খুঁজুন
                               
, ,
           

সংস্কৃতির স্বাধীনতায় উগ্রবাদ কাম্য নয়

আহসান হাবিব বরুন:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ৯:৩৬ অপরাহ্ণ
সংস্কৃতির স্বাধীনতায় উগ্রবাদ কাম্য নয়

আবহমানকাল ধরে বাংলাদেশ একটি বৈচিত্র্যময়, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক চর্চার দেশ হিসেবে বিশ্ব দরবারে পরিচিত। উদার ও মধ্যপন্থি মুসলিমপ্রধান দেশ হিসেবে এই ভূখণ্ডে ধর্মীয় গোড়ামি, পরমতঅসহিষ্ণুতা কিংবা উগ্রতার স্থান কখনো স্থায়ী হতে পারেনি। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যে ভয়ের ছায়া এবং অনিশ্চয়তা দানা বেঁধে উঠেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও গভীর চিন্তার বিষয়।

এখানে আমি অত্যন্ত দ্বিধাহীন চিত্তে বলতে পারি যে,বাংলাদেশকে বুঝতে হলে শুধু তার রাজনীতি, অর্থনীতি কিংবা ভূগোলের দিকে তাকালে হবে না; শুনতে হবে তার মানুষের গান, দেখতে হবে তার লোকজ উৎসব, অনুভব করতে হবে তার মাটির গন্ধ। এই দেশের নদীর স্রোতের সঙ্গে ভেসে এসেছে ভাটিয়ালির সুর, গ্রামবাংলার উঠোনে জন্ম নিয়েছে জারি-সারি ও পালাগান, বাউলের একতারায় ধ্বনিত হয়েছে মানুষের অন্তর্গত মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। মসজিদের মিনার থেকে আজানের ধ্বনি যেমন এ দেশের আকাশে মিশে আছে, তেমনি কোনো গ্রামীণ মেলায় বাঁশির সুর, কোনো মঞ্চে নাটকের সংলাপ কিংবা কোনো শিল্পীর কণ্ঠে গানও এ দেশের মানুষের জীবন ও অনুভূতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বহুত্বই বাংলাদেশের সৌন্দর্য, এই সহাবস্থানই আমাদের সভ্যতার শক্তি।

আবহমানকাল ধরে বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিচর্চার বিশ্বজোড়া সুনাম রয়েছে। এই দেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ ধর্মীয় সংকীর্ণতার দেশ। বরং বাংলাদেশের ঐতিহ্য হলো ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক সহনশীলতার সহাবস্থান। একজন মানুষ একই সঙ্গে ধর্মপ্রাণ হতে পারেন এবং সাহিত্য, সংগীত, নাটক, চলচ্চিত্র কিংবা লোকসংস্কৃতির অনুরাগী হতে পারেন। ধর্মীয় চেতনা ও সুস্থ সংস্কৃতিচর্চাকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ বানানো তাই আমার কাছে কেবল অপ্রয়োজনীয় নয়, বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বাস্তবতারও পরিপন্থী।

তবে এখানে আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই—সংস্কৃতির নামে কোনো অপসংস্কৃতি, অশালীনতা, উসকানি কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করার প্রশ্নই আসে না। আইন ভঙ্গ হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সত্যিই আপত্তিকর বা বেআইনি কিছু থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা পরীক্ষা করবে, প্রয়োজন হলে শর্ত আরোপ করবে, এমনকি আইনগত ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু কোনো গোষ্ঠী আপত্তি তুললেই একটি অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হবে—এটি কোনো গণতান্ত্রিক, সহনশীল ও আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্রের নীতি হতে পারে না।

উল্লেখ্য ১৯ আগস্ট কিশোরগঞ্জ শহরের পুরাতন স্টেডিয়ামে ব্যান্ড অ্যাশেজ ও সংগীতশিল্পী নোবেলের কনসার্ট হওয়ার কথা ছিল। স্থানীয় ইমাম-ওলামা পরিষদের আপত্তির পর জেলা প্রশাসন অনুষ্ঠানটির অনুমতি বাতিল করে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য ধর্মীয় আপত্তির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং আয়োজক প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধনসংক্রান্ত প্রশ্নের কথাও বলা হয়েছে। প্রশাসনের এসব যুক্তি যদি বাস্তব ও আইনসম্মত হয়, সেগুলোর যথাযথ তদন্ত হওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও নিশ্চিত করতে হবে—কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক চাপ যেন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মূল নিয়ামক হয়ে না দাঁড়ায়।

আজ কনসার্ট। কাল নাটক। পরশু সিনেমা। তার পরদিন বাউলগান। এরপর হয়তো লোকসংগীত, কবিগান কিংবা নৌকাবাইচ। প্রতিটি ক্ষেত্রেই যদি কোনো একটি গোষ্ঠীর আপত্তিকে অনুষ্ঠান বন্ধের যথেষ্ট কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে একসময় প্রশ্ন উঠবে—বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জীবনের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষমতা আসলে কার হাতে? রাষ্ট্রের হাতে, নাকি রাস্তায় সংগঠিত চাপের হাতে? এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

১৮ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলা পুলিশের আয়োজিত একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ বিষয়টি কেবল কোনো বেসরকারি আয়োজকের সমস্যা নয়; রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও যদি নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়ে, তাহলে সেটি আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্যও সতর্কবার্তা।

আরও উদ্বেগের বিষয়, শহুরে কনসার্টের বাইরেও গ্রামবাংলার লোকসংস্কৃতি নানা চাপের মুখে পড়ছে। সিলেটের বিশ্বনাথে ইব্রাহিম শাহের মাজারসংলগ্ন বাউলগানের আসরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় বাদ্যযন্ত্র, শব্দযন্ত্র ও চেয়ার ভাঙচুরের খবর এসেছে। নেত্রকোনার মদনেও বাউলগানের আয়োজন বন্ধের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন বলে উড়িয়ে দিলে ভুল হবে।

কারণ বাউল শুধু গান নয়। বাউল বাংলার আত্মপরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশের বাউলগান ২০০৮ সালে ইউনেসকোর মানবজাতির অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বশীল তালিকায় স্থান পেয়েছে। অর্থাৎ যে ঐতিহ্যকে বিশ্ব সংরক্ষণের যোগ্য মনে করছে, সেই ঐতিহ্য যদি নিজের দেশেই ভয় ও বাধার মুখে পড়ে, তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য লজ্জার এবং আত্মসমালোচনার বিষয়।

সাম্প্রতিক সময়ে ‘তৌহিদী জনতা’, ‘ইমাম-ওলামা পরিষদ’সহ বিভিন্ন ব্যানারে সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধের দাবি ওঠার ঘটনাও উদ্বেগ তৈরি করেছে। জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে গত ১৫ মাসে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে অন্তত ১১টি সাংস্কৃতিক আয়োজনে বাধা এবং ধর্মীয় কটূক্তির অভিযোগে আরও ৩৬টি আয়োজন বাধাগ্রস্ত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। এসব অভিযোগের প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি বলে আমি মনে করছি।

কারণ সংস্কৃতির ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত সবসময় মঞ্চ ভেঙে আসে না। অনেক সময় শুধু ভয় তৈরি করাই যথেষ্ট।

একজন আয়োজক যদি ভাবেন যে,অনুষ্ঠান করলে ঝামেলা হতে পারে। একজন শিল্পী যদি ভাবেন—দূরের জেলায় গিয়ে গান করা নিরাপদ তো? একজন হলমালিক যদি ভাবেন—অনুষ্ঠান বন্ধ হলে ক্ষতির দায় কে নেবে? আর প্রশাসনৎ যদি  ভাবে—অনুষ্ঠান করতে দিলে সংঘর্ষ হতে পারে। এভাবে কেউ কাউকে সরাসরি নিষেধ না করেও একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশকে ভীত ও সংকুচিত করে ফেলা যায়।

একসময় দেখা যাবে, অনুষ্ঠান করার অনুমতি থাকলেও কেউ আয়োজন করতে চাইছেন না। মঞ্চ আছে, কিন্তু শিল্পী নেই। দর্শক আছে, কিন্তু অনুষ্ঠান নেই। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আছে, কিন্তু তাদের কার্যক্রম সীমিত। তখন হয়তো কোনো পোস্টার ছিঁড়তে হবে না, কোনো মঞ্চ ভাঙতে হবে না—ভয়ই সংস্কৃতিকে ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকিয়ে দেবে। সুতরাং এই ভয়ের সংস্কৃতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

একটি সিনেমা ভালো না লাগলে সেটি না দেখার অধিকার আমার আছে। কিন্তু অন্য একজনের সেটি দেখার অধিকারও আছে। কোনো গান আমার পছন্দ না হলে আমি সেটি শুনব না; কিন্তু অন্যের গান শোনার অধিকার কেড়ে নেওয়ার অধিকার আমার নেই। অর্থাৎ ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং সহাবস্থান নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

অন্যদিকে ধর্মীয় মূল্যবোধের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ধর্মীয় অনুভূতিকে সম্মান করতে হবে। ইচ্ছাকৃত অবমাননা বা উসকানিকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। কিন্তু ধর্মীয় অনুভূতির নাম করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কিংবা অন্যের বৈধ অধিকার কেড়ে নেওয়ার সুযোগও দেওয়া যাবে না।

কারণ রাষ্ট্রের কাজ হলো অধিকারগুলোর মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা—কোনো একটি গোষ্ঠীর হাতে ভেটো ক্ষমতা তুলে দেওয়া নয়।

এখানে আমাদের রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জঙ্গিবাদ, উগ্রবাদ ও ধর্মীয় নিরাপত্তা-আতঙ্কের বয়ান বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। শেখ হাসিনার দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক বিরোধিতার নানা প্রশ্নের পাশাপাশি জঙ্গিবাদবিরোধী বয়ানও ছিল রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আজ যারা বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে নানা ধরনের নেতিবাচক বয়ান প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাদের হাতে নতুন করে কোনো অজুহাত তুলে দেওয়া আমাদের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।

বিশেষ করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের বয়ান যখন প্রতিবেশী ভারতসহ বিভিন্ন মহলে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে, তখন আমাদের আরও সতর্ক হওয়া দরকার। বাংলাদেশকে প্রমাণ করতে হবে—এই দেশ ধর্মপ্রাণ, কিন্তু উগ্র নয়; মূল্যবোধসম্পন্ন, কিন্তু অসহিষ্ণু নয়; মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু বহুত্ববাদবিরোধী নয়।

আর সেই বাস্তবতা প্রমাণ করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আইনের শাসন। বর্তমানে একটি নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। বিএনপি একটি উদার ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক ঐতিহ্যের কথা বলে। অতএব সেই সরকারের আমলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে ঘিরে যদি একের পর এক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তাহলে সেটি সরকারের জন্যও সুখকর কোনো বার্তা নয়। সরকারকে তাই বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

কেউ যদি শান্তিপূর্ণভাবে আপত্তি জানান, রাষ্ট্র তার কথা শুনবে। প্রয়োজন হলে আয়োজকদের সঙ্গে আলোচনা হবে। অনুষ্ঠানস্থলের নিরাপত্তা, শব্দের মাত্রা, সময়সূচি, জনদুর্ভোগ, শালীনতা কিংবা আইনগত শর্ত—সবকিছু নিশ্চিত করা যাবে। কিন্তু কেউ যদি হামলা, ভাঙচুর, ভয়ভীতি বা জবরদস্তির মাধ্যমে অনুষ্ঠান বন্ধ করতে চায়, সেখানে রাষ্ট্রকে আপসহীন হতে হবে।

এখানে আমি মনে করি,সংস্কৃতি বিরোধী শক্তিকে দমন করার অর্থ কোনো ধর্মীয় মতকে দমন করা নয়; বরং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাকে দমন করা। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশকে পিছিয়ে নেওয়ার কোনো প্রচেষ্টা সফল হতে দেওয়া যাবে না। পৃথিবী যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, সৃজনশীল অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক কূটনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন আমরা যদি গান, নাটক, সিনেমা কিংবা লোকসংস্কৃতির আয়োজন নিয়েই ভয় পেতে শুরু করি, তাহলে সেটি আত্মবিশ্বাসের সংকট ছাড়া আর কিছু নয়।

এখানে সৌদি আরবের পরিবর্তনের কথাও স্মরণ করা যেতে পারে। ইসলামি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই দেশ ভিশন ২০৩০-এর অধীনে বিনোদন ও সংস্কৃতিকে নতুনভাবে বিকশিত করছে। ২০১৮ সালে কয়েক দশকের বিরতির পর দেশটিতে সিনেমা হল পুনরায় চালু হয়েছে; কনসার্ট ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানও এখন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশ। এর অর্থ এই নয় যে সৌদি আরবের সংস্কৃতিনীতি বাংলাদেশকে হুবহু অনুসরণ করতে হবে। আমি বলতে চাইছি যে—ধর্মীয় পরিচয় ও আধুনিক সাংস্কৃতিক জীবনের মধ্যে সমন্বয় অসম্ভব কোনো বিষয় নয়।

আমরা চাই ধর্মীয় মূল্যবোধ অটুট থাকুক। চাই মসজিদ-মাদ্রাসা, ইসলামি শিক্ষা ও ধর্মীয় অনুশীলন আরও শক্তিশালী হোক। একই সঙ্গে চাই নাট্যমঞ্চ প্রাণবন্ত থাকুক, সিনেমা হল সচল থাকুক, বাউল তার একতারা হাতে গান গাইতে পারেন, তরুণেরা সুস্থ সংগীতচর্চা করতে পারেন, সাহিত্য ও শিল্পচর্চা বিকশিত হোক। এই দুইয়ের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি করার কোনো প্রয়োজন নেই।

বরং সুস্থ সংস্কৃতি তরুণ সমাজকে সৃজনশীল করে। চিন্তা করতে শেখায়। মাদক, অপরাধ ও অন্ধ উগ্রতার বিপরীতে একটি ইতিবাচক সামাজিক পরিসর তৈরি করে। ফলে সংস্কৃতির পথ বন্ধ করা কোনোভাবেই সমাজের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করে না।

এখন সময় এসেছে সরকারকে একটি সুস্পষ্ট নীতি ঘোষণা করার—আইনসম্মত কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কেবল কোনো গোষ্ঠীর আপত্তির কারণে বন্ধ করা যাবে না।

একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেরও দায়িত্ব রয়েছে। আয়োজকদের আইন মেনে চলতে হবে। শিল্পীদেরও দায়িত্বশীল থাকতে হবে। ধর্মীয় অনুভূতি, সামাজিক সংবেদনশীলতা ও জনশৃঙ্খলার বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে দায়িত্বহীনতার স্বাধীনতা নয়।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে,বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি শুধু পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা তৈরি পোশাক শিল্প দিয়ে তৈরি হয় না। একটি দেশের মানুষের মনন, সহনশীলতা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতাও তার পরিচয়ের অংশ। সুতরাং মঞ্চ বন্ধের প্রতিটি ঘটনা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ভাবমূর্তির সঙ্গেই সম্পর্কিত।

আমরা এমন বাংলাদেশ চাই না, যেখানে শিল্পী মঞ্চে ওঠার আগে ভয় পাবেন।  আমরা এমন বাংলাদেশও চাই না, যেখানে ধর্মের নাম করে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সাহস পাবে। বরঞ্চ আমরা চাই এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে ধর্ম থাকবে হৃদয়ে, সংস্কৃতি থাকবে জীবনে, আর আইন থাকবে রাষ্ট্রের হাতে।

পরিশেষে বলতে চাই,বাংলাদেশে উগ্রবাদের কোনো  ঠাঁই নেই। রাষ্ট্রকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে—কোনো গোষ্ঠী বা স্বার্থান্বেষী দল যেন আইন নিজের হাতে তুলে নিতে না পারে। শিল্প ও সংস্কৃতির অবাধ পথচলা রোধ করা হলে তরুণ সমাজ পথভ্রষ্ট হবে এবং দেশীয় ভাবমূর্তি বিশ্বজুড়ে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে। স্বাধীন ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে আর কোনো সাংস্কৃতিক মঞ্চ যেন ভীতি ও হুমকির মুখে বন্ধ না হয়—সরকার ও প্রশাসনকে অবিলম্বে সেই কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে পতিত-পলাতক স্বৈরাচার ও তাদের আশ্রয়দাতাদের সেই পুরনো উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদের বয়ানই নতুন প্রাণ লাভ করবে। যা শান্তি কামি কোনো দেশপ্রেমিক মানুষের কাম্য হতে পারে না। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সবাইকে সহিহ বুঝ নসিব করুন।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

‘বিদেশে কিছু পেলে শুধু ১০% দিয়েন’—দুদকের অভিযোগে আসিফ মাহমুদ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:৩৯ অপরাহ্ণ
‘বিদেশে কিছু পেলে শুধু ১০% দিয়েন’—দুদকের অভিযোগে আসিফ মাহমুদ

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে বিদেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারসহ দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

এ ছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এবং ঢাকা ওয়াসা, এলজিইডি ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনে কর্মকর্তা নিয়োগে মোট ১৮৭ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগও করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।

দুদকের অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ৩৬ জন জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়নে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও টেন্ডারে কমিশন নেওয়া এবং নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে।

রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) এসব অভিযোগের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশের পর নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আসিফ মাহমুদ।

এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘অনুসন্ধানে বিদেশে কিছু পেলে আমাকে শুধু ১০% দিয়েন, চলতে কষ্ট হচ্ছে।’

তার এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে দুদকের অভিযোগকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি 

বন্ধ ইউনিট চালু, জাতীয় গ্রিডে ফিরছে আদানির বিদ্যুৎ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:৩০ অপরাহ্ণ
বন্ধ ইউনিট চালু, জাতীয় গ্রিডে ফিরছে আদানির বিদ্যুৎ

কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিট ফের সচল হয়েছে। ফলে কেন্দ্রটির দুটি ইউনিট থেকেই বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়েছে।

রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুপুর ২টার দিকে গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে ৭৫৬ মেগাওয়াট এবং দ্বিতীয় ইউনিট থেকে ২৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশে সরবরাহ করা হয়। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ধীরে ধীরে দ্বিতীয় ইউনিটের উৎপাদন বাড়িয়ে প্রায় ৭৫০ মেগাওয়াটে নেওয়া হবে।

গত ৯ সেপ্টেম্বর রাত ১২টার দিকে কারিগরি ত্রুটির কারণে কেন্দ্রটির একটি ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে দুটি ইউনিট থেকে বাংলাদেশে ঘণ্টায় এক হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছিল। একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার পর সরবরাহ কমে প্রায় ৭৫৮ মেগাওয়াটে নেমে আসে।

এর আগে কয়লা সরবরাহ সংকটের কারণেও গোড্ডা কেন্দ্রটির উৎপাদন কমে গিয়েছিল। গত ৭ আগস্ট ঝড়ের কারণে কয়লা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। পরে আগস্টের শেষ দিকে কয়লা সরবরাহ বাড়লে কেন্দ্রটির বিদ্যুৎ উৎপাদনও বাড়তে শুরু করে।

দিনের বেলায় কেন্দ্রটি প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করছিল। একটি ইউনিট বন্ধ থাকায় ওই সময় দেশের বিদ্যুৎব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছিল।

১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৮০০ মেগাওয়াট করে দুটি ইউনিট রয়েছে। ২০১৭ সালে কেন্দ্রটির সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। চাহিদা অনুযায়ী কেন্দ্রটি থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহের রেকর্ড রয়েছে।

বর্তমানে দেশে ১৬ থেকে ১৭ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে পিডিবি প্রায় ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে। গোড্ডা কেন্দ্রের বন্ধ ইউনিট ফের চালু হওয়ায় জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কিছুটা কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

যোগ্যতা ও সমতার ভিত্তিতে সব নাগরিকের সুযোগ নিশ্চিত করতে চাই: রাষ্ট্রপতি

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:২২ অপরাহ্ণ
যোগ্যতা ও সমতার ভিত্তিতে সব নাগরিকের সুযোগ নিশ্চিত করতে চাই: রাষ্ট্রপতি

দেশে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত হলে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব সম্প্রদায়ের মানুষের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত হবে বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বঙ্গভবনে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর ও সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মার নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এ কথা বলেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশকে উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে এগিয়ে নিতে গণতন্ত্রের নিয়মিত চর্চা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা জরুরি। দেশের মানুষ একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চায়।

তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ দুর্বল হলে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অধিকার সুরক্ষিত রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

সাক্ষাৎকালে পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করায় হিন্দু সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান। একই সঙ্গে জন্মাষ্টমী ও রথযাত্রাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপনে সরকারের সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানান তিনি।

হিন্দু সম্প্রদায়ের কল্যাণে সরকারের বিভিন্ন সহায়তা, পুরোহিত ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য সম্মানী কর্মসূচিসহ বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন সন্তোষ শর্মা। এসব পদক্ষেপে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সন্তুষ্টির বিষয়টি তিনি রাষ্ট্রপতিকে জানান।

এ সময় পরিষদের নেতারা হিন্দু সম্প্রদায়সহ সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের নাগরিকদের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও সমান অধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

প্রতিনিধিদল আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের পূজামণ্ডপে উপস্থিত হয়ে ভক্ত ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্য রাষ্ট্রপতিকে আমন্ত্রণ জানায়। রাষ্ট্রপতি সাদরে আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন এবং প্রতিনিধিদলকে ধন্যবাদ জানান।

রাষ্ট্রপতি বলেন, বর্তমান সরকার সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং যোগ্যতা, ন্যায়সঙ্গত অধিকার ও সমতার ভিত্তিতে সব নাগরিকের জন্য ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ।

তিনি হিন্দু সম্প্রদায়সহ দেশের সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

রাষ্ট্রপতি আশা প্রকাশ করেন, আসন্ন দুর্গাপূজা উৎসবমুখর, শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে শারদীয় দুর্গোৎসব দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করবে বলেও আশা প্রকাশ করেন।

সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি