খুঁজুন
                               
, ,
           

সার্বভৌমত্ব ও বিচারিক মর্যাদা রক্ষায় দিল্লিকে ঢাকার কূটনৈতিক বার্তা

ড. মোঃ মিজানুর রহমান:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৫০ অপরাহ্ণ
সার্বভৌমত্ব ও বিচারিক মর্যাদা রক্ষায় দিল্লিকে ঢাকার কূটনৈতিক বার্তা

সম্প্রতি ভারতের প্রতি বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক প্রতিবাদ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এই প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভারত অবস্থানকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে প্রকাশ্য বক্তব্য এবং গণমাধ্যমে সরাসরি অংশগ্রহণ। বাংলাদেশের সরকারি অবস্থান অনুযায়ী, তিনি বর্তমানে বিচারাধীন; তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে এবং কিছু মামলায় তিনি দণ্ডপ্রাপ্ত। ফলে সরকার বিষয়টিকে কেবল একটি রাজনৈতিক বিতর্ক হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রের সার্বভৌম মর্যাদা, বিচারিক কর্তৃত্ব, জাতীয় সংবেদনশীলতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ভারতীয় ভূখণ্ডে অবস্থানরত একজন পলাতক ও দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও জনগণের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ গভীর উদ্বেগ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে ঢাকা জানিয়েছে, এ ধরনের কর্মসূচি দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের চলমান প্রচেষ্টার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে—এ মর্মে ভারত সরকারকে আগেই উদ্বেগ জানানো হলেও তা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি বলে বাংলাদেশ দুঃখ প্রকাশ করেছে।

কোনো রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি শুধু বন্ধুত্ব, বাণিজ্য কিংবা নিরাপত্তা সহযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, সাংবিধানিক মর্যাদা, বিচারিক স্বাধীনতা এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানেরও প্রতিফলন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্বীকৃত নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্র যদি মনে করে তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বা বিচারিক প্রক্রিয়া অন্য একটি দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে প্রভাবিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তবে কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানানো শুধু তার বৈধ অধিকারই নয়, বরং রাষ্ট্রের দায়িত্বও। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমান ঘটনাটি কেবল একটি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া নয়; বরং এটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের পারস্পরিক আস্থা, বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনধিকার হস্তক্ষেপ পরিহার এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আচরণের মৌলিক নীতিগুলোকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। তাই এই ঘটনাকে একটি বিচ্ছিন্ন কূটনৈতিক বিরোধ হিসেবে নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতির আলোকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

এ ঘটনাকে দলীয় রাজনীতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রের সার্বভৌম সমতা, অ-হস্তক্ষেপের নীতি এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচারের আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কারণ টেকসই প্রতিবেশী সম্পর্কের ভিত্তি পারস্পরিক সম্মান, সংযম এবং একে অপরের সাংবিধানিক ও বিচারিক ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধা। বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক যেমন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও নিরাপত্তা সহযোগিতায় সমৃদ্ধ, তেমনি সীমান্ত হত্যা, তিস্তার পানি বণ্টন, বাণিজ্য বৈষম্য ও রাজনৈতিক আস্থার মতো কিছু অমীমাংসিত প্রশ্নও বিদ্যমান। তাই সাম্প্রতিক ঘটনাকে আবেগের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক রীতির আলোকে বিচার করাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত।

জাতিসংঘ সনদের ২(১) অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রের সার্বভৌম সমতা এবং ২(৭) অনুচ্ছেদ অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অ-হস্তক্ষেপের নীতিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কেবল ভূখণ্ডের ওপর কর্তৃত্ব নয়; বিচারিক এখতিয়ার, আইন প্রয়োগ এবং স্বাধীন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারও এর অন্তর্ভুক্ত। ফলে কোনো রাষ্ট্রের বিচারিক প্রক্রিয়া অন্য দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে প্রভাবিত হতে পারে—এমন আশঙ্কা কূটনৈতিক উদ্বেগ সৃষ্টি করাই স্বাভাবিক।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক শুধু লিখিত আইনের ওপর নয়, কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও পারস্পরিক সংযমের ওপরও নির্ভরশীল। এ কারণেই অধিকাংশ রাষ্ট্র তাদের ভূখণ্ডকে অন্য দেশের রাজনৈতিক সংঘাতের মঞ্চে পরিণত হতে দেয় না। রাজনৈতিক আশ্রয় আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত হলেও, আশ্রয় দেওয়া এবং আশ্রয়প্রাপ্ত ব্যক্তিকে স্বাগতিক দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে নিজ দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালনের সুযোগ দেওয়া এক বিষয় নয়। দালাই লামার ক্ষেত্রে ভারতের সতর্ক অবস্থান এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রে ভারতবিরোধী কর্মকাণ্ড নিয়ে ভারতের অতীত উদ্বেগ—উভয়ই এ কূটনৈতিক বাস্তবতার পরিচায়ক।

বাংলাদেশের আপত্তিও আশ্রয় প্রদানের বিরুদ্ধে নয়; বরং বিচারাধীন, দণ্ডিত ও প্রত্যর্পণ-অনুরোধাধীন বলে বিবেচিত একজন ব্যক্তিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিরুদ্ধে। সরকার বিষয়টিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্ন হিসেবে নয়, পারস্পরিক রাষ্ট্রীয় সম্মান ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারের আলোকে ব্যাখ্যা করেছে। ২০১৩ সালের বাংলাদেশ–ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তি দুই দেশের বিচারিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। যদিও প্রত্যর্পণ স্বয়ংক্রিয় নয় এবং প্রতিটি আবেদন সংশ্লিষ্ট চুক্তি, জাতীয় আইন ও কূটনৈতিক বিবেচনার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি হয়, তবু বাংলাদেশ জানিয়েছে যে শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার অনুরোধের এখনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। ফলে বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি প্রত্যর্পণ সহযোগিতার কার্যকারিতাকেও সামনে এনেছে।

এ আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের রাজনৈতিক সংকট। বিভিন্ন পক্ষের ব্যাখ্যা ভিন্ন হলেও সহিংসতা, প্রাণহানি ও গভীর রাজনৈতিক অস্থিরতার বিষয়টি ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ স্বাধীন তদন্ত ও জবাবদিহির আহ্বান জানিয়েছে। পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনা এবং তাঁর সরকারের একাধিক সাবেক মন্ত্রী ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, দুর্নীতি ও অর্থপাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা হয়েছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী বিচার দেশের প্রচলিত আইনেই চলছে, যদিও সংশ্লিষ্ট পক্ষ এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য বক্তব্য বাংলাদেশের কাছে বিশেষ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্ব পেয়েছে।
২০২৪-পরবর্তী বাস্তবতায় বাংলাদেশ একদিকে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করছে, অন্যদিকে বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি আন্তর্জাতিক সম্মান প্রত্যাশা করছে। তাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক প্রতিবাদকে কেবল তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা, বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি রাষ্ট্রীয় অবস্থান এবং দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখা অধিকতর যুক্তিসঙ্গত।

বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকার ভিত্তিতে গত পাঁচ দশকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য সহযোগিতা গড়ে উঠেছে। ২০১৫ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন এ সম্পর্কের একটি বড় সাফল্য। বর্তমানে ভারত থেকে বাংলাদেশ ২,৫০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ আমদানি করে এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১৪–১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। তবে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য ঘাটতি এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উদ্বেগ। অন্যদিকে তিস্তার পানি বণ্টন, সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়া এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যু। বাংলাদেশ প্রাণঘাতী শক্তির ব্যবহার কমানোর আহ্বান জানিয়ে এসেছে, আর ভারত সীমান্ত অপরাধ, চোরাচালান ও অবৈধ অনুপ্রবেশকে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরে। ফলে সীমান্ত প্রশ্ন এখনো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অন্যতম সংবেদনশীল বিষয়।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও মতপার্থক্য রয়েছে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল, ভারত তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারকে কৌশলগত সমর্থন দিয়েছে। ভারত অবশ্য ধারাবাহিকভাবে বলেছে, তারা বাংলাদেশের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান দেখায় এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে না। এই ভিন্ন বয়ান জনপরিসরে পারস্পরিক আস্থাকে প্রভাবিত করেছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক প্রতিবাদকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা যায় না। এটি সীমান্ত, বিচারিক সহযোগিতা, রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা এবং দীর্ঘদিনের আস্থার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত বৃহত্তর বাস্তবতার অংশ।

দুই দেশের সম্পর্ক ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগও আলোচিত হয়ে আসছে। এর কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে স্থান পেলেও কিছু বিষয়ে দুই দেশের সরকারি অবস্থান ভিন্ন এবং কিছু অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। তাই এসব বিষয় বিশ্লেষণে প্রতিষ্ঠিত তথ্য, রাজনৈতিক বক্তব্য ও জনমতের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি।

সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনায় হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অধিকারসহ বিভিন্ন সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং বাংলাদেশ সরকারও প্রাণঘাতী শক্তির ব্যবহার কমানোর আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী অধিকাংশ ঘটনাকে সীমান্ত অপরাধ, চোরাচালান বা আত্মরক্ষার প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করেছে। একইভাবে অবৈধ অনুপ্রবেশ, কথিত ‘পুশ-ইন’, মাদক ও অস্ত্র পাচার নিয়েও দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে এসবের মধ্যেও সীমান্ত সম্মেলন, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও নিরাপত্তা সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটি ইতিবাচক ভিত্তি।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বিশ্লেষকের অভিযোগ, ভারত অতীতে তৎকালীন সরকারকে কূটনৈতিকভাবে সমর্থন দিয়েছে। অন্যদিকে ভারত বরাবরই বলে এসেছে, তারা বাংলাদেশের জনগণের নির্বাচিত সরকারের সঙ্গেই কাজ করে। এই রাজনৈতিক বিতর্ক দুই দেশের পারস্পরিক আস্থাকে প্রভাবিত করেছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে দাবি উঠেছে যে ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে সক্রিয় প্রচারণা চালাচ্ছেন।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবাদকে বৃহত্তর কূটনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখা যায়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিচারিক প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কাছ থেকে অধিকতর সংযম, পারস্পরিক সম্মান ও কূটনৈতিক সংবেদনশীলতা প্রত্যাশা করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক এতটাই বিস্তৃত যে কোনো একক ঘটনা দিয়ে তাকে মূল্যায়ন করা যায় না; দীর্ঘমেয়াদে পারস্পরিক আস্থা, নিয়মিত সংলাপ ও আন্তর্জাতিক রীতিনীতিই সম্পর্কের প্রধান ভিত্তি।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কে প্রতিটি রাষ্ট্রই তার সার্বভৌমত্ব, বিচারিক কর্তৃত্ব ও জাতীয় মর্যাদা রক্ষায় সংবেদনশীল। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক প্রতিবাদ একটি স্বাভাবিক ও স্বীকৃত পদক্ষেপ। সরকারের অবস্থান অনুযায়ী শেখ হাসিনা বিচারাধীন, বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত ও কিছু ক্ষেত্রে দণ্ডপ্রাপ্ত; একই সঙ্গে তার প্রত্যর্পণও চাওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের রাজনীতি ও বিচারিক বিষয় নিয়ে তার প্রকাশ্য বক্তব্যকে বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচনা করতেই পারে। প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সম্ভাব্য কূটনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে ভারতকে আগেই অবহিত করা হয়েছিল। যদি তা হয়ে থাকে, তবে সেই উদ্বেগ উপেক্ষিত হওয়াকে ঢাকা কূটনৈতিক সংবেদনশীলতার ঘাটতি হিসেবে দেখতেই পারে।

তবে বাংলাদেশের প্রতিবাদে ভারতবিরোধী অবস্থান নেওয়ার আহ্বান নেই; বরং সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক সম্মান, অ-হস্তক্ষেপ এবং গঠনমূলক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রত্যাশাই পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। ভারত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা নিজস্ব আইনি কাঠামোর যুক্তি উপস্থাপন করতে পারে, কিন্তু সে কারণে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক উদ্বেগকে আন্তর্জাতিক কূটনীতির দৃষ্টিতে অস্বাভাবিক বলা কঠিন।

বিষয়টি ভারতের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। ‘Neighbourhood First’ নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার বাংলাদেশ আঞ্চলিক নিরাপত্তা, উত্তর-পূর্ব ভারতের যোগাযোগ, বঙ্গোপসাগর, জ্বালানি ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব বহন করে। গত এক দশকের সহযোগিতার অর্জন টিকিয়ে রাখতে পারস্পরিক রাজনৈতিক আস্থা অপরিহার্য। আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ভারতের জন্যও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সার্বভৌম উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সংবেদনশীল বিষয়ে কূটনৈতিক সংযম প্রদর্শন তার গ্রহণযোগ্যতাকে আরও শক্তিশালী করবে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক প্রতিবাদকে কেবল একটি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করা যাবে না। বিষয়টি রাষ্ট্রের সার্বভৌম মর্যাদা, বিচারিক কর্তৃত্ব, কূটনৈতিক শিষ্টাচার, পারস্পরিক আস্থা এবং আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জাতিসংঘ সনদে বর্ণিত সার্বভৌম সমতা ও অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অ-হস্তক্ষেপের নীতিও এ ধরনের অবস্থানের আন্তর্জাতিক ভিত্তিকে সুদৃঢ় করে। ফলে এ ধরনের ইস্যুতে উভয় পক্ষেরই সংযম, পরিমিতি ও কূটনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মতপার্থক্য থাকা অস্বাভাবিক নয়; তবে সেসবের সমাধান হওয়া উচিত আন্তরিক সংলাপ, পারস্পরিক সম্মান এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক রীতিনীতির আলোকে। ভৌগোলিক নৈকট্য, অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তি বা সরকার পরিবর্তিত হলেও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্ক স্থায়ী থাকে। তাই সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক বিরোধ হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্র-রাষ্ট্র সম্পর্ক, সার্বভৌম সমতা, বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা এবং গঠনমূলক ভবিষ্যতমুখী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করাই হবে অধিকতর বিচক্ষণ ও দূরদর্শী পদক্ষেপ।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট।
Mizan12bd@yahoo.com

চা-বাগান, ঝরনা আর হাওর টানছে পর্যটক, প্রস্তুত মৌলভীবাজার

মৌলভীবাজার সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৫৬ পূর্বাহ্ণ
চা-বাগান, ঝরনা আর হাওর টানছে পর্যটক, প্রস্তুত মৌলভীবাজার

শরতের নীল আকাশ, সবুজ চা-বাগান, পাহাড়ি ঝরনা আর হাওরের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটিতে মৌলভীবাজারে পর্যটকদের আগ্রহ বাড়ছে। পর্যটকদের বরণে প্রস্তুতি নিয়েছে জেলার হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজগুলো। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে আগাম বুকিং ৮০ থেকে ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে, আবার কিছু কটেজের সব কক্ষ আগেই বুকিং হয়ে গেছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, হাকালুকি হাওর ও হামহাম ঝরনা পর্যটকদের আকর্ষণ করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মণিপুরি সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি, নাচ-গান, হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের অভিজ্ঞতা। সব মিলিয়ে পূজার ছুটিকে কেন্দ্র করে জেলার পর্যটন ব্যবসায়ীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বাড়তি প্রত্যাশা।

হোটেল-রিসোর্টে আগাম বুকিংয়ের চাপ

দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটিকে সামনে রেখে মৌলভীবাজারের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে থাকার জায়গা বুকিংয়ের ব্যস্ততা বেড়েছে। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের হোটেল, রিসোর্ট এবং কটেজগুলোতে আগাম বুকিংয়ের হার উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। কমলগঞ্জের টিলাগাঁও ইকো ভিলেজের ব্যবস্থাপক সোহেল আহমেদ বলেন, পূজার দীর্ঘ ছুটিকে সামনে রেখে তাঁদের প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কক্ষ আগাম বুকিং হয়ে গেছে।শ্রীমঙ্গলের বালিসিরা কটেজের মালিক ও রাধানগর পর্যটন কল্যাণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী সামছুল হক জানান, তাঁদের কটেজের সব কক্ষ আগেই বুকিং হয়েছে।

শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি মো. সেলিম আহমদ বলেন, উৎসবের সময়ে হোটেল-রিসোর্টে সাধারণত ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ কক্ষ বুকিং থাকে। জেলার পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকারি উদ্যোগ আরও বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

চা-বাগান, ঝরনা ও হাওরের টানে পর্যটকেরা

মৌলভীবাজারের পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ এর বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক পরিবেশ। বিস্তীর্ণ চা-বাগানের সবুজ, পাহাড়ি পথ, ঝরনার পানি এবং হাওরের বিস্তৃত জলরাশি ভ্রমণপিপাসুদের কাছে আলাদা আবেদন তৈরি করে। জেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, হাকালুকি হাওর ও হামহাম ঝরনা পর্যটকদের কাছে পরিচিত গন্তব্য। শরতের আবহে এসব স্থানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটির সময় ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন অনেকে। পর্যটকদের আকর্ষণ শুধু প্রকৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় সংস্কৃতি ও খাবারের বৈচিত্র্যও মৌলভীবাজার ভ্রমণকে ভিন্ন অভিজ্ঞতা দেয়। ফলে পূজার ছুটিতে জেলার পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে দর্শনার্থীদের বাড়তি উপস্থিতির প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

মণিপুরি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের আকর্ষণ

কমলগঞ্জের ভানুবিল মাঝের গাঁওয়ে মণিপুরি কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটনকেন্দ্র ‘মাঙাল ময়ুম’ স্থানীয় সংস্কৃতিকে পর্যটকদের সামনে তুলে ধরছে। সেখানে মণিপুরি নাচ-গান, হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কেন্দ্রটির উদ্যোক্তা নিরঞ্জন সিংহ বলেন, পর্যটকেরা এখানে এসে মণিপুরি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারেন। এতে একদিকে স্থানীয় সংস্কৃতির পরিচিতি বাড়ছে, অন্যদিকে এলাকার মানুষের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনধারা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করার ফলে ভ্রমণকারীরা প্রকৃতি দেখার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সংস্কৃতি জানার সুযোগ পাচ্ছেন। এতে পর্যটন কার্যক্রমের সুফল স্থানীয় পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন চান পর্যটনসংশ্লিষ্টরা

পর্যটকদের আগ্রহ বাড়লেও পর্যটনশিল্পের বিকাশে সড়ক ও রেল যোগাযোগব্যবস্থার দুরবস্থাকে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, পর্যটনকেন্দ্রে যাতায়াত সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ না হলে পর্যটন খাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন। ট্যুর গাইড অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রাসেল আলম সিলেট-ঢাকা রুটে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানোসহ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, যাতায়াতের সুযোগ বাড়লে পর্যটকদের ভ্রমণ পরিকল্পনা সহজ হবে এবং স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

পর্যটকদের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা

পূজার ছুটিতে পর্যটকদের আগমন বাড়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে টহল ও হেল্পডেস্ক রাখার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। শ্রীমঙ্গল জোনের ট্যুরিস্ট পুলিশের পুলিশ পরিদর্শক মো. কামরুল হোসেন চৌধুরী বলেন, পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে টহল ও হেল্পডেস্ক থাকবে। মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মো. মনিরুল ইসলাম জানান, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে পর্যটকদের আগমন এবং পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং গুজব ও অপপ্রচার প্রতিরোধে পূজার আগে, চলাকালে ও প্রতিমা বিসর্জনের সময় সতর্ক নজরদারি থাকবে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের সমন্বয়ে মৌলভীবাজারের পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। পূজার ছুটিতে আগাম বুকিংয়ের উচ্চ হার স্থানীয় হোটেল-রিসোর্ট ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা বাড়িয়েছে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

 

ত্রিদেশীয় সিরিজে হার দিয়ে শুরু বাংলাদেশের, জিম্বাবুয়ের দাপুটে জয়

ক্রীড়া প্রতিবেদক,কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৩৯ পূর্বাহ্ণ
ত্রিদেশীয় সিরিজে হার দিয়ে শুরু বাংলাদেশের, জিম্বাবুয়ের দাপুটে জয়

ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচেই বড় হারের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। ব্যাটিং ব্যর্থতায় জিম্বাবুয়ের দেওয়া ২৭২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ১৭২ রানেই অলআউট হয়েছে তাওহিদ হৃদয়ের দল। আবুধাবিতে শনিবার ৯৯ রানের জয় দিয়ে সিরিজ শুরু করেছে জিম্বাবুয়ে। ম্যাচে শুরুতে বল হাতে জিম্বাবুয়েকে চাপে ফেলেছিল বাংলাদেশ। মাত্র ২৪ রানে তিন উইকেট হারিয়ে বিপাকে পড়ে দলটি। কিন্তু ব্রেন্ডন টেলর ও ক্রেইগ আরভিনের বড় জুটি জিম্বাবুয়েকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করে। পরে লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় বাংলাদেশ।

টেলর-আরভিনের ১৫০ রানের জুটিতে ঘুরে দাঁড়াল জিম্বাবুয়ে

টস জিতে আগে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই বাংলাদেশের পেসার তাসকিন আহমেদের বোলিংয়ের সামনে বিপাকে পড়ে জিম্বাবুয়ে। মাত্র ২৪ রানের মধ্যে তিনটি উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে দলটি। তবে এই অবস্থায় দলের হাল ধরেন ব্রেন্ডন টেলর ও ক্রেইগ আরভিন। চতুর্থ উইকেটে দুজন মিলে গড়েন ১৫০ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি। টেলর ১০১ বলে ৮১ রান করেন। আরভিনের ব্যাট থেকে আসে ১০৬ বলে ৯৩ রান। তাঁদের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে প্রাথমিক বিপর্যয় কাটিয়ে বড় সংগ্রহের পথে এগিয়ে যায় জিম্বাবুয়ে। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ২৭১ রান সংগ্রহ করে দলটি। ফলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় ২৭২ রান।

তাসকিনের তিন উইকেটেও থামেনি জিম্বাবুয়ে

বাংলাদেশের হয়ে বল হাতে সবচেয়ে সফল ছিলেন তাসকিন আহমেদ। ৪৪ রান দিয়ে তিনি নেন ৩ উইকেট। শুরুতে তাঁর বোলিংয়েই দ্রুত তিন উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে জিম্বাবুয়ে। এ ছাড়া শরীফুল ইসলাম ও সাইফ হাসান দুটি করে উইকেট শিকার করেন। তবে টেলর ও আরভিনের জুটি ভাঙতে দেরি হওয়ায় জিম্বাবুয়ে বড় সংগ্রহ গড়তে সক্ষম হয়।

২৭২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশের শুরুটা খুব খারাপ ছিল না। কিন্তু সৌম্য সরকার ৯ রান করে ব্লেসিং মুজারাবানির বলে ক্যাচ দিয়ে ফিরতেই ছন্দপতন শুরু হয়। তানজিদ হাসান তামিম আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে দলকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে ৪৬ রান করে তাঁর বিদায়ের পর বাংলাদেশের চাপ আরও বাড়ে। নাজমুল হোসেন শান্তও বেশিক্ষণ উইকেটে থাকতে পারেননি। তিনি করেন ১৩ রান। দলীয় ৯৭ রানে চতুর্থ উইকেট হিসেবে আউট হন অধিনায়ক তাওহিদ হৃদয়। ২১ বলে ১৩ রান করে সিকান্দার রাজার বলে এলবিডব্লিউ হন তিনি। অধিনায়কের বিদায়ের পর বাংলাদেশের জয়ের আশা আরও ক্ষীণ হয়ে যায়।

নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারিয়ে ১৭২ রানেই শেষ

হৃদয়ের বিদায়ের পর বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে আর ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হয়নি। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে দলটি। মোসাদ্দেক হোসেনও বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। শেষ দিকে রিশাদ হোসেন ও তাসকিন আহমেদ ২৬ বলে ৩২ রানের জুটি গড়ে হারের ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করেন। রিশাদ করেন ২৩ রান, আর তাসকিন ১৬ রানে অপরাজিত থাকেন। তবে তাঁদের এই প্রচেষ্টা বাংলাদেশের পরাজয় এড়ানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। শেষ পর্যন্ত ১৭২ রানেই গুটিয়ে যায় দলের ইনিংস। জিম্বাবুয়ের হয়ে বল হাতে সবচেয়ে সফল ছিলেন ব্র্যাড ইভান্স। তিনি নেন ৪ উইকেট। সিকান্দার রাজা ও মাসাকাদজা দুটি করে উইকেট শিকার করেন।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

 

 

ঢাকা ক্রিকেটার্সকে ৫১ রানে উড়িয়ে বসুন্ধরার টানা তিন জয়

ক্রীড়া প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১:০৪ পূর্বাহ্ণ
ঢাকা ক্রিকেটার্সকে ৫১ রানে উড়িয়ে বসুন্ধরার টানা তিন জয়

ব্যাট হাতে খালেদ মাসুদের ঝোড়ো অর্ধশতক আর বল হাতে তাপস ঘোষের বিধ্বংসী বোলিংয়ে দাপুটে জয় পেয়েছে বসুন্ধরা স্ট্রাইকার্স। এবিজি স্পোর্টস সিটির আনভীর ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ফ্রস্ট ব্লাস্ট টি-টোয়েন্টি করপোরেট ক্রিকেটের তৃতীয় আসরের গ্রুপ পর্বের ম্যাচে ঢাকা ক্রিকেটার্সকে ৫১ রানে হারিয়েছে দলটি। এ জয়ে টুর্নামেন্টে টানা তৃতীয় জয় তুলে নিয়ে নিজেদের ধারাবাহিকতার প্রমাণ দিল বসুন্ধরা। শনিবার আগে ব্যাট করতে নেমে ১৯.৩ ওভারে ১৪০ রানে অলআউট হয় বসুন্ধরা স্ট্রাইকার্স। জবাবে ব্যাট করতে নেমে তাপস ঘোষের বোলিং তোপে ১৬.৫ ওভারে মাত্র ৮৯ রানেই গুটিয়ে যায় ঢাকা ক্রিকেটার্সের ইনিংস।

খালেদ মাসুদের ঝোড়ো ফিফটিতে লড়াকু সংগ্রহ 

ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুটা ভালো হয়নি বসুন্ধরা স্ট্রাইকার্সের। দলীয় ৯ রানে মাহমুদুল হাসান শেখের বলে বোল্ড হয়ে সাজঘরে ফেরেন ওপেনার মাহেন। তাঁর ব্যাট থেকে আসে মাত্র ২ রান। আগের দুই ম্যাচে ভালো ছন্দে থাকা শেহজাদ আকবর সোবহানও এদিন বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। তিনি করেন ৬ রান। প্রাথমিক ধাক্কা সামাল দিতে দ্বিতীয় উইকেটে ৩৯ রানের জুটি গড়েন খালেদ মাসুদ ও সুমন আহমেদ। তবে ১৭ বলে ১০ রান করে সুমন ফিরে গেলে আবারও চাপে পড়ে দলটি। একপ্রান্ত আগলে রেখে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং চালিয়ে যান খালেদ। তাঁর ব্যাটে রান আসতে থাকায় বড় সংগ্রহের আশা জাগে বসুন্ধরা শিবিরে। মাত্র ৩৫ বলে ৬টি চার ও ৩টি ছক্কায় ৫৯ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলেন তিনি। দলীয় ৯৬ রানে ফিরোজ রশিদের বলে খালেদ আউট হলে ফের ছন্দপতন ঘটে বসুন্ধরার ব্যাটিংয়ে। এরপর নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে দলটি।

শেষ দিকে বাবুর ব্যাটে ১৪০ রান

মাঝের ওভারে অন্তু ১৩ বলে ১৭ এবং রাজি ১১ রান করে দলের সংগ্রহ বাড়াতে ভূমিকা রাখেন। শেষ দিকে বাবুর অপরাজিত ১৭ রানের ইনিংসও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৬ বলের ইনিংসটি খেলে বসুন্ধরাকে ১৪০ রানে পৌঁছে দেন তিনি। ঢাকা ক্রিকেটার্সের হয়ে বল হাতে সবচেয়ে সফল ছিলেন ফিরোজ রশিদ। ২৩ রান দিয়ে তিনি নেন ৩ উইকেট। মাহমুদুল হাসান শেখ এক মেডেনসহ ১৩ রান খরচায় শিকার করেন ২ উইকেট। ১৪১ রানের লক্ষ্য খুব বড় না হলেও বসুন্ধরার বোলারদের নিয়ন্ত্রিত পারফরম্যান্সের সামনে তা তাড়া করা কঠিন হয়ে পড়ে ঢাকা ক্রিকেটার্সের জন্য।

তাপস ঘোষের তোপে ভেঙে পড়ে ঢাকা ক্রিকেটার্স

লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই চাপে পড়ে ঢাকা ক্রিকেটার্স। বসুন্ধরার বোলারদের নিয়ন্ত্রিত আক্রমণে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে দলটি। ব্যাটারদের কেউই বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। ঢাকা ক্রিকেটার্সের হয়ে সর্বোচ্চ ২৪ রান করেন ফারুক টিটো। ২৯ বলের ইনিংসে দুটি চার ও একটি ছক্কা মারেন তিনি। রাসেল করেন ১১ রান এবং তাসবিহ ইবতিসাম রাফির ব্যাট থেকে আসে ১০ রান। বাকি ব্যাটারদের কেউই দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছাতে পারেননি। অতিরিক্ত থেকে যোগ হয় ১৭ রান।

বসুন্ধরার হয়ে বল হাতে ম্যাচের সবচেয়ে উজ্জ্বল পারফরম্যান্স দেখান তাপস ঘোষ। মাত্র ৩.৫ ওভারে ৮ রান দিয়ে ৩ উইকেট তুলে নেন তিনি। তাঁর নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়েই দ্রুত গুটিয়ে যায় ঢাকা ক্রিকেটার্সের ব্যাটিং লাইনআপ। খালেদ মাসুদও বল হাতে অবদান রাখেন। ২ ওভারে ৮ রান দিয়ে নেন ২ উইকেট। রাজি ৪ ওভারে ২০ রান খরচায় শিকার করেন আরও ২ উইকেট। এ ছাড়া মাহেন ও লাজিম একটি করে উইকেট নেন। খালেদ মাসুদের ৫৯ রানের ইনিংস বসুন্ধরাকে লড়াই করার মতো সংগ্রহ এনে দেয়। এরপর তাপস ঘোষের দুর্দান্ত বোলিং এবং অন্য বোলারদের কার্যকর ভূমিকা ঢাকা ক্রিকেটার্সকে ৮৯ রানেই আটকে দেয়।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি