খুঁজুন
                               
, ,
           

নারীবান্ধব গণপরিবহনের পথে বাংলাদেশের নতুন যাত্রা

আহসান হাবিব বরুন:
প্রকাশিত: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ৯:২৭ অপরাহ্ণ
নারীবান্ধব গণপরিবহনের পথে বাংলাদেশের নতুন যাত্রা

দক্ষিণ এশিয়ার মেগাসিটিগুলোর নগর-জীবনের সবচেয়ে বড় এবং সুদূরপ্রসারী চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো নারীবান্ধব ও নিরাপদ গণপরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা, যা বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যা এবং জনসংখ্যার ঘনত্বের নিরিখে অন্যতম ব্যস্ত এক প্রান্তর, সেখানে নারীদের জন্য প্রতিদিনের গণপরিবহন ব্যবহার যেন এক নিরন্তর সংগ্রাম। কর্মক্ষেত্রে নারীদের বিপুল অংশগ্রহণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে তাদের চালিকাশক্তি হওয়ার সত্ত্বেও, সড়কে তাদের যাতায়াতের বাস্তবতা বহু বছর ধরেই চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ভোগান্তিতে আচ্ছন্ন। ঠিক এই প্রেক্ষাপটে, নবনির্বাচিত বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) রাজধানীতে চালু করতে যাচ্ছে নারীদের জন্য বিশেষ ‘পিংক বাস সার্ভিস’। নারী চালক ও নারী কন্ডাক্টর দ্বারা পরিচালিত এই উদ্যোগটি আপাতদৃষ্টিতে একটি যুগান্তকারী সামাজিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তবে নীতি-বিশ্লেষণ ও আন্তর্জাতিক নগর-পরিবহন ব্যবস্থার অভিজ্ঞতার আলোকে প্রশ্ন থেকে যায়—এই ‘গোলাপি বাস’ কি ঢাকার পরিবহন খাতের গভীরে গেড়ে বসা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য ও নিরাপত্তা সংকটের একটি পূর্ণাঙ্গ সমাধান, নাকি নিছকই একটি প্রতীকী সংস্কার?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণের একটি ধারা লক্ষ করা যাচ্ছে। ১৬ আগস্ট পাঠানো বিআরটিসির সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ১৮ আগস্ট তেজগাঁওয়ের বিআরটিসি ট্রাক ডিপো প্রাঙ্গণে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম আনুষ্ঠানিকভাবে এই বাস সার্ভিসের উদ্বোধন করবেন। এই অনুষ্ঠানে সরকারের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারকদের উপস্থিতিও স্পষ্ট করে যে, নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাদের নারী ক্ষমতায়ন ও নিরাপদ যাতায়াতের প্রতিশ্রুতি দ্রুত দৃশ্যমান করতে আগ্রহী।

রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই পদক্ষেপ অত্যন্ত কৌশলগত। ইশতেহারের একটি স্পষ্ট প্রতিশ্রুতিকে ক্ষমতার সূচনালগ্নেই নীতিগত পদক্ষেপে রূপান্তর করা জনমনে ইতিবাচক বার্তা পাঠায়। তদুপরি, এই সার্ভিসে চালক ও কন্ডাক্টর হিসেবে নারীদের পদায়ন কেবল নারীদের জন্য পৃথক আসন নিশ্চিত করছে না, বরং পরিবহন খাতের ঐতিহ্যগত পুরুষকেন্দ্রিক শ্রমবাজারে নারীদের সরাসরি অন্তর্ভুক্তির এক বলিষ্ঠ দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে।

একটি নিরাপদ শহর গড়ে তোলার প্রধান শর্ত হলো এর গণপরিবহনে নারীদের অবাধ ও হয়রানিমুক্ত চলাচলের স্বাধীনতা। তবে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ও স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সাম্প্রতিক গবেষণা চিত্রটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক:

একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার গণপরিবহনে যাতায়াতকারী নারীদের ৮৫ থেকে৯০ শতাংশের বেশি জীবনে কোনো না কোনো সময় শারীরিক বা মৌখিক হয়রানির শিকার হয়েছেন। ভিড়ের সুযোগে স্পর্শকাতর আচরণ, অশালীন মন্তব্য এবং চালক বা সহকারী দ্বারা নিগ্রহের ভয় প্রতিনিয়ত নারী যাত্রীদের তাড়া করে ফেরে।

সাধারণ বাসগুলোতে নারীদের জন্য মাত্র কয়েকটি সংরক্ষিত আসন থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুরুষ যাত্রীরা বাসের অনভিপ্রেত ভিড়ের মধ্যে এসব আসন দখল করে রাখেন অথবা সেখানে বসতে চাওয়া নারীদের মানসিকভাবে হেনস্তা করা হয়।

চলাচলের অনিরাপত্তা নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক জীবনে অংশগ্রহণের সুযোগকে সীমিত করে দেয়। অনেক নারী নিরাপত্তাহীনতার কারণে ভালো কর্মসংস্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হন অথবা যাতায়াতের জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে সিএনজি অটোরিকশা বা রাইড-শেয়ারিংয়ের ওপর নির্ভরশীল হন।

এই জটিল বাস্তবতায় নারীবান্ধব ‘পিংক বাস সার্ভিস’ চালু হওয়া অবশ্যই একটি স্বস্তির নিঃশ্বাস। সম্পূর্ণ নারী পরিচালিত বাস সার্ভিস নারীদের জন্য এমন একটি ‘সেফ স্পেস’ বা নিরাপদ অঞ্চল তৈরি করবে, যেখানে অন্তত বাস ভ্রমণের পুরো সময়টাতে তাদের কোনো যৌন হয়রানি বা সামাজিক হেনস্তার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন থাকতে হবে না।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রধান শহরগুলোতে নারীদের জন্য পৃথক পরিবহন সার্ভিস চালুর সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। মেক্সিকো সিটি, টোকিও, কায়রো, জাকার্তা এবং পার্শ্ববর্তী ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে নারীদের জন্য বিশেষ বাস বা ট্রেন কোচ চালু করা হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করলে দুটি স্পষ্ট ধারা দেখা যায়:

১.স্বল্পমেয়াদে, নারীদের জন্য তৈরি এই ধরনের বিচ্ছিন্ন বা পৃথক ব্যবস্থা দারুণ ইতিবাচক ফল দেয়। নারী যাত্রীরা মানসিকভাবে নিরাপদ বোধ করেন এবং তাদের ওপর যৌন হয়রানির হার তাৎক্ষণিকভাবে কমে যায়। বিশেষ করে নারী চালক ও কন্ডাক্টর থাকার ফলে কর্মসংস্থানের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।

২.আন্তর্জাতিক নগর-বিজ্ঞানী ও জেন্ডার গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, কেবল ‘পিংক বাস’ বা ‘অনলি উইমেন’ সার্ভিস দিয়ে পুরো শহরের নিরাপত্তা সংকট দূর করা সম্ভব নয়। যদি সাধারণ ও মূলধারার গণপরিবহনে পুরুষদের মানসিকতা এবং আইনি প্রয়োগ ব্যবস্থা উন্নত না হয়, তবে এই বিশেষ সার্ভিস উল্টো নারীদের ‘বিচ্ছিন্ন’ করে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করে। মূলধারার বাসগুলো পুরুষদের একচেটিয়া অধিকারে পরিণত হতে পারে এবং সেখানে নারীদের যাতায়াত আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

এদিকে ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় বিআরটিসির অতীতের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এ ধরনের বিশেষ বা ছকভাঙা উদ্যোগ সূচনাতেই থেমে যাওয়ার এক ধরনের ঝোঁক থাকে। ইতোপূর্বেও নারীদের জন্য ‘লেডিস বাস’ চালু হয়েছিল, কিন্তু পর্যাপ্ত বাস না থাকা, নির্দিষ্ট রুটে সময়সূচি বজায় রাখতে না পারা এবং সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলো ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়ে। সুতরাং এই নতুন পিংক বাস সার্ভিসের সাফল্য নির্ভর করবে কয়েকটি প্রধান চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলার ওপর:

১.সীমিত সংখ্যক বাস ও রুট দিয়ে বিশাল ঢাকার নারী জনসংখ্যার চাহিদা মেটানো অসম্ভব।
পর্যাপ্ত বাস বরাদ্দ নিশ্চিত করা এবং প্রধান প্রধান কর্মজীবী রুটে ফ্রিকোয়েন্সি বাড়ানো।
২.ভারী যানবাহন চালনায় নারী চালকের স্বল্পতা এবং তাদের পেশাগত নিরাপত্তা। বিআরটিসির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ও উন্নত ট্রেনিং একাডেমি গড়ে তোলা এবং তাদের বিশেষ ভাতা নিশ্চিত করা।
৩.ঢাকার তীব্র যানজটে বাসের নির্দিষ্ট শিডিউল ধরে রাখা কঠিন। ডেডিকেটেড বাস লেইন (BRT) বা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বিশেষ অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা।
৪.কারিগরি ত্রুটি ও বিআরটিসির প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি। আধুনিক ডিপো সুবিধা এবং নিয়মিত গণতদারকির মাধ্যমে বাসের গুণমান ধরে রাখা।

আমি মনে করি,পিংক বাস সার্ভিসকে নিছক একটি প্রতীকী রাজনৈতিক সাফল্য থেকে একটি দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই নীতি সংস্কারে রূপান্তর করতে হলে সরকারকে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে:

পিংক বাসকে মূলধারার গণপরিবহন ব্যবস্থার একটি সহায়ক শাখা হিসেবে দেখতে হবে, একমাত্র সমাধান হিসেবে নয়। মূলধারার সাধারণ বাসগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, চালক ও কন্ডাক্টরদের জন্য নারীবান্ধব আচরণের ওপর বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ এবং যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা (যেমন: মোবাইল কোর্ট বা জরুরি হেল্পলাইন ৯৯৯-এর দ্রুত কার্যকারিতা) সুনিশ্চিত করতে হবে। কেবল বাস নারীবান্ধব হলেই চলবে না; বাস স্টপেজ, ফুটপাত এবং বাস সংযোগস্থলগুলোকে পর্যাপ্ত আলো, নিরাপত্তা কর্মী ও সিসিটিভির আওতায় এনে সার্বিকভাবে নিরাপদ করে তুলতে হবে।

পরিশেষে বলতে চাই,সরকারের এই নতুন উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় এবং ইতিবাচক এক দিকনির্দেশনা। তবে এটি যেন কেবল উদ্বোধনী বিজ্ঞাপনের চাকচিক্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর তদারকি এবং অবকাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে এই ‘পিংক বাস সার্ভিস’ যদি ঢাকার বুকে সফলভাবে সচল রাখা যায়, তবেই তা বাংলাদেশের পরিবহন ইতিহাসে জেন্ডার সমতা ও নাগরিক নিরাপত্তার এক নতুন স্বর্ণযুগের সূচনা করবে ইনশাল্লাহ।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

‘রাজনীতির সদরে-অন্দরে’ রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রবহমান ধারার দলিল: তথ্যমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ১১:০৬ অপরাহ্ণ
‘রাজনীতির সদরে-অন্দরে’ রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রবহমান ধারার দলিল: তথ্যমন্ত্রী

‘রাজনীতির সদরে-অন্দরে’ বইটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রবহমান ধারার একটি দলিল বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।

তিনি বলেছেন, বইটি শুধু সুখপাঠ্য নয়, রাজনৈতিক কর্মী, সমাজকর্মী ও সচেতন নাগরিকদের জন্য সংগ্রহে রাখার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। সূচিপত্র প্রকাশিত বইটি লিখেছেন দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশের সম্পাদক মারুফ কামাল খান।

অনুষ্ঠানে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বইটি পড়লে বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির নানা দিক সামনে আসে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এতে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রবহমান ধারাটি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। আঁকাবাঁকা ও জটিল পথ অতিক্রম করে রাজনীতি কীভাবে রূপান্তরিত, পরিবর্তিত ও বিবর্তিত হয়েছে, বইটির মাধ্যমে তা বোঝা যায়।

তিনি বলেন, মারুফ কামাল খান তার স্মৃতির ভান্ডার থেকে বইটিতে অনেক চরিত্র, ঘটনা ও পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন। সেখান থেকে রস আস্বাদন ও জ্ঞান আহরণ—দুটিই নির্ভর করবে পাঠকের ওপর।

তথ্যমন্ত্রী আরও বলেন, রাজনীতির সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক, রাজনীতির সঙ্গে বিভিন্ন বৃত্তের সম্পর্ক এবং রাজনীতির সঙ্গে মানুষের প্রবৃত্তির সম্পর্ক—সবই কমবেশি উঠে এসেছে বইটিতে।

তিনি বলেন, বইটির ব্যাপ্তিকালও কম নয়। প্রায় স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক চরিত্র এতে স্থান পেয়েছে। লেখক যেসব চরিত্রকে সামনে এনেছেন, তাদের নানা কথাবার্তা ও কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে মানুষের বিভিন্ন প্রবৃত্তিও ফুটে উঠেছে। কখনো সেখানে সুকুমারবৃত্তির পরিচয় পাওয়া গেছে, আবার কখনো তার বিপরীত চিত্রও সামনে এসেছে।

জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি তার বইটি আগেই সংগ্রহ করেছিলাম।

প্রকাশনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সূচিপত্রের প্রধান নির্বাহী ও প্রকাশক সাঈদ বারী। উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, সংসদ সদস্য ও জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক ও কবি আবদুল হাই শিকদার, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি কাদের গণি চৌধুরীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

কালের আলো/এম/এএইচ

দলের সিদ্ধান্ত ও আল্লাহর মেহেরবানিতেই রাষ্ট্রপতি প্রার্থী: মির্জা ফখরুল

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ৯:০১ অপরাহ্ণ
দলের সিদ্ধান্ত ও আল্লাহর মেহেরবানিতেই রাষ্ট্রপতি প্রার্থী: মির্জা ফখরুল

বিএনপি মনোনীত রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, তিনি কখনো ভাবেননি যে রাষ্ট্রপতি হবেন। দলের সিদ্ধান্ত ও মহান আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতেই রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর হেয়ার রোডে নিজের সরকারি বাসভবনে ঠাকুরগাঁও সাংবাদিক ফোরাম ঢাকার নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি এসব কথা বলেন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমি কখনো ভাবিনি যে রাষ্ট্রপতি হবো। এটা দলের এবং মহান আল্লাহর অশেষ মেহেরবানি। রাষ্ট্রপতি হলেও আমার ইচ্ছে আছে, আমি জনগণের পাশে থেকে সেবা করবো।’

তিনি আরও বলেন, ‘যতই ব্যস্ত থাকি না কেন, সবসময় জনগণের জন্য এবং এলাকার উন্নয়নে পাশে থাকবো।’

সাক্ষাৎকালে ঠাকুরগাঁও সাংবাদিক ফোরাম ঢাকার নেতারা বিএনপি মনোনীত রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অভিনন্দন জানান। এ সময় তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ায় মহান আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া আদায় করেন। পরে তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের খোঁজখবর নেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দেন।

সৌজন্য সাক্ষাতে সংগঠনের সভাপতি ও বাংলাদেশ প্রতিদিনের মানিক মুনতাসির, সাধারণ সম্পাদক ও সমকালের দেলোয়ার হোসেন, বাসসের প্রধান বার্তা সম্পাদক মানিকুল আজাদ, সহসভাপতি ও স্টার টিভির মাহবুব আলম রাজ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কালবেলার শফিকুল ইসলাম, অর্থ সম্পাদক ও বাসসের জাহাঙ্গীর আলম, সাংগঠনিক সম্পাদক ও ৭১ টেলিভিশনের আব্দুল লতিফ, প্রচার সম্পাদক ও জিটিভির সাজ্জাদ হোসেন এবং নারী বিষয়ক সম্পাদক ও নিউজ টোয়েন্টিফোরের মোছা. শিউলী বেগম নাহিদ উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া সংগঠনের কার্যনির্বাহী সদস্য ৭১ টেলিভিশনের নূর তাজমিন নীর, স্টার টিভির ফরহাদ বিন নূর, কালের কণ্ঠের মো. নবাব শরীয়তুল্লাহ (সৌম্য সরকার), সাম্প্রতিক দেশকালের নাসরিন আখতার, যুগান্তরের ইমরান খান, চ্যানেল আইয়ের তাফহিমুল ইসলাম ও নিউজ এজেন্সি এবিপির বিশেষ প্রতিনিধি আবু সাঈদ উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে সংগঠনের উপদেষ্টা ও সিনিয়র সাংবাদিক মশিউর রহমান, প্রথম আলোর তুহিন সাইফুল্লাহ এবং বাসসের জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক মাহাবুর আলম সোহাগও উপস্থিত ছিলেন।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

অর্থবছরের সময় বদলের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত

মোস্তফা কামাল:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ৮:৫৯ অপরাহ্ণ
অর্থবছরের সময় বদলের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত

দেশের প্রথাগত অর্থবছরের সময়কাল বদলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। জুলাই টু জুনের বদলে অর্থবছরের নতুন সময়কাল হবে এপ্রিল টু মার্চ । আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরকে ট্রানজিশনাল অর্থবছর হিসেবে বিবেচনা করে ৯ মাসে অর্থবছর (জুলাই-মার্চ) শেষ করা হবে। এরপর ২০২৮-২৯ নতুন অর্থবছর (এপ্রিল-মার্চ) অনুযায়ী সরকারের সব কার্যক্রম শুরু করা হবে। পাকা সিদ্ধান্ত হয়েছে মন্ত্রি পরিষদে। তা কার্যকরের আগে, অর্থবছর পরিবর্তনের সঙ্গে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় যুক্ত বিভিন্ন সিস্টেমে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আনতে হবে। চেঞ্জমেকিং বা নতুন বন্দোবস্তের চিন্তা-মেধা সবার হয় না। সেই উদ্যোগ নেয়ার সাহসও সবার হয় না। অর্থবছর বদলানো কেবল ক্যালেন্ডারের কয়েকটি পাতা উল্টে দেওয়া নয়। জুলাইর জায়গায় এপ্রিল, জুনের জায়গায় মার্চ নিয়ে আসা নয়। রাষ্ট্রের অর্থবছর কোনো সাধারণ ক্যালেন্ডার নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাজেট, উন্নয়ন প্রকল্প, রাজস্ব আদায়, সরকারি ব্যয়, কৃষি, ব্যবসা বাণিজ্য, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, করব্যবস্থা, সরকারি হিসাবরক্ষণ এবং শেষ পর্যন্ত নাগরিকের জীবন।

আমাদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বড় অংশ বাস্তবায়নের তৎপরতা দেখা যায় অর্থবছরের শেষ দিকে। ফলে জুনের শেষ মুহূর্তে প্রকল্প বাস্তবায়নের যে তাড়াহুড়া, তার সঙ্গে যখন বর্ষার পানি যুক্ত হয়, তখন তৈরি হয় এক অদ্ভুত বাস্তবতা। যে রাস্তা শুকনো মৌসুমে করার কথা, সেটি করা হচ্ছে বৃষ্টির মধ্যে। যে বাঁধের কাজ আগে শেষ হওয়ার কথা, সেটি চলছে নদীর পানি বাড়ার সময়। যে অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বছরের শুরুতেই অর্থ বরাদ্দ ছিল, সেটির বড় অংশের কাজ শুরু হচ্ছে অর্থবছরের শেষ কয়েক মাসে। তখন প্রশ্ন ঘোরে এ উন্নয়ন কতো দিনের? এ কথাও সত্য বাংলাদেশের সমস্যা শুধু অর্থবছরের সময়সূচিতে নয়। সমস্যা আরো অনেক জায়গায়। প্রকল্প পরিকল্পনা, ক্রয়প্রক্রিয়া, অনুমোদনব্যবস্থা, জমি অধিগ্রহণ, দরপত্র, ঠিকাদারি ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প পরিচালনা, তদারকি এবং জবাবদিহিতায় অনেক ঘাটতি।

প্রকৃতিতভাবে জুলাই-আগস্টে অর্থাৎ বর্ষাকালে অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম চলে। এতে একদিকে কাজ দীর্ঘায়িত হয়, কাজের গুণগত মানও নষ্ট হয়। সেইসাথে হয় জনদুর্ভোগ। এপ্রিল–মার্চ সময়কে অর্থবছর হিসেবে ব্যবহার করা হলে বর্ষার আগেই অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রম শেষ করা যাবে। অর্থ বছরের এমন সময় বদল একটা বহুল-প্রতিক্ষীত পরিবর্তন। বাংলা ক্যালেন্ডার ধরে পহেলা বৈশাখ থেকে ৩০ চৈত্র অর্থবছর ধরার একটা দাবিও ঘুরছিল অনেক দিন ধরে। যা করা হয়েছে তাও বাংলা ক্যালেন্ডারের কাছাকাছিই। বেসরকারিভাবে গ্রাম-বাংলার দোকান-পাট অর্থাৎ হালখাতা ও জমির খাজনা পরিশোধ করা হচ্ছে বৈশাখ-চৈত্র মাসে অর্থাৎ এপ্রিল- মার্চ মাসে। এ প্রথাটি মোঘল সম্রাট আকবরের চিন্তার জের। মোগল সম্রাট আকবরের আমলে বাংলা নববর্ষ চালু হয়। রাজস্ব আহরণের দৃষ্টিকোণ থেকে তখন অর্থবর্ষ গণনা শুরু হয় এপ্রিল মাসে। পরে উপনিবেশ আমলে ১৮৬০ সালের ৭ এপ্রিল ভারতের প্রথম বাজেট দেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির স্কটিশ অর্থনীতিবিদ জেমস উইলসন। তখন থেকে এপ্রিল মাসে অর্থবছরের শুরু হয়। এই ব্যবস্থা চলে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ পর্যন্ত। পরে ভারত এপ্রিল–মার্চ সময়কালকে নিজেদের অর্থবছর হিসেবে বজায় রাখে। অন্যদিকে পঞ্চাশের দশকে পাকিস্তান অর্থবছরের সময়কাল পরিবর্তন করে জুলাই–জুন ধরে অর্থবছর গণনা শুরু করে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে একই ধারা বজায় রেখে জুলাই–জুন সময় ধরেই অর্থবছর গণণা অব্যাহত রাখা হয়।

সময়ের বিবর্তনে খোদ ব্রিটেন তাদের অর্থবছর তিন মাস এগিয়ে এনে এপ্রিলে স্থিত করেছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, শ্রীলংকা এবং নেপাল তাদের অর্থ বছর পাল্টিয়ে ৬ মাস এগিয়ে এনেছে। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই জানুয়ারি–ডিসেম্বর সময়কাল ধরেই অর্থবছর হিসাব করা হয়। বিশেষ করে উন্নত দেশে এটি বেশি। জানুয়ারি–ডিসেম্বর সময়কাল ধরে অর্থবছর গণনা করা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, জার্মানি, ফ্রান্স, ব্রাজিল, রাশিয়া, কোরিয়া। পার্শ্ববর্তী শ্রীলঙ্কাও জানুয়ারি–ডিসেম্বর ধরেই অর্থবছরের সব হিসাব–নিকাশ করে। অন্যদিকে জুলাই–জুন ধরে যেসব দেশ অর্থবছর হিসাব করে, সেসব দেশের মধ্যে আছে অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, নেপাল, পাকিস্তান। আর এপ্রিল–মার্চ অর্থবছরের দেশগুলো মধ্যে আছে ভারত, যুক্তরাজ্য। তবে অনেক দেশে কর দেওয়ার সময় এবং অর্থবছরের সময়ের মধ্যে ভিন্নতা আছে।

অর্থবছর হলো সরকারের আর্থিক হিসাবের এক বছর। এই অর্থবছর ধরেই সরকার কত আয় করবে, কত খরচ করবে, তা নিয়ে বাজেট করে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য বরাদ্দও অর্থবছর হিসাবেই দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী বাজেট বাস্তবায়ন করে। অর্থবছরের নতুন সময়কাল বাস্তবায়ন শুরু হলে কেবল সরকারি পরিকল্পনায়ই পরিবর্তন আসবে না। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনায়ও আসবে নতুন সময়সূচি। এ ছাড়া মানুষের জীবনে প্রতিবছরের আয়–ব্যয়ের হিসাব, কর ব্যবস্থাপনাসহ বেশ কিছু পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতেই হবে। প্রভাব পড়বে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাব–নিকাশেও। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ও প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি), শুল্ক–কর, বিনিয়োগ, দেশি–বিদেশি ঋণ ও দায়দেনা, সরকারি প্রতিষ্ঠানের লাভ–লোকসানের হিসাব অর্থবছর ধরেই করা হয়। এসব বিবেচনায় নিয়েই মন্ত্রিসভার বৈঠকে অর্থবছরের সময়কাল পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ সংক্রান্ত তেমন আগাম তথ্য ছিল না গণমাধ্যমে। সরকার চায় উন্নয়ন প্রকল্পের কর্মকাণ্ডে গতি বাড়াতে। নতুন সময়কালে, অর্থাৎ এপ্রিল–মার্চ অর্থবছরে বাজেট কার্যকর করা হলে অর্থবছর শুরু হবে গ্রীষ্মের শুরুতে। ফলে এপ্রিল–জুনের শুকনো মৌসুমেই নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

এ ছাড়া প্রতিবছরই দেখা যায়, অর্থবছরের শেষ সময়ে উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা খরচ বেড়ে যায়। বিশেষ করে জুন মাসে তড়িঘড়ি করে কাজ শেষ করেন অনেক ঠিকাদার। এভাবে কাজ করে বিল তুলে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে প্রতিবছরই। জুনে বৃষ্টির কারণে অনেক সময় কাজের মানও ঠিক থাকে না। অর্থবছরের শুরুতেই এপ্রিল মাস থেকে অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ শুরু করা গেলে অর্থবছরের শেষ চার–পাঁচ মাসে (নভেম্বর–মার্চ) শুষ্ক মৌসুমে উন্নয়ন প্রকল্পের কাজে গতি বাড়ানো সম্ভব হবে। সড়ক, সেতু, ভবনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে বর্ষার বাধা কিছুটা কমবে বলেও আশা করা যায়। এ ছাড়া অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের প্রায় পুরোটাই শুষ্ক মৌসুম হওয়ায় শেষ মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে দেখিয়ে টাকা তুলে নেওয়ার প্রবণতাও কমতে পারে। প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কী হবে? অবশ্যই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাব–নিকাশও পরিবর্তন করতে হবে। করব্যবস্থা ও কোম্পানির হিসাবের সঙ্গে নতুন অর্থবছরের সামঞ্জস্য করতে হবে। বড় বড় প্রতিষ্ঠান তাদের হিসাব–নিকাশের সফটওয়্যারে আপডেট আনতে হবে। এতে নতুন করে কিছু খরচ বাড়বে, প্রাপ্তিও ঘটবে। সাধারণ মানুষও পরিবর্তনের তাগিদ পাবে। এতে তাদের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি বড় কোনো পরিবর্তন হবে না। করবর্ষ ও অর্থবছর এক হওয়ায় ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের আয়কর গণনার সময় বদলে যাবে। এখন জুলাই–জুন সময়ের আয়ের ওপর কর দিতে হয়। আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময়সূচিতে কিছুটা পরিবর্তন আসবে। নতুন ব্যবস্থায় এপ্রিল–মার্চ সময়ের ওপর ভিত্তি করে রিটার্ন জমা ও কর দিতে হবে।

সামগ্রিক বিবেচনায় ১ এপ্রিল–৩১ মার্চ করার সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। বর্ষাকালের সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সূচির অসামঞ্জস্য কমিয়ে প্রকল্পের গতি ও মান বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। শুধু অর্থবছরের সময়সূচি বদলালেই উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতি, অর্থছাড়ে বিলম্ব বা দুর্বল বাস্তবায়ন সক্ষমতার মতো দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো দূর হবে না। বরং নতুন কাঠামো কার্যকর করতে বাজেট প্রণয়ন, রাজস্ব আদায়, সরকারি হিসাব ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বড় ধরনের সমন্বয় প্রয়োজন হবে। তাই এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক সংস্কার হিসেবে দেখার পাশাপাশি এর বাস্তবায়ন কতটা পরিকল্পিত ও দক্ষ হচ্ছে, সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি, জবাবদিহি ও তদারকি নিশ্চিত করা গেলে অর্থবছর পরিবর্তন দেশের উন্নয়ন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে। এমন আশাবাদ ও উচ্চ্বাশার সমান্তরালে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে সত্য। একটি দেশে ৫৫ বছর পর অর্থবছরের সময়সীমায় পরিবর্তনের একটি উদ্যোগ খাপ খাওয়াতে একটু সময় লাগবে সত্য। সময় পরিবর্তনের পাশাপাশি রাজস্ব আদায়, সরকারি হিসাব পরিচালনা, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, সরকারি ক্রয় ও অর্থছাড় ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার দিনে দিনে চলে আসবে, তা ভাবা যায় না। প্রত্যাশিত সুফল পেতে সময় লাগবে। অর্থবছর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাজেট প্রণয়ন, রাজস্ব আদায়, করব্যবস্থা, সরকারি হিসাবরক্ষণ, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও অর্থছাড়ের পদ্ধতিতে কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন হবে, সেই হোম ওয়ার্ক সরকার করেছে। প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় আনার আগে বিভিন্ন পর্যায়ে মতামত নেওয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের অনেকে প্রকল্প অনুমোদন, দরপত্র প্রক্রিয়া, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, অর্থছাড়, সরকারি ক্রয় এবং বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের পুরো কাঠামোয় সংস্কারের তাগিদ দিয়েছেন। প্রকল্পের শুরুতেই সঠিক পরিকল্পনা এবং সময়মতো অর্থছাড় নিশ্চিত করতে বলেছেন। বারবার মেয়াদ বাড়ানোর প্রবণতা রুখতে বলেছেন।

রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নানা দুর্বলতার কারণে প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রতা যেন না হয় সে ব্যাপারে সরকারকে কঠোর হতে হবে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতার সামঞ্জস্য আনতে হবে। বলাই বাহুল্য শিল্প, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতো কিছু মন্ত্রণালয় ঐতিহাসিকভাবেই বাজেট বাস্তবায়নে দুর্বল। আবার স্থানীয় সরকার ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মতো কিছু মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন সক্ষমতা তুলনামূলক ভালো। এসব ফের কমাতে হবে। বাজেট বাস্তবায়নের বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আগে ব্যয় কাঠামোয় সংস্কার আনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সেইসথে প্রতিটি প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। মনে করার দরকার রয়েছে, ২০১০ সালেও জুলাই-জুনের পরিবর্তে অন্য সময়সীমায় অর্থবছর নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। এবারের প্রেক্ষিত ভিন্ন। নতুন বাংলাদেশ, রূপান্তরিত বাংলাদেশের কথা মুখে মুখে সবাই বলছেন। এবার বাস্তব দেখার অপেক্ষা।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন।