খুঁজুন
                               
, ,
           

সার্বভৌমত্ব ও বিচারিক মর্যাদা রক্ষায় দিল্লিকে ঢাকার কূটনৈতিক বার্তা

ড. মোঃ মিজানুর রহমান:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৫০ অপরাহ্ণ
সার্বভৌমত্ব ও বিচারিক মর্যাদা রক্ষায় দিল্লিকে ঢাকার কূটনৈতিক বার্তা

সম্প্রতি ভারতের প্রতি বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক প্রতিবাদ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এই প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভারত অবস্থানকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে প্রকাশ্য বক্তব্য এবং গণমাধ্যমে সরাসরি অংশগ্রহণ। বাংলাদেশের সরকারি অবস্থান অনুযায়ী, তিনি বর্তমানে বিচারাধীন; তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে এবং কিছু মামলায় তিনি দণ্ডপ্রাপ্ত। ফলে সরকার বিষয়টিকে কেবল একটি রাজনৈতিক বিতর্ক হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রের সার্বভৌম মর্যাদা, বিচারিক কর্তৃত্ব, জাতীয় সংবেদনশীলতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ভারতীয় ভূখণ্ডে অবস্থানরত একজন পলাতক ও দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও জনগণের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ গভীর উদ্বেগ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে ঢাকা জানিয়েছে, এ ধরনের কর্মসূচি দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের চলমান প্রচেষ্টার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে—এ মর্মে ভারত সরকারকে আগেই উদ্বেগ জানানো হলেও তা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি বলে বাংলাদেশ দুঃখ প্রকাশ করেছে।

কোনো রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি শুধু বন্ধুত্ব, বাণিজ্য কিংবা নিরাপত্তা সহযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, সাংবিধানিক মর্যাদা, বিচারিক স্বাধীনতা এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানেরও প্রতিফলন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্বীকৃত নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্র যদি মনে করে তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বা বিচারিক প্রক্রিয়া অন্য একটি দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে প্রভাবিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তবে কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানানো শুধু তার বৈধ অধিকারই নয়, বরং রাষ্ট্রের দায়িত্বও। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমান ঘটনাটি কেবল একটি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া নয়; বরং এটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের পারস্পরিক আস্থা, বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনধিকার হস্তক্ষেপ পরিহার এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আচরণের মৌলিক নীতিগুলোকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। তাই এই ঘটনাকে একটি বিচ্ছিন্ন কূটনৈতিক বিরোধ হিসেবে নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতির আলোকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

এ ঘটনাকে দলীয় রাজনীতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রের সার্বভৌম সমতা, অ-হস্তক্ষেপের নীতি এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচারের আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কারণ টেকসই প্রতিবেশী সম্পর্কের ভিত্তি পারস্পরিক সম্মান, সংযম এবং একে অপরের সাংবিধানিক ও বিচারিক ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধা। বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক যেমন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও নিরাপত্তা সহযোগিতায় সমৃদ্ধ, তেমনি সীমান্ত হত্যা, তিস্তার পানি বণ্টন, বাণিজ্য বৈষম্য ও রাজনৈতিক আস্থার মতো কিছু অমীমাংসিত প্রশ্নও বিদ্যমান। তাই সাম্প্রতিক ঘটনাকে আবেগের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক রীতির আলোকে বিচার করাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত।

জাতিসংঘ সনদের ২(১) অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রের সার্বভৌম সমতা এবং ২(৭) অনুচ্ছেদ অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অ-হস্তক্ষেপের নীতিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কেবল ভূখণ্ডের ওপর কর্তৃত্ব নয়; বিচারিক এখতিয়ার, আইন প্রয়োগ এবং স্বাধীন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারও এর অন্তর্ভুক্ত। ফলে কোনো রাষ্ট্রের বিচারিক প্রক্রিয়া অন্য দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে প্রভাবিত হতে পারে—এমন আশঙ্কা কূটনৈতিক উদ্বেগ সৃষ্টি করাই স্বাভাবিক।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক শুধু লিখিত আইনের ওপর নয়, কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও পারস্পরিক সংযমের ওপরও নির্ভরশীল। এ কারণেই অধিকাংশ রাষ্ট্র তাদের ভূখণ্ডকে অন্য দেশের রাজনৈতিক সংঘাতের মঞ্চে পরিণত হতে দেয় না। রাজনৈতিক আশ্রয় আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত হলেও, আশ্রয় দেওয়া এবং আশ্রয়প্রাপ্ত ব্যক্তিকে স্বাগতিক দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে নিজ দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালনের সুযোগ দেওয়া এক বিষয় নয়। দালাই লামার ক্ষেত্রে ভারতের সতর্ক অবস্থান এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রে ভারতবিরোধী কর্মকাণ্ড নিয়ে ভারতের অতীত উদ্বেগ—উভয়ই এ কূটনৈতিক বাস্তবতার পরিচায়ক।

বাংলাদেশের আপত্তিও আশ্রয় প্রদানের বিরুদ্ধে নয়; বরং বিচারাধীন, দণ্ডিত ও প্রত্যর্পণ-অনুরোধাধীন বলে বিবেচিত একজন ব্যক্তিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিরুদ্ধে। সরকার বিষয়টিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্ন হিসেবে নয়, পারস্পরিক রাষ্ট্রীয় সম্মান ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারের আলোকে ব্যাখ্যা করেছে। ২০১৩ সালের বাংলাদেশ–ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তি দুই দেশের বিচারিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। যদিও প্রত্যর্পণ স্বয়ংক্রিয় নয় এবং প্রতিটি আবেদন সংশ্লিষ্ট চুক্তি, জাতীয় আইন ও কূটনৈতিক বিবেচনার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি হয়, তবু বাংলাদেশ জানিয়েছে যে শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার অনুরোধের এখনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। ফলে বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি প্রত্যর্পণ সহযোগিতার কার্যকারিতাকেও সামনে এনেছে।

এ আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের রাজনৈতিক সংকট। বিভিন্ন পক্ষের ব্যাখ্যা ভিন্ন হলেও সহিংসতা, প্রাণহানি ও গভীর রাজনৈতিক অস্থিরতার বিষয়টি ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ স্বাধীন তদন্ত ও জবাবদিহির আহ্বান জানিয়েছে। পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনা এবং তাঁর সরকারের একাধিক সাবেক মন্ত্রী ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, দুর্নীতি ও অর্থপাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা হয়েছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী বিচার দেশের প্রচলিত আইনেই চলছে, যদিও সংশ্লিষ্ট পক্ষ এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য বক্তব্য বাংলাদেশের কাছে বিশেষ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্ব পেয়েছে।
২০২৪-পরবর্তী বাস্তবতায় বাংলাদেশ একদিকে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করছে, অন্যদিকে বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি আন্তর্জাতিক সম্মান প্রত্যাশা করছে। তাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক প্রতিবাদকে কেবল তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা, বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি রাষ্ট্রীয় অবস্থান এবং দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখা অধিকতর যুক্তিসঙ্গত।

বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকার ভিত্তিতে গত পাঁচ দশকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য সহযোগিতা গড়ে উঠেছে। ২০১৫ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন এ সম্পর্কের একটি বড় সাফল্য। বর্তমানে ভারত থেকে বাংলাদেশ ২,৫০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ আমদানি করে এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১৪–১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। তবে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য ঘাটতি এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উদ্বেগ। অন্যদিকে তিস্তার পানি বণ্টন, সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়া এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যু। বাংলাদেশ প্রাণঘাতী শক্তির ব্যবহার কমানোর আহ্বান জানিয়ে এসেছে, আর ভারত সীমান্ত অপরাধ, চোরাচালান ও অবৈধ অনুপ্রবেশকে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরে। ফলে সীমান্ত প্রশ্ন এখনো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অন্যতম সংবেদনশীল বিষয়।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও মতপার্থক্য রয়েছে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল, ভারত তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারকে কৌশলগত সমর্থন দিয়েছে। ভারত অবশ্য ধারাবাহিকভাবে বলেছে, তারা বাংলাদেশের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান দেখায় এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে না। এই ভিন্ন বয়ান জনপরিসরে পারস্পরিক আস্থাকে প্রভাবিত করেছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক প্রতিবাদকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা যায় না। এটি সীমান্ত, বিচারিক সহযোগিতা, রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা এবং দীর্ঘদিনের আস্থার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত বৃহত্তর বাস্তবতার অংশ।

দুই দেশের সম্পর্ক ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগও আলোচিত হয়ে আসছে। এর কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে স্থান পেলেও কিছু বিষয়ে দুই দেশের সরকারি অবস্থান ভিন্ন এবং কিছু অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। তাই এসব বিষয় বিশ্লেষণে প্রতিষ্ঠিত তথ্য, রাজনৈতিক বক্তব্য ও জনমতের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি।

সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনায় হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অধিকারসহ বিভিন্ন সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং বাংলাদেশ সরকারও প্রাণঘাতী শক্তির ব্যবহার কমানোর আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী অধিকাংশ ঘটনাকে সীমান্ত অপরাধ, চোরাচালান বা আত্মরক্ষার প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করেছে। একইভাবে অবৈধ অনুপ্রবেশ, কথিত ‘পুশ-ইন’, মাদক ও অস্ত্র পাচার নিয়েও দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে এসবের মধ্যেও সীমান্ত সম্মেলন, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও নিরাপত্তা সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটি ইতিবাচক ভিত্তি।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বিশ্লেষকের অভিযোগ, ভারত অতীতে তৎকালীন সরকারকে কূটনৈতিকভাবে সমর্থন দিয়েছে। অন্যদিকে ভারত বরাবরই বলে এসেছে, তারা বাংলাদেশের জনগণের নির্বাচিত সরকারের সঙ্গেই কাজ করে। এই রাজনৈতিক বিতর্ক দুই দেশের পারস্পরিক আস্থাকে প্রভাবিত করেছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে দাবি উঠেছে যে ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে সক্রিয় প্রচারণা চালাচ্ছেন।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবাদকে বৃহত্তর কূটনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখা যায়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিচারিক প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কাছ থেকে অধিকতর সংযম, পারস্পরিক সম্মান ও কূটনৈতিক সংবেদনশীলতা প্রত্যাশা করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক এতটাই বিস্তৃত যে কোনো একক ঘটনা দিয়ে তাকে মূল্যায়ন করা যায় না; দীর্ঘমেয়াদে পারস্পরিক আস্থা, নিয়মিত সংলাপ ও আন্তর্জাতিক রীতিনীতিই সম্পর্কের প্রধান ভিত্তি।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কে প্রতিটি রাষ্ট্রই তার সার্বভৌমত্ব, বিচারিক কর্তৃত্ব ও জাতীয় মর্যাদা রক্ষায় সংবেদনশীল। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক প্রতিবাদ একটি স্বাভাবিক ও স্বীকৃত পদক্ষেপ। সরকারের অবস্থান অনুযায়ী শেখ হাসিনা বিচারাধীন, বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত ও কিছু ক্ষেত্রে দণ্ডপ্রাপ্ত; একই সঙ্গে তার প্রত্যর্পণও চাওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের রাজনীতি ও বিচারিক বিষয় নিয়ে তার প্রকাশ্য বক্তব্যকে বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচনা করতেই পারে। প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সম্ভাব্য কূটনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে ভারতকে আগেই অবহিত করা হয়েছিল। যদি তা হয়ে থাকে, তবে সেই উদ্বেগ উপেক্ষিত হওয়াকে ঢাকা কূটনৈতিক সংবেদনশীলতার ঘাটতি হিসেবে দেখতেই পারে।

তবে বাংলাদেশের প্রতিবাদে ভারতবিরোধী অবস্থান নেওয়ার আহ্বান নেই; বরং সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক সম্মান, অ-হস্তক্ষেপ এবং গঠনমূলক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রত্যাশাই পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। ভারত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা নিজস্ব আইনি কাঠামোর যুক্তি উপস্থাপন করতে পারে, কিন্তু সে কারণে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক উদ্বেগকে আন্তর্জাতিক কূটনীতির দৃষ্টিতে অস্বাভাবিক বলা কঠিন।

বিষয়টি ভারতের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। ‘Neighbourhood First’ নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার বাংলাদেশ আঞ্চলিক নিরাপত্তা, উত্তর-পূর্ব ভারতের যোগাযোগ, বঙ্গোপসাগর, জ্বালানি ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব বহন করে। গত এক দশকের সহযোগিতার অর্জন টিকিয়ে রাখতে পারস্পরিক রাজনৈতিক আস্থা অপরিহার্য। আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ভারতের জন্যও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সার্বভৌম উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সংবেদনশীল বিষয়ে কূটনৈতিক সংযম প্রদর্শন তার গ্রহণযোগ্যতাকে আরও শক্তিশালী করবে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক প্রতিবাদকে কেবল একটি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করা যাবে না। বিষয়টি রাষ্ট্রের সার্বভৌম মর্যাদা, বিচারিক কর্তৃত্ব, কূটনৈতিক শিষ্টাচার, পারস্পরিক আস্থা এবং আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জাতিসংঘ সনদে বর্ণিত সার্বভৌম সমতা ও অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অ-হস্তক্ষেপের নীতিও এ ধরনের অবস্থানের আন্তর্জাতিক ভিত্তিকে সুদৃঢ় করে। ফলে এ ধরনের ইস্যুতে উভয় পক্ষেরই সংযম, পরিমিতি ও কূটনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মতপার্থক্য থাকা অস্বাভাবিক নয়; তবে সেসবের সমাধান হওয়া উচিত আন্তরিক সংলাপ, পারস্পরিক সম্মান এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক রীতিনীতির আলোকে। ভৌগোলিক নৈকট্য, অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তি বা সরকার পরিবর্তিত হলেও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্ক স্থায়ী থাকে। তাই সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক বিরোধ হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্র-রাষ্ট্র সম্পর্ক, সার্বভৌম সমতা, বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা এবং গঠনমূলক ভবিষ্যতমুখী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করাই হবে অধিকতর বিচক্ষণ ও দূরদর্শী পদক্ষেপ।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট।
Mizan12bd@yahoo.com

রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হতে কী যোগ্যতা প্রয়োজন?

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৬:৫২ অপরাহ্ণ
রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হতে কী যোগ্যতা প্রয়োজন?

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ভোট গ্রহণের তারিখ ২০ আগস্ট। একাধিক প্রার্থী থাকলে সেদিন বেলা দুইটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের অধিবেশনকক্ষে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। তফসিলের পর থেকেই রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হতে কী ধরনের যোগ্যতা প্রয়োজন, তা নিয়ে সবার মাঝেই রয়েছে অদম্য কৌতূহল।

গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব ছাড়েন মো. সাহাবুদ্দিন। এরপর থেকে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধানের ৪৮ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকবেন, যিনি আইন অনুযায়ী সংসদ-সদস্যদের মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন। (২) রাষ্ট্রপ্রধানরূপে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের অন্য সব ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করিবেন এবং এই সংবিধান ও অন্য কোনো আইনের দ্বারা তাহাকে প্রদত্ত ও তাহার উপর অর্পিত সব ক্ষমতা প্রয়োগ ও কর্তব্য পালন করিবেন।

সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদে আরও বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হতে হলে তাকে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতাও থাকতে হবে তাকে। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য প্রার্থীর বয়স হতে হবে কমপক্ষে ৩৫ বছর। এছাড়া কেউ যদি আগে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে সংবিধান অনুযায়ী অভিশংসনের মাধ্যমে অপসারিত হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি আবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য যোগ্য হবেন না।

তবে তার মনোনয়নপত্রে একজন সংসদ সদস্যকে প্রস্তাবক এবং আরেকজনকে সমর্থক হতে হবে। প্রার্থীর নিজেরও সম্মতিসূচক স্বাক্ষর থাকতে হবে। কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে কার্যভার গ্রহণের দিন তার সংসদীয় আসন শূন্য হবে। বাছাই ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর একজন বৈধ প্রার্থী থাকলে তাকে ভোট ছাড়াই নির্বাচিত ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন। একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদ সদস্যদের ভোট নেওয়া হবে।

কালের আলো/এম/এএইচ

লিবিয়া থেকে ফিরলেন আরও ৩৪০ বাংলাদেশি

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৬:৩৪ অপরাহ্ণ
লিবিয়া থেকে ফিরলেন আরও ৩৪০ বাংলাদেশি

লিবিয়ায় বিপদগ্রস্ত ও স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে আগ্রহী আরও ৩৪০ বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন।

শুক্রবার (৭ আগস্ট) দুপুর ১২টায় ফ্লাই ওইয়া এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তারা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান।

বাংলাদেশ দূতাবাস, লিবিয়ার তত্ত্বাবধানে এবং লিবিয়ার জাতীয় ঐক্যমত্যের সরকারের সহযোগিতা ও ব্যবস্থাপনায় এসব বাংলাদেশিকে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়।

প্রত্যাবাসন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গত ৫ আগস্ট লিবিয়া সরকারের ব্যবস্থাপনায় দেশে ফিরতে আগ্রহী বাংলাদেশিদের ত্রিপোলিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস প্রাঙ্গণ থেকে সরকারি অভ্যর্থনা কেন্দ্রে নেওয়া হয়।

এ সময় বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সমন্বয় করেন।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল মো. হাবীব উল্লাহ দূতাবাস প্রাঙ্গণ ও সরকারি অভ্যর্থনা কেন্দ্রে প্রত্যাবাসনপ্রত্যাশী বাংলাদেশিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তাদের বিদায় জানান।

এ সময় তিনি তাদের অভিজ্ঞতা ও সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজখবর নেন।

দীর্ঘ অপেক্ষা ও নানা প্রতিকূলতার পর দেশে ফেরার সুযোগ পাওয়ায় প্রত্যাবাসনপ্রত্যাশী অনেক বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

প্রত্যাবাসন কার্যক্রম নির্বিঘ্ন করতে দূতাবাসের কর্মকর্তারা ত্রিপোলির মেতিগা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও উপস্থিত ছিলেন। তারা দেশে ফেরত আসা বাংলাদেশিদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেন। এ সময় দূতাবাসের কাউন্সেলর (শ্রম), প্রথম সচিব (শ্রম)সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রি-ডিপার্চার ব্রিফিংয়ে রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল মো. হাবীব উল্লাহ বলেন, বিপদগ্রস্ত বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপদ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ দূতাবাস দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। এ লক্ষ্যে লিবিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক ও সমন্বয় করা হচ্ছে।

মানবিক কারণে স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসন কার্যক্রমে সহযোগিতার জন্য লিবিয়া সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, বিপদগ্রস্ত বাংলাদেশিদের দেশে ফেরানোর ক্ষেত্রে লিবিয়া সরকারের অগ্রাধিকার দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কেরই প্রতিফলন।
দেশে ফিরে প্রত্যাবাসিত বাংলাদেশিদের নতুনভাবে জীবন শুরু করার আহ্বান জানান রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, সমাজের নেতিবাচক মন্তব্য বা অবজ্ঞাকে উপেক্ষা করে পরিবারের সহযোগিতা ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।

একইসঙ্গে অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচারের ঝুঁকি সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরিতে দেশে ফেরত আসা ব্যক্তিদের ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি। যাতে অন্য কেউ দালালচক্রের প্রলোভনে পড়ে একই ধরনের দুর্ভোগের শিকার না হন।

মানবপাচার ও দালালচক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন রাষ্ট্রদূত।

বিদায় দেওয়ার সময় রাষ্ট্রদূত লিবিয়ার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। প্রত্যাবাসন কার্যক্রমে সহযোগিতার জন্য লিবিয়ার জাতীয় ঐক্যমত্যের সরকার, বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।

রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশ দূতাবাস ও লিবিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ প্রচেষ্টা এবং আন্তরিক সমন্বয়ের ফলেই এই মানবিক প্রত্যাবাসন কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

ভবিষ্যতেও বিপদগ্রস্ত ও স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে আগ্রহী বাংলাদেশিদের প্রত্যাবাসনে লিবিয়া সরকারের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

স্বাধীন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হয়: তথ্যমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৫:৫৫ অপরাহ্ণ
স্বাধীন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হয়: তথ্যমন্ত্রী

একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হয় বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।

শুক্রবার (৭ আগস্ট) ঢাকার একটি হোটেলে টেলিভিশন এডিটরস কাউন্সিল (টিইসি) আয়োজিত ‘টেকসই গণতন্ত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এ মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, গণমাধ্যম স্বীকার করছে তাদের ওপর কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ নেই। বরং একটি স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও অর্থনৈতিকভাবে টেকসই গণমাধ্যম ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাংবাদিক, মালিক ও সরকার পক্ষ যৌথভাবে কাজ করে চলেছে।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, সরকার এমন একটি মিডিয়া ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে চায়, যেখানে গণমাধ্যমের মালিক, সাংবাদিক, বিজ্ঞাপনদাতা, রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তাদের ন্যায্য মর্যাদা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

তিনি গণতন্ত্র ও গণমাধ্যমকে একে অপরের পরিপূরক উল্লেখ করে বলেন, টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য যেমন স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম অপরিহার্য, তেমনি একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হয়।

মন্ত্রী গণমাধ্যমকে কেবল একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, সাংবাদিকতা ও এই শিল্প অন্য যেকোনো ক্ষেত্রর চেয়ে ভিন্ন। এটি রাষ্ট্র ও সমাজের একটি অঘোষিত অথচ অনিবার্য চতুর্থ স্তম্ভ। ফলে সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতা, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তবে সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য গণমাধ্যম শিল্পের অর্থনৈতিক ভিত্তিকেও শক্তিশালী হতে হবে।

মন্ত্রী বলেন, মালিকপক্ষ যদি ন্যায্য ব্যবসায়িক পরিবেশ ও যুক্তিসংগত মুনাফা না পায়, তাহলে গণমাধ্যম শিল্প টেকসই হবে না। একই সঙ্গে শক্তিশালী বেসরকারি উৎপাদন অর্থনীতি ছাড়া পণ্য বিজ্ঞাপন বাজারও সম্প্রসারিত হবে না।

তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে প্রচলিত গণমাধ্যমের সঙ্গে ডিজিটাল প্ল্যাটর্ফম, বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত হয়ে মিডিয়া ইকোসিস্টেমকে আরও জটিল করে তুলেছে।

তথ্যমন্ত্রী এই পরিবর্তিত বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যৎমুখী নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে আনা দরকার, যাতে প্রত্যেক অংশীজনের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হয়।

তিনি বলেন, সুশাসন ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা না থাকলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে ব্যবসায়িক স্বার্থ বা দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

তিনি এ প্রবণতাকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য ক্ষতিকর বলে মন্তব্য করেন।

কালের আলো/এসএকে