খুঁজুন
                               
, ,
           

গুমের অবসান ও ন্যায়বিচারের পথে নতুন বাংলাদেশ

আহসান হাবিব বরুন:
প্রকাশিত: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৪৯ অপরাহ্ণ
গুমের অবসান ও ন্যায়বিচারের পথে নতুন বাংলাদেশ

রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়া। কিন্তু রাষ্ট্র নিজেই যখন তার নাগরিককে দিনদুপুরে বা রাতের আঁধারে তুলে নিয়ে নিখোঁজ করে দেয়, তখন তা আর কোনো গণতান্ত্রিক সমাজ থাকে না—তা রূপান্তরিত হয় এক নারকীয় বন্দিশালায়। ৩০ আগস্ট ‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস’ বা বিশ্ব গুম দিবস। এই দিবসটি কেবল পঞ্জিকার পাতা উল্টানোর কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি গুম হওয়া হাজারও মানুষের কান্না, অন্ধকারের কুঠুরিতে বন্দী জীবনের নিঃশব্দ আর্তনাদ এবং বিচারহীনতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার দিন। গুম কেবল একটি নির্দিষ্ট মানুষকে হারিয়ে যাওয়া বোঝায় না, এটি একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ, যা ভুক্তভোগী পরিবারসহ সমগ্র সমাজকে প্রতিনিয়ত তিলে তিলে ধ্বংস করে। গুম হওয়া প্রতিটি নাম, প্রতিটি মুখ আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বিবেকের কাছে এক একটি জ্বলন্ত প্রশ্ন।

কোনো শিশুর কাছে তার বাবা কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নন। তিনি সেই মানুষ, যিনি স্কুল থেকে ফেরার সময় হাত ধরে বাড়ি নিয়ে আসতেন। কোনো গৃহবধূর কাছে নিখোঁজ স্বামী কোনো পরিসংখ্যান নন; তিনি সংসারের নির্ভরতা, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং জীবনের সঙ্গী। কোনো বৃদ্ধ মায়ের কাছে নিখোঁজ সন্তান আজও সেই ছোট্ট শিশুই—যে একদিন মায়ের আঁচল ধরে হাঁটতে শিখেছিল।

তাই একজন মানুষকে তুলে নিয়ে গিয়ে তার অবস্থান অস্বীকার করা মানে শুধু একজন নাগরিককে অদৃশ্য করে দেওয়া নয়; একটি পরিবারকে জীবন্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া। মৃত্যুতে অন্তত একটি শেষ খবর থাকে, কবর থাকে, শোকের আনুষ্ঠানিকতা থাকে। গুমের সবচেয়ে নির্মমতা হলো—এখানে শোকেরও কোনো শেষ নেই।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলা শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যূত ও পলাতক স্বৈরাচারী শাসন আমলটি চিহ্নিত হয়ে থাকবে গুম, খুন ও চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে। শেখ হাসিনার শাসন আমলকে টিকিয়ে রাখার মূল হাতিয়ার ছিল রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে ব্যবহার করে বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মী, ভিন্নমতালম্বী, মানবাধিকারকর্মী ও সাধারণ নাগরিকদের গুম করা। এই স্বৈরাচারী ব্যবস্থার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও নারকীয় রূপ ছিল ‘আয়নাঘর’।

বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা দ্বারা পরিচালিত এই গোপন বন্দিশালাগুলো ছিল আধুনিক যুগের টর্চার সেল। জানলাহীন, আলো-বাতাসহীন, অত্যন্ত ছোট ছোট স্যাঁতসেঁতে কুঠুরিতে বন্দীদের বছরের পর বছর আঁটকে রাখা হতো। দিনে-রাতে সবসময় প্রকাণ্ড ফ্যানের আওয়াজ চালিয়ে রাখা হতো, যাতে বাইরের কোনো শব্দ ভেতরে না আসে এবং ভেতরের আর্তনাদ বাইরে না পৌঁছায়।

সেখানে বন্দীদের ওপর চালানো হতো অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন—বৈদ্যুতিক শক, ওয়াটার বোর্ডিং, নখ উপড়ে ফেলা এবং হাত-পা বেঁধে ঝুলিয়ে পিটানো ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। সাবেক সেনাকর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (বহিষ্কৃত) আবদুল্লাহিল আমান আযমী কিংবা বারিস্টার আরমানদের মতো ভুক্তভোগীরা দীর্ঘ ৮-৯ বছর পর মুক্তি পেয়ে যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা কোনো সভ্য সমাজের গল্প নয়; তা যেন মধ্যযুগীয় কোনো হিংস্রতার নামান্তর।

গুমের সবচেয়ে করুণ দৃশ্য ফুটে ওঠে গুম হওয়া পরিবারগুলোর দৈনন্দিন জীবনে। একটি স্বাভাবিক মৃত্যু মানুষকে শোক সইবার শক্তি দেয়, কিন্তু গুম বা জোরপূর্বক নিখোঁজ হওয়া একটি পরিবারকে অনন্তকাল ধরে ঝুলন্ত যন্ত্রণার মধ্যে রাখে। মায়ের আর্তনাদের কোনো শেষ নেই। “আমার বাবা কি বেঁচে আছে, নাকি তাকে মেরে ফেলা হয়েছে?”—এই প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে কত শত মা চোখ বোজা পর্যন্ত দরজার দিকে তাকিয়ে থেকেছেন। অনেক মা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন সন্তানের মুখটি আর না দেখেই। ছোট্ট শিশুদের কান্না দেখলে পাষাণ হৃদয়ও কেঁপে ওঠে।

বহু শিশু রয়েছে, যারা যখন ছোট ছিল তখন তাদের বাবাকে তুলে নেওয়া হয়েছিল; আজ তারা বড় হয়েছে, কিন্তু বাবার ছায়া পায়নি।  ঈদের দিন বা জন্মদিনে অন্য শিশুরা যখন বাবার হাত ধরে ঘুরে বেড়ায়, তখন গুম হওয়া পরিবারের শিশুরা তাদের বাবার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে নীরবে অশ্রু বিসর্জন দেয়। গৃহবধূর অপেক্ষার প্রহর যেন শেষই হতে চায় না। স্বামী জীবিত না মৃত—এই নিশ্চিত তথ্য না থাকায় বহু নারী সামাজিকভাবে আইনি ও পারিবারিক চরম জটিলতায় পড়েছেন। তাদের এই দীর্ঘ নীরব কান্না রাষ্ট্রের প্রতিটি ইট-পাথরে আছড়ে পড়ে। ‘মায়ের ডাক’ নামক প্ল্যাটফর্মটি গত এক দশক ধরে এই কান্না ও দাবির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার তথ্যানুসারে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনামলে ৭০০ জনেরও বেশি মানুষকে জোরপূর্বক গুম করা হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে অন্তত ৬০০ জনের বেশি গুমের শিকার হয়েছেন।

এদের মধ্যে পরবর্তীতে অনেকের লাশ নদী বা রাস্তার পাশে পাওয়া গেছে, কাউকে কাউকে কয়েক মাস বা বছর পর গ্রেফতার দেখানো হয়েছে, কিন্তু একটি বড় অংশের কোনো খোঁজ আজও মেলেনি। একই সাথে মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত অন্তত ৭০৮ জন ব্যক্তি গুমের শিকার হন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ২০২১ সালে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ “He Didn’t Even Cry: Enforced Disappearances in Bangladesh” শীর্ষক ৮২ পৃষ্ঠার একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে সংস্থাটি উল্লেখ করে, তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার বিরোধী দলের নেতাকর্মী ও সমালোচকদের নিশ্চিহ্ন করতে গুমকে একটি পরিকল্পিত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে এবং তারা ৮৬টি সুনির্দিষ্ট গুমের ঘটনার বিস্তারিত তালিকা জাতিসংঘে জমা দিয়েছিল, যার সদুত্তর শেখ হাসিনার সরকার কখনোই দিতে পারেনি।

পাশাপাশি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানায় যে র‍্যাব এবং গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) সরাসরি এই গুমের সাথে জড়িত। এসবের ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র র‍্যাব এবং এর শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল এই গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যা।

বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু গুমের ঘটনা বিশ্ব বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল বিএনপি-র শীর্ষস্থানীয় নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য এম ইলিয়াস আলী এবং তার গাড়িচালক আনসার আলীকে ঢাকার বনানী থেকে গুম করা হয়, যাদের আজ পর্যন্ত কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

২০১০ সালের ২৫ জুন ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা চৌধুরী আলমকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়ার পর তিনি চিরতরে নিখোঁজ হন।

২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর ঢাকার শাহীনবাগ এলাকা থেকে ৮ জন যুবকের সাথে সাজেদুল ইসলাম সুমনকে তুলে নিয়ে যায় র‍্যাব-১; পরবর্তীতে সুমনের বোন সানজিদা ইসলাম তুলি ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক হিসেবে গুমবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।

২০১৯ সালের ৯ এপ্রিল ইউপিডিএফ নেতা মাইকেল চাকমাকে ঢাকা থেকে গুম করা হয় এবং তিনি ৫ বছরেরও বেশি সময় আয়নাঘরে বন্দী থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর মুক্ত হন।

একইভাবে ২০১৬ সালের আগস্টে নিজ নিজ বাসা থেকে তুলে নিয়ে ৮ বছর আয়নাঘরে বন্দী রাখার পর ২০২৪ সালের আগস্টে মুক্তি পান মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান ও আবদুল্লাহিল আমান আযমী।

আন্তর্জাতিক আইনে গুম একটি স্বতন্ত্র ও গুরুতর মানবতাবিরোধী অপরাধ। ২০০৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ‘International Convention for the Protection of All Persons from Enforced Disappearance’ বা ‘সব ব্যক্তির গুম হওয়া থেকে সুরক্ষার আন্তর্জাতিক সনদ’ গৃহীত হয়, যার মূল কথা হলো—কোনো অবস্থাতেই, যুদ্ধ বা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার বাহানাতেও কাউকে গুম করা যাবে না।

জাতিসংঘের ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এনফোর্সড অর ইনভলন্টারি ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সেস’ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের গুমের ঘটনাগুলো তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছিল। জাতিসংঘ বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ সরকারকে গুমের অভিযোগগুলো তদন্তের নিরপেক্ষ সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানালেও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার তা ধারাবাহিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে এসেছিল।

বিশ্বের উন্নত দেশসমূহ ও বিভিন্ন অঞ্চলে গুম প্রতিরোধে কঠোর আইনি অবকাঠামো রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানবাধিকার সনদ এবং ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের (ECHR) অধীনে গুমকে চরম মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ফ্রান্সে গুমের অপরাধের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং মারাত্মক শারীরিক ক্ষতির ক্ষেত্রে অপরাধীদের অত্যন্ত কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘Global Magnitsky Human Rights Accountability Act’-এর অধীনে আন্তর্জাতিকভাবে গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত যেকোনো দেশের কর্মকর্তাদের ওপর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, ভিসা নিষেধাজ্ঞা এবং আর্থিক অবরোধ আরোপ করা হয়।

অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নেপাল ২০১৭ সালে তাদের নতুন ক্রিমিনাল কোডে গুমকে একটি সুনির্দিষ্ট অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে, যেখানে গুমের অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ ১৫ বছরের কারাদণ্ড এবং জরিমানার বিধান রয়েছে।

শ্রীলঙ্কা ২০১৮ সালে জাতিসংঘের গুমবিরোধী সনদে অনুস্বাক্ষর করে এবং গুম প্রতিরোধ আইন পাস করে, যেখানে গুমের অপরাধে ২০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। তবে পাকিস্তান ও ভারতে গুমের ঘটনা ঘটলেও সেখানে গুমবিরোধী আলাদা ও পূর্ণাঙ্গ আইনের মারাত্মক অভাব রয়েছে, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল দীর্ঘদিন সোচ্চার।

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে এবং গঠিত হয় নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ডক্টর ইউনুসের নেতৃত্বাধীন সরকার গুমের বিচার ও এটি প্রতিরোধে অভূতপূর্ব ও দৃঢ় অঙ্গিকার প্রদর্শন করেছে। দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট জাতিসংঘের গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে অনুস্বাক্ষর করেছে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে গুম বন্ধের আইনি অঙ্গীকারে আবদ্ধ হলো।

বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারকে বাস্তব আইনে পরিণত করা। ২০২৫ সালে Enforced Disappearance Prevention and Redress Ordinance-এর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরে ২০২৬ সালের ৩ আগস্ট বর্তমান সরকার Enforced Disappearance Prevention and Redress Act, 2026-এর খসড়ায় অনুমোদন দেয়। সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য অনুযায়ী খসড়ায় enforced disappearance-কে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। তবে ভুক্তভোগীর মৃত্যু হলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত যাওয়ার বিধান এবং সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা জরিমানার প্রস্তাব রয়েছে; তদন্ত ও বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য সর্বোচ্চ ১২০ দিনের সময়সীমার কথাও বলা হয়েছে।

আমি মনে করি,এখানে সরকারের সামনে দুটি বিষয় সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, আইনটি দ্রুত কার্যকর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আইনটি যেন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ কঠোর শাস্তি থাকাই যথেষ্ট নয়; স্বাধীন তদন্ত, ন্যায়সংগত বিচার, কমান্ড রেসপনসিবিলিটি, সাক্ষী সুরক্ষা, ভুক্তভোগীর অধিকার এবং কার্যকর প্রতিকার—সবকিছুর সমন্বয় একান্ত প্রয়োজন।

পরিশেষে বলতে চাই,একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে গুমের মতো বিভীষিকার আর কখনো যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তার জন্য কেবল কমিশন গঠন বা সনদে স্বাক্ষরই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। জাতিসংঘের সনদের আলোকে বাংলাদেশের দণ্ডবিধিতে গুমকে একটি পৃথক, জামিনঅযোগ্য ও গুরুতর অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যেখানে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান থাকবে। ডিজিএফআই, র‍্যাব ও ডিবি-র মতো সংস্থাগুলোকে রাজনীতিকরণের হাত থেকে মুক্ত করতে হবে এবং কোনো গোয়েন্দা সংস্থা যেন সাধারণ নাগরিক বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে গোপনে তুলে নিয়ে আটক রাখার এখতিয়ার না পায়, তার জন্য আইনি তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি গুমের শিকার ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উপযুক্ত অর্থ ও সামাজিক ক্ষতিপূরণ প্রদানসহ গুম হওয়া ব্যক্তিদের রেখে যাওয়া সন্তানদের পড়াশোনা ও পরিবারের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে গুমের হুকুমদাতা থেকে শুরু করে সরাসরি বাস্তবায়নকারী—তা সে যত বড় প্রভাবশালী বা শীর্ষ কর্মকর্তা হোক না কেন—প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে দৃশ্যমান শাস্তি দিতে হবে। বিশ্ব গুম দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—রাষ্ট্রের কোনো নাগরিক আর কখনোই রাতের আঁধারে গুম হবে না, কোনো মায়ের কোল আর খালি হবে না, আর কোনো শিশুকে বাবার ছবির দিকে তাকিয়ে কাঁদতে হবে না। রাষ্ট্রকে তার বিবেকের কাছে সৎ হতে হবে; হারিয়ে যাওয়া প্রতিটি নামের হিসাব দিতে হবে এবং সুবিচার সুনিশ্চিত করতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার থেকে উচ্চকক্ষ, সংবিধানে যেসব পরিবর্তনের প্রস্তাব

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৫২ পূর্বাহ্ণ
তত্ত্বাবধায়ক সরকার থেকে উচ্চকক্ষ, সংবিধানে যেসব পরিবর্তনের প্রস্তাব

সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের এখতিয়ার নির্ধারণ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, সংসদের উচ্চকক্ষের গঠন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির কিছু বিষয় মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন শিক্ষাবিদ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা। সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সপ্তম বৈঠকে এসব প্রস্তাব ও মতামত উঠে এসেছে।

মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের ক্যাবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, বৈঠকে সংবিধানের বিভিন্ন অংশে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন, সংশোধনপ্রক্রিয়ায় স্থিতিশীলতা ও নমনীয়তার ভারসাম্য এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

বিচার বিভাগের এখতিয়ার স্পষ্ট করার প্রস্তাব

বৈঠকে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ, সংবিধান সংশোধনের বর্তমান বিধান এবং পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বিলুপ্ত মৌলিক কাঠামো-সংক্রান্ত বিধান নিয়ে মতামত দেন শিক্ষাবিদরা। সংবিধানের ব্যাখ্যা, মৌলিক কাঠামো রক্ষা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিচার বিভাগের এখতিয়ার সাংবিধানিকভাবে স্পষ্ট করার ওপর গুরুত্ব দেন তাঁরা।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রাষ্ট্রের একটি অঙ্গ যাতে অন্য অঙ্গের ওপর খবরদারি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বজায় রেখে তার এখতিয়ারও স্পষ্ট করা দরকার, যাতে সংবিধানের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে জনপ্রত্যাশা উপেক্ষিত না হয়।

সংবিধান সংশোধনের বর্তমান পদ্ধতিতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিধান রয়েছে। এই পদ্ধতির বাইরে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা রাখা যায় কি না, সে বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে জানান কমিটির সভাপতি। তবে এসব বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে বিকল্প ভাবনা

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বিন্যাস এবং সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে অংশগ্রহণকারীদের অনেকে লিখিত মতামত দেবেন বলে জানিয়েছেন।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিকল্পগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিকল্পগুলোর মধ্যে সর্বশেষ পর্যায়ে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা বাদ দেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। আগের বিকল্পগুলোতে ঐকমত্য না হলে সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে বিচার বিভাগের ভূমিকা রাখার বিষয়ে আলোচকদের মতামত পাওয়া গেছে।

তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার কাঠামো কিংবা গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে বৈঠকে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাব চূড়ান্ত হয়নি। বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনা ও লিখিত মতামত পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।

উচ্চকক্ষে কারা প্রতিনিধিত্ব করবেন, তা নিয়েও আলোচনা

সংবিধানে উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়টিও বৈঠকের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। উচ্চকক্ষে কোন কোন শ্রেণি বা এলাকার প্রতিনিধিত্ব থাকবে, প্রতিনিধিরা কীভাবে নির্বাচিত হবেন, জেলাভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব রাখা হবে কি না এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করা যায় কি না—এসব বিষয়ে মতামত দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশ এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দেশ। এ কাঠামোর মধ্যে উচ্চকক্ষের মতো ব্যবস্থায় কীভাবে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে আলোচকেরা বিভিন্ন মতামত দিয়েছেন।

এসব মতামত লিখিতভাবে পাওয়ার পর সেগুলো পর্যালোচনা করে কমিটিতে আলোচনা করা হবে বলে জানান তিনি। উচ্চকক্ষের গঠন, প্রতিনিধিত্বের ধরন কিংবা নির্বাচনপদ্ধতি নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ও মৌলিক অধিকার

রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির কিছু বিষয় রাষ্ট্রের সামর্থ্য অনুযায়ী মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করা যায় কি না, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে জনগণের সার্বভৌমত্বের বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার প্রস্তাব এসেছে।

শিক্ষাবিদদের এসব মতামত সংবিধানের বিভিন্ন অংশে কী ধরনের পরিবর্তন আনা প্রয়োজন, তা নির্ধারণের আলোচনার অংশ বলে জানান কমিটির সভাপতি। তাঁর মতে, জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত হয়নি, কিন্তু জাতির দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে প্রয়োজন হতে পারে—এমন বিষয়ও সংশোধনপ্রক্রিয়ায় বিবেচনা করা দরকার।

তিনি বলেন, নির্বাচনি ইশতেহার ও জনগণের চাহিদার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয়ও সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।

বিরোধী দলকে আবারও আলোচনায় আসার আহ্বান

সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ না থাকা নিয়ে ঐকমত্য কমিশনের সাবেক সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজের সমালোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে আলোচনার ভিত্তিতে প্রণীত হয়েছে। ওই কমিশনের সভাপতি ছিলেন সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং সহসভাপতি ছিলেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্যই কাজ করছে। কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের নাম দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তাঁরা এখনো নাম দেননি। নাম দেওয়া হলে তাঁদের স্বাগত জানানো হবে।

তিনি জানান, কমিটির প্রতিটি বৈঠক এবং জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বিরোধী দলকে অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। সরকার চায়, সরকারি ও বিরোধী দলের অংশগ্রহণে সমঝোতার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন হোক।

তবে বিরোধী দল অংশ না নিলেও সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সরকারের অঙ্গীকার এবং এটি জাতির প্রত্যাশার সঙ্গে সম্পর্কিত।

বিরোধী দল চাইলে লিখিত মতামত দিতে পারে বলেও জানান কমিটির সভাপতি। প্রতিবেদন তৈরির পর সংবিধান সংশোধনের বিল সংসদে উত্থাপিত হলে বিরোধী দল তাতে অংশ নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

২৪ অক্টোবর আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা

সংবিধান সংশোধন নিয়ে আরও মতামত সংগ্রহের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, আগামী ২৪ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির প্রতিনিধি এবং বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে দিনব্যাপী আলোচনার প্রাথমিক পরিকল্পনা রয়েছে।

তাঁর মতে, সংক্ষিপ্ত সময়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পুরোপুরি শোনা ও রেকর্ড করা কঠিন। এ কারণে তাঁদের মতামত বিস্তারিতভাবে শোনার জন্য দিনব্যাপী আলোচনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বৈঠকে ছিলেন শিক্ষাবিদ ও কমিটির সদস্যরা

মঙ্গলবারের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক মাহবুবুল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান, অধ্যাপক গীতিআরা নাসরিন, অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কে এইচ লুৎফুল এলাহী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক একরামুল হক।

এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম ও অধ্যাপক শামীমা সুলতানা, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মো. মাহবুবুর রহমান ও অধ্যাপক মোহাম্মদ একরামুল হক এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক নেসার ইউ আহমেদ।

কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, জয়নুল আবেদীন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নূরুল হক, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমীন এবং মো. মাহমুদুল হক রুবেলও বৈঠকে অংশ নেন।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

বিশ্ব ইজতেমার তারিখ ঘোষণাসহ সাদপন্থীদের ছয় দফা দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৩৯ পূর্বাহ্ণ
বিশ্ব ইজতেমার তারিখ ঘোষণাসহ সাদপন্থীদের ছয় দফা দাবি

টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমার সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের সহিংসতার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং তাবলীগ জামাতের ধর্মীয় কার্যক্রমে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধসহ ছয় দফা দাবি জানিয়েছে তাবলীগ জামাত বাংলাদেশের মাওলানা সাদ অনুসারী পক্ষ। একই সঙ্গে বিশ্ব ইজতেমা ময়দান ব্যবহারে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা, বিভিন্ন এলাকার মার্কাজ মসজিদ নিয়ে বিরোধের আইনানুগ নিষ্পত্তি এবং মসজিদে ধর্মীয় কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখার জন্য প্রশাসনিক নিরাপত্তা চেয়েছে সংগঠনটি।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুপুরে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব দাবি জানানো হয়। তাবলীগ জামাত বাংলাদেশের (মাওলানা সাদ অনুসারী) মিডিয়া সমন্বয়ক মো. সায়েম বিজ্ঞপ্তিটি পাঠান।

বিশ্ব ইজতেমার তারিখ দ্রুত ঘোষণার দাবি

সাদপন্থীদের ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা আয়োজনের সুনির্দিষ্ট তারিখ দ্রুত ঘোষণা এবং আয়োজন নির্বিঘ্ন করতে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ। পাশাপাশি ইজতেমা ময়দান ব্যবহারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

তাঁদের বক্তব্য, ইজতেমা আয়োজন ও ময়দান ব্যবহারের বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত প্রয়োজন, যাতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে বিরোধ নিরসন করা যায় এবং ধর্মীয় কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত না হয়।

২০১৮ ও ২০২৪ সালের সহিংসতার তদন্ত দাবি

টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দানকেন্দ্রিক ২০১৮ ও ২০২৪ সালের সহিংসতা এবং প্রাণহানির ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে সাদপন্থী পক্ষ। এসব ঘটনায় প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে তারা।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এসব ঘটনার তদন্তে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও অন্যান্য তথ্য নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তদন্তকারী সংস্থা যেন রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাব ছাড়াই দায়িত্ব পালন করতে পারে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে টঙ্গীর ইজতেমা ময়দানে ২০১৮ সালে ইসমাইল মণ্ডল ও শামসুদ্দিন বেলাল এবং ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর বেলাল হোসেন ও মিজানুর রহমানের মৃত্যুর ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া ২০১৯ সালে কিশোরগঞ্জে আব্দুর রহিম রাজন এবং ২০২৩ সালে ঢাকার নিউমার্কেট এলাকায় শামসুল হকের মৃত্যুর ঘটনাও তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সাদপন্থী পক্ষ। তবে বিজ্ঞপ্তিতে উত্থাপিত অভিযোগ ও দাবিগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষগুলোর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তাবলীগের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বন্ধের আহ্বান

তাবলীগ জামাতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বহিরাগত ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক নেতাদের হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

সম্প্রতি ‘ওলামা-মাশায়েখ বাংলাদেশ’ নাম ব্যবহার করে আয়োজিত একটি সংবাদ সম্মেলনে তাবলীগ জামাতের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে দেওয়া বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে সাদপন্থীরা দাবি করেন, সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ব্যক্তিরা তাবলীগ জামাতের প্রতিনিধিত্ব করেন না।

বিজ্ঞপ্তিতে তাঁদের বক্তব্যকে ‘অসত্য, বিভ্রান্তিকর ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে অভিহিত করা হয়। সাদপন্থীদের অভিযোগ, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা তৃতীয় পক্ষ হিসেবে তাবলীগ জামাতের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে উসকে দিচ্ছেন।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য বিজ্ঞপ্তিতে তুলে ধরা হয়নি। তাবলীগ জামাতের ধর্মীয় কার্যক্রম ও অভ্যন্তরীণ বিষয় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা এবং প্রকৃত ঘটনা নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সাদপন্থী পক্ষ।

ইজতেমা ময়দান নিয়ে আগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দাবি

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত একটি যৌথ সভায় ইজতেমা ময়দান খালি করার বিষয়ে লিখিত সিদ্ধান্ত হয়েছিল বলে সাদপন্থীরা উল্লেখ করছেন। ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

এ ছাড়া ১৭ ডিসেম্বর রাতে ডা. আসগরের নামে প্রচারিত একটি কথিত অডিও রেকর্ডের সত্যতা ও প্রেক্ষাপট যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

অডিওটির সত্যতা বা এ বিষয়ে কোনো তদন্তের ফলাফল সম্পর্কে বিজ্ঞপ্তিতে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। সাদপন্থীরা বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছেন।

মার্কাজ মসজিদ নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির দাবি

দেশের বিভিন্ন জেলা ও থানার মার্কাজ মসজিদ নিয়ে বিরোধ এবং দখলসংক্রান্ত অভিযোগ আইনানুগভাবে নিষ্পত্তির দাবি জানিয়েছে সাদপন্থী পক্ষ। একই সঙ্গে মসজিদগুলোতে তাবলীগের নিয়মিত ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে তারা।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে মসজিদে তাবলীগের নিয়মিত আমল পরিচালনায় বাধা, মার্কাজ মসজিদ নিয়ে বিরোধ এবং এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি প্রচারণা ধর্মীয় পরিবেশ ও সামাজিক সম্প্রীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে মসজিদে ধর্মীয় কার্যক্রমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মার্কাজ মসজিদসংক্রান্ত বিরোধ আইনানুগভাবে নিষ্পত্তি করা এবং তাবলীগ জামাতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বহিরাগত হস্তক্ষেপ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

সাদপন্থীদের ছয় দফা দাবির মূল বিষয়গুলো হলো—

১. টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমার সুনির্দিষ্ট তারিখ দ্রুত ঘোষণা ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ।

২. ২০১৮ ও ২০২৪ সালের ইজতেমা ময়দানকেন্দ্রিক সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা।

৩. তাবলীগ জামাতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বহিরাগত ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক নেতাদের হস্তক্ষেপ বন্ধ করা।

৪. বিশ্ব ইজতেমা ময়দান ব্যবহারে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা।

৫. দেশের বিভিন্ন জেলা ও থানার মার্কাজ মসজিদ নিয়ে বিরোধ ও দখলসংক্রান্ত অভিযোগ আইনানুগভাবে নিষ্পত্তি করা।

৬. মসজিদে তাবলীগের ধর্মীয় কার্যক্রম নির্বিঘ্নে পরিচালনায় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

এলপিজি নিয়ে শঙ্কা, রাজধানীতে সিলিন্ডারের দামে আগুন

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:০৬ অপরাহ্ণ
এলপিজি নিয়ে শঙ্কা, রাজধানীতে সিলিন্ডারের দামে আগুন

সাত দফা দাবিতে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার সারা দেশে এলপি গ্যাস বিক্রি বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি। এ ঘোষণাকে কেন্দ্র করে কোথাও কোথাও সিলিন্ডার কেনার চাপ বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দামে। রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় ১২ কেজি ওজনের এলপিজি সিলিন্ডার ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাজধানীর মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা, ফার্মগেট ও কদমতলী থানার জুরাইনে এলপিজি বিক্রির দোকান ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

তবে সব এলাকায় ক্রেতার চাপ সমান নয়। কোথাও বিক্রি বেড়েছে, আবার কোথাও স্বাভাবিক রয়েছে। গৃহস্থালি গ্যাস বিক্রেতারা জানান, দুই দিন বিক্রি বন্ধ থাকার ঘোষণায় অনেক গ্রাহক আগেভাগেই সিলিন্ডার কিনছেন।

বিশেষ করে যাদের বাসায় গ্যাস শেষ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তারা আগে থেকেই সিলিন্ডার সংগ্রহ করছেন। এ সুযোগে কিছু দোকানে দাম বাড়ানোর অভিযোগও উঠেছে।

মিরপুর-১০-এর সেনপাড়ার খুচরা গ্যাস বিক্রেতা আবিদ আলী বলেন, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার বিক্রি বন্ধ থাকার ঘোষণায় ক্রেতারা বেশি করে গ্যাস কিনতে আসছেন। অনেকেই জানতে চাইছেন, কত দিন গ্যাস বিক্রি বন্ধ থাকবে।

আবিদ আলী জানান, বাসায় পৌঁছে দিয়ে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করছেন তিনি। গত এক মাস ধরে গ্যাসের সরবরাহ কম বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, ঢাকার ভেতরে সংকট বেশি থাকায় ঢাকার বাইরে থেকে গ্যাস এনে চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করছেন।

তার দোকানে ১২ কেজির সিলিন্ডার থাকলেও অন্য মাপের সিলিন্ডার ছিল না। কয়েকটি সিলিন্ডারে গ্যাস থাকলেও দোকানের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সিলিন্ডার খালি পড়ে থাকতে দেখা যায়।

শেওড়াপাড়ার কয়েকটি দোকানেও ক্রেতার চাপ কিছুটা বেড়েছে। তবে সেখানে চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি দুই দিন বিক্রি বন্ধ থাকার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দাম বাড়ানোর অভিযোগও পাওয়া গেছে।

মিরপুরের বেগম রোকেয়া সরণির ডিলার এনামুল হক বলেন, সরকার নির্ধারিত দামে ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি করলে তাদের লাভ খুব কম থাকে। তার দাবি, দোকানভাড়া, পরিবহন খরচ ও কর্মচারীদের বেতনসহ বিভিন্ন ব্যয় মেটানোর পর সিলিন্ডারপ্রতি প্রায় ৪০ টাকা লাভ থাকে।

তিনি বলেন, সরকার আমাদের কাছে ১ হাজার ৭৪২ টাকা রেখে ১ হাজার ৮৩৭ টাকায় ১২ কেজির গ্যাস বিক্রি করতে বলে। এতে আমাদের চলে না। দোকানভাড়া, আনা-নেওয়ার খরচ, কর্মচারীদের বেতনসহ নানা ব্যয় রয়েছে।

এনামুল হক জানান, তার দোকানে ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ১৫০ টাকা এবং ৩৫ কেজির সিলিন্ডার ৫ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সাত দফা দাবিতে তাদের কর্মসূচি চলছে। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার বিক্রি বন্ধ থাকবে। দাবি পূরণ না হলে লাগাতার কর্মসূচি দেওয়ার কথাও জানান তিনি।

কদমতলী থানার জুরাইনের খুচরা এলপিজি বিক্রয় প্রতিষ্ঠান বিসমিল্লাহ ট্রেডের স্বত্বাধিকারী মাহফুজ আলম বলেন, দুই দিন বিক্রি বন্ধের ঘোষণা আসার পর থেকেই সিলিন্ডার কেনার চাপ বেড়েছে। বিশেষ করে হোটেল ব্যবসায়ীরা বেশি সিলিন্ডার কিনছেন।

তিনি বলেন, সাধারণত হোটেল ব্যবসায়ীরা খালি সিলিন্ডার দিয়ে ভর্তি সিলিন্ডার নিয়ে যান। কিন্তু গতকাল থেকে কেউ কেউ দুটি খালি সিলিন্ডার নিয়ে এসে দুটি ভর্তি সিলিন্ডার নিচ্ছেন। এতে বিক্রির চাপ বেড়েছে।

মাহফুজ আলম বলেন, তারা অতিরিক্ত সিলিন্ডার মজুত রাখেননি। তাই চায়ের দোকানদার ও বাসাবাড়ির গ্রাহকদের কথা বিবেচনা করে সীমিত পরিমাণে সিলিন্ডার বিক্রি করছেন। জনভোগান্তির কথা বিবেচনা করে সরকার ব্যবসায়ীদের দাবিগুলো মেনে নেবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
জুরাইনের জনি চায়ের দোকানের মালিক জনি বলেন, বেশি সিলিন্ডার কিনে মজুত করার মতো পুঁজি তার নেই। মঙ্গলবার সিলিন্ডারের গ্যাস শেষ হয়ে যাওয়ায় নতুন সিলিন্ডার নিতে এসেছেন তিনি।

ফার্মগেটের রাজাবাজার এলাকার খুচরা গ্যাসের দোকানগুলোতে মঙ্গলবার বাড়তি ক্রেতার চাপ দেখা যায়নি। আনারুল নামের এক বিক্রেতা বলেন, তার দোকানে এখনো ক্রেতার সংখ্যা স্বাভাবিক রয়েছে। প্রতিদিনের মতোই দু-একজন ক্রেতা আসছেন। তবে বুধবার ক্রেতার চাপ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

দুই দিন বিক্রি বন্ধ থাকলে আগের দিন বুধবার সিলিন্ডার কেনার চাপ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন কয়েকজন বিক্রেতা। তাদের মতে, চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সরবরাহের ঘাটতি তৈরি হলে বাজারে সংকট আরও তীব্র হতে পারে। তবে কোথাও কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত হতে সরবরাহ ও বিক্রির তথ্য যাচাই প্রয়োজন।

গত সোমবার (১২ অক্টোবর) সাত দফা দাবিতে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার সারা দেশে এলপিজি বিক্রি বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয় এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি।

সমিতির দাবিগুলো হলো—

১. জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, লাইসেন্স ফি, সিলিন্ডার ওঠানো-নামানো এবং অব্যবহৃত সিলিন্ডারের লোকসানসহ বিভিন্ন খরচ বিবেচনায় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা অথবা ৭ শতাংশ করা।

২. কোম্পানিগুলো মাসে একাধিকবার এলপিজির দাম সমন্বয় করলে তা বিইআরসির ঘোষণার মাধ্যমে করা।

৩. দীর্ঘদিন ধরে যেসব কোম্পানি গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না, সেসব কোম্পানির সিলিন্ডার সরকারিভাবে অথবা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মাধ্যমে রিফিলের ব্যবস্থা করা।

৪. কোম্পানির সরবরাহ করা চালানে পণ্যের প্রকৃত মূল্য উল্লেখ করা।

৫. পরিবেশকের গুদাম পর্যন্ত গ্যাস পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে ন্যায্য পরিবহন ভাড়া দেওয়া।

৬. গ্যাস সিলিন্ডার বহনকারী পিকআপ বা ট্রাকের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক থাকলে শুধু রেলিং না থাকার অজুহাতে ট্রাফিক পুলিশের মামলা করা বন্ধ করা।

৭. ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের ওপর অনৈতিক ও অযৌক্তিক জরিমানা আরোপ বন্ধ করা।

ব্যবসায়ীদের এসব দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি