খুঁজুন
                               
, ,
           

সংস্কৃতির স্বাধীনতায় উগ্রবাদ কাম্য নয়

আহসান হাবিব বরুন:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ৯:৩৬ অপরাহ্ণ
সংস্কৃতির স্বাধীনতায় উগ্রবাদ কাম্য নয়

আবহমানকাল ধরে বাংলাদেশ একটি বৈচিত্র্যময়, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক চর্চার দেশ হিসেবে বিশ্ব দরবারে পরিচিত। উদার ও মধ্যপন্থি মুসলিমপ্রধান দেশ হিসেবে এই ভূখণ্ডে ধর্মীয় গোড়ামি, পরমতঅসহিষ্ণুতা কিংবা উগ্রতার স্থান কখনো স্থায়ী হতে পারেনি। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যে ভয়ের ছায়া এবং অনিশ্চয়তা দানা বেঁধে উঠেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও গভীর চিন্তার বিষয়।

এখানে আমি অত্যন্ত দ্বিধাহীন চিত্তে বলতে পারি যে,বাংলাদেশকে বুঝতে হলে শুধু তার রাজনীতি, অর্থনীতি কিংবা ভূগোলের দিকে তাকালে হবে না; শুনতে হবে তার মানুষের গান, দেখতে হবে তার লোকজ উৎসব, অনুভব করতে হবে তার মাটির গন্ধ। এই দেশের নদীর স্রোতের সঙ্গে ভেসে এসেছে ভাটিয়ালির সুর, গ্রামবাংলার উঠোনে জন্ম নিয়েছে জারি-সারি ও পালাগান, বাউলের একতারায় ধ্বনিত হয়েছে মানুষের অন্তর্গত মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। মসজিদের মিনার থেকে আজানের ধ্বনি যেমন এ দেশের আকাশে মিশে আছে, তেমনি কোনো গ্রামীণ মেলায় বাঁশির সুর, কোনো মঞ্চে নাটকের সংলাপ কিংবা কোনো শিল্পীর কণ্ঠে গানও এ দেশের মানুষের জীবন ও অনুভূতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বহুত্বই বাংলাদেশের সৌন্দর্য, এই সহাবস্থানই আমাদের সভ্যতার শক্তি।

আবহমানকাল ধরে বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিচর্চার বিশ্বজোড়া সুনাম রয়েছে। এই দেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ ধর্মীয় সংকীর্ণতার দেশ। বরং বাংলাদেশের ঐতিহ্য হলো ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক সহনশীলতার সহাবস্থান। একজন মানুষ একই সঙ্গে ধর্মপ্রাণ হতে পারেন এবং সাহিত্য, সংগীত, নাটক, চলচ্চিত্র কিংবা লোকসংস্কৃতির অনুরাগী হতে পারেন। ধর্মীয় চেতনা ও সুস্থ সংস্কৃতিচর্চাকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ বানানো তাই আমার কাছে কেবল অপ্রয়োজনীয় নয়, বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বাস্তবতারও পরিপন্থী।

তবে এখানে আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই—সংস্কৃতির নামে কোনো অপসংস্কৃতি, অশালীনতা, উসকানি কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করার প্রশ্নই আসে না। আইন ভঙ্গ হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সত্যিই আপত্তিকর বা বেআইনি কিছু থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা পরীক্ষা করবে, প্রয়োজন হলে শর্ত আরোপ করবে, এমনকি আইনগত ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু কোনো গোষ্ঠী আপত্তি তুললেই একটি অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হবে—এটি কোনো গণতান্ত্রিক, সহনশীল ও আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্রের নীতি হতে পারে না।

উল্লেখ্য ১৯ আগস্ট কিশোরগঞ্জ শহরের পুরাতন স্টেডিয়ামে ব্যান্ড অ্যাশেজ ও সংগীতশিল্পী নোবেলের কনসার্ট হওয়ার কথা ছিল। স্থানীয় ইমাম-ওলামা পরিষদের আপত্তির পর জেলা প্রশাসন অনুষ্ঠানটির অনুমতি বাতিল করে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য ধর্মীয় আপত্তির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং আয়োজক প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধনসংক্রান্ত প্রশ্নের কথাও বলা হয়েছে। প্রশাসনের এসব যুক্তি যদি বাস্তব ও আইনসম্মত হয়, সেগুলোর যথাযথ তদন্ত হওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও নিশ্চিত করতে হবে—কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক চাপ যেন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মূল নিয়ামক হয়ে না দাঁড়ায়।

আজ কনসার্ট। কাল নাটক। পরশু সিনেমা। তার পরদিন বাউলগান। এরপর হয়তো লোকসংগীত, কবিগান কিংবা নৌকাবাইচ। প্রতিটি ক্ষেত্রেই যদি কোনো একটি গোষ্ঠীর আপত্তিকে অনুষ্ঠান বন্ধের যথেষ্ট কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে একসময় প্রশ্ন উঠবে—বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জীবনের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষমতা আসলে কার হাতে? রাষ্ট্রের হাতে, নাকি রাস্তায় সংগঠিত চাপের হাতে? এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

১৮ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলা পুলিশের আয়োজিত একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ বিষয়টি কেবল কোনো বেসরকারি আয়োজকের সমস্যা নয়; রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও যদি নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়ে, তাহলে সেটি আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্যও সতর্কবার্তা।

আরও উদ্বেগের বিষয়, শহুরে কনসার্টের বাইরেও গ্রামবাংলার লোকসংস্কৃতি নানা চাপের মুখে পড়ছে। সিলেটের বিশ্বনাথে ইব্রাহিম শাহের মাজারসংলগ্ন বাউলগানের আসরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় বাদ্যযন্ত্র, শব্দযন্ত্র ও চেয়ার ভাঙচুরের খবর এসেছে। নেত্রকোনার মদনেও বাউলগানের আয়োজন বন্ধের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন বলে উড়িয়ে দিলে ভুল হবে।

কারণ বাউল শুধু গান নয়। বাউল বাংলার আত্মপরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশের বাউলগান ২০০৮ সালে ইউনেসকোর মানবজাতির অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বশীল তালিকায় স্থান পেয়েছে। অর্থাৎ যে ঐতিহ্যকে বিশ্ব সংরক্ষণের যোগ্য মনে করছে, সেই ঐতিহ্য যদি নিজের দেশেই ভয় ও বাধার মুখে পড়ে, তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য লজ্জার এবং আত্মসমালোচনার বিষয়।

সাম্প্রতিক সময়ে ‘তৌহিদী জনতা’, ‘ইমাম-ওলামা পরিষদ’সহ বিভিন্ন ব্যানারে সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধের দাবি ওঠার ঘটনাও উদ্বেগ তৈরি করেছে। জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে গত ১৫ মাসে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে অন্তত ১১টি সাংস্কৃতিক আয়োজনে বাধা এবং ধর্মীয় কটূক্তির অভিযোগে আরও ৩৬টি আয়োজন বাধাগ্রস্ত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। এসব অভিযোগের প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি বলে আমি মনে করছি।

কারণ সংস্কৃতির ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত সবসময় মঞ্চ ভেঙে আসে না। অনেক সময় শুধু ভয় তৈরি করাই যথেষ্ট।

একজন আয়োজক যদি ভাবেন যে,অনুষ্ঠান করলে ঝামেলা হতে পারে। একজন শিল্পী যদি ভাবেন—দূরের জেলায় গিয়ে গান করা নিরাপদ তো? একজন হলমালিক যদি ভাবেন—অনুষ্ঠান বন্ধ হলে ক্ষতির দায় কে নেবে? আর প্রশাসনৎ যদি  ভাবে—অনুষ্ঠান করতে দিলে সংঘর্ষ হতে পারে। এভাবে কেউ কাউকে সরাসরি নিষেধ না করেও একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশকে ভীত ও সংকুচিত করে ফেলা যায়।

একসময় দেখা যাবে, অনুষ্ঠান করার অনুমতি থাকলেও কেউ আয়োজন করতে চাইছেন না। মঞ্চ আছে, কিন্তু শিল্পী নেই। দর্শক আছে, কিন্তু অনুষ্ঠান নেই। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আছে, কিন্তু তাদের কার্যক্রম সীমিত। তখন হয়তো কোনো পোস্টার ছিঁড়তে হবে না, কোনো মঞ্চ ভাঙতে হবে না—ভয়ই সংস্কৃতিকে ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকিয়ে দেবে। সুতরাং এই ভয়ের সংস্কৃতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

একটি সিনেমা ভালো না লাগলে সেটি না দেখার অধিকার আমার আছে। কিন্তু অন্য একজনের সেটি দেখার অধিকারও আছে। কোনো গান আমার পছন্দ না হলে আমি সেটি শুনব না; কিন্তু অন্যের গান শোনার অধিকার কেড়ে নেওয়ার অধিকার আমার নেই। অর্থাৎ ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং সহাবস্থান নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

অন্যদিকে ধর্মীয় মূল্যবোধের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ধর্মীয় অনুভূতিকে সম্মান করতে হবে। ইচ্ছাকৃত অবমাননা বা উসকানিকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। কিন্তু ধর্মীয় অনুভূতির নাম করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কিংবা অন্যের বৈধ অধিকার কেড়ে নেওয়ার সুযোগও দেওয়া যাবে না।

কারণ রাষ্ট্রের কাজ হলো অধিকারগুলোর মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা—কোনো একটি গোষ্ঠীর হাতে ভেটো ক্ষমতা তুলে দেওয়া নয়।

এখানে আমাদের রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জঙ্গিবাদ, উগ্রবাদ ও ধর্মীয় নিরাপত্তা-আতঙ্কের বয়ান বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। শেখ হাসিনার দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক বিরোধিতার নানা প্রশ্নের পাশাপাশি জঙ্গিবাদবিরোধী বয়ানও ছিল রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আজ যারা বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে নানা ধরনের নেতিবাচক বয়ান প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাদের হাতে নতুন করে কোনো অজুহাত তুলে দেওয়া আমাদের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।

বিশেষ করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের বয়ান যখন প্রতিবেশী ভারতসহ বিভিন্ন মহলে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে, তখন আমাদের আরও সতর্ক হওয়া দরকার। বাংলাদেশকে প্রমাণ করতে হবে—এই দেশ ধর্মপ্রাণ, কিন্তু উগ্র নয়; মূল্যবোধসম্পন্ন, কিন্তু অসহিষ্ণু নয়; মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু বহুত্ববাদবিরোধী নয়।

আর সেই বাস্তবতা প্রমাণ করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আইনের শাসন। বর্তমানে একটি নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। বিএনপি একটি উদার ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক ঐতিহ্যের কথা বলে। অতএব সেই সরকারের আমলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে ঘিরে যদি একের পর এক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তাহলে সেটি সরকারের জন্যও সুখকর কোনো বার্তা নয়। সরকারকে তাই বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

কেউ যদি শান্তিপূর্ণভাবে আপত্তি জানান, রাষ্ট্র তার কথা শুনবে। প্রয়োজন হলে আয়োজকদের সঙ্গে আলোচনা হবে। অনুষ্ঠানস্থলের নিরাপত্তা, শব্দের মাত্রা, সময়সূচি, জনদুর্ভোগ, শালীনতা কিংবা আইনগত শর্ত—সবকিছু নিশ্চিত করা যাবে। কিন্তু কেউ যদি হামলা, ভাঙচুর, ভয়ভীতি বা জবরদস্তির মাধ্যমে অনুষ্ঠান বন্ধ করতে চায়, সেখানে রাষ্ট্রকে আপসহীন হতে হবে।

এখানে আমি মনে করি,সংস্কৃতি বিরোধী শক্তিকে দমন করার অর্থ কোনো ধর্মীয় মতকে দমন করা নয়; বরং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাকে দমন করা। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশকে পিছিয়ে নেওয়ার কোনো প্রচেষ্টা সফল হতে দেওয়া যাবে না। পৃথিবী যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, সৃজনশীল অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক কূটনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন আমরা যদি গান, নাটক, সিনেমা কিংবা লোকসংস্কৃতির আয়োজন নিয়েই ভয় পেতে শুরু করি, তাহলে সেটি আত্মবিশ্বাসের সংকট ছাড়া আর কিছু নয়।

এখানে সৌদি আরবের পরিবর্তনের কথাও স্মরণ করা যেতে পারে। ইসলামি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই দেশ ভিশন ২০৩০-এর অধীনে বিনোদন ও সংস্কৃতিকে নতুনভাবে বিকশিত করছে। ২০১৮ সালে কয়েক দশকের বিরতির পর দেশটিতে সিনেমা হল পুনরায় চালু হয়েছে; কনসার্ট ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানও এখন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশ। এর অর্থ এই নয় যে সৌদি আরবের সংস্কৃতিনীতি বাংলাদেশকে হুবহু অনুসরণ করতে হবে। আমি বলতে চাইছি যে—ধর্মীয় পরিচয় ও আধুনিক সাংস্কৃতিক জীবনের মধ্যে সমন্বয় অসম্ভব কোনো বিষয় নয়।

আমরা চাই ধর্মীয় মূল্যবোধ অটুট থাকুক। চাই মসজিদ-মাদ্রাসা, ইসলামি শিক্ষা ও ধর্মীয় অনুশীলন আরও শক্তিশালী হোক। একই সঙ্গে চাই নাট্যমঞ্চ প্রাণবন্ত থাকুক, সিনেমা হল সচল থাকুক, বাউল তার একতারা হাতে গান গাইতে পারেন, তরুণেরা সুস্থ সংগীতচর্চা করতে পারেন, সাহিত্য ও শিল্পচর্চা বিকশিত হোক। এই দুইয়ের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি করার কোনো প্রয়োজন নেই।

বরং সুস্থ সংস্কৃতি তরুণ সমাজকে সৃজনশীল করে। চিন্তা করতে শেখায়। মাদক, অপরাধ ও অন্ধ উগ্রতার বিপরীতে একটি ইতিবাচক সামাজিক পরিসর তৈরি করে। ফলে সংস্কৃতির পথ বন্ধ করা কোনোভাবেই সমাজের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করে না।

এখন সময় এসেছে সরকারকে একটি সুস্পষ্ট নীতি ঘোষণা করার—আইনসম্মত কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কেবল কোনো গোষ্ঠীর আপত্তির কারণে বন্ধ করা যাবে না।

একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেরও দায়িত্ব রয়েছে। আয়োজকদের আইন মেনে চলতে হবে। শিল্পীদেরও দায়িত্বশীল থাকতে হবে। ধর্মীয় অনুভূতি, সামাজিক সংবেদনশীলতা ও জনশৃঙ্খলার বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে দায়িত্বহীনতার স্বাধীনতা নয়।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে,বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি শুধু পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা তৈরি পোশাক শিল্প দিয়ে তৈরি হয় না। একটি দেশের মানুষের মনন, সহনশীলতা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতাও তার পরিচয়ের অংশ। সুতরাং মঞ্চ বন্ধের প্রতিটি ঘটনা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ভাবমূর্তির সঙ্গেই সম্পর্কিত।

আমরা এমন বাংলাদেশ চাই না, যেখানে শিল্পী মঞ্চে ওঠার আগে ভয় পাবেন।  আমরা এমন বাংলাদেশও চাই না, যেখানে ধর্মের নাম করে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সাহস পাবে। বরঞ্চ আমরা চাই এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে ধর্ম থাকবে হৃদয়ে, সংস্কৃতি থাকবে জীবনে, আর আইন থাকবে রাষ্ট্রের হাতে।

পরিশেষে বলতে চাই,বাংলাদেশে উগ্রবাদের কোনো  ঠাঁই নেই। রাষ্ট্রকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে—কোনো গোষ্ঠী বা স্বার্থান্বেষী দল যেন আইন নিজের হাতে তুলে নিতে না পারে। শিল্প ও সংস্কৃতির অবাধ পথচলা রোধ করা হলে তরুণ সমাজ পথভ্রষ্ট হবে এবং দেশীয় ভাবমূর্তি বিশ্বজুড়ে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে। স্বাধীন ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে আর কোনো সাংস্কৃতিক মঞ্চ যেন ভীতি ও হুমকির মুখে বন্ধ না হয়—সরকার ও প্রশাসনকে অবিলম্বে সেই কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে পতিত-পলাতক স্বৈরাচার ও তাদের আশ্রয়দাতাদের সেই পুরনো উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদের বয়ানই নতুন প্রাণ লাভ করবে। যা শান্তি কামি কোনো দেশপ্রেমিক মানুষের কাম্য হতে পারে না। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সবাইকে সহিহ বুঝ নসিব করুন।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

চা-বাগান, ঝরনা আর হাওর টানছে পর্যটক, প্রস্তুত মৌলভীবাজার

মৌলভীবাজার সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৫৬ পূর্বাহ্ণ
চা-বাগান, ঝরনা আর হাওর টানছে পর্যটক, প্রস্তুত মৌলভীবাজার

শরতের নীল আকাশ, সবুজ চা-বাগান, পাহাড়ি ঝরনা আর হাওরের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটিতে মৌলভীবাজারে পর্যটকদের আগ্রহ বাড়ছে। পর্যটকদের বরণে প্রস্তুতি নিয়েছে জেলার হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজগুলো। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে আগাম বুকিং ৮০ থেকে ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে, আবার কিছু কটেজের সব কক্ষ আগেই বুকিং হয়ে গেছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, হাকালুকি হাওর ও হামহাম ঝরনা পর্যটকদের আকর্ষণ করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মণিপুরি সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি, নাচ-গান, হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের অভিজ্ঞতা। সব মিলিয়ে পূজার ছুটিকে কেন্দ্র করে জেলার পর্যটন ব্যবসায়ীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বাড়তি প্রত্যাশা।

হোটেল-রিসোর্টে আগাম বুকিংয়ের চাপ

দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটিকে সামনে রেখে মৌলভীবাজারের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে থাকার জায়গা বুকিংয়ের ব্যস্ততা বেড়েছে। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের হোটেল, রিসোর্ট এবং কটেজগুলোতে আগাম বুকিংয়ের হার উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। কমলগঞ্জের টিলাগাঁও ইকো ভিলেজের ব্যবস্থাপক সোহেল আহমেদ বলেন, পূজার দীর্ঘ ছুটিকে সামনে রেখে তাঁদের প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কক্ষ আগাম বুকিং হয়ে গেছে।শ্রীমঙ্গলের বালিসিরা কটেজের মালিক ও রাধানগর পর্যটন কল্যাণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী সামছুল হক জানান, তাঁদের কটেজের সব কক্ষ আগেই বুকিং হয়েছে।

শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি মো. সেলিম আহমদ বলেন, উৎসবের সময়ে হোটেল-রিসোর্টে সাধারণত ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ কক্ষ বুকিং থাকে। জেলার পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকারি উদ্যোগ আরও বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

চা-বাগান, ঝরনা ও হাওরের টানে পর্যটকেরা

মৌলভীবাজারের পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ এর বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক পরিবেশ। বিস্তীর্ণ চা-বাগানের সবুজ, পাহাড়ি পথ, ঝরনার পানি এবং হাওরের বিস্তৃত জলরাশি ভ্রমণপিপাসুদের কাছে আলাদা আবেদন তৈরি করে। জেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, হাকালুকি হাওর ও হামহাম ঝরনা পর্যটকদের কাছে পরিচিত গন্তব্য। শরতের আবহে এসব স্থানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটির সময় ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন অনেকে। পর্যটকদের আকর্ষণ শুধু প্রকৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় সংস্কৃতি ও খাবারের বৈচিত্র্যও মৌলভীবাজার ভ্রমণকে ভিন্ন অভিজ্ঞতা দেয়। ফলে পূজার ছুটিতে জেলার পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে দর্শনার্থীদের বাড়তি উপস্থিতির প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

মণিপুরি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের আকর্ষণ

কমলগঞ্জের ভানুবিল মাঝের গাঁওয়ে মণিপুরি কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটনকেন্দ্র ‘মাঙাল ময়ুম’ স্থানীয় সংস্কৃতিকে পর্যটকদের সামনে তুলে ধরছে। সেখানে মণিপুরি নাচ-গান, হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কেন্দ্রটির উদ্যোক্তা নিরঞ্জন সিংহ বলেন, পর্যটকেরা এখানে এসে মণিপুরি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারেন। এতে একদিকে স্থানীয় সংস্কৃতির পরিচিতি বাড়ছে, অন্যদিকে এলাকার মানুষের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনধারা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করার ফলে ভ্রমণকারীরা প্রকৃতি দেখার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সংস্কৃতি জানার সুযোগ পাচ্ছেন। এতে পর্যটন কার্যক্রমের সুফল স্থানীয় পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন চান পর্যটনসংশ্লিষ্টরা

পর্যটকদের আগ্রহ বাড়লেও পর্যটনশিল্পের বিকাশে সড়ক ও রেল যোগাযোগব্যবস্থার দুরবস্থাকে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, পর্যটনকেন্দ্রে যাতায়াত সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ না হলে পর্যটন খাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন। ট্যুর গাইড অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রাসেল আলম সিলেট-ঢাকা রুটে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানোসহ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, যাতায়াতের সুযোগ বাড়লে পর্যটকদের ভ্রমণ পরিকল্পনা সহজ হবে এবং স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

পর্যটকদের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা

পূজার ছুটিতে পর্যটকদের আগমন বাড়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে টহল ও হেল্পডেস্ক রাখার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। শ্রীমঙ্গল জোনের ট্যুরিস্ট পুলিশের পুলিশ পরিদর্শক মো. কামরুল হোসেন চৌধুরী বলেন, পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে টহল ও হেল্পডেস্ক থাকবে। মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মো. মনিরুল ইসলাম জানান, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে পর্যটকদের আগমন এবং পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং গুজব ও অপপ্রচার প্রতিরোধে পূজার আগে, চলাকালে ও প্রতিমা বিসর্জনের সময় সতর্ক নজরদারি থাকবে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের সমন্বয়ে মৌলভীবাজারের পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। পূজার ছুটিতে আগাম বুকিংয়ের উচ্চ হার স্থানীয় হোটেল-রিসোর্ট ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা বাড়িয়েছে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

 

ত্রিদেশীয় সিরিজে হার দিয়ে শুরু বাংলাদেশের, জিম্বাবুয়ের দাপুটে জয়

ক্রীড়া প্রতিবেদক,কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৩৯ পূর্বাহ্ণ
ত্রিদেশীয় সিরিজে হার দিয়ে শুরু বাংলাদেশের, জিম্বাবুয়ের দাপুটে জয়

ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচেই বড় হারের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। ব্যাটিং ব্যর্থতায় জিম্বাবুয়ের দেওয়া ২৭২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ১৭২ রানেই অলআউট হয়েছে তাওহিদ হৃদয়ের দল। আবুধাবিতে শনিবার ৯৯ রানের জয় দিয়ে সিরিজ শুরু করেছে জিম্বাবুয়ে। ম্যাচে শুরুতে বল হাতে জিম্বাবুয়েকে চাপে ফেলেছিল বাংলাদেশ। মাত্র ২৪ রানে তিন উইকেট হারিয়ে বিপাকে পড়ে দলটি। কিন্তু ব্রেন্ডন টেলর ও ক্রেইগ আরভিনের বড় জুটি জিম্বাবুয়েকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করে। পরে লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় বাংলাদেশ।

টেলর-আরভিনের ১৫০ রানের জুটিতে ঘুরে দাঁড়াল জিম্বাবুয়ে

টস জিতে আগে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই বাংলাদেশের পেসার তাসকিন আহমেদের বোলিংয়ের সামনে বিপাকে পড়ে জিম্বাবুয়ে। মাত্র ২৪ রানের মধ্যে তিনটি উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে দলটি। তবে এই অবস্থায় দলের হাল ধরেন ব্রেন্ডন টেলর ও ক্রেইগ আরভিন। চতুর্থ উইকেটে দুজন মিলে গড়েন ১৫০ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি। টেলর ১০১ বলে ৮১ রান করেন। আরভিনের ব্যাট থেকে আসে ১০৬ বলে ৯৩ রান। তাঁদের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে প্রাথমিক বিপর্যয় কাটিয়ে বড় সংগ্রহের পথে এগিয়ে যায় জিম্বাবুয়ে। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ২৭১ রান সংগ্রহ করে দলটি। ফলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় ২৭২ রান।

তাসকিনের তিন উইকেটেও থামেনি জিম্বাবুয়ে

বাংলাদেশের হয়ে বল হাতে সবচেয়ে সফল ছিলেন তাসকিন আহমেদ। ৪৪ রান দিয়ে তিনি নেন ৩ উইকেট। শুরুতে তাঁর বোলিংয়েই দ্রুত তিন উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে জিম্বাবুয়ে। এ ছাড়া শরীফুল ইসলাম ও সাইফ হাসান দুটি করে উইকেট শিকার করেন। তবে টেলর ও আরভিনের জুটি ভাঙতে দেরি হওয়ায় জিম্বাবুয়ে বড় সংগ্রহ গড়তে সক্ষম হয়।

২৭২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশের শুরুটা খুব খারাপ ছিল না। কিন্তু সৌম্য সরকার ৯ রান করে ব্লেসিং মুজারাবানির বলে ক্যাচ দিয়ে ফিরতেই ছন্দপতন শুরু হয়। তানজিদ হাসান তামিম আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে দলকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে ৪৬ রান করে তাঁর বিদায়ের পর বাংলাদেশের চাপ আরও বাড়ে। নাজমুল হোসেন শান্তও বেশিক্ষণ উইকেটে থাকতে পারেননি। তিনি করেন ১৩ রান। দলীয় ৯৭ রানে চতুর্থ উইকেট হিসেবে আউট হন অধিনায়ক তাওহিদ হৃদয়। ২১ বলে ১৩ রান করে সিকান্দার রাজার বলে এলবিডব্লিউ হন তিনি। অধিনায়কের বিদায়ের পর বাংলাদেশের জয়ের আশা আরও ক্ষীণ হয়ে যায়।

নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারিয়ে ১৭২ রানেই শেষ

হৃদয়ের বিদায়ের পর বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে আর ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হয়নি। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে দলটি। মোসাদ্দেক হোসেনও বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। শেষ দিকে রিশাদ হোসেন ও তাসকিন আহমেদ ২৬ বলে ৩২ রানের জুটি গড়ে হারের ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করেন। রিশাদ করেন ২৩ রান, আর তাসকিন ১৬ রানে অপরাজিত থাকেন। তবে তাঁদের এই প্রচেষ্টা বাংলাদেশের পরাজয় এড়ানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। শেষ পর্যন্ত ১৭২ রানেই গুটিয়ে যায় দলের ইনিংস। জিম্বাবুয়ের হয়ে বল হাতে সবচেয়ে সফল ছিলেন ব্র্যাড ইভান্স। তিনি নেন ৪ উইকেট। সিকান্দার রাজা ও মাসাকাদজা দুটি করে উইকেট শিকার করেন।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

 

 

ঢাকা ক্রিকেটার্সকে ৫১ রানে উড়িয়ে বসুন্ধরার টানা তিন জয়

ক্রীড়া প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১:০৪ পূর্বাহ্ণ
ঢাকা ক্রিকেটার্সকে ৫১ রানে উড়িয়ে বসুন্ধরার টানা তিন জয়

ব্যাট হাতে খালেদ মাসুদের ঝোড়ো অর্ধশতক আর বল হাতে তাপস ঘোষের বিধ্বংসী বোলিংয়ে দাপুটে জয় পেয়েছে বসুন্ধরা স্ট্রাইকার্স। এবিজি স্পোর্টস সিটির আনভীর ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ফ্রস্ট ব্লাস্ট টি-টোয়েন্টি করপোরেট ক্রিকেটের তৃতীয় আসরের গ্রুপ পর্বের ম্যাচে ঢাকা ক্রিকেটার্সকে ৫১ রানে হারিয়েছে দলটি। এ জয়ে টুর্নামেন্টে টানা তৃতীয় জয় তুলে নিয়ে নিজেদের ধারাবাহিকতার প্রমাণ দিল বসুন্ধরা। শনিবার আগে ব্যাট করতে নেমে ১৯.৩ ওভারে ১৪০ রানে অলআউট হয় বসুন্ধরা স্ট্রাইকার্স। জবাবে ব্যাট করতে নেমে তাপস ঘোষের বোলিং তোপে ১৬.৫ ওভারে মাত্র ৮৯ রানেই গুটিয়ে যায় ঢাকা ক্রিকেটার্সের ইনিংস।

খালেদ মাসুদের ঝোড়ো ফিফটিতে লড়াকু সংগ্রহ 

ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুটা ভালো হয়নি বসুন্ধরা স্ট্রাইকার্সের। দলীয় ৯ রানে মাহমুদুল হাসান শেখের বলে বোল্ড হয়ে সাজঘরে ফেরেন ওপেনার মাহেন। তাঁর ব্যাট থেকে আসে মাত্র ২ রান। আগের দুই ম্যাচে ভালো ছন্দে থাকা শেহজাদ আকবর সোবহানও এদিন বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। তিনি করেন ৬ রান। প্রাথমিক ধাক্কা সামাল দিতে দ্বিতীয় উইকেটে ৩৯ রানের জুটি গড়েন খালেদ মাসুদ ও সুমন আহমেদ। তবে ১৭ বলে ১০ রান করে সুমন ফিরে গেলে আবারও চাপে পড়ে দলটি। একপ্রান্ত আগলে রেখে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং চালিয়ে যান খালেদ। তাঁর ব্যাটে রান আসতে থাকায় বড় সংগ্রহের আশা জাগে বসুন্ধরা শিবিরে। মাত্র ৩৫ বলে ৬টি চার ও ৩টি ছক্কায় ৫৯ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলেন তিনি। দলীয় ৯৬ রানে ফিরোজ রশিদের বলে খালেদ আউট হলে ফের ছন্দপতন ঘটে বসুন্ধরার ব্যাটিংয়ে। এরপর নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে দলটি।

শেষ দিকে বাবুর ব্যাটে ১৪০ রান

মাঝের ওভারে অন্তু ১৩ বলে ১৭ এবং রাজি ১১ রান করে দলের সংগ্রহ বাড়াতে ভূমিকা রাখেন। শেষ দিকে বাবুর অপরাজিত ১৭ রানের ইনিংসও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৬ বলের ইনিংসটি খেলে বসুন্ধরাকে ১৪০ রানে পৌঁছে দেন তিনি। ঢাকা ক্রিকেটার্সের হয়ে বল হাতে সবচেয়ে সফল ছিলেন ফিরোজ রশিদ। ২৩ রান দিয়ে তিনি নেন ৩ উইকেট। মাহমুদুল হাসান শেখ এক মেডেনসহ ১৩ রান খরচায় শিকার করেন ২ উইকেট। ১৪১ রানের লক্ষ্য খুব বড় না হলেও বসুন্ধরার বোলারদের নিয়ন্ত্রিত পারফরম্যান্সের সামনে তা তাড়া করা কঠিন হয়ে পড়ে ঢাকা ক্রিকেটার্সের জন্য।

তাপস ঘোষের তোপে ভেঙে পড়ে ঢাকা ক্রিকেটার্স

লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই চাপে পড়ে ঢাকা ক্রিকেটার্স। বসুন্ধরার বোলারদের নিয়ন্ত্রিত আক্রমণে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে দলটি। ব্যাটারদের কেউই বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। ঢাকা ক্রিকেটার্সের হয়ে সর্বোচ্চ ২৪ রান করেন ফারুক টিটো। ২৯ বলের ইনিংসে দুটি চার ও একটি ছক্কা মারেন তিনি। রাসেল করেন ১১ রান এবং তাসবিহ ইবতিসাম রাফির ব্যাট থেকে আসে ১০ রান। বাকি ব্যাটারদের কেউই দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছাতে পারেননি। অতিরিক্ত থেকে যোগ হয় ১৭ রান।

বসুন্ধরার হয়ে বল হাতে ম্যাচের সবচেয়ে উজ্জ্বল পারফরম্যান্স দেখান তাপস ঘোষ। মাত্র ৩.৫ ওভারে ৮ রান দিয়ে ৩ উইকেট তুলে নেন তিনি। তাঁর নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়েই দ্রুত গুটিয়ে যায় ঢাকা ক্রিকেটার্সের ব্যাটিং লাইনআপ। খালেদ মাসুদও বল হাতে অবদান রাখেন। ২ ওভারে ৮ রান দিয়ে নেন ২ উইকেট। রাজি ৪ ওভারে ২০ রান খরচায় শিকার করেন আরও ২ উইকেট। এ ছাড়া মাহেন ও লাজিম একটি করে উইকেট নেন। খালেদ মাসুদের ৫৯ রানের ইনিংস বসুন্ধরাকে লড়াই করার মতো সংগ্রহ এনে দেয়। এরপর তাপস ঘোষের দুর্দান্ত বোলিং এবং অন্য বোলারদের কার্যকর ভূমিকা ঢাকা ক্রিকেটার্সকে ৮৯ রানেই আটকে দেয়।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি