খুঁজুন
                               
, ,
           

দিল্লির ভুল কূটনীতি কি হারাচ্ছে ঢাকার আস্থা?

আহসান হাবিব বরুন:
প্রকাশিত: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৫০ অপরাহ্ণ
দিল্লির ভুল কূটনীতি কি হারাচ্ছে ঢাকার আস্থা?

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক প্রটোকলের ইতিহাসে প্রতিবেশীর প্রতি আধিপত্যবাদী আচরণের বহু দৃষ্টান্ত থাকলেও, অতি সম্প্রতি ভারত সরকার কর্তৃক বাংলাদেশের সঙ্গে প্রদর্শিত কূটনৈতিক অনাচার সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে। দীর্ঘ দেড় দশকের একপাক্ষিক ও স্বৈরাচারভিত্তিক সুবিধাবাদী কাঠামোর অবসানের পর বাংলাদেশে যে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তাকে মেনে নিতে সাউথ ব্লকের নিদারুণ মানসিক অস্বস্তি আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট। সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অত্যন্ত নাটকীয় ভঙ্গিতে জানিয়েছিলেন—ভারতের মাটি বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে স্বাগত জানানোর জন্য ‘অধীর আগ্রহে’ অপেক্ষা করছে। কিন্তু কূটনীতির খাতা খুলতেই প্রকাশ পেল দিল্লির সেই পুরানো ছদ্মবেশ। কথা ও কাজের যোজন যোজন দূরত্ব প্রমাণ করে, ভারত এখনো তাদের গতানুগতিক ছদ্ম-কূটনীতি ও আধিপত্যবাদী মনস্তাত্ত্বিক খেলা থেকে সরে আসতে পারেনি।

আগামী ১২ ও ১৩ই সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিশ্বরাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী জোট ব্রিকস (BRICS)-এর ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনের ‘আউটরিচ’ পর্বে অংশ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে যে আনুষ্ঠানিক দাওয়াতপত্র পাঠানো হয়েছে, তার ভাষা ও প্রটোকল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের চরম অবমাননা।

আমন্ত্রণপত্রে তারেক রহমানকে ১৮ কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের ‘প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে সম্বোধন না করে, কেবল একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট ‘বিমসটেক (BIMSTEC)-এর চেয়ার’ হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ভিয়েনা কনভেনশন এবং প্রথাগত ডিপ্লোমেটিক কাস্টমসের এটি কেবল চরম লঙ্ঘনই নয়, বরং এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জনগণের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সত্যকে অস্বীকৃতি জানানোর অসৎ প্রয়াস ছাড়া আর কিছুই নয়।

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্রতিটি শব্দের প্রয়োগ, সম্বোধন এবং বাক্যবিন্যাস নিখুঁত হিসাব-নিকাশের পর নির্ধারিত হয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো একটি প্রবীণ সংস্থায় এই ধরনের ভুল দুর্ঘটনাবশত ঘটেছে কিংবা এটি একটি ‘প্রযুক্তিগত অসাবধানতা’—এই যুক্তি শিশুসুলভ। এটি কোনো অনিচ্ছাকৃত বিচ্যুতি নয়, বরং সাউথ ব্লকের একটি ঠান্ডা মাথার সুপরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির অপপ্রয়াস।

নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে যখন একাধিক দেশি-বিদেশি সাংবাদিক মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালকে চেপে ধরেন এবং প্রশ্ন তোলেন—কেন বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর পদবি এড়িয়ে তাঁকে বিমসটেক প্রধান হিসেবে কার্ড পাঠানো হলো? তখন তিনি কোনো যৌক্তিক বা প্রশাসনিক ব্যাখ্যা দেওয়ার পরিবর্তে কৌশলে এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, “প্রস্তুতি চলছে, কারিগরি বিষয় নিয়ে পরে কথা বলা যাবে।” মুখপাত্রের এই বিভ্রান্তিকর ও পাশ কাটানো উত্তরই প্রমাণ করে যে, এটি কোনো ‘টাইপিং ভুল’ ছিল না। এটি ছিল ঢাকাকে একটি বার্তা দেওয়ার সুপরিকল্পিত কৌশল, যার মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের সার্বভৌম নেতৃত্বের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা এবং বাংলাদেশ সরকারকে ভূরাজনৈতিকভাবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে কিছুটা ছোট করে উপস্থাপন করা।

দিল্লির মূল সমস্যা হলো—তারা এখনো ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুধাবন করতে পারছে না, অথবা বুঝতে পেরেও তা মেনে নিতে অস্বীকার করছে। শেখ হাসিনা সরকারের টানা দেড় দশকে দিল্লি বাংলাদেশের ভূখণ্ড, প্রটোকল, অর্থনৈতিক বাজার এবং ট্রানজিট সুবিধা একচেটিয়াভাবে ব্যবহার করেছে, যার বিনিময়ে বাংলাদেশ পেয়েছে সীমান্তে ফেলানীদের লাশ, অসম তিস্তা চুক্তি আর বাণিজ্য বৈষম্য। সেই সময় বাংলাদেশকে ভারতের একটি ‘অঙ্গরাজ্য সমতুল্য’ প্রটোকলে মূল্যায়ন করার যে বদঅভ্যাস সাউথ ব্লকে তৈরি হয়েছিল, সেখান থেকে ভারতীয় নীতি-নির্ধারকেরা বের হতে পারছেন না।

ভারতের নীতি-নির্ধারকদের মনস্তত্ত্ব এখনো হাসিনাকেন্দ্রিক সেই পুরনো একপাক্ষিক অক্ষেই আটকে আছে। তারা ভুলে গেছে যে, গণ-অভ্যুত্থান ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে আজ এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। এই নতুন বাংলাদেশে সরকার পরিচালিত হয় জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছায়, দিল্লির সাউথ ব্লকের কোনো প্রেসক্রিপশনে নয়। ভারত যদি ভেবে থাকে যে আগের মতোই অবমূল্যায়ন আর অসৌজন্যমূলক প্রটোকল দিয়ে ঢাকাকে পদানত রাখা যাবে, তবে তারা মহা ভুলের স্বর্গে বাস করছে।

দিল্লিকে বুঝতে হবে, ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ আর ২০০৯ বা ২০১৪ সালের জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল এবং বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত ভৌগোলিক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বাংলাদেশ আজ বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর মনোযোগের কেন্দ্রে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, যুক্তরাজ্য এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের উদীয়মান শক্তিগুলো এখন বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ স্তরের সার্বভৌম গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি সমমর্যাদার ভিত্তিতে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ রক্ষা করছে।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নতুন বাংলাদেশ আর কোনো একক দেশের ওপর নির্ভরশীল নয়। ভারত যখন একের পর এক কূটনৈতিক ভুল করছে, তখন বিশ্বরাজনীতিতে অন্যান্য পরাশক্তিগুলো বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামরিক সমীকরণে সমমর্যাদার সম্পর্কে এগিয়ে আসছে।

বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা, বাণিজ্য পথ এবং ভূরাজনৈতিক সুরক্ষার জন্য ভারতকে দিনশেষে বাংলাদেশের ওপরই নির্ভর করতে হবে। বাংলাদেশের আত্মসম্মানে আঘাত দিয়ে ভারত কেবল নিজের ভূরাজনৈতিক নিরাপত্তাকেই চরম ঝুঁকিতে ফেলছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিচিতি সব সময় দুই ধারায় বিভক্ত ছিল—একপক্ষ ছিল নতজানু ও দাসত্বপ্রবণ, আর অপরপক্ষ ছিল স্বাধীন, আত্মমর্যাদাশীল ও সার্বভৌম। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রথম বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন ও স্বাবলম্বী রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড় করিয়েছিলেন। তিনি কেবল সার্ক (SAARC) গঠনের মাধ্যমে আঞ্চলিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেননি, বরং বড় কোনো পরাশক্তির রক্তচক্ষুকে পরোয়া না করে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও সেই একই ধারাবাহিকতা রক্ষা করে প্রতিবেশীর সব ধরনের আধিপত্যবাদী মনস্তাত্ত্বিক চাপকে দৃঢ়ভাবে মোকাবেলা করেছিলেন।

তাদের যোগ্য উত্তরসূরি এবং আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পিতা-মাতার সেই বীরত্বপূর্ণ ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতির পথেই হাঁটছেন। তাঁর পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্রই হলো—সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে দাসত্ব নয়। দেশের কোটি কোটি জনগণের স্পষ্ট অনুভূতির প্রতিফলন ঘটিয়ে আজ প্রধানমন্ত্রীকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যে কূটনৈতিক কাঠামোয় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর রাষ্ট্রীয় পদবি দিতে ভারতের হাত কাঁপে, যে প্রটোকলে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকে কোনো আঞ্চলিক সংস্থার ছায়ায় ঢেকে দেওয়ার চক্রান্ত হয়—সেই আমন্ত্রণে সাড়া দেওয়া হবে শহীদ জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়ার আত্মমর্যাদাশীল নীতির পরিপন্থী। সুতরাং দেশের জাতীয় স্বার্থ এবং আত্মসম্মানকে বিকিয়ে দিয়ে কোনো প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ‘প্রহসনের বন্ধুত্ব’ বিএনপি বা তারেক রহমান কোনো দিন বরদাশ করেননি, ভবিষ্যতেও করবেন না।

আসন্ন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন হতে পারত বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে থমকে যাওয়া পারস্পরিক কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠন ও সুসংহত করার এক সোনালী সুযোগ। দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন, বিভ্রান্তি এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের মেঘ কাটিয়ে দুটি প্রতিবেশী দেশ সমমর্যাদার ভিত্তিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারত। ঢাকাও ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, যদি সমমর্যাদা নিশ্চিত হয়, তবে আন্তর্জাতিক স্বার্থে ভারত সফরে প্রধানমন্ত্রী ইতিবাচক চিন্তা করতে পারেন। কিন্তু দিল্লি তাদের ঐতিহ্যগত ‘দাদাগিরি’ ও আধিপত্যবাদী আচরণের কারণে সেই ঐতিহাসিক সুযোগটিকে ধূলিসাৎ করে দিল।

একটি শীর্ষ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দাওয়াত পাঠানোর মতো সংবেদনশীল বিষয়েও তারা যে সংকীর্ণতা ও কূটচালের পরিচয় দিয়েছে, তা প্রমাণ করে যে ভারত এখনো সম মর্যাদার প্রতিবেশীকে গ্রহণ করতে মানসিকভাবে প্রস্তুত নয়। তারা সম্পর্ক উন্নয়ন বলতে বোঝায় আধিপত্য বজায় রাখা।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া কেমন হওয়া উচিত? কূটনীতিতে নীরবতা অনেক সময় সম্মতির লক্ষণ হিসেবে গণ্য হয়। তাই ভারতের এই অরুচিকর এবং অপমানজনক আমন্ত্রণের বিপরীতে নমনীয়তা দেখানোর কোনো সুযোগ বাংলাদেশের সামনে নেই।

বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিত অবিলম্বে ভারতের এই দাওয়াতপত্রকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রটোকলবিরোধী আখ্যা দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করা।প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে নয়াদিল্লি সফর থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা উচিত।

নয়াদিল্লিকে পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিতে হবে যে, বিমসটেক চেয়ার হিসেবে নয়, বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সমমর্যাদা দেওয়া হলেই কেবল ভবিষ্যতে কোনো দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক সম্মেলনে বাংলাদেশ অংশ নেবে।

ভারত সফর থেকে বিরত থাকা কোনো আবেগী সিদ্ধান্ত হবে না, বরং এটি হবে আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভাষায় একটি অতি শক্তিশালী ‘কূটনৈতিক প্রতিবাদ’ (Diplomatic Protest)। সাউথ ব্লককে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে যে—’নতুন বাংলাদেশ’ তার আত্মসম্মান, প্রটোকল এবং সার্বভৌম মর্যাদার প্রশ্নে কোনো আপস করবে না।

পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশের জনগণ ভারতের সঙ্গে একটি সুসংহত, সুস্থ ও বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী সম্পর্ক চায়, কিন্তু তা হতে হবে সমমর্যাদা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে। কোনো প্রটোকলভিত্তিক কারসাজি বা কূটনৈতিক হেয় করার প্রয়াস বাংলাদেশের সচেতন জনগণ মেনে নেবে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি দেশবাসীর আজ পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তিনি যদি দিল্লির এই অপমানজনক দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে ভারত সফর থেকে বিরত থাকেন, তবে তা হবে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও জাতীয় আত্মমর্যাদা সমুন্নত রাখার ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। দিল্লির এই অসৌজন্যমূলক ও আধিপত্যবাদী আচরণের এর চেয়ে কঠোর, সময়োপযোগী এবং সমুচিত জবাব আর কিছুই হতে পারে না।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

পুলিশকে ‘নিষ্ক্রিয়’ করার চেষ্টা রুখতে জনসম্পৃক্ততার ডাক তথ্য প্রতিমন্ত্রীর

বিশেষ সংবাদদাতা ও ময়মনসিংহ প্রতিবেদক:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৪৯ অপরাহ্ণ
পুলিশকে ‘নিষ্ক্রিয়’ করার চেষ্টা  রুখতে জনসম্পৃক্ততার ডাক তথ্য প্রতিমন্ত্রীর

পুলিশকে নিষ্ক্রিয় করতে একটি চক্র নানা ধরনের বিতর্ক ও বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এমপি। এমন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে এককভাবে নির্ভর না করে জনগণকে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে অপরাধীদের শনাক্ত করে তাদের বিষয়ে গোপনে পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার জন্য সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

  • জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বয় কমিটি গঠনের তাগিদ
  • অপরাধীদের গোপন তথ্য দিতে আহ্বান
  • মাদকবিরোধী অভিযানে বাড়ি বাড়ি যাওয়ার নির্দেশ

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত আইনশৃঙ্খলা কমিটির বিশেষ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

সীমিত পুলিশ, বাড়াতে হবে জনসম্পৃক্ততা
ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, একটি থানায় কর্মরত সীমিতসংখ্যক পুলিশ সদস্য দিয়ে এককভাবে পুরো এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। অপরাধের ধরন ও পরিধি বিবেচনায় নিয়ে পুলিশ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন। এ জন্য স্থানীয় পর্যায়ে পুলিশ-জনগণের সমন্বয় কমিটি গঠনের ওপর জোর দেন তিনি।

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব শুধু পুলিশের ওপর রেখে দিলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। স্থানীয় জনগণের কাছ থেকে অপরাধসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ এবং দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তা জানানোর ব্যবস্থা কার্যকর হলে অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশের সক্ষমতাও বাড়তে পারে—এমন একটি সমন্বিত কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথাই তুলে ধরেন তিনি।

‘বিতর্ক সৃষ্টি করে পুলিশকে দুর্বল করার চেষ্টা’
পুলিশকে নিষ্ক্রিয় করতে একটি চক্র নানা ধরনের বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করছে উল্লেখ করে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তথ্য প্রতিমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, অপরাধীদের শনাক্ত করতে জনগণকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য গোপনে পুলিশকে দিতে হবে।

একই সঙ্গে একটি নিষিদ্ধ দলের রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ ও তৎপর থাকার আহ্বান জানান তিনি। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নামে যেন নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও পুলিশকে কঠোরভাবে সতর্ক করেন প্রতিমন্ত্রী।

মিথ্যা মামলা নয়, আইনের প্রয়োগে সতর্কতা
পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, কোনো অবস্থাতেই মিথ্যা মামলা নেওয়া যাবে না। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিরীহ মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে, সংবাদকর্মীদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি। তাঁর মতে, মিথ্যা অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের মাধ্যমে এলাকায় যাতে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, সেদিকে সাংবাদিকদের অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে একদিকে পুলিশের সক্রিয়তা, অন্যদিকে গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল তথ্য পরিবেশন—দুই দিকের ভারসাম্যকেই গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

মাদকবিরোধী অভিযানে তালিকা ধরে অভিযান
মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা উল্লেখ করে মাদক কারবারিদের তালিকা অনুযায়ী বাড়ি বাড়ি অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন প্রতিমন্ত্রী। ইয়াবাসহ মাদক উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ জনগণকেও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তাঁর বক্তব্যে মাদক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শুধু অভিযান পরিচালনার পরিবর্তে স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য, জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা এবং নাগরিক সহযোগিতাকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। মাদক কারবারিদের শনাক্তকরণ ও তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন তিনি।

নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা জান্নাতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেবাশীষ কর্মকার, সহকারী কমিশনার (ভূমি) সালাহ উদ্দিন মাহমুদ এবং নান্দাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজহারুল ইসলাম। এ ছাড়া উপজেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারাও সভায় উপস্থিত ছিলেন।

সভা শেষে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে লিফলেট বিতরণ করেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী। এ সময় নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে ডেঙ্গুর প্রজননস্থল ধ্বংসের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। লিফলেট বিতরণ কর্মসূচিতে নান্দাইল উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। এর আগে পাঁচ দিনের সফরে মঙ্গলবার দুপুরে ময়মনসিংহের নান্দাইলে পৌঁছান ইয়াসের খান চৌধুরী। সফরের অংশ হিসেবে কিশোরগঞ্জ ও জামালপুরের একাধিক কর্মসূচিতে তাঁর অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।

কালের আলো/এএইচ/এমএএএমকে

সংবাদমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার পর ‘ট্রাম্প টিভি’ চালু হোয়াইট হাউসের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৪৬ অপরাহ্ণ
সংবাদমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার পর ‘ট্রাম্প টিভি’ চালু হোয়াইট হাউসের

দ্য এসেনশিয়ালস স্টেশন’ নামে একটি নতুন ২৪ ঘণ্টার অনলাইন সম্প্রচার চ্যানেল চালু করেছে। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে চ্যানেলটির সম্প্রচার শুরু হয়। হোয়াইট হাউসের নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে এটি পরিচালিত হচ্ছে এবং প্রশাসনের ঘোষণা, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য ও বিভিন্ন পুরোনো ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে।

চ্যানেলটি চালুর সময়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে, কারণ এর কয়েক দিন আগে CNN, পলিটিকো ও MS NOW-এর সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। ট্রাম্প ওই সংবাদমাধ্যমগুলোর কাভারেজ নিয়ে আপত্তি প্রকাশ করে তাদের বিরুদ্ধে ‘ভুয়া খবর’ প্রচারের অভিযোগ করেন।

সরাসরি প্রশাসনের ভিডিও

হোয়াইট হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প টিভিতে প্রশাসনের ভিডিও, প্রেসিডেন্টের বক্তব্য ও বিভিন্ন ঘোষণা সম্প্রচার করা হচ্ছে। প্রেসিডেন্টের অতীতের নির্বাচিত ভিডিও এবং প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ফুটেজও এতে দেখানো হচ্ছে।

সরকার ও প্রেসিডেন্টের নিজস্ব ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে সরাসরি বক্তব্য প্রচারের নজির অবশ্য নতুন নয়। তবে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের চলমান বিরোধের মধ্যে নতুন চ্যানেলটি চালু হওয়ায় বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে।

তিন সংবাদমাধ্যমের মামলা

হোয়াইট হাউসে প্রবেশাধিকার ফিরে পেতে CNN, পলিটিকো ও MS NOW ২১ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনের ফেডারেল আদালতে মামলা করেছে। প্রতিষ্ঠান তিনটি অভিযোগ করেছে, তাদের সংবাদ কাভারেজের কারণে প্রবেশাধিকার বাতিল করা মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সুরক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

মামলায় তারা দ্রুত নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউসে প্রবেশাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার আবেদন করেছে।

অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য, হোয়াইট হাউসে প্রবেশাধিকার একটি বিশেষ সুবিধা এবং প্রেসিডেন্টের কাভারেজ নিয়ে প্রশাসনের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে।

টেলিভিশন পুলে সংকট

হোয়াইট হাউসে সব টেলিভিশন চ্যানেলের ক্যামেরা একসঙ্গে প্রবেশ করতে না পারায় দীর্ঘদিন ধরে প্রধান সম্প্রচারমাধ্যমগুলো একটি টিভি পুলের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের অনুষ্ঠান কাভার করে আসছে। CNN, ABC, CBS, NBC ও Fox News এই ব্যবস্থার অংশ।

CNN-কে পুল থেকে বাদ দেওয়ার পর অন্য বড় সম্প্রচারমাধ্যমগুলোও প্রেসিডেন্টের নির্ধারিত পুল কাভারেজ স্থগিত করে। ফলে ট্রাম্পের কয়েকটি অনুষ্ঠানের ভিডিও কাভারেজে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি তৈরি হয়।

স্বাধীন সাংবাদিকতার বিকল্প কি?

ট্রাম্প টিভিতে প্রচারিত ভিডিও ও তথ্য প্রশাসন নিজেই তৈরি, বাছাই ও প্রচার করবে। ফলে এটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের মতো বাইরের সাংবাদিকদের অনুসন্ধান, প্রশ্ন, যাচাই বা সম্পাদনার মাধ্যমে তৈরি সংবাদপ্ল্যাটফর্ম নয়।

সমর্থকেরা বলছেন, এর মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমের মধ্যস্থতা ছাড়াই প্রেসিডেন্টের বক্তব্য সরাসরি জনগণের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। অন্যদিকে সংবাদমাধ্যম ও প্রেস-স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে, সরকারি যোগাযোগমাধ্যম ও স্বাধীন সাংবাদিকতার ভূমিকা আলাদা।

এদিকে CNN, পলিটিকো ও MS NOW-এর করা মামলার মাধ্যমে বিষয়টি এখন আদালতের বিচারাধীন।

কালের আলো/এসএ

ফায়ার সার্ভিসের নতুন মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৪৪ অপরাহ্ণ
ফায়ার সার্ভিসের নতুন মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের বর্তমান মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ জাহেদ কামালকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে প্রত্যাবর্তন করা হয়েছে।

এর ফলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ। নতুন মহাপরিচালক হিসেবে তিনি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের দায়িত্ব পালন করবেন।

কালের আলো/এমএসআইপি