খুঁজুন
                               
, ,
           

গুমের অবসান ও ন্যায়বিচারের পথে নতুন বাংলাদেশ

আহসান হাবিব বরুন:
প্রকাশিত: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৪৯ অপরাহ্ণ
গুমের অবসান ও ন্যায়বিচারের পথে নতুন বাংলাদেশ

রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়া। কিন্তু রাষ্ট্র নিজেই যখন তার নাগরিককে দিনদুপুরে বা রাতের আঁধারে তুলে নিয়ে নিখোঁজ করে দেয়, তখন তা আর কোনো গণতান্ত্রিক সমাজ থাকে না—তা রূপান্তরিত হয় এক নারকীয় বন্দিশালায়। ৩০ আগস্ট ‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস’ বা বিশ্ব গুম দিবস। এই দিবসটি কেবল পঞ্জিকার পাতা উল্টানোর কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি গুম হওয়া হাজারও মানুষের কান্না, অন্ধকারের কুঠুরিতে বন্দী জীবনের নিঃশব্দ আর্তনাদ এবং বিচারহীনতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার দিন। গুম কেবল একটি নির্দিষ্ট মানুষকে হারিয়ে যাওয়া বোঝায় না, এটি একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ, যা ভুক্তভোগী পরিবারসহ সমগ্র সমাজকে প্রতিনিয়ত তিলে তিলে ধ্বংস করে। গুম হওয়া প্রতিটি নাম, প্রতিটি মুখ আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বিবেকের কাছে এক একটি জ্বলন্ত প্রশ্ন।

কোনো শিশুর কাছে তার বাবা কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নন। তিনি সেই মানুষ, যিনি স্কুল থেকে ফেরার সময় হাত ধরে বাড়ি নিয়ে আসতেন। কোনো গৃহবধূর কাছে নিখোঁজ স্বামী কোনো পরিসংখ্যান নন; তিনি সংসারের নির্ভরতা, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং জীবনের সঙ্গী। কোনো বৃদ্ধ মায়ের কাছে নিখোঁজ সন্তান আজও সেই ছোট্ট শিশুই—যে একদিন মায়ের আঁচল ধরে হাঁটতে শিখেছিল।

তাই একজন মানুষকে তুলে নিয়ে গিয়ে তার অবস্থান অস্বীকার করা মানে শুধু একজন নাগরিককে অদৃশ্য করে দেওয়া নয়; একটি পরিবারকে জীবন্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া। মৃত্যুতে অন্তত একটি শেষ খবর থাকে, কবর থাকে, শোকের আনুষ্ঠানিকতা থাকে। গুমের সবচেয়ে নির্মমতা হলো—এখানে শোকেরও কোনো শেষ নেই।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলা শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যূত ও পলাতক স্বৈরাচারী শাসন আমলটি চিহ্নিত হয়ে থাকবে গুম, খুন ও চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে। শেখ হাসিনার শাসন আমলকে টিকিয়ে রাখার মূল হাতিয়ার ছিল রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে ব্যবহার করে বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মী, ভিন্নমতালম্বী, মানবাধিকারকর্মী ও সাধারণ নাগরিকদের গুম করা। এই স্বৈরাচারী ব্যবস্থার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও নারকীয় রূপ ছিল ‘আয়নাঘর’।

বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা দ্বারা পরিচালিত এই গোপন বন্দিশালাগুলো ছিল আধুনিক যুগের টর্চার সেল। জানলাহীন, আলো-বাতাসহীন, অত্যন্ত ছোট ছোট স্যাঁতসেঁতে কুঠুরিতে বন্দীদের বছরের পর বছর আঁটকে রাখা হতো। দিনে-রাতে সবসময় প্রকাণ্ড ফ্যানের আওয়াজ চালিয়ে রাখা হতো, যাতে বাইরের কোনো শব্দ ভেতরে না আসে এবং ভেতরের আর্তনাদ বাইরে না পৌঁছায়।

সেখানে বন্দীদের ওপর চালানো হতো অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন—বৈদ্যুতিক শক, ওয়াটার বোর্ডিং, নখ উপড়ে ফেলা এবং হাত-পা বেঁধে ঝুলিয়ে পিটানো ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। সাবেক সেনাকর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (বহিষ্কৃত) আবদুল্লাহিল আমান আযমী কিংবা বারিস্টার আরমানদের মতো ভুক্তভোগীরা দীর্ঘ ৮-৯ বছর পর মুক্তি পেয়ে যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা কোনো সভ্য সমাজের গল্প নয়; তা যেন মধ্যযুগীয় কোনো হিংস্রতার নামান্তর।

গুমের সবচেয়ে করুণ দৃশ্য ফুটে ওঠে গুম হওয়া পরিবারগুলোর দৈনন্দিন জীবনে। একটি স্বাভাবিক মৃত্যু মানুষকে শোক সইবার শক্তি দেয়, কিন্তু গুম বা জোরপূর্বক নিখোঁজ হওয়া একটি পরিবারকে অনন্তকাল ধরে ঝুলন্ত যন্ত্রণার মধ্যে রাখে। মায়ের আর্তনাদের কোনো শেষ নেই। “আমার বাবা কি বেঁচে আছে, নাকি তাকে মেরে ফেলা হয়েছে?”—এই প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে কত শত মা চোখ বোজা পর্যন্ত দরজার দিকে তাকিয়ে থেকেছেন। অনেক মা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন সন্তানের মুখটি আর না দেখেই। ছোট্ট শিশুদের কান্না দেখলে পাষাণ হৃদয়ও কেঁপে ওঠে।

বহু শিশু রয়েছে, যারা যখন ছোট ছিল তখন তাদের বাবাকে তুলে নেওয়া হয়েছিল; আজ তারা বড় হয়েছে, কিন্তু বাবার ছায়া পায়নি।  ঈদের দিন বা জন্মদিনে অন্য শিশুরা যখন বাবার হাত ধরে ঘুরে বেড়ায়, তখন গুম হওয়া পরিবারের শিশুরা তাদের বাবার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে নীরবে অশ্রু বিসর্জন দেয়। গৃহবধূর অপেক্ষার প্রহর যেন শেষই হতে চায় না। স্বামী জীবিত না মৃত—এই নিশ্চিত তথ্য না থাকায় বহু নারী সামাজিকভাবে আইনি ও পারিবারিক চরম জটিলতায় পড়েছেন। তাদের এই দীর্ঘ নীরব কান্না রাষ্ট্রের প্রতিটি ইট-পাথরে আছড়ে পড়ে। ‘মায়ের ডাক’ নামক প্ল্যাটফর্মটি গত এক দশক ধরে এই কান্না ও দাবির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার তথ্যানুসারে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনামলে ৭০০ জনেরও বেশি মানুষকে জোরপূর্বক গুম করা হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে অন্তত ৬০০ জনের বেশি গুমের শিকার হয়েছেন।

এদের মধ্যে পরবর্তীতে অনেকের লাশ নদী বা রাস্তার পাশে পাওয়া গেছে, কাউকে কাউকে কয়েক মাস বা বছর পর গ্রেফতার দেখানো হয়েছে, কিন্তু একটি বড় অংশের কোনো খোঁজ আজও মেলেনি। একই সাথে মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত অন্তত ৭০৮ জন ব্যক্তি গুমের শিকার হন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ২০২১ সালে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ “He Didn’t Even Cry: Enforced Disappearances in Bangladesh” শীর্ষক ৮২ পৃষ্ঠার একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে সংস্থাটি উল্লেখ করে, তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার বিরোধী দলের নেতাকর্মী ও সমালোচকদের নিশ্চিহ্ন করতে গুমকে একটি পরিকল্পিত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে এবং তারা ৮৬টি সুনির্দিষ্ট গুমের ঘটনার বিস্তারিত তালিকা জাতিসংঘে জমা দিয়েছিল, যার সদুত্তর শেখ হাসিনার সরকার কখনোই দিতে পারেনি।

পাশাপাশি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানায় যে র‍্যাব এবং গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) সরাসরি এই গুমের সাথে জড়িত। এসবের ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র র‍্যাব এবং এর শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল এই গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যা।

বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু গুমের ঘটনা বিশ্ব বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল বিএনপি-র শীর্ষস্থানীয় নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য এম ইলিয়াস আলী এবং তার গাড়িচালক আনসার আলীকে ঢাকার বনানী থেকে গুম করা হয়, যাদের আজ পর্যন্ত কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

২০১০ সালের ২৫ জুন ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা চৌধুরী আলমকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়ার পর তিনি চিরতরে নিখোঁজ হন।

২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর ঢাকার শাহীনবাগ এলাকা থেকে ৮ জন যুবকের সাথে সাজেদুল ইসলাম সুমনকে তুলে নিয়ে যায় র‍্যাব-১; পরবর্তীতে সুমনের বোন সানজিদা ইসলাম তুলি ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক হিসেবে গুমবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।

২০১৯ সালের ৯ এপ্রিল ইউপিডিএফ নেতা মাইকেল চাকমাকে ঢাকা থেকে গুম করা হয় এবং তিনি ৫ বছরেরও বেশি সময় আয়নাঘরে বন্দী থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর মুক্ত হন।

একইভাবে ২০১৬ সালের আগস্টে নিজ নিজ বাসা থেকে তুলে নিয়ে ৮ বছর আয়নাঘরে বন্দী রাখার পর ২০২৪ সালের আগস্টে মুক্তি পান মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান ও আবদুল্লাহিল আমান আযমী।

আন্তর্জাতিক আইনে গুম একটি স্বতন্ত্র ও গুরুতর মানবতাবিরোধী অপরাধ। ২০০৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ‘International Convention for the Protection of All Persons from Enforced Disappearance’ বা ‘সব ব্যক্তির গুম হওয়া থেকে সুরক্ষার আন্তর্জাতিক সনদ’ গৃহীত হয়, যার মূল কথা হলো—কোনো অবস্থাতেই, যুদ্ধ বা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার বাহানাতেও কাউকে গুম করা যাবে না।

জাতিসংঘের ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এনফোর্সড অর ইনভলন্টারি ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সেস’ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের গুমের ঘটনাগুলো তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছিল। জাতিসংঘ বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ সরকারকে গুমের অভিযোগগুলো তদন্তের নিরপেক্ষ সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানালেও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার তা ধারাবাহিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে এসেছিল।

বিশ্বের উন্নত দেশসমূহ ও বিভিন্ন অঞ্চলে গুম প্রতিরোধে কঠোর আইনি অবকাঠামো রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানবাধিকার সনদ এবং ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের (ECHR) অধীনে গুমকে চরম মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ফ্রান্সে গুমের অপরাধের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং মারাত্মক শারীরিক ক্ষতির ক্ষেত্রে অপরাধীদের অত্যন্ত কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘Global Magnitsky Human Rights Accountability Act’-এর অধীনে আন্তর্জাতিকভাবে গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত যেকোনো দেশের কর্মকর্তাদের ওপর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, ভিসা নিষেধাজ্ঞা এবং আর্থিক অবরোধ আরোপ করা হয়।

অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নেপাল ২০১৭ সালে তাদের নতুন ক্রিমিনাল কোডে গুমকে একটি সুনির্দিষ্ট অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে, যেখানে গুমের অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ ১৫ বছরের কারাদণ্ড এবং জরিমানার বিধান রয়েছে।

শ্রীলঙ্কা ২০১৮ সালে জাতিসংঘের গুমবিরোধী সনদে অনুস্বাক্ষর করে এবং গুম প্রতিরোধ আইন পাস করে, যেখানে গুমের অপরাধে ২০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। তবে পাকিস্তান ও ভারতে গুমের ঘটনা ঘটলেও সেখানে গুমবিরোধী আলাদা ও পূর্ণাঙ্গ আইনের মারাত্মক অভাব রয়েছে, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল দীর্ঘদিন সোচ্চার।

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে এবং গঠিত হয় নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ডক্টর ইউনুসের নেতৃত্বাধীন সরকার গুমের বিচার ও এটি প্রতিরোধে অভূতপূর্ব ও দৃঢ় অঙ্গিকার প্রদর্শন করেছে। দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট জাতিসংঘের গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে অনুস্বাক্ষর করেছে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে গুম বন্ধের আইনি অঙ্গীকারে আবদ্ধ হলো।

বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারকে বাস্তব আইনে পরিণত করা। ২০২৫ সালে Enforced Disappearance Prevention and Redress Ordinance-এর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরে ২০২৬ সালের ৩ আগস্ট বর্তমান সরকার Enforced Disappearance Prevention and Redress Act, 2026-এর খসড়ায় অনুমোদন দেয়। সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য অনুযায়ী খসড়ায় enforced disappearance-কে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। তবে ভুক্তভোগীর মৃত্যু হলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত যাওয়ার বিধান এবং সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা জরিমানার প্রস্তাব রয়েছে; তদন্ত ও বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য সর্বোচ্চ ১২০ দিনের সময়সীমার কথাও বলা হয়েছে।

আমি মনে করি,এখানে সরকারের সামনে দুটি বিষয় সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, আইনটি দ্রুত কার্যকর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আইনটি যেন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ কঠোর শাস্তি থাকাই যথেষ্ট নয়; স্বাধীন তদন্ত, ন্যায়সংগত বিচার, কমান্ড রেসপনসিবিলিটি, সাক্ষী সুরক্ষা, ভুক্তভোগীর অধিকার এবং কার্যকর প্রতিকার—সবকিছুর সমন্বয় একান্ত প্রয়োজন।

পরিশেষে বলতে চাই,একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে গুমের মতো বিভীষিকার আর কখনো যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তার জন্য কেবল কমিশন গঠন বা সনদে স্বাক্ষরই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। জাতিসংঘের সনদের আলোকে বাংলাদেশের দণ্ডবিধিতে গুমকে একটি পৃথক, জামিনঅযোগ্য ও গুরুতর অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যেখানে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান থাকবে। ডিজিএফআই, র‍্যাব ও ডিবি-র মতো সংস্থাগুলোকে রাজনীতিকরণের হাত থেকে মুক্ত করতে হবে এবং কোনো গোয়েন্দা সংস্থা যেন সাধারণ নাগরিক বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে গোপনে তুলে নিয়ে আটক রাখার এখতিয়ার না পায়, তার জন্য আইনি তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি গুমের শিকার ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উপযুক্ত অর্থ ও সামাজিক ক্ষতিপূরণ প্রদানসহ গুম হওয়া ব্যক্তিদের রেখে যাওয়া সন্তানদের পড়াশোনা ও পরিবারের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে গুমের হুকুমদাতা থেকে শুরু করে সরাসরি বাস্তবায়নকারী—তা সে যত বড় প্রভাবশালী বা শীর্ষ কর্মকর্তা হোক না কেন—প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে দৃশ্যমান শাস্তি দিতে হবে। বিশ্ব গুম দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—রাষ্ট্রের কোনো নাগরিক আর কখনোই রাতের আঁধারে গুম হবে না, কোনো মায়ের কোল আর খালি হবে না, আর কোনো শিশুকে বাবার ছবির দিকে তাকিয়ে কাঁদতে হবে না। রাষ্ট্রকে তার বিবেকের কাছে সৎ হতে হবে; হারিয়ে যাওয়া প্রতিটি নামের হিসাব দিতে হবে এবং সুবিচার সুনিশ্চিত করতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

অনিবন্ধিত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে রুল জারি

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ৮:১০ অপরাহ্ণ
অনিবন্ধিত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে রুল জারি

সারাদেশে অনিবন্ধিত অবস্থায় থাকা ৩৩ হাজার ৬১৪টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কেন ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।

রোববার (৩০ আগস্ট)এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি আহমেদ সোহেল এবং বিচারপতি এস এম ইফতেখার উদ্দিন মাহমুদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব, গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালকসহ (ডিজি) সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের এ রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

আদালতে রিটকারীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মো. কাওসার হোসাইন।

পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে ৩৪ হাজার ৬১২টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে নিবন্ধন রয়েছে মাত্র ৯৯৮টির। অর্থাৎ বাকি ৩৩ হাজার ৬১৪টি বিদ্যালয়ই অনিবন্ধিত।’

কাওসার হোসাইন আরও বলেন, ‘দ্য রেজিস্ট্রেশন অব প্রাইভেট স্কুল অর্ডিন্যান্স-১৯৬২ অনুযায়ী, অনিবন্ধিত অবস্থায় কোনো বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনার সুযোগ নেই। এই আইনের ৩ ধারায় স্পষ্ট বলা আছে যে, নিবন্ধন ছাড়া স্কুল পরিচালনা করলে তা বন্ধ করে দেওয়া এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।’

আইনজীবী জানান, এই বিশাল সংখ্যক বিদ্যালয় অনিবন্ধিত থাকা সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে কোনো প্রতিকার না পাওয়ায় জনস্বার্থে এই রিট আবেদনটি করা হয়।

আদালত শুনানি শেষে বিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তাকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

ঋণের নামে সাড়ে ৫ হাজার কোটি উধাও, ভাঙছে সাদ-মুসা গ্রুপের অর্থজাল

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৫৯ অপরাহ্ণ
ঋণের নামে সাড়ে ৫ হাজার কোটি উধাও, ভাঙছে সাদ-মুসা গ্রুপের অর্থজাল

চট্টগ্রামের বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠী সাদ-মুসা গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যাংকঋণের নামে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তদন্তে নেমে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য পাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এখন পর্যন্ত সংস্থাটির অনুসন্ধানে দেশের ১২টি ব্যাংক থেকে ৫ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া ও অর্থ সরিয়ে নেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। অনুসন্ধান শেষ না হওয়ায় এই অঙ্ক আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা।

তবে ঘটনাটিকে শুধু একটি শিল্পগোষ্ঠীর ঋণখেলাপির ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। দুদকের অনুসন্ধান ও ইতোমধ্যে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর অভিযোগে যে পদ্ধতির কথা উঠে এসেছে, তাতে প্রশ্ন উঠছে ব্যাংকঋণ অনুমোদন ও তদারকির কাঠামো নিয়েও। এক প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেওয়ার পর তা অন্য প্রতিষ্ঠানে সরিয়ে দেওয়া, পুরনো ঋণ সমন্বয়, কাগুজে বিল-এলসির মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন এবং একই গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অর্থ ঘোরানোর অভিযোগ—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে একটি জটিল ঋণচক্রের চিত্র।

শুরু ১২০ কোটি থেকে, ঋণ ছাড়াল দুই হাজার কোটি
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে ন্যাশনাল ব্যাংকের সঙ্গে সাদ-মুসা গ্রুপের ব্যবসায়িক সম্পর্ক শুরু হয় ১২০ কোটি টাকার কম্পোজিট ঋণসীমার মাধ্যমে। কয়েক দফা বাড়িয়ে এই সীমা দাঁড়ায় ৯৫৯ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে সাদ-মুসা হোমটেক্স অ্যান্ড ক্লথিং লিমিটেডের নামে অনুমোদন করা হয় ৪১৫ কোটি টাকার চলতি মূলধন ঋণ। অভিযোগ রয়েছে, ঋণের একটি অংশ প্রকৃত ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার না করে অন্য প্রতিষ্ঠানের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। রেডিয়াম কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলসসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নামও অনুসন্ধানে এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে খোলা হিসাব ভুয়া বিল লেনদেনে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। দুদকের হিসাবে, সাদ-মুসা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও নামে-বেনামে ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে অনুমোদিত ঋণের পরিমাণ ২ হাজার ২৮১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাওনা ছিল ১ হাজার ১৮০ কোটি টাকার বেশি।

চারটি ঘটনায় উঠে আসছে একই কৌশল
সাদ-মুসা গ্রুপের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত যেসব মামলার তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে, সেগুলো পাশাপাশি রাখলে একটি অভিন্ন পদ্ধতির অভিযোগ দেখা যায়। ন্যাশনাল ব্যাংকের ৪৫৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা আত্মসাতের মামলায় অভিযোগ—ঋণের অর্থ অন্য কাজে ব্যবহার করা হয়েছে এবং ঋণ অনুমোদনের আগে গ্রাহকের সক্ষমতা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মোহাম্মদ মোহসিনসহ ২৯ জনের বিরুদ্ধে এ মামলা করা হয়। আসামিদের মধ্যে ব্যাংকের সাবেক পরিচালক ও কর্মকর্তারাও রয়েছেন। প্রাইম ব্যাংকের চট্টগ্রামের জুবিলি রোড শাখার ৪৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকার ঘটনায়ও অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা যাচাইয়ের ঘাটতি। ১০০ কোটি টাকার প্রকল্প ঋণের মধ্যে ৪৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০২৫ সালের মার্চে ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। পূবালী ব্যাংকের প্রায় ৯৫ কোটি টাকার ঘটনায় আবার সামনে এসেছে কাগুজে বিল ও লোকাল এলসির ব্যবহার। এমএ রহমান ডাইং ইন্ডাস্ট্রিজের নামে ঋণ নিয়ে ২৫টি লোকাল এলসির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মোহাম্মদ মোহসিন, তার স্ত্রী এবং ব্যাংকের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান আলাদা হলেও অভিযোগের কাঠামোতে মিল—ঋণ নেওয়া, অর্থের গতিপথ বদলানো এবং কাগুজে লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ সরিয়ে নেওয়া।

করোনার প্রণোদনার ৪০৪ কোটি নিয়েও অভিযোগ
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অধ্যায় করোনাকালীন প্রণোদনা ঋণ। ব্যবসা টিকিয়ে রাখা ও কর্মসংস্থান ধরে রাখতে সরকার যে বিশেষ প্যাকেজ দিয়েছিল, সাদ-মুসা গ্রুপ সেই অর্থেরও অপব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ দুদকের। ২০২৫ সালের মে মাসে ৪০৪ কোটি টাকা উত্তোলন, আত্মসাৎ ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে মোহাম্মদ মোহসিনসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এজাহার অনুযায়ী, ভুয়া কাগজপত্র ও অনুমোদনবিহীন প্রক্রিয়ায় ঋণ নেওয়া হয়। ব্যাংকের কর্মকর্তারা প্রকৃত আর্থিক প্রয়োজন যাচাই না করেই ঋণ অনুমোদন করেন বলে অভিযোগ। পরে অর্থ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর, ফ্লোর কেনা, পুরনো ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এখানেই প্রশ্নটি আরও বড়—যে অর্থ সংকটে থাকা প্রকৃত ব্যবসা ও শ্রমিকের কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখার জন্য দেওয়া হয়েছিল, সেটি যদি পুরনো দায় মেটানো বা অন্য কাজে চলে যায়, তাহলে প্রণোদনা ব্যবস্থার উদ্দেশ্য কতটা বাস্তবায়িত হলো?

ব্যাংকের ভেতরের ভূমিকা কতটা?
এই কেলেঙ্কারির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো—অভিযোগ শুধু ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে নয়। বিভিন্ন মামলায় ব্যাংকের পরিচালক ও কর্মকর্তাদেরও আসামি করা হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, বিপুল অঙ্কের ঋণ অনুমোদনের সময় গ্রাহকের প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসার নগদ প্রবাহ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও পারস্পরিক লেনদেন কতটা যাচাই করা হয়েছিল? একই গোষ্ঠীর একাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অর্থ স্থানান্তর হয়ে থাকলে ব্যাংকের নজরদারি ব্যবস্থায় তা শনাক্ত হওয়ার কথা। অথচ অভিযোগ অনুযায়ী, একই ধরনের লেনদেন বিভিন্ন পর্যায়ে চলেছে। এতে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং তদারকি কাঠামো নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

জামানত কতটা নিরাপদ?
বিএফআইইউর অনুসন্ধানেও সাদ-মুসা গ্রুপের ঋণের বিপরীতে থাকা সম্পদ, কারখানা ও শিল্পপার্কের জমি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় সাদ-মুসা শিল্পপার্কে প্রায় ২০০ বিঘা জমির কথা উঠে এলেও বিপুল ঋণের তুলনায় এসব সম্পদের জামানত মূল্য যথেষ্ট কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, ঋণ খেলাপি হলে কাগজে থাকা সম্পদ আর বাস্তবে দ্রুত উদ্ধারযোগ্য অর্থ—দুটি এক বিষয় নয়। সম্পদের প্রকৃত বাজারমূল্য, মালিকানা, দায় এবং আইনি জটিলতা ঋণ আদায়ের সময় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সাদ-মুসা গ্রুপের বাইরেও যে প্রশ্ন
দুদকের অনুসন্ধান এখনো শেষ হয়নি। ফলে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার এই অঙ্কই চূড়ান্ত নয়। আরও প্রতিষ্ঠান, আরও ঋণ এবং অর্থের আরও গতিপথ সামনে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এরই মধ্যে যে চিত্রটি স্পষ্ট, তা হলো—এটি শুধু একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ নয়; একই সঙ্গে এটি ব্যাংকিং খাতে ঋণ অনুমোদন, গ্রাহক যাচাই, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং ব্যাংক কর্মকর্তাদের জবাবদিহির বড় পরীক্ষাও। তদন্তে অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে সাদ-মুসা গ্রুপের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর ঋণ অনুমোদন ব্যবস্থার দুর্বলতাও নতুন করে সামনে আসবে। আর অর্থ উদ্ধার না হলে প্রশ্নটি আরও কঠিন হবে—সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার দায় শেষ পর্যন্ত বহন করবে কে? শেষ পর্যন্ত তাই সাদ-মুসা গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারির আসল গল্প শুধু ‘কত টাকা নেওয়া হয়েছে’ তা নয়; বরং কীভাবে এত টাকা নেওয়া সম্ভব হলো, কোথায় গেল সেই অর্থ এবং এতদিন তা ঠেকানো গেল না কেন—উত্তর খুঁজতে হবে এই তিন প্রশ্নের মধ্যেই।

কালের আলো/এম/এএইচ

বিইউপির পশ্চিম ক্যাম্পাসে নতুন দিগন্ত, নৈতিক মূল্যবোধে গুরুত্ব সেনাপ্রধানের

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
প্রকাশিত: রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৫৪ অপরাহ্ণ
বিইউপির পশ্চিম ক্যাম্পাসে নতুন দিগন্ত, নৈতিক মূল্যবোধে গুরুত্ব সেনাপ্রধানের

উচ্চশিক্ষার পরিসর আরও বিস্তৃত করতে এবং আধুনিক শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ তৈরিতে নতুন অবকাঠামো যুক্ত হলো বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)–এর পশ্চিম ক্যাম্পাসে। বিশ্ববিদ্যালয়টির পশ্চিম ক্যাম্পাসে নবনির্মিত ইউটিলিটি বিল্ডিং, ফ্যাকাল্টি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এফএসটি) টাওয়ার এবং ফ্যাকাল্টি অব আর্টস অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেস (এফএএসএস) টাওয়ার উদ্বোধন করেছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।

রোববার (৩০ আগস্ট) মিরপুর সেনানিবাসে আয়োজিত এ উদ্বোধনকে শুধু নতুন তিনটি ভবন চালুর আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিইউপির একাডেমিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ, গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আরও আধুনিক ও সমন্বিত শিক্ষা পরিবেশ তৈরির ধারাবাহিকতায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

একাডেমিক সম্প্রসারণে নতুন অবকাঠামো
বিইউপির পশ্চিম ক্যাম্পাসে নতুন তিন ভবনের সংযোজন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের পথও সুগম করবে। বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং কলা ও সামাজিক বিজ্ঞানের জন্য পৃথক টাওয়ার প্রতিষ্ঠা সংশ্লিষ্ট অনুষদগুলোর শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমকে আরও সংগঠিত করার সুযোগ তৈরি করবে। আধুনিক অবকাঠামোর সঙ্গে একাডেমিক কার্যক্রমের সমন্বয় ঘটাতে পারলে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষার পাশাপাশি গবেষণা, উদ্ভাবন ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়বে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

উদ্বোধনের পর ক্যাম্পাস পরিদর্শন
নবনির্মিত ভবনগুলোর উদ্বোধন শেষে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ক্যাম্পাসে একটি গাছের চারা রোপণ করেন। পরে তিনি বিইউপির পশ্চিম ক্যাম্পাস ও শিক্ষার্থীদের আবাসিক এলাকা ঘুরে দেখেন। ক্যাম্পাস পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আবাসন ও সামগ্রিক ক্যাম্পাস পরিবেশের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। একটি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে একাডেমিক অবকাঠামোর সঙ্গে আবাসিক সুবিধার সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শিক্ষা ও গবেষণার পাশাপাশি মূল্যবোধ
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান উচ্চশিক্ষার সাফল্যের একটি মৌলিক দিক সামনে আনেন। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত সাফল্য শুধু একাডেমিক উৎকর্ষে সীমাবদ্ধ নয়; নৈতিকতা, মূল্যবোধ, সততা ও দায়িত্ববোধসম্পন্ন মানবসম্পদ গড়ে তোলাই এর বড় অর্জন। তাঁর বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে নৈতিক মূল্যবোধের সমন্বয়ের বিষয়টিও। প্রযুক্তি ও জ্ঞাননির্ভর বিশ্বে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে শিক্ষার্থীদের দক্ষতার পাশাপাশি দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবেও গড়ে ওঠার প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি আধুনিক শিক্ষা পরিবেশ তৈরি, গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং দেশপ্রেমিক প্রজন্ম গঠনে বিইউপির ভূমিকার প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তরোত্তর সাফল্য ও সমৃদ্ধি কামনা করেন।

বই প্রকাশ ও ১৪ দলকে সম্মাননা
অনুষ্ঠানে বিইউপি উপাচার্য মেজর জেনারেল মো. মাহবুব-উল আলমের লেখা ‘এডুকেশন মাইন্ডস; এওকেনিং কনসাইন্স’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন সেনাপ্রধান। এরপর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জনকারী বিইউপির ১৪টি শিক্ষার্থী দলকে পুরস্কৃত করা হয়। শিক্ষার্থীদের এসব অর্জন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি সহশিক্ষা, প্রতিযোগিতা ও নেতৃত্ব বিকাশে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের চিত্রও তুলে ধরে।

‘শুধু ভবন নয়, মানুষ তৈরি করতে হবে’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মূল পর্ব অনুষ্ঠিত হয় বিইউপির স্বাধীনতা মিলনায়তনে। স্বাগত বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মেজর জেনারেল মো. মাহবুব-উল আলম শিক্ষা ও গবেষণায় বিইউপির অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো, গবেষণার পরিধি সম্প্রসারণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে বিইউপি কাজ করে যাচ্ছে। আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

অবকাঠামো থেকে সক্ষমতায় রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ
বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নতুন ভবন নির্মাণ নিঃসন্দেহে সক্ষমতা বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তবে এর প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে এসব অবকাঠামো কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর। শুধু আধুনিক শ্রেণিকক্ষ বা গবেষণাগার থাকলেই বিশ্বমানের শিক্ষা নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন যোগ্য শিক্ষক, পর্যাপ্ত গবেষণা বরাদ্দ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, উদ্ভাবনবান্ধব পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বাস্তবমুখী গবেষণার সুযোগ। নতুন অবকাঠামোর সঙ্গে এসব বিষয় সমান্তরালে এগিয়ে নিতে পারলে বিইউপির একাডেমিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ভবিষ্যতের বিইউপির ভিত্তি
বিইউপির পশ্চিম ক্যাম্পাসে নতুন তিন ভবনের উদ্বোধন তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সম্প্রসারণের পাশাপাশি একটি বৃহত্তর একাডেমিক লক্ষ্যকেও সামনে আনে। শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি, সৃজনশীলতা এবং নৈতিক মূল্যবোধ—এই পাঁচটি ক্ষেত্রের সমন্বিত বিকাশই ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে।

অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনীর কোয়ার্টারমাস্টার জেনারেল (কিউএমজি) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ শাহীনুল হক, ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের কমান্ড্যান্ট লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ ফয়জুর রহমান, বিইউপি সিনেটের সদস্য, সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, বিইউপির সাবেক উপাচার্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। নতুন ভবনগুলো এখন বিইউপির জন্য শুধু অবকাঠামো নয়—এসব স্থাপনা কতটা কার্যকরভাবে জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণা ও মূল্যবোধসম্পন্ন নেতৃত্ব তৈরির কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে, সেটিই হবে পরবর্তী সময়ের বড় পরীক্ষা, এমনটিই মনে করেন বিশ্লেষকরা।

কালের আলো/এমএএএমকে