই প্রদর্শনীকে পূর্ণাঙ্গ উড়ন্ত গাড়ির আত্মপ্রকাশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, কোনো গাড়ি অল্প সময়ের জন্য মাটি ছেড়ে উঠতে পারা আর সেটিকে ব্যবহার করে নিয়মিত আকাশপথে যাতায়াত করা এক বিষয় নয়। গাড়িটির বাস্তব কার্যক্ষমতা, নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক ব্যবহারের উপযোগিতা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।

প্রদর্শনীতে কী দেখালেন ইলন মাস্ক?

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) আয়োজিত প্রদর্শনীতে মাস্ক বলেন, ‘আজ রাতে আপনারা কিছু অবিশ্বাস্য বিষয় দেখতে যাচ্ছেন।’ গাড়িটির প্রদর্শনী এআই দিয়ে তৈরি কোনো দৃশ্য নয়, তা প্রমাণ করার জন্যই দর্শকদের সামনে এটি দেখানোর প্রয়োজন ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। টেসলার দাবি, নতুন রোডস্টারে স্পেসএক্সের মহাকাশ প্রযুক্তি থেকে অনুপ্রাণিত বিশেষ থ্রাস্টার ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রচলিত গাড়ির বাইরে নতুন ধরনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দেখানোর পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। প্রদর্শনীতে দেখানো প্রযুক্তি বাস্তবে কতটা কার্যকর এবং গাড়িটির কোন সংস্করণে এসব সুবিধা থাকবে, তা স্পষ্টভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। শুধু আকর্ষণীয় প্রদর্শনী দিয়ে কোনো প্রযুক্তির দৈনন্দিন ব্যবহারযোগ্যতা নিশ্চিত করা যায় না।

কীভাবে শূন্যে উঠবে গাড়ি?

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গাড়িটিতে উচ্চচাপে সংরক্ষিত বাতাস দ্রুত নির্গত করে থ্রাস্ট বা ধাক্কা তৈরির ব্যবস্থা ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে। বাতাস দ্রুত বেরিয়ে গেলে বিপরীত দিকে বল সৃষ্টি হয়। এই বল কাজে লাগিয়ে গাড়িটিকে সাময়িকভাবে শূন্যে তোলা বা ঘোরানোর মতো কৌশল দেখানো সম্ভব হতে পারে। তবে এ ধরনের প্রযুক্তির কার্যকারিতা নির্ভর করে থ্রাস্টের পরিমাণ, গাড়ির ওজন, ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ এবং বাতাসের চাপ ব্যবস্থাপনার ওপর। দীর্ঘ সময় বাতাসে থাকা কিংবা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে আকাশপথে চলাচলের জন্য আরও জটিল প্রযুক্তি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা প্রয়োজন। তাই থ্রাস্টার ব্যবহার করে সাময়িকভাবে শূন্যে ওঠার প্রদর্শনীকে পূর্ণাঙ্গ উড্ডয়নক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

উড়ন্ত গাড়ি হতে হলে যেসব চ্যালেঞ্জ পেরোতে হবে

একটি পূর্ণাঙ্গ উড়ন্ত গাড়িকে একই সঙ্গে সড়ক ও আকাশপথে নিরাপদে চলাচলের উপযোগী হতে হবে। এর জন্য শুধু শক্তিশালী থ্রাস্টার থাকলেই চলবে না; প্রয়োজন হবে নির্ভরযোগ্য দিকনির্দেশনা, ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ উড্ডয়ন ও অবতরণব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রযুক্তি। এর পাশাপাশি যাত্রীদের নিরাপত্তা, শক্তির ব্যবহার, শব্দদূষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তব পরিবেশে এসব শর্ত পূরণ না হলে প্রযুক্তিটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতে ব্যবহার করা কঠিন হবে।

২০২৮ সালে উৎপাদনের পরিকল্পনা

মাস্ক জানিয়েছেন, নতুন রোডস্টারের উৎপাদন ২০২৮ সালে শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে উৎপাদন শুরুর নির্দিষ্ট সময়, গাড়ি সরবরাহের সূচি, চূড়ান্ত মূল্য এবং বিশেষ প্রযুক্তির বাস্তব কার্যক্ষমতা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। পরিকল্পিত সময়ের মধ্যে উৎপাদন শুরু হলেও গাড়িটির কোন সংস্করণে থ্রাস্টার প্রযুক্তি থাকবে এবং সেটি ক্রেতাদের জন্য কতটা ব্যবহারযোগ্য হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে থাকবে। উৎপাদনের ঘোষণা আর বাজারে পরীক্ষিত, অনুমোদিত ও ব্যবহারযোগ্য গাড়ি সরবরাহ—দুটি আলাদা বিষয়।

টেসলার প্রদর্শনী উড়ন্ত গাড়ির ধারণাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। কিন্তু গাড়িটি দীর্ঘ সময় উড়তে পারে, আকাশপথে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারে কিংবা সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় সব নিরাপত্তাশর্ত পূরণ করেছে—এমন প্রমাণ এই বর্ণনায় নেই। অতএব, এখনই টেসলার নতুন রোডস্টারকে পূর্ণাঙ্গ উড়ন্ত গাড়ি বলা ঠিক হবে না। বরং এটিকে থ্রাস্টার প্রযুক্তির সম্ভাবনা তুলে ধরার একটি প্রদর্শনী হিসেবে দেখা যায়।

সূত্র: বিবিসি

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

 

পাঠ্যবইয়ে বাবুই, বাস্তবে নেই—তালগাছ কমে হারাচ্ছে বাংলার চিরচেনা দৃশ্য

মৌলভীবাজার সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৩৭ পূর্বাহ্ণ
পাঠ্যবইয়ে বাবুই, বাস্তবে নেই—তালগাছ কমে হারাচ্ছে বাংলার চিরচেনা দৃশ্য

‘বাবুই পাখিকে ডাকি বলিছে চড়াই, কুঁড়ে ঘরে থাকি কর শিল্পের বড়াই।’ কবি রজনীকান্ত সেনের ‘স্বাধীনতার সুখ’ কবিতার এই পঙ্‌ক্তি বাংলা পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে বহু প্রজন্মের শিক্ষার্থীর কাছে পরিচিত। নিজের হাতে তৈরি বাসার সৌন্দর্য আর আত্মনির্ভরতার প্রতীক হিসেবে বাবুই পাখির পরিচয়ও পেয়েছে বিশেষ মাত্রা। কিন্তু কবিতায় পরিচিত সেই পাখি ও তার নিপুণ বুননের বাসা এখন বাস্তবে অনেকের কাছেই অচেনা হয়ে উঠছে।

একসময় গ্রামবাংলার তালগাছের পাতায় পাতায় ঝুলত বাবুই পাখির অসংখ্য বাসা। পাখির কিচিরমিচিরে মুখর থাকত গ্রামের পথঘাট। মৌলভীবাজারের বিভিন্ন গ্রাম ও হাওরাঞ্চলেও ছিল এমন দৃশ্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে কমেছে তালগাছ, সংকুচিত হয়েছে বাবুই পাখির আবাসস্থল। নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, কীটনাশকের ব্যবহার, পাখি শিকার এবং অপরিকল্পিত বসতি নির্মাণের মতো নানা কারণে প্রকৃতির এই পরিচিত দৃশ্য এখন ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে। স্থানীয় বাসিন্দা, প্রবীণ শিক্ষক ও পাখিপ্রেমীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে, মৌলভীবাজারের অনেক এলাকায় একসময় প্রচুর তালগাছ থাকলেও এখন সেগুলোর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। কোথাও কোথাও তালগাছের অস্তিত্ব থাকলেও সেখানে আর আগের মতো বাবুই পাখির বাসা দেখা যায় না।

তালগাছের পাতায় পাতায় ঝুলত শত বাসা

মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার ২ নম্বর উত্তরভাগ ইউনিয়নের উত্তরভাগ গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি ও অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক মো. মুজিবুর রহমানের স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল সেই সময়ের গ্রামবাংলা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় গ্রামের মেঠোপথের পাশে সারি সারি তালগাছ ছিল। গাছগুলোর পাতায় পাতায় বাবুই পাখির শৈল্পিক বাসা ঝুলত। পাখির কিচিরমিচির শব্দে মুখর থাকত পুরো গ্রাম। মুজিবুর রহমান বলেন, শুধু তাঁর গ্রামেই নয়, আবহমান বাংলার বহু গ্রামেই এমন দৃশ্য দেখা যেত। কিন্তু এখন মৌলভীবাজারের গ্রাম-গঞ্জে তালগাছ খুব একটা চোখে পড়ে না। সেই সঙ্গে কমে গেছে বাবুই পাখির উপস্থিতিও।

তাঁর স্মৃতিচারণে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কীভাবে একটি পরিচিত প্রাকৃতিক দৃশ্য কয়েক দশকের ব্যবধানে মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। যে পাখি ও বাসা একসময় গ্রামীণ পরিবেশের স্বাভাবিক অংশ ছিল, এখন তা দেখার জন্যও অনেক জায়গায় খোঁজ করতে হয়।

এক দশকেই বদলে গেছে গ্রামের চিত্র

শ্রীমঙ্গল উপজেলার ২ নম্বর ভুনবীর ইউনিয়নের সরকার বাজার এলাকার বাসিন্দা জনি দাসও দেখেছেন তালগাছ কমে যাওয়ার এমন পরিবর্তন। তাঁর মতে, প্রায় এক দশক আগেও তাঁদের এলাকায় যত তালগাছ ছিল, এখন তার চার ভাগের এক ভাগও নেই। জনি দাস জানান, ২০০১-২০০২ সালের দিকে শুধু তাঁদের গ্রামেই রাস্তার পাশে ও বিভিন্ন বাড়িতে অন্তত দুই শতাধিক তালগাছ ছিল। এসব গাছে বাবুই পাখির বাসাও দেখা যেত। কিন্তু বর্তমানে পুরো গ্রাম ঘুরেও একটি তালগাছ পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে তাঁর।

বাবুই পাখির বাসার অবস্থা আরও করুণ বলে মনে করেন তিনি। একসময় যা ছিল গ্রামের পরিচিত দৃশ্য, এখন তা দেখা যেন জাদুঘরে বিরল কোনো নিদর্শন দেখার মতো বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের এমন অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, তালগাছ কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু গাছের সংখ্যা হ্রাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে বদলে যাচ্ছে গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং পাখিদের বসবাসের সুযোগও।

এখনো রয়েছে বাবুইয়ের বাসা দেখার বিরল সুযোগ

তবে মৌলভীবাজারের সব জায়গা থেকেই বাবুই পাখির বাসা হারিয়ে যায়নি। শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৩ নম্বর শ্রীমঙ্গল ইউনিয়নের রূপসপুর বা ফুলবাড়ি এলাকায় পাশাপাশি থাকা দুটি তালগাছে এখনো অসংখ্য বাবুই পাখির শৈল্পিক বাসা দেখা যায়। এলাকার এই দৃশ্য দেখতে প্রতিদিন বিকেলে সেখানে ভিড় করেন অনেকে। তালগাছের পাতায় ঝুলে থাকা বাসাগুলো এখনো প্রকৃতিপ্রেমীদের আকর্ষণ করে। চারপাশে তালগাছ ও বাবুইয়ের বাসা কমে যাওয়ায় এমন জায়গাগুলো স্থানীয়ভাবে বিশেষ গুরুত্বও পেয়েছে।

ওই এলাকার বাসিন্দা হাজী মো. ফজলুর রহমান মনে করেন, নির্বিচারে গাছ কাটা, কীটনাশকের অবাধ ব্যবহার, পাখি শিকারিদের দৌরাত্ম্য এবং অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর নির্মাণের কারণে তালগাছ কমে যাচ্ছে। এতে বাবুই পাখির আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে এবং পাখিটির টিকে থাকাও কঠিন হয়ে পড়ছে। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষার বিষয়টি শুধু পাখি সংরক্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; এর সঙ্গে গ্রামীণ পরিবেশের ভারসাম্যও জড়িত।

কুলাউড়ায় তালগাছ আছে, নেই বাবুইয়ের বাসা

কুলাউড়া উপজেলার কাদিপুর এলাকার সোলেমান হোসেনের স্মৃতিতেও রয়েছে ছোটবেলায় দেখা অসংখ্য তালগাছ ও বাবুই পাখির বাসার কথা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাঁর এলাকার চিত্র বদলে গেছে। সোলেমান হোসেন জানান, বর্তমানে পুরো এলাকায় রাস্তার পাশে সরকারি জমিতে মাত্র একটি তালগাছ রয়েছে। আগে সেই গাছেও বাবুই পাখির বাসা দেখা যেত। কিন্তু কয়েক বছর ধরে সেখানে আর কোনো বাসা চোখে পড়ছে না।

এই অভিজ্ঞতা দেখায়, শুধু তালগাছের অস্তিত্ব থাকলেই বাবুই পাখির উপস্থিতি নিশ্চিত হয় না। গাছের পাশাপাশি পাখির উপযোগী পরিবেশ, নিরাপত্তা ও খাদ্যের প্রাপ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে নির্দিষ্ট এলাকায় বাবুই পাখি না থাকার সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে আরও পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা প্রয়োজন। শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৪ নম্বর সিন্দুরখান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইয়াছিন আরাফাত রবিনও তাঁর শৈশবের সঙ্গে বর্তমানের পার্থক্য তুলে ধরেছেন। ছোটবেলায় তাঁদের এলাকায় অসংখ্য তালগাছ দেখেছেন তিনি। এসব গাছে বাসা বাঁধত বাবুই পাখি। এখন তালগাছ যেমন কম দেখা যায়, তেমনি চোখে পড়ে না পাখিটির শৈল্পিক বাসাও।

তিন প্রজাতির বাবুই নিয়ে উদ্বেগ

পাখিপ্রেমী খোকন সিং বিভিন্ন প্রজাতির পাখি নিয়ে খোঁজখবর করেন এবং ফটোগ্রাফির মাধ্যমে পাখিদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় পাহাড়, টিলা ও হাওরসমৃদ্ধ মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলায় দাগি, বাংলা ও দেশি—এই তিন প্রজাতির বাবুই পাখির আবাস ছিল। তিনি জানান, বর্তমানে বাংলা ও দাগি বাবুইয়ের দেখা প্রায় মেলেই না। তাঁর পর্যবেক্ষণে, কোনোরকমে টিকে আছে কিছু দেশি বাবুই পাখি।

খোকন সিংয়ের মতে, বাবুই পাখির বাসা তৈরির জন্য তালগাছ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তালগাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় পাখিটির আবাসস্থলও সংকটের মুখে পড়েছে। বাবুই পাখিকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রচুর পরিমাণে তালগাছ রোপণ করতে হবে বলে মনে করেন তিনি। তবে কোনো প্রজাতির বর্তমান সংখ্যা, বিস্তৃতি কিংবা বিলুপ্তির ঝুঁকি নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করতে নিয়মিত মাঠপর্যায়ের জরিপ ও বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রয়োজন। পাখিপ্রেমীদের পর্যবেক্ষণ স্থানীয় পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিলেও তা দিয়ে পুরো জেলার প্রজাতিগত অবস্থা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যায় না।

আবাসস্থল ধ্বংসে ঝুঁকিতে পাখি ও বন্যপ্রাণী

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. কাজী নাজমুল হক বলেন, নানা কারণে গ্রামাঞ্চলে তালগাছ কাটা এবং অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর নির্মাণের ফলে বাবুই পাখিসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল নষ্ট হচ্ছে। তিনি পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষায় সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তালগাছ সংরক্ষণ এবং বাবুই পাখিকে বিলুপ্তির ঝুঁকি থেকে রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। নাজমুল হকের সতর্কবার্তা হলো, প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ না নিলে একসময় বাবুই পাখি বাস্তব জীবনের পরিচিত দৃশ্য থেকে হারিয়ে গিয়ে কেবল পাঠ্যপুস্তকের কবিতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তে পারে।

তালগাছ রক্ষা ও নতুন করে রোপণ জরুরি

বাবুই পাখির বাসা শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়, এটি গ্রামবাংলার পরিবেশ ও স্মৃতিরও অংশ। তালগাছের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং পাখির বাসা বিরল হয়ে পড়ার যে চিত্র স্থানীয়দের বক্তব্যে উঠে এসেছে, তা আবাসস্থল সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয়ভাবে তালগাছ সংরক্ষণ, উপযুক্ত জায়গায় নতুন চারা রোপণ, নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ, পাখি শিকার প্রতিরোধ এবং কীটনাশকের দায়িত্বশীল ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। পাশাপাশি বিদ্যমান বাবুইয়ের বাসা থাকা গাছগুলো রক্ষা করা এবং পাখির উপস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করাও প্রয়োজন।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

 

অফিসার্স ক্লাবের নির্মাণাধীন ভবনে সাবেক অতিরিক্ত সচিবের মরদেহ উদ্ধার

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১:২৭ পূর্বাহ্ণ
অফিসার্স ক্লাবের নির্মাণাধীন ভবনে সাবেক অতিরিক্ত সচিবের মরদেহ উদ্ধার

রাজধানীর রমনায় অবস্থিত অফিসার্স ক্লাবের ভেতরে নির্মাণাধীন একটি ভবন থেকে সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. মোশাররফ হোসেনের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বেলা পৌনে ১২টার দিকে ভবনটির নিচতলায় সিঁড়ির পাশের ফাঁকা জায়গা থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ভবনটির তৃতীয় তলা থেকে নিচতলার ফাঁকা অংশে পড়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ঘটনার বিস্তারিত পরিস্থিতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া তথ্যের বাইরে নিশ্চিতভাবে কিছু জানা যায়নি।

মেয়েকে নিয়ে সকালে অফিসার্স ক্লাবে যান

অফিসার্স ক্লাব সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে মো. মোশাররফ হোসেন তাঁর ছোট মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ক্লাবে প্রবেশ করেন। পরে ক্লাবের সুইমিংপুলের সামনে মেয়েকে রেখে তিনি পাশের নির্মাণাধীন ভবনের ভেতরে যান। এরপর প্রায় এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেলে ভবনটির নিচতলায় সিঁড়ির পাশের ফাঁকা অংশে তাঁকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করেন। মোশাররফ হোসেন অফিসার্স ক্লাবের সদস্য ছিলেন। তিনি পরিবারের সঙ্গে রাজধানীর বনানীর একটি বাড়িতে বসবাস করতেন।

তৃতীয় তলা থেকে পড়ে যাওয়ার কথা জানাল পুলিশ

ঘটনা সম্পর্কে রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) শেখ জাহিদুল ইসলাম জানান, সকালে ছোট মেয়েকে নিয়ে অফিসার্স ক্লাবের সুইমিংপুলে গিয়েছিলেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. মোশাররফ হোসেন। তাঁর চোখে কম দেখার সমস্যা ছিল। পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, নির্মাণাধীন ভবনটির তৃতীয় তলা থেকে তিনি নিচতলার ফাঁকা অংশে পড়ে যান। ঘটনাস্থলে মরদেহের সুরতহাল সম্পন্ন করেছে পুলিশ। তবে কীভাবে তিনি নিচে পড়ে যান, সে বিষয়ে পুলিশের বক্তব্যের বাইরে বিস্তারিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিবারের সদস্যরা ময়নাতদন্ত করাতে চাননি। এ কারণে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের কথা জানিয়েছেন রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মোশাররফ হোসেনের বড় মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। তিনি দেশে ফেরার পর বাবার দাফন সম্পন্ন করা হবে।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি