খুঁজুন
                               
, ,
           

পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্রের ঝঙ্কার: স্বাধীন দেশে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর দৌরাত্ম্য আর কতকাল?

এম মহাসিন মিয়া:
প্রকাশিত: সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৫৫ অপরাহ্ণ
পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্রের ঝঙ্কার: স্বাধীন দেশে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর দৌরাত্ম্য আর কতকাল?

প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র্য ও সৌন্দর্যের লীলাভূমি স্বাধীন বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ পার্বত্য চট্টগ্রাম আজ আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর লাগামহীন দৌরাত্ম্যে বিভীষিকাময় এক জনপদে পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতা অর্জনের দীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও এই ভূখণ্ডের একটি বিশেষ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ আজও শান্তির বদলে প্রতিনিয়ত গানপাউডার আর বারুদের গন্ধ শুঁকে দিনাতিপাত করছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের অনবদ্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ঢেকে দিয়েছে অবৈধ অস্ত্রের মহড়া, আধিপত্য বিস্তারের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম এবং পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনগণকে জিম্মি করে রাখার অপকৌশল। পাহাড়ে শান্তিশৃঙ্খলা ও দেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখতে রাষ্ট্র ও সরকারের পক্ষ থেকে যুগে যুগে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হলেও সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর অনড় অবস্থান, অপতৎপরতা এবং সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা কায়েমের অশুভ আকাঙ্ক্ষার কারণে প্রত্যাশিত স্থায়িত্ব লাভ করেনি পার্বত্য অঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশ। ফলে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সার্বভৌম ভূখণ্ডে এমন সশস্ত্র নৈরাজ্য আর কতকাল বহাল থাকবে, তা আজ গোটা জাতির কাছে এক মস্ত বড় প্রশ্ন ও চরম উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‎
‎সম্প্রতি খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার পানছড়িতে ঘটে যাওয়া এক রক্তক্ষয়ী ঘটনা পাহাড়ে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর উগ্রতা ও আধিপত্য বিস্তারের চিত্রকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার চেঙ্গি ইউনিয়নের তারাবন এলাকায় গত ৫ সেপ্টেম্বর- ২০২৬ তারিখে পাহাড়ি দুটি প্রধান আঞ্চলিক দল, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস-মূল) এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-মূল) এর মধ্যে এক ভয়াবহ সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। সকালের দিকে জেএসএস ক্যাডারদের মহড়া ও ফাঁকা গুলির পর বিকেলে তা রূপ নেয় মুখোমুখি এক রক্তক্ষয়ী গোলাগুলিতে। বিবর্ণ চাকমার নেতৃত্বাধীন ২৫-৩০ জনের জেএসএস দল এবং সুমেন চাকমার পরিচালনায় ৩৫-৪০ জনের সুসজ্জিত ইউপিডিএফ বাহিনীর মধ্যে একটানা আড়াই ঘণ্টাব্যাপী আক্ষরিক অর্থেই যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই দুই পক্ষের মধ্যকার প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ রাউন্ড অনবরত গুলিবিনিময়ের ফলে পুরো তারাবন ও জগা পাড়া এলাকা মুহূর্তে এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। কোনো প্রাণহানি নিশ্চিত না হলেও অনবরত বিকট গুলির শব্দে অবরুদ্ধ সাধারণ মানুষের মনে এক বিভীষিকাময় ভীতি তৈরি হয়েছিল।
‎
‎পানছড়ির উত্তাপ প্রশমিত হতে না হতেই ৬ সেপ্টেম্বর- ২০২৬ তারিখে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটির সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় পর্যটন উপত্যকা সাজেকে ইউপিডিএফ (প্রসীত) ও জেএসএস (সন্তু) গ্রুপের সশস্ত্র ক্যাডারদের বিপজ্জনক মহড়া ও মুখোমুখি অবস্থান পাহাড়ের পরিস্থিতিকে আরও থমথমে করে তোলে। দেশের শীর্ষতম পর্যটন কেন্দ্র সাজেক উপত্যকার নোয়াপাড়া, ৮নং পাড়া, কিচিংপাড়া ও ব্রীজপাড়ার মতো স্পর্শকাতর ও ঘনবসতিপূর্ণ স্থানগুলোতে ইউপিডিএফের প্রায় নব্বইজন এবং জেএসএস গ্রুপের সত্তর-আশিজন ক্যাডার ভারি অস্ত্রশস্ত্রসহ কৌশলগত অবস্থান নেয়। ইউপিডিএফের পক্ষে সুমন চাকমা, কহেন চাকমা ও পরান্টু চাকমা এবং জেএসএসের পক্ষে বিক্রম চাকমা ও মুচং চাকমার মতো শীর্ষ সশস্ত্র কমান্ডারের সরাসরি নেতৃত্বে শতাধিক ক্যাডারের এমন মহড়া যে কোনো মুহূর্তে এক ভয়াবহ রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছিল। একদিকে সাধারণ স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে জীবনভীতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন, অন্যদিকে সাজেকে বেড়াতে আসা অগণিত পর্যটকদের নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। মূলত পাহাড়ে পর্যটন শিল্পকে ধ্বংস করা এবং সাধারণ মানুষকে চাপে রাখার কৌশল হিসেবেই সাজেকের মতো জায়গায় সশস্ত্র ক্যাডাররা এই অবস্থান নিয়েছিল।
‎
‎পাহাড়জুড়ে কায়েম করা এই নৈরাজ্যের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় সুপরিচিত পর্যটন এলাকা রিসাং ঝর্ণা সংলগ্ন অঞ্চলে ইউপিডিএফ (প্রসীত) বাহিনীর অতর্কিত গুলিবর্ষণে। গভীর রাতে নিরবতা ভঙ্গ করে সেনাবাহিনীর মাটিরাঙ্গা জোনের অন্তর্ভুক্ত সাপমারা আর্মি ক্যাম্পের কয়েক কিলোমিটার উত্তরে এই সশস্ত্র দলটি প্রথম দফায় ১০-১২ রাউন্ড এবং পরবর্তী দফায় গভীর রাত ১২টা থেকে ৩টার মধ্যে আরও প্রায় ৩০ রাউন্ড ফাঁকা গুলি বর্ষণ করে গা ঢাকা দেয়। সর্বমোট ৪০-৪২ রাউন্ড ভারী অস্ত্রের গুলি চালিয়ে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন এবং পর্যটন খাতে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর মূল উদ্দেশ্য। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি রিসাং ঝর্ণার মতো জায়গায় ঘুরতে আসা পর্যটকদের মনে এই জাতীয় রাতের আঁধারে গুলিবর্ষণ গভীর আতঙ্কের জন্ম দেয়। শান্ত জনপদ মাটিরাঙ্গায় এমন প্রকাশ্য অস্ত্রের ঝঙ্কার প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের জীবন বা এলাকার অর্থনৈতিক অগ্রগতির তোয়াক্কা না করে এই সশস্ত্র দলগুলো কেবল নিজেদের কায়েমী স্বার্থ হাসিল এবং সাধারণ মানুষকে সার্বক্ষণিক ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে বন্দি করে রাখতে চায়।
‎
‎সাম্প্রতিক পার্বত্য চট্টগ্রামের এই তিনটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা কোনো আকস্মিক অগ্নিকাণ্ড নয়, বরং এটি তাদের দীর্ঘদিনের সুপরিকল্পিত আধিপত্য বিস্তারের ছকেরই অংশ। জেএসএস-মূল, ইউপিডিএফ-মূল, ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক, জেএসএস-সংস্কার সহ বিভিন্ন উপশাখায় বিভক্ত এই সংগঠনগুলো মুখে তাঁদের জুম্ম জনগণের অধিকার আদায়ের কথা বললেও বাস্তবে তারা সন্ত্রাসী কার্যক্রমেই লিপ্ত। নিজেদের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক প্রভাববলয় বা ‘টার্ফ’ ধরে রাখা এবং চাঁদাবাজির রুট সচল রাখার জন্য তারা একে অপরের বিরুদ্ধে চরম শত্রুতায় লিপ্ত হয়। গোষ্ঠীগত এই দ্বন্দ্বের বলি হতে হয় নিরীহ পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীকে, যাদের দৈনন্দিন কাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষি কাজ হুমকির মুখে পড়ে। নিজেদের মধ্যে অঞ্চল ভাগাভাগি এবং আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে পুরো পাহাড়ের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ভেস্তে যাচ্ছে। তথাকথিত অধিকার আদায়ের নামে নিজেদের জাতির মানুষের বুক খালি করা এবং সার্বিক জনজীবনকে অচল করে দেওয়া ছাড়া এই আঞ্চলিক দলগুলোর আর কোনো জনকল্যাণমুখী ভূমিকা সাধারণ মানুষের চোখে পড়ে না।
‎
‎পার্বত্য অঞ্চলে সশস্ত্র দলগুলোর টিকে থাকার প্রধান রসদ এবং অর্থায়নের মূল উৎস হলো এক ভয়াবহ চাঁদা আদায় ও তোলাবাজি নেটওয়ার্ক। পাহাড়ের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে জেলা শহর পর্যন্ত প্রতিটি বাজার, যানবাহন, জুমচাষ, বাঁশ কাটা, ফল বিক্রি এমনকি সাধারণ চাকরিজীবীদের বেতন থেকেও নিয়মিত জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করা হয়। কোনো সাধারণ নাগরিক বা ব্যবসায়ী যদি এই অবৈধ চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে তার কপালে জোটে অমানসিক নির্যাতন, অপহরণ কিংবা নির্মম হত্যাকাণ্ড। শুধু চাঁদা আদায়ই নয়, পাহাড়ের গহীন অরণ্যকে ব্যবহার করে অবৈধ অস্ত্রের কারবার, মাদক চোরাচালান এবং সীমান্ত পারের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সাথে গোপন যোগসাজশের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করছে এই সংগঠনগুলো। এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ কালো টাকা দিয়েই তারা আধুনিক ও ভারী সব অস্ত্রশস্ত্র ক্রয় করছে, যা দিয়ে দিন দিন তারা নিজেদের সামরিক শক্তি বাড়িয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ জানানোর দুঃসাহস দেখাচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষ আজ নিজস্ব ভূখণ্ডে থেকেও এক প্রকার মুক্তিপণ দিয়ে জীবনযাপনের চরম অপমানজনক পরিস্থিতি সহ্য করতে বাধ্য হচ্ছে।
‎
‎গুম, খুন এবং অপহরণ পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর এক প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কোনো ব্যক্তি যদি এই সংগঠনগুলোর মতাদর্শের বাইরে গিয়ে স্বাধীন মতামত প্রকাশ করে কিংবা তাদের চাঁদা দাবির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়, তাকে রাতের আঁধারে তুলে নিয়ে যাওয়া এখন পাহাড়ে নিত্যদিনের ঘটনা। অসংখ্য পাহাড়ি তরুণকে জোরপূর্বক ক্যাডার দলে রিক্রুট করা হচ্ছে এবং তা না মানলে পুরো পরিবারকে ভিটেমাটি ছাড়া করার হুমকি দেওয়া হয়। মানবাধিকারের বুলি ছড়ানো দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এনজিও সংস্থা পাহাড়ে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বা সেনাবাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে সোচ্চার হলেও, আঞ্চলিক সন্ত্রাসী দলগুলোর হাতে অগণিত নিরীহ মানুষের এই নির্মম গুম ও খুনের ঘটনায় অদ্ভুত নীরবতা পালন করে। এই সন্ত্রাসী দলগুলো সাধারণ পাহাড়িদের ভয় দেখিয়ে এমন এক স্তব্ধতার সংস্কৃতি তৈরি করেছে, যেখানে প্রতিবাদের কোনো ভাষা অবশিষ্ট থাকে না। স্বজনহারা পরিবারগুলোর আর্তনাদ পাহাড়ের উপত্যকাগুলোতে প্রতিধ্বনি হলেও সন্ত্রাসী ক্যাডারদের রক্তচক্ষু ও প্রতিশোধের ভয়ে কেউ পুলিশ বা আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সাহস পর্যন্ত পায় না।
‎
‎বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পার্বত্য অঞ্চলের রয়েছে বিপুল সম্ভাবনাময় ভূমিকা, বিশেষ করে পর্যটন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহারে। কিন্তু সাজেক, রিসাং ঝর্ণা, পানছড়ি বা বান্দরবানের মতো আকর্ষণীয় এলাকাগুলোতে প্রতিনিয়ত সশস্ত্র সংঘাত ও গোলাগুলির খবর ছড়িয়ে পড়ায় পর্যটন খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশি-বিদেশি পর্যটকরা যখন পাহাড়ে নিজেদের জীবন ও নিরাপত্তার হুমকি অনুভব করেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তারা এসব স্থান ভ্রমণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। ফলে পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য, হোটেল-রিসোর্ট শিল্প এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের রুটি-রুজির ওপর নেমে আসে চরম বিপর্যয়। শুধু পর্যটনই নয়, এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে পাহাড়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যেমন, রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ এবং বিদ্যুৎ সংযোগ সম্প্রসারণের কাজ বারবার থমকে যায়। ঠিকাদারদের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি এবং চাঁদা না দিলে নির্মাণকাজে নিয়োজিত কর্মীদের অপহরণ বা হত্যা করার মাধ্যমে পুরো অঞ্চলের উন্নয়ন থমকে দেওয়ার অপচেষ্টা করে চলেছে এই গোষ্ঠীগুলো। ফলে পার্বত্য অঞ্চলকে মূল অর্থনীতির ধারার সাথে যুক্ত করা চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
‎
‎স্বাধীন বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কোনো অবস্থাতেই নিজের ভূখণ্ডের একটি নির্দিষ্ট অংশে সমান্তরাল সশস্ত্র শাসন বা সন্ত্রাসী ক্যাডারদের রাজত্ব মেনে নিতে পারে না। পাহাড়ের অখণ্ডতা রক্ষা, সাধারণ জনগণের মৌলিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং দেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থে এখনই এই আঞ্চলিক দলগুলোর বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির শর্তাবলি যারা বছরের পর বছর ধরে লঙ্ঘন করে আসছে এবং অবৈধ অস্ত্র সমর্পণ না করে উল্টো তা দিয়ে রাষ্ট্রকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সময় এসেছে। পাহাড়ে আস্তানা গড়া প্রতিটি অবৈধ অস্ত্রের জোগানদাতা ও ক্যাডারদের চিরুনি অভিযানের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনতে হবে। সার্বভৌম রাষ্ট্রে কোনো বিশেষ অঞ্চলকে অপরাধীদের নিরাপদ অভয়ারণ্যে পরিণত হতে দেওয়া যায় না, এবং এ বিষয়ে কোনো প্রকার শিথিলতা বা আপসকামিতা মেনে নেওয়ার সুযোগ নেই।
‎
‎সবমিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় ও উপত্যকাগুলোতে স্থায়ী শান্তি, সম্প্রীতি ও প্রগতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে হলে সশস্ত্র দলগুলোর দৌরাত্ম্য চিরতরে বন্ধ করতে হবে। পাহাড়ে বসবাসরত পাহাড়ি ও বাঙালি, উভয় জনগোষ্ঠীর শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষ আজ সশস্ত্র দলগুলোর হাত থেকে মুক্তি পেতে ব্যাকুল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের উচিত অবিলম্বে পার্বত্য অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদার করা, সকল অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সমন্বিত যৌথ অভিযান জোরদার করা এবং চাঁদাবাজি-অস্ত্র ব্যবসা বন্ধে কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো। একই সাথে পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ যুবসমাজকে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর প্রলোভন ও ভয়ভীতি থেকে মুক্ত করে মূলধারার শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। রাষ্ট্রকে পরিষ্কার বার্তা দিতে হবে যে, সার্বভৌম বাংলাদেশে ক্ষমতার একমাত্র উৎস জনগণ ও সংবিধান, কোনো অবৈধ অস্ত্রের নলের মুখ নয়। সরকারের সমউপযোগী, কঠোর ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তই কেবল পারে পার্বত্য অঞ্চল থেকে সশস্ত্র সহিংসতার কালো ছায়া দূর করে দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে এবং পাহাড়িদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।
‎
‎লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
‎ইমেইল: mmohasinmiah013@gmail.com

জামায়াত নিয়ে বিএনপিকে সতর্ক করলেন ফজলুর রহমান

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
জামায়াত নিয়ে বিএনপিকে সতর্ক করলেন ফজলুর রহমান

জামায়াতে ইসলামীকে বিশ্বাস করলে বিএনপি ভুল করবে বলে মন্তব্য করেছেন কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান। একই সঙ্গে জামায়াতের বিষয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) বিকেলে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে মহানগর বিএনপি আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ফজলুর রহমান বলেন, ‘আপনার গলায় আপনি সাপ পেঁচিয়ে রাখছেন, বিএনপি। যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, যারা আমাদের মা-বোনের ইজ্জত নিয়েছিল এবং সোনার বাংলাকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছিল, যারা বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল—আপনারা যদি আবার সেই জামায়াতে ইসলামকে বিশ্বাস করেন, তবে ভুল করবেন।’

জামায়াতের রাজনৈতিক ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, তারা যখন সংসদে যায়, তখন এক ধরনের অবস্থান নেয়; আবার সংসদ থেকে বের হয়ে ভিন্ন ধরনের বক্তব্য দেয়। এমনকি এক দফার মাধ্যমে বিএনপিকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার কথাও তারা বলে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ কারণে বিষয়টি নিয়ে বিএনপিকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে বলে জানান ফজলুর রহমান।

আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনামলে দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার সবচেয়ে বেশি খর্ব করা হয়েছে। ছাত্রদের নেতৃত্বে দেশের মানুষ রাজপথে নেমে আসার পর শেখ হাসিনাসহ তার সহযোগীদের দেশ ছাড়তে হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসা করে ফজলুর রহমান বলেন, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি যে দিকনির্দেশনা নিয়ে এগোচ্ছে, তাতে সহজে বিএনপিকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া সম্ভব নয়।

নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের সভাপতিত্বে সমাবেশে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালাম, নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদ, মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু, যুবদলের আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম সজলসহ জেলা ও মহানগর বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি 

শান্তি চাই, তবে নিরাপত্তায় আপস নয়: রাজনাথ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:০০ অপরাহ্ণ
শান্তি চাই, তবে নিরাপত্তায় আপস নয়: রাজনাথ

ভারত যুদ্ধ চায় না, শান্তিতে বিশ্বাস করে। তবে শান্তির আকাঙ্ক্ষাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং।

রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) এনডিটিভি ডিফেন্স সামিট ২০২৬-এ দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সম্মেলনে ভারতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে দেশটির সামরিক কর্মকর্তা ও শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

রাজনাথ সিং বলেন, ভারত শান্তি চায়, তবে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস করবে না। কোনো প্রতিবেশী দেশ সন্ত্রাসবাদে মদদ দিয়ে গেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যেকোনো অভিযান চালাতে ভারত প্রস্তুত থাকবে।

ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, ভারত সংলাপে বিশ্বাসী। তবে কোনো দেশ সন্ত্রাসবাদে মদদ দিলে সেই সংলাপ সেখানেই শেষ হবে। ভারত সহযোগিতা চায়, কিন্তু জাতীয় স্বার্থের বিনিময়ে নয়।

এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনাথ সিং ‘প্রতিবেশী দেশ’ বলতে পাকিস্তানকে ইঙ্গিত করেছেন।

যুদ্ধের ধরন বদলাচ্ছে

সম্মেলনে ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল ধীরাজ শেঠ আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তি ও তথ্যযুদ্ধের প্রভাব নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, প্রযুক্তি সরাসরি লড়াইয়ের সময় কমিয়ে আনলেও পুরো যুদ্ধের মেয়াদ কমছে না।

তার মতে, যুদ্ধ জয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হলো ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ। ভূখণ্ড দখলে রাখা, সুরক্ষিত করা ও প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর ভূমিকা অপরিহার্য।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুদ্ধ নিয়ে নানা তথ্য ও বিশ্লেষণ ছড়িয়ে পড়ায় প্রকৃত পরিস্থিতি অনেক সময় আড়ালে পড়ে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন জেনারেল ধীরাজ। তার ভাষায়, বর্তমান সময়ের যুদ্ধকে অনেক ক্ষেত্রে ‘বিরতি দিয়ে চলা যুদ্ধ’ হিসেবে দেখা যায়। সংঘাতের বিরতিও সামরিক কৌশলের অংশ হয়ে উঠছে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান বিশ্বের দীর্ঘস্থায়ী সংকটে আত্মনির্ভরতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোনো সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি নিজস্ব সক্ষমতা ও সম্পদের ওপর নির্ভরতা পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

নদী রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি: পানিসম্পদমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৪১ অপরাহ্ণ
নদী রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি: পানিসম্পদমন্ত্রী

নদী রক্ষা ও সংরক্ষণে সরকার, জনগণ, গবেষক ও পরিবেশবিদদের সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি।

রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর পান্থপথে পানি ভবন মিলনায়তনে বিশ্ব নদী দিবস ও মার্ক এ্যাঞ্জেলো রিভার অ্যাওয়ার্ড-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশন যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, নদী দখল ও দূষণ রোধের পাশাপাশি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হবে। নদীকে শুধু পানি প্রবাহের মাধ্যম হিসেবে দেখলে হবে না; দেশের পরিবেশ, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবন-জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও নদীকে বিবেচনা করতে হবে।

তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় নদী ও জলাভূমি সংরক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। নদীকে কেন্দ্র করে টেকসই ও জলবায়ু-সহনশীল উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নদীকে নিরাপদ ও জীবন্ত রাখতে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে বলেও জানান তিনি।

নদী সংরক্ষণে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের গুরুত্ব

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, মার্ক এ্যাঞ্জেলো রিভার অ্যাওয়ার্ড নদী ও জলসম্পদ সংরক্ষণে দীর্ঘদিন ধরে অবদান রাখা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। এ ধরনের সম্মাননা অন্যদেরও নদী রক্ষায় উৎসাহিত করবে।

নদীর প্রতি দায়বদ্ধতা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগকে আরও উৎসাহিত করা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পাঁচ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান পেল রিভার অ্যাওয়ার্ড

নদী রক্ষা ও সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে অনুষ্ঠানে পাঁচ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে মার্ক এ্যাঞ্জেলো রিভার অ্যাওয়ার্ড-২০২৬ দেওয়া হয়।

লেখক ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পেয়েছেন সেভ দ্য রিভার মুভমেন্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাহবুবুল কবির সিদ্দিকী। গবেষণা ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পেয়েছেন নদী গবেষক ও রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন।

সাংবাদিকতা ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পেয়েছেন যমুনা টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি সাজ্জাদ পারভেজ এবং দৈনিক বণিক বার্তার নিজস্ব প্রতিবেদক মো. আল ফাতাহ। সংগঠন ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পেয়েছে নোঙর ট্রাস্ট। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান সুমন শামস পুরস্কার গ্রহণ করেন।

প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুকিত মজুমদার বাবুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া, পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক সোলায়মান হায়দার এবং বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মনির হোসেন।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি