খুঁজুন
                               
, ,
           

দিল্লির ভুল কূটনীতি কি হারাচ্ছে ঢাকার আস্থা?

আহসান হাবিব বরুন:
প্রকাশিত: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৫০ অপরাহ্ণ
দিল্লির ভুল কূটনীতি কি হারাচ্ছে ঢাকার আস্থা?

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক প্রটোকলের ইতিহাসে প্রতিবেশীর প্রতি আধিপত্যবাদী আচরণের বহু দৃষ্টান্ত থাকলেও, অতি সম্প্রতি ভারত সরকার কর্তৃক বাংলাদেশের সঙ্গে প্রদর্শিত কূটনৈতিক অনাচার সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে। দীর্ঘ দেড় দশকের একপাক্ষিক ও স্বৈরাচারভিত্তিক সুবিধাবাদী কাঠামোর অবসানের পর বাংলাদেশে যে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তাকে মেনে নিতে সাউথ ব্লকের নিদারুণ মানসিক অস্বস্তি আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট। সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অত্যন্ত নাটকীয় ভঙ্গিতে জানিয়েছিলেন—ভারতের মাটি বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে স্বাগত জানানোর জন্য ‘অধীর আগ্রহে’ অপেক্ষা করছে। কিন্তু কূটনীতির খাতা খুলতেই প্রকাশ পেল দিল্লির সেই পুরানো ছদ্মবেশ। কথা ও কাজের যোজন যোজন দূরত্ব প্রমাণ করে, ভারত এখনো তাদের গতানুগতিক ছদ্ম-কূটনীতি ও আধিপত্যবাদী মনস্তাত্ত্বিক খেলা থেকে সরে আসতে পারেনি।

আগামী ১২ ও ১৩ই সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিশ্বরাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী জোট ব্রিকস (BRICS)-এর ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনের ‘আউটরিচ’ পর্বে অংশ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে যে আনুষ্ঠানিক দাওয়াতপত্র পাঠানো হয়েছে, তার ভাষা ও প্রটোকল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের চরম অবমাননা।

আমন্ত্রণপত্রে তারেক রহমানকে ১৮ কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের ‘প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে সম্বোধন না করে, কেবল একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট ‘বিমসটেক (BIMSTEC)-এর চেয়ার’ হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ভিয়েনা কনভেনশন এবং প্রথাগত ডিপ্লোমেটিক কাস্টমসের এটি কেবল চরম লঙ্ঘনই নয়, বরং এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জনগণের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সত্যকে অস্বীকৃতি জানানোর অসৎ প্রয়াস ছাড়া আর কিছুই নয়।

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্রতিটি শব্দের প্রয়োগ, সম্বোধন এবং বাক্যবিন্যাস নিখুঁত হিসাব-নিকাশের পর নির্ধারিত হয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো একটি প্রবীণ সংস্থায় এই ধরনের ভুল দুর্ঘটনাবশত ঘটেছে কিংবা এটি একটি ‘প্রযুক্তিগত অসাবধানতা’—এই যুক্তি শিশুসুলভ। এটি কোনো অনিচ্ছাকৃত বিচ্যুতি নয়, বরং সাউথ ব্লকের একটি ঠান্ডা মাথার সুপরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির অপপ্রয়াস।

নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে যখন একাধিক দেশি-বিদেশি সাংবাদিক মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালকে চেপে ধরেন এবং প্রশ্ন তোলেন—কেন বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর পদবি এড়িয়ে তাঁকে বিমসটেক প্রধান হিসেবে কার্ড পাঠানো হলো? তখন তিনি কোনো যৌক্তিক বা প্রশাসনিক ব্যাখ্যা দেওয়ার পরিবর্তে কৌশলে এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, “প্রস্তুতি চলছে, কারিগরি বিষয় নিয়ে পরে কথা বলা যাবে।” মুখপাত্রের এই বিভ্রান্তিকর ও পাশ কাটানো উত্তরই প্রমাণ করে যে, এটি কোনো ‘টাইপিং ভুল’ ছিল না। এটি ছিল ঢাকাকে একটি বার্তা দেওয়ার সুপরিকল্পিত কৌশল, যার মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের সার্বভৌম নেতৃত্বের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা এবং বাংলাদেশ সরকারকে ভূরাজনৈতিকভাবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে কিছুটা ছোট করে উপস্থাপন করা।

দিল্লির মূল সমস্যা হলো—তারা এখনো ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুধাবন করতে পারছে না, অথবা বুঝতে পেরেও তা মেনে নিতে অস্বীকার করছে। শেখ হাসিনা সরকারের টানা দেড় দশকে দিল্লি বাংলাদেশের ভূখণ্ড, প্রটোকল, অর্থনৈতিক বাজার এবং ট্রানজিট সুবিধা একচেটিয়াভাবে ব্যবহার করেছে, যার বিনিময়ে বাংলাদেশ পেয়েছে সীমান্তে ফেলানীদের লাশ, অসম তিস্তা চুক্তি আর বাণিজ্য বৈষম্য। সেই সময় বাংলাদেশকে ভারতের একটি ‘অঙ্গরাজ্য সমতুল্য’ প্রটোকলে মূল্যায়ন করার যে বদঅভ্যাস সাউথ ব্লকে তৈরি হয়েছিল, সেখান থেকে ভারতীয় নীতি-নির্ধারকেরা বের হতে পারছেন না।

ভারতের নীতি-নির্ধারকদের মনস্তত্ত্ব এখনো হাসিনাকেন্দ্রিক সেই পুরনো একপাক্ষিক অক্ষেই আটকে আছে। তারা ভুলে গেছে যে, গণ-অভ্যুত্থান ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে আজ এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। এই নতুন বাংলাদেশে সরকার পরিচালিত হয় জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছায়, দিল্লির সাউথ ব্লকের কোনো প্রেসক্রিপশনে নয়। ভারত যদি ভেবে থাকে যে আগের মতোই অবমূল্যায়ন আর অসৌজন্যমূলক প্রটোকল দিয়ে ঢাকাকে পদানত রাখা যাবে, তবে তারা মহা ভুলের স্বর্গে বাস করছে।

দিল্লিকে বুঝতে হবে, ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ আর ২০০৯ বা ২০১৪ সালের জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল এবং বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত ভৌগোলিক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বাংলাদেশ আজ বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর মনোযোগের কেন্দ্রে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, যুক্তরাজ্য এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের উদীয়মান শক্তিগুলো এখন বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ স্তরের সার্বভৌম গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি সমমর্যাদার ভিত্তিতে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ রক্ষা করছে।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নতুন বাংলাদেশ আর কোনো একক দেশের ওপর নির্ভরশীল নয়। ভারত যখন একের পর এক কূটনৈতিক ভুল করছে, তখন বিশ্বরাজনীতিতে অন্যান্য পরাশক্তিগুলো বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামরিক সমীকরণে সমমর্যাদার সম্পর্কে এগিয়ে আসছে।

বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা, বাণিজ্য পথ এবং ভূরাজনৈতিক সুরক্ষার জন্য ভারতকে দিনশেষে বাংলাদেশের ওপরই নির্ভর করতে হবে। বাংলাদেশের আত্মসম্মানে আঘাত দিয়ে ভারত কেবল নিজের ভূরাজনৈতিক নিরাপত্তাকেই চরম ঝুঁকিতে ফেলছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিচিতি সব সময় দুই ধারায় বিভক্ত ছিল—একপক্ষ ছিল নতজানু ও দাসত্বপ্রবণ, আর অপরপক্ষ ছিল স্বাধীন, আত্মমর্যাদাশীল ও সার্বভৌম। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রথম বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন ও স্বাবলম্বী রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড় করিয়েছিলেন। তিনি কেবল সার্ক (SAARC) গঠনের মাধ্যমে আঞ্চলিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেননি, বরং বড় কোনো পরাশক্তির রক্তচক্ষুকে পরোয়া না করে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও সেই একই ধারাবাহিকতা রক্ষা করে প্রতিবেশীর সব ধরনের আধিপত্যবাদী মনস্তাত্ত্বিক চাপকে দৃঢ়ভাবে মোকাবেলা করেছিলেন।

তাদের যোগ্য উত্তরসূরি এবং আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পিতা-মাতার সেই বীরত্বপূর্ণ ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতির পথেই হাঁটছেন। তাঁর পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্রই হলো—সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে দাসত্ব নয়। দেশের কোটি কোটি জনগণের স্পষ্ট অনুভূতির প্রতিফলন ঘটিয়ে আজ প্রধানমন্ত্রীকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যে কূটনৈতিক কাঠামোয় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর রাষ্ট্রীয় পদবি দিতে ভারতের হাত কাঁপে, যে প্রটোকলে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকে কোনো আঞ্চলিক সংস্থার ছায়ায় ঢেকে দেওয়ার চক্রান্ত হয়—সেই আমন্ত্রণে সাড়া দেওয়া হবে শহীদ জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়ার আত্মমর্যাদাশীল নীতির পরিপন্থী। সুতরাং দেশের জাতীয় স্বার্থ এবং আত্মসম্মানকে বিকিয়ে দিয়ে কোনো প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ‘প্রহসনের বন্ধুত্ব’ বিএনপি বা তারেক রহমান কোনো দিন বরদাশ করেননি, ভবিষ্যতেও করবেন না।

আসন্ন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন হতে পারত বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে থমকে যাওয়া পারস্পরিক কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠন ও সুসংহত করার এক সোনালী সুযোগ। দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন, বিভ্রান্তি এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের মেঘ কাটিয়ে দুটি প্রতিবেশী দেশ সমমর্যাদার ভিত্তিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারত। ঢাকাও ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, যদি সমমর্যাদা নিশ্চিত হয়, তবে আন্তর্জাতিক স্বার্থে ভারত সফরে প্রধানমন্ত্রী ইতিবাচক চিন্তা করতে পারেন। কিন্তু দিল্লি তাদের ঐতিহ্যগত ‘দাদাগিরি’ ও আধিপত্যবাদী আচরণের কারণে সেই ঐতিহাসিক সুযোগটিকে ধূলিসাৎ করে দিল।

একটি শীর্ষ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দাওয়াত পাঠানোর মতো সংবেদনশীল বিষয়েও তারা যে সংকীর্ণতা ও কূটচালের পরিচয় দিয়েছে, তা প্রমাণ করে যে ভারত এখনো সম মর্যাদার প্রতিবেশীকে গ্রহণ করতে মানসিকভাবে প্রস্তুত নয়। তারা সম্পর্ক উন্নয়ন বলতে বোঝায় আধিপত্য বজায় রাখা।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া কেমন হওয়া উচিত? কূটনীতিতে নীরবতা অনেক সময় সম্মতির লক্ষণ হিসেবে গণ্য হয়। তাই ভারতের এই অরুচিকর এবং অপমানজনক আমন্ত্রণের বিপরীতে নমনীয়তা দেখানোর কোনো সুযোগ বাংলাদেশের সামনে নেই।

বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিত অবিলম্বে ভারতের এই দাওয়াতপত্রকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রটোকলবিরোধী আখ্যা দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করা।প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে নয়াদিল্লি সফর থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা উচিত।

নয়াদিল্লিকে পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিতে হবে যে, বিমসটেক চেয়ার হিসেবে নয়, বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সমমর্যাদা দেওয়া হলেই কেবল ভবিষ্যতে কোনো দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক সম্মেলনে বাংলাদেশ অংশ নেবে।

ভারত সফর থেকে বিরত থাকা কোনো আবেগী সিদ্ধান্ত হবে না, বরং এটি হবে আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভাষায় একটি অতি শক্তিশালী ‘কূটনৈতিক প্রতিবাদ’ (Diplomatic Protest)। সাউথ ব্লককে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে যে—’নতুন বাংলাদেশ’ তার আত্মসম্মান, প্রটোকল এবং সার্বভৌম মর্যাদার প্রশ্নে কোনো আপস করবে না।

পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশের জনগণ ভারতের সঙ্গে একটি সুসংহত, সুস্থ ও বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী সম্পর্ক চায়, কিন্তু তা হতে হবে সমমর্যাদা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে। কোনো প্রটোকলভিত্তিক কারসাজি বা কূটনৈতিক হেয় করার প্রয়াস বাংলাদেশের সচেতন জনগণ মেনে নেবে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি দেশবাসীর আজ পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তিনি যদি দিল্লির এই অপমানজনক দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে ভারত সফর থেকে বিরত থাকেন, তবে তা হবে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও জাতীয় আত্মমর্যাদা সমুন্নত রাখার ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। দিল্লির এই অসৌজন্যমূলক ও আধিপত্যবাদী আচরণের এর চেয়ে কঠোর, সময়োপযোগী এবং সমুচিত জবাব আর কিছুই হতে পারে না।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

গ্রামীণ জীবনের গল্পে কেন এতটা আপন হয়ে উঠেছিলেন ফারুক

বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৫৩ অপরাহ্ণ
গ্রামীণ জীবনের গল্পে কেন এতটা আপন হয়ে উঠেছিলেন ফারুক

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে অনেক নায়ক এসেছেন, জনপ্রিয়তাও পেয়েছেন। তবে গ্রামীণ মানুষের আবেগ, জেদ, প্রতিবাদ আর ভালোবাসাকে পর্দায় এতটা সহজ-স্বাভাবিকভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন—এমন শিল্পীর সংখ্যা খুবই কম। তাঁদের মধ্যে আকবর হোসেন পাঠান ফারুক ছিলেন অন্যতম।

১৯৭১ সালে এইচ আকবর পরিচালিত ‘জলছবি’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় ফারুকের। তবে দর্শকের বড় পরিসরে পরিচিতি পান খান আতাউর রহমানের ‘সুজন সখী’ দিয়ে। ১৯৭৫ সালের এই সিনেমায় ‘সুজন’ চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকের মনে আলাদা জায়গা করে নেয়।

এরপর আমজাদ হোসেনের ‘নয়নমনি’ সিনেমায় ‘নয়ন’ চরিত্রে অভিনয় করে আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। গ্রামীণ এক তরুণের আবেগ, সরলতা ও প্রতিবাদী মানসিকতাকে এমনভাবে পর্দায় তুলে ধরেছিলেন, যা তাঁকে দর্শকের আরও কাছে নিয়ে যায়।

সত্তর ও আশির দশকে ফারুক অভিনীত বেশ কয়েকটি সিনেমা বাংলা চলচ্চিত্রে বিশেষ জায়গা করে নেয়। ‘লাঠিয়াল’, ‘নয়নমনি’, ‘সুজন সখী’, ‘সারেং বউ’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘লাল কাজল’-এসব সিনেমায় তাঁর চরিত্রগুলো মূলত গ্রামীণ সমাজ ও সাধারণ মানুষের জীবনকে ঘিরে।

১৯৭৮ সালের ‘সারেং বউ’ সিনেমায় ‘কদম সারেং’ চরিত্রে তাঁর অভিনয়ও দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলে। আর ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ সিনেমার শেষদিকে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত মিলনের যন্ত্রণা ফুটিয়ে তোলার দীর্ঘ দৃশ্যটি তাঁর অভিনয় প্রতিভার অন্যতম উদাহরণ হয়ে আছে।

চলচ্চিত্র বিশ্লেষক ও নির্মাতা মতিন রহমানের মতে, ফারুক গ্রামীণ মানুষের জেদ, তাড়না ও প্রতিবাদের ভাষা খুব সহজাতভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে পারতেন। তাঁর অভিনয়ের এই স্বাভাবিক ভঙ্গিই তাঁকে সমসাময়িক অনেক শিল্পীর থেকে আলাদা করেছে।

ফারুক শুধু পর্দার নায়ক ছিলেন না, দর্শকের কাছে হয়ে উঠেছিলেন পরিবারের একজনের মতো। তাঁর আচরণ, কথা বলার ধরন ও চরিত্র ধারণের স্বাভাবিকতার কারণেই দর্শক তাঁকে ভালোবেসে ‘মিয়া ভাই’ নামে ডাকতে শুরু করেন।

চাষী নজরুল ইসলাম তাঁকে নিয়ে নির্মাণ করেন ‘মিয়া ভাই’ সিনেমা। সময়ের সঙ্গে ডাকনামটিও যেন তাঁর জনপ্রিয় পরিচয়ের অংশ হয়ে যায়।

মজার বিষয় হলো, ফারুকের জন্ম মানিকগঞ্জের ঘিওরের একটি গ্রামে হলেও তাঁর বেড়ে ওঠা মূলত পুরান ঢাকায়। সেখানে নাটক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত শিল্পী-নির্মাতাদের সংস্পর্শে আসেন তিনি।

পুরান ঢাকার লালকুঠির সাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে মেলামেশা তাঁর অভিনয়জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিভিন্ন এলাকার মানুষের কথাবার্তা, আচরণ ও জীবনযাপন কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে সিনেমার গ্রামীণ চরিত্রগুলোতে সেই অভিজ্ঞতার ছাপ দেখা যায়।

আশির দশকের শেষদিকে বাংলাদেশের সিনেমায় গ্রামীণ গল্পের সংখ্যা কমতে শুরু করে। ধীরে ধীরে শহুরে জীবন, চাকচিক্য ও আধুনিকতার গল্প জায়গা নেয় পর্দায়।

ফলে ফারুকের মতো শিল্পীদের জন্য যে ধরনের চরিত্র তৈরি হতো, সেসবও কমে যায়। চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, গ্রামীণ গল্পের সংখ্যা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ধরনের স্বতন্ত্র নায়ক তৈরির সুযোগও কমেছে।

ফারুকের ক্যারিয়ারের বড় অংশজুড়ে থাকা গ্রামীণ চরিত্রগুলো তাই শুধু তাঁর অভিনয়জীবনের স্মৃতি নয়, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের একটি বিশেষ সময়েরও প্রতিচ্ছবি।

অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে ‘লাঠিয়াল’ সিনেমার জন্য ১৯৭৫ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতার পুরস্কার পান ফারুক। পরে ২০১৬ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা লাভ করেন তিনি।

অভিনয়ের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন এই অভিনেতা।

২০২৩ সালের ১৫ মে ৭৪ বছর বয়সে মারা যান ফারুক। কিন্তু তাঁর অভিনীত নয়ন, সুজন, কদম সারেং কিংবা মিলনের মতো চরিত্রগুলো এখনো বাংলাদেশের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের স্মৃতিতে জীবন্ত।

ফারুকের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো এখানেই—তিনি শুধু সিনেমায় গ্রামের মানুষের চরিত্রে অভিনয় করেননি, বরং সেই মানুষগুলোর আবেগকে দর্শকের নিজের জীবনের গল্প করে তুলেছিলেন।

কালের আলো/এসএ

জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যেতে হবে: সংস্কৃতি মন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৪৮ অপরাহ্ণ
জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যেতে হবে: সংস্কৃতি মন্ত্রী

বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও বৈচিত্র্যকে ধারণ করে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে সূচিপত্র প্রকাশিত মারুফ কামাল খানের লেখা ‘রাজনীতির সদরে-অন্দরে’ বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, ‘সমাজে নানা ধরনের চিন্তা, মত ও আদর্শের মানুষ থাকবে। পাহাড় ও সমতলে যেমন বৈচিত্র্য রয়েছে, তেমনি মানুষের চিন্তা ও আদর্শেও পার্থক্য থাকতে পারে। এই বৈচিত্র্যের মধ্যেই ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমরা ‘ইউনিটি ইন ডাইভার্সিটি’ চাই। বাংলাকে আমাদের যাত্রাভূমি হিসেবে নিয়ে দেশকে বিশ্বের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড় করাতে চাই।’

তিনি বলেন, ‘বাংলার ইতিহাস হাজার হাজার বছরের পুরোনো। একসময় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ জ্ঞান, শিক্ষা ও সমৃদ্ধির সন্ধানে বাংলায় আসতেন। এই ভূখণ্ডের ঐতিহ্য, সৌন্দর্য ও সমৃদ্ধি ছিল এমন যে, এখানে আসা মানুষ সহজে ফিরে যেতে চাইতেন না। ঐতিহাসিক নানা কারণে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়লেও সঠিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারলে এই বাংলাই সমকালীন পৃথিবীতে, অন্তত এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ দেশে পরিণত হতে পারে।

মন্ত্রী বলেন, ‘জাতীয় অর্থনীতি ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। ঐক্য ও বৈচিত্র্যকে ধারণ করেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে হবে।’

মারুফ কামাল খানের সাহিত্য ও সাংবাদিকতা প্রসঙ্গে নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, মারুফ কামাল খান শুধু একজন কবি নন, তিনি কথাসাহিত্যিক ও চিন্তাশীল লেখক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। তার লেখালেখির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ ‘রাজনীতির সদরে-অন্দরে’ বইয়ে উঠে এসেছে। এ কারণেই বইটি পাঠকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তিনি আরও বলেন, বইটি শুধু ব্যক্তিগত সংগ্রহে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের বিভিন্ন পাঠাগারে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মাধ্যমে বাংলাদেশের সব লাইব্রেরিতে বইটি পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বক্তারা মারুফ কামাল খানের দীর্ঘ সাংবাদিকতা, সাহিত্যচর্চা ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

আইফোন ১৮ প্রোর গোপন তথ্য ডার্ক ওয়েবে, অ্যাপলের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৪২ অপরাহ্ণ
আইফোন ১৮ প্রোর গোপন তথ্য ডার্ক ওয়েবে, অ্যাপলের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

অ্যাপলের নতুন আইফোন ১৮ প্রো বাজারে আসার আগেই এর গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য ডার্ক ওয়েবে ফাঁস হয়েছে। মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটির ভারতীয় সরবরাহকারী টাটা ইলেকট্রনিকসের সিস্টেমে সাইবার হামলার পর চুরি হওয়া নথির মধ্যে আসন্ন আইফোনটির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য ও কিছু ছবি প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

রয়টার্সের পর্যালোচনা করা নথিগুলোতে আইফোন ১৮ প্রোর শত শত যন্ত্রাংশের তথ্য রয়েছে বলে জানা গেছে। এসব নথিতে বিভিন্ন যন্ত্রাংশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের নামও রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান সার্কিট বোর্ডের চিপ, ব্যাটারি ও ক্যামেরার বিভিন্ন অংশের তথ্য রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফাঁস হওয়া তথ্য থেকে অ্যাপল কোন যন্ত্রাংশের জন্য কোন সরবরাহকারীর ওপর নির্ভর করছে, সে সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যেতে পারে। বিষয়টি অ্যাপলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রতিষ্ঠানটি সাধারণত সরবরাহকারী ও যন্ত্রাংশসংক্রান্ত এ ধরনের তথ্য কঠোরভাবে গোপন রাখে।

চুরি হওয়া ফাইলগুলোর মধ্যে আইফোনের ড্রপ-টেস্টের ছবিও রয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স। ছবিতে ধূসর রঙের একটি বার আকৃতির স্মার্টফোন, পেছনে তিনটি ক্যামেরা এবং অ্যাপলের লোগো দেখা যায়।

তবে রয়টার্স জানিয়েছে, ছবিতে থাকা ফোনটির মডেল নম্বর তারা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি। অবশ্য বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র দাবি করেছে, ছবিগুলো আইফোন ১৮ প্রো মডেলের।

ঘটনার সূত্রপাত টাটা ইলেকট্রনিকসের সিস্টেমে সাইবার হামলা থেকে। জুনে প্রতিষ্ঠানটি তাদের কয়েকটি সিস্টেমে সাইবার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনা শনাক্ত করার কথা জানায়। এর আগে সাইবার নিরাপত্তা গবেষকেরা জানিয়েছিলেন, World Leaks নামের একটি র‍্যানসমওয়্যার গোষ্ঠী টাটা ইলেকট্রনিকসের চুরি করা তথ্য ডার্ক ওয়েবে প্রকাশ করেছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই গোষ্ঠী ২ লাখের বেশি ফাইল প্রকাশ করেছে বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন। এসব ফাইলের মধ্যে অ্যাপল ও টেসলার সঙ্গে সম্পর্কিত নথিও থাকার দাবি করা হয়। তবে প্রকাশিত সব তথ্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ফাঁসের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ শুধু নতুন আইফোনের তথ্য প্রকাশ নয়। সরবরাহকারী ও যন্ত্রাংশের তালিকা প্রকাশ পাওয়ায় অ্যাপলের বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান, নকল পণ্য প্রস্তুতকারী ও অন্যান্য ব্যবসায়িক পক্ষের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অ্যাপল বিষয়টি তদন্ত করছে বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে। একই সময়ে টাটা ইলেকট্রনিকস সংবেদনশীল সিস্টেমে অভ্যন্তরীণ প্রবেশাধিকার সীমিত করেছে এবং নিরাপত্তা জোরদারে পদক্ষেপ নিয়েছে।

ঘটনাটি নিয়ে ভারত সরকারও তদন্ত শুরু করেছে। ভারতের ইলেকট্রনিকস ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব এস কৃষ্ণন ৩ জুলাই সাংবাদিকদের জানান, টাটা ইলেকট্রনিকসের তথ্য ফাঁসের বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।

এদিকে আইফোন ১৮ প্রো ও ১৮ প্রো ম্যাক্স ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে উন্মোচিত হতে পারে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। তবে অ্যাপল এখনো নতুন মডেলগুলোর আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করেনি।

কালের আলো/এসএ