খুঁজুন
                               
, ,
           

সার্বভৌমত্ব ও বিচারিক মর্যাদা রক্ষায় দিল্লিকে ঢাকার কূটনৈতিক বার্তা

ড. মোঃ মিজানুর রহমান:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৫০ অপরাহ্ণ
সার্বভৌমত্ব ও বিচারিক মর্যাদা রক্ষায় দিল্লিকে ঢাকার কূটনৈতিক বার্তা

সম্প্রতি ভারতের প্রতি বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক প্রতিবাদ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এই প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভারত অবস্থানকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে প্রকাশ্য বক্তব্য এবং গণমাধ্যমে সরাসরি অংশগ্রহণ। বাংলাদেশের সরকারি অবস্থান অনুযায়ী, তিনি বর্তমানে বিচারাধীন; তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে এবং কিছু মামলায় তিনি দণ্ডপ্রাপ্ত। ফলে সরকার বিষয়টিকে কেবল একটি রাজনৈতিক বিতর্ক হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রের সার্বভৌম মর্যাদা, বিচারিক কর্তৃত্ব, জাতীয় সংবেদনশীলতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ভারতীয় ভূখণ্ডে অবস্থানরত একজন পলাতক ও দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও জনগণের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ গভীর উদ্বেগ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে ঢাকা জানিয়েছে, এ ধরনের কর্মসূচি দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের চলমান প্রচেষ্টার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে—এ মর্মে ভারত সরকারকে আগেই উদ্বেগ জানানো হলেও তা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি বলে বাংলাদেশ দুঃখ প্রকাশ করেছে।

কোনো রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি শুধু বন্ধুত্ব, বাণিজ্য কিংবা নিরাপত্তা সহযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, সাংবিধানিক মর্যাদা, বিচারিক স্বাধীনতা এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানেরও প্রতিফলন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্বীকৃত নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্র যদি মনে করে তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বা বিচারিক প্রক্রিয়া অন্য একটি দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে প্রভাবিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তবে কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানানো শুধু তার বৈধ অধিকারই নয়, বরং রাষ্ট্রের দায়িত্বও। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমান ঘটনাটি কেবল একটি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া নয়; বরং এটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের পারস্পরিক আস্থা, বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনধিকার হস্তক্ষেপ পরিহার এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আচরণের মৌলিক নীতিগুলোকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। তাই এই ঘটনাকে একটি বিচ্ছিন্ন কূটনৈতিক বিরোধ হিসেবে নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতির আলোকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

এ ঘটনাকে দলীয় রাজনীতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রের সার্বভৌম সমতা, অ-হস্তক্ষেপের নীতি এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচারের আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কারণ টেকসই প্রতিবেশী সম্পর্কের ভিত্তি পারস্পরিক সম্মান, সংযম এবং একে অপরের সাংবিধানিক ও বিচারিক ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধা। বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক যেমন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও নিরাপত্তা সহযোগিতায় সমৃদ্ধ, তেমনি সীমান্ত হত্যা, তিস্তার পানি বণ্টন, বাণিজ্য বৈষম্য ও রাজনৈতিক আস্থার মতো কিছু অমীমাংসিত প্রশ্নও বিদ্যমান। তাই সাম্প্রতিক ঘটনাকে আবেগের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক রীতির আলোকে বিচার করাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত।

জাতিসংঘ সনদের ২(১) অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রের সার্বভৌম সমতা এবং ২(৭) অনুচ্ছেদ অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অ-হস্তক্ষেপের নীতিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কেবল ভূখণ্ডের ওপর কর্তৃত্ব নয়; বিচারিক এখতিয়ার, আইন প্রয়োগ এবং স্বাধীন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারও এর অন্তর্ভুক্ত। ফলে কোনো রাষ্ট্রের বিচারিক প্রক্রিয়া অন্য দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে প্রভাবিত হতে পারে—এমন আশঙ্কা কূটনৈতিক উদ্বেগ সৃষ্টি করাই স্বাভাবিক।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক শুধু লিখিত আইনের ওপর নয়, কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও পারস্পরিক সংযমের ওপরও নির্ভরশীল। এ কারণেই অধিকাংশ রাষ্ট্র তাদের ভূখণ্ডকে অন্য দেশের রাজনৈতিক সংঘাতের মঞ্চে পরিণত হতে দেয় না। রাজনৈতিক আশ্রয় আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত হলেও, আশ্রয় দেওয়া এবং আশ্রয়প্রাপ্ত ব্যক্তিকে স্বাগতিক দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে নিজ দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালনের সুযোগ দেওয়া এক বিষয় নয়। দালাই লামার ক্ষেত্রে ভারতের সতর্ক অবস্থান এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রে ভারতবিরোধী কর্মকাণ্ড নিয়ে ভারতের অতীত উদ্বেগ—উভয়ই এ কূটনৈতিক বাস্তবতার পরিচায়ক।

বাংলাদেশের আপত্তিও আশ্রয় প্রদানের বিরুদ্ধে নয়; বরং বিচারাধীন, দণ্ডিত ও প্রত্যর্পণ-অনুরোধাধীন বলে বিবেচিত একজন ব্যক্তিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিরুদ্ধে। সরকার বিষয়টিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্ন হিসেবে নয়, পারস্পরিক রাষ্ট্রীয় সম্মান ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারের আলোকে ব্যাখ্যা করেছে। ২০১৩ সালের বাংলাদেশ–ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তি দুই দেশের বিচারিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। যদিও প্রত্যর্পণ স্বয়ংক্রিয় নয় এবং প্রতিটি আবেদন সংশ্লিষ্ট চুক্তি, জাতীয় আইন ও কূটনৈতিক বিবেচনার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি হয়, তবু বাংলাদেশ জানিয়েছে যে শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার অনুরোধের এখনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। ফলে বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি প্রত্যর্পণ সহযোগিতার কার্যকারিতাকেও সামনে এনেছে।

এ আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের রাজনৈতিক সংকট। বিভিন্ন পক্ষের ব্যাখ্যা ভিন্ন হলেও সহিংসতা, প্রাণহানি ও গভীর রাজনৈতিক অস্থিরতার বিষয়টি ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ স্বাধীন তদন্ত ও জবাবদিহির আহ্বান জানিয়েছে। পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনা এবং তাঁর সরকারের একাধিক সাবেক মন্ত্রী ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, দুর্নীতি ও অর্থপাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা হয়েছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী বিচার দেশের প্রচলিত আইনেই চলছে, যদিও সংশ্লিষ্ট পক্ষ এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য বক্তব্য বাংলাদেশের কাছে বিশেষ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্ব পেয়েছে।
২০২৪-পরবর্তী বাস্তবতায় বাংলাদেশ একদিকে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করছে, অন্যদিকে বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি আন্তর্জাতিক সম্মান প্রত্যাশা করছে। তাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক প্রতিবাদকে কেবল তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা, বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি রাষ্ট্রীয় অবস্থান এবং দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখা অধিকতর যুক্তিসঙ্গত।

বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকার ভিত্তিতে গত পাঁচ দশকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য সহযোগিতা গড়ে উঠেছে। ২০১৫ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন এ সম্পর্কের একটি বড় সাফল্য। বর্তমানে ভারত থেকে বাংলাদেশ ২,৫০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ আমদানি করে এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১৪–১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। তবে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য ঘাটতি এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উদ্বেগ। অন্যদিকে তিস্তার পানি বণ্টন, সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়া এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যু। বাংলাদেশ প্রাণঘাতী শক্তির ব্যবহার কমানোর আহ্বান জানিয়ে এসেছে, আর ভারত সীমান্ত অপরাধ, চোরাচালান ও অবৈধ অনুপ্রবেশকে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরে। ফলে সীমান্ত প্রশ্ন এখনো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অন্যতম সংবেদনশীল বিষয়।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও মতপার্থক্য রয়েছে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল, ভারত তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারকে কৌশলগত সমর্থন দিয়েছে। ভারত অবশ্য ধারাবাহিকভাবে বলেছে, তারা বাংলাদেশের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান দেখায় এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে না। এই ভিন্ন বয়ান জনপরিসরে পারস্পরিক আস্থাকে প্রভাবিত করেছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক প্রতিবাদকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা যায় না। এটি সীমান্ত, বিচারিক সহযোগিতা, রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা এবং দীর্ঘদিনের আস্থার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত বৃহত্তর বাস্তবতার অংশ।

দুই দেশের সম্পর্ক ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগও আলোচিত হয়ে আসছে। এর কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে স্থান পেলেও কিছু বিষয়ে দুই দেশের সরকারি অবস্থান ভিন্ন এবং কিছু অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। তাই এসব বিষয় বিশ্লেষণে প্রতিষ্ঠিত তথ্য, রাজনৈতিক বক্তব্য ও জনমতের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি।

সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনায় হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অধিকারসহ বিভিন্ন সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং বাংলাদেশ সরকারও প্রাণঘাতী শক্তির ব্যবহার কমানোর আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী অধিকাংশ ঘটনাকে সীমান্ত অপরাধ, চোরাচালান বা আত্মরক্ষার প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করেছে। একইভাবে অবৈধ অনুপ্রবেশ, কথিত ‘পুশ-ইন’, মাদক ও অস্ত্র পাচার নিয়েও দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে এসবের মধ্যেও সীমান্ত সম্মেলন, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও নিরাপত্তা সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটি ইতিবাচক ভিত্তি।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বিশ্লেষকের অভিযোগ, ভারত অতীতে তৎকালীন সরকারকে কূটনৈতিকভাবে সমর্থন দিয়েছে। অন্যদিকে ভারত বরাবরই বলে এসেছে, তারা বাংলাদেশের জনগণের নির্বাচিত সরকারের সঙ্গেই কাজ করে। এই রাজনৈতিক বিতর্ক দুই দেশের পারস্পরিক আস্থাকে প্রভাবিত করেছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে দাবি উঠেছে যে ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে সক্রিয় প্রচারণা চালাচ্ছেন।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবাদকে বৃহত্তর কূটনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখা যায়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিচারিক প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কাছ থেকে অধিকতর সংযম, পারস্পরিক সম্মান ও কূটনৈতিক সংবেদনশীলতা প্রত্যাশা করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক এতটাই বিস্তৃত যে কোনো একক ঘটনা দিয়ে তাকে মূল্যায়ন করা যায় না; দীর্ঘমেয়াদে পারস্পরিক আস্থা, নিয়মিত সংলাপ ও আন্তর্জাতিক রীতিনীতিই সম্পর্কের প্রধান ভিত্তি।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কে প্রতিটি রাষ্ট্রই তার সার্বভৌমত্ব, বিচারিক কর্তৃত্ব ও জাতীয় মর্যাদা রক্ষায় সংবেদনশীল। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক প্রতিবাদ একটি স্বাভাবিক ও স্বীকৃত পদক্ষেপ। সরকারের অবস্থান অনুযায়ী শেখ হাসিনা বিচারাধীন, বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত ও কিছু ক্ষেত্রে দণ্ডপ্রাপ্ত; একই সঙ্গে তার প্রত্যর্পণও চাওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের রাজনীতি ও বিচারিক বিষয় নিয়ে তার প্রকাশ্য বক্তব্যকে বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচনা করতেই পারে। প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সম্ভাব্য কূটনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে ভারতকে আগেই অবহিত করা হয়েছিল। যদি তা হয়ে থাকে, তবে সেই উদ্বেগ উপেক্ষিত হওয়াকে ঢাকা কূটনৈতিক সংবেদনশীলতার ঘাটতি হিসেবে দেখতেই পারে।

তবে বাংলাদেশের প্রতিবাদে ভারতবিরোধী অবস্থান নেওয়ার আহ্বান নেই; বরং সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক সম্মান, অ-হস্তক্ষেপ এবং গঠনমূলক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রত্যাশাই পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। ভারত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা নিজস্ব আইনি কাঠামোর যুক্তি উপস্থাপন করতে পারে, কিন্তু সে কারণে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক উদ্বেগকে আন্তর্জাতিক কূটনীতির দৃষ্টিতে অস্বাভাবিক বলা কঠিন।

বিষয়টি ভারতের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। ‘Neighbourhood First’ নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার বাংলাদেশ আঞ্চলিক নিরাপত্তা, উত্তর-পূর্ব ভারতের যোগাযোগ, বঙ্গোপসাগর, জ্বালানি ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব বহন করে। গত এক দশকের সহযোগিতার অর্জন টিকিয়ে রাখতে পারস্পরিক রাজনৈতিক আস্থা অপরিহার্য। আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ভারতের জন্যও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সার্বভৌম উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সংবেদনশীল বিষয়ে কূটনৈতিক সংযম প্রদর্শন তার গ্রহণযোগ্যতাকে আরও শক্তিশালী করবে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক প্রতিবাদকে কেবল একটি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করা যাবে না। বিষয়টি রাষ্ট্রের সার্বভৌম মর্যাদা, বিচারিক কর্তৃত্ব, কূটনৈতিক শিষ্টাচার, পারস্পরিক আস্থা এবং আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জাতিসংঘ সনদে বর্ণিত সার্বভৌম সমতা ও অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অ-হস্তক্ষেপের নীতিও এ ধরনের অবস্থানের আন্তর্জাতিক ভিত্তিকে সুদৃঢ় করে। ফলে এ ধরনের ইস্যুতে উভয় পক্ষেরই সংযম, পরিমিতি ও কূটনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মতপার্থক্য থাকা অস্বাভাবিক নয়; তবে সেসবের সমাধান হওয়া উচিত আন্তরিক সংলাপ, পারস্পরিক সম্মান এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক রীতিনীতির আলোকে। ভৌগোলিক নৈকট্য, অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তি বা সরকার পরিবর্তিত হলেও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্ক স্থায়ী থাকে। তাই সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক বিরোধ হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্র-রাষ্ট্র সম্পর্ক, সার্বভৌম সমতা, বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা এবং গঠনমূলক ভবিষ্যতমুখী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করাই হবে অধিকতর বিচক্ষণ ও দূরদর্শী পদক্ষেপ।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট।
Mizan12bd@yahoo.com

বন্দরে পড়ে থাকা পণ্য নিলাম-ধ্বংসে এনবিআরের বড় উদ্যোগ

চট্টগ্রাম সংবাদদাতা
প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:২২ অপরাহ্ণ
বন্দরে পড়ে থাকা পণ্য নিলাম-ধ্বংসে এনবিআরের বড় উদ্যোগ

চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা নিলামযোগ্য ও খালাস না হওয়া পণ্যের জট নিরসনে উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বন্দরের অভ্যন্তরে অবিন্যস্ত অবস্থায় পড়ে থাকা এসব পণ্যের বিস্তারিত তালিকা তৈরি, নিলাম এবং প্রয়োজনে ধ্বংসের কার্যক্রম এগিয়ে নিতে ২০ জন কাস্টমস কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) এ তথ্য জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সংস্থাটির প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে এসব কর্মকর্তা চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে দায়িত্ব পালন করবেন। পণ্যগুলোর ইনভেন্টরি বা মজুত তালিকা তৈরির কার্যক্রম চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের এ দায়িত্বে রাখা হবে।

বন্দরে পড়ে থাকা পণ্যের তালিকা তৈরিতে বিশেষ উদ্যোগ

চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা এবং আমদানির পর খালাস না হওয়া পণ্য বন্দরের জায়গা দখল করে রাখে। এসব পণ্যের মধ্যে নিলামযোগ্য পণ্যও রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে পণ্য জমে থাকায় সেগুলোর সঠিক হিসাব, সংরক্ষণ, নিলাম এবং ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এ পরিস্থিতিতে নিলামযোগ্য ও খালাস না হওয়া পণ্যের বিস্তারিত তালিকা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর। এ জন্য দেশের বিভিন্ন কাস্টমস হাউস, ভ্যাট কমিশনারেট ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে ২০ জন কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে সংযুক্ত করা হয়েছে।

তাঁদের মূল দায়িত্ব হবে বন্দরে পড়ে থাকা পণ্যের ইনভেন্টরি কার্যক্রম সম্পন্ন করা। এর মাধ্যমে কোন পণ্য নিলামযোগ্য, কোনগুলো খালাস হয়নি এবং কোন পণ্যের বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, তা নির্ধারণের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।

১৫ অক্টোবর থেকে দায়িত্ব পালন করবেন কর্মকর্তারা

এনবিআরের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ১৫ অক্টোবর থেকে ইনভেন্টরি কার্যক্রম চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে দায়িত্ব পালন করবেন। দেশের বিভিন্ন দপ্তর থেকে তাঁদের সাময়িকভাবে সংযুক্ত করা হয়েছে।

নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন নারায়ণগঞ্জ ভ্যাট কমিশনারেটের মো. শাহজাহান সরকার ও মুহাম্মদ মোশাররফ হোসাইন; গাজীপুরের মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন ও মো. বিল্লাল হোসেন; ঢাকা দক্ষিণের মো. বেলাল উদ্দিন ও ফজলুল হক; ঢাকা উত্তরের উত্তম কুমার দাস ও মাহমুদুল হাসান।

এ ছাড়া ঢাকা পূর্বের মো. হেদায়েতুল ইসলাম চৌধুরী; ঢাকা পশ্চিমের মো. রোমেল তালুকদার ও সুমনা দেবনাথ; চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেটের ইফতেখার আহমেদ ও মো. আসিফ ইকবাল রাজু; এবং কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কাজী নাইম উদ্দীনকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

তালিকায় আরও রয়েছেন কুমিল্লার মোছা. উম্মে সালমা ও অম্বিকা রানী, কমলাপুর আইসিডি কাস্টম হাউসের মো. তৌহিদুর রহমান, বেনাপোল কাস্টম হাউসের শংকেরালীঘ দেব এবং ঢাকা বন্ড কমিশনারেটের দক্ষিণ ও উত্তর অংশের সত্যজিৎ সরকার ও মো. শাহিনুর আলম।

নিলাম ও ধ্বংসের মাধ্যমে পণ্যের জট নিরসনের লক্ষ্য

এনবিআরের উদ্যোগের পরবর্তী ধাপে তালিকাভুক্ত পণ্যের ধরন ও অবস্থা অনুযায়ী নিলাম অথবা ধ্বংসের কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। যেসব পণ্য নিলামযোগ্য, সেগুলো নিলামের আওতায় আনার মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, নিলামের অনুপযোগী বা বিধি অনুযায়ী ধ্বংস করা প্রয়োজন—এমন পণ্যের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দীর্ঘদিন ধরে বন্দরে পড়ে থাকা পণ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে বন্দরের অভ্যন্তরে জায়গার ব্যবহার আরও কার্যকর হতে পারে। পাশাপাশি নতুন আমদানি পণ্যের কনটেইনার ব্যবস্থাপনা ও খালাস কার্যক্রমেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

রাজস্ব আদায় বাড়ানো ও কনটেইনার জট কমানোর প্রত্যাশা

দ্রুত ইনভেন্টরি সম্পন্ন করে নিলাম ও ধ্বংসের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া গেলে চট্টগ্রাম বন্দরে জমে থাকা কনটেইনারের জট কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নিলামযোগ্য পণ্য বিক্রির মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে।

তবে এ উদ্যোগের বাস্তব সুফল নির্ভর করবে পণ্যের তালিকা তৈরির কাজ কত দ্রুত শেষ হয়, নিলামপ্রক্রিয়া কতটা কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা যায় এবং দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা পণ্য অপসারণে কী পরিমাণ অগ্রগতি অর্জিত হয়, তার ওপর।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

সামান্য সংক্রমণও হতে পারে প্রাণঘাতী, সেপসিসের লক্ষণ চিনবেন যেভাবে

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:০৫ অপরাহ্ণ
সামান্য সংক্রমণও হতে পারে প্রাণঘাতী, সেপসিসের লক্ষণ চিনবেন যেভাবে
সাধারণ সংক্রমণও কখনো কখনো প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা যখন অস্বাভাবিক ও অনিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়া দেখায়, তখন দেখা দিতে পারে সেপসিস। এটি এমন একটি গুরুতর চিকিৎসাজনিত জরুরি অবস্থা, যা দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করা না হলে কিডনি, ফুসফুস, হৃৎপিণ্ড ও মস্তিষ্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দিতে পারে। গুরুতর অবস্থায় রোগী সেপটিক শকে আক্রান্ত হতে পারেন, এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে।

চিকিৎসকদের মতে, সেপসিসের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংক্রমণের লক্ষণের সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, বিভ্রান্তি, প্রস্রাব কমে যাওয়া কিংবা রক্তচাপ কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, নবজাতক এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা জরুরি।

সেপসিস কী, কেন বিপজ্জনকসেপসিসকে অনেক সময় রক্তদূষণ বলা হলেও এটি শুধু রক্তে জীবাণু প্রবেশ করার ঘটনা নয়। বরং সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিরোধব্যবস্থার অনিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়ায় নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করাই সেপসিসের মূল বৈশিষ্ট্য। রক্তের কালচার পরীক্ষায় জীবাণু শনাক্ত না হলেও সেপসিস হতে পারে।

এ অবস্থায় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে যেতে পারে। রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে কমে গেলে এবং রক্ত সঞ্চালন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হলে রোগী সেপটিক শকে আক্রান্ত হতে পারেন। এ পর্যায়ে নিবিড় চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

কোন কোন সংক্রমণ থেকে সেপসিস হতে পারে

ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাকসহ বিভিন্ন জীবাণুর সংক্রমণ থেকে সেপসিস তৈরি হতে পারে। শরীরের কোনো একটি স্থানে শুরু হওয়া সংক্রমণ জটিল হয়ে উঠলে এবং তার বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিক্রিয়া অনিয়ন্ত্রিত হলে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়।

নিউমোনিয়া সেপসিসের অন্যতম পরিচিত কারণ। এ ছাড়া কিডনি ও মূত্রনালির সংক্রমণ, পেটের ভেতরের সংক্রমণ, পেরিটোনাইটিস, অ্যাপেন্ডিসাইটিস, মেনিনজাইটিস, ত্বকের গভীর সংক্রমণ এবং সংক্রমিত ক্ষত থেকেও সেপসিস হতে পারে। অস্ত্রোপচারের পর কিংবা ক্যাথেটার ব্যবহারের সময় সংক্রমণ হলেও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তবে সব সংক্রমণই সেপসিসে রূপ নেয় না। সংক্রমণের ধরন, রোগীর শারীরিক অবস্থা এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতাসহ বিভিন্ন বিষয় এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।

জ্বর, দ্রুত শ্বাস ও হৃৎস্পন্দন বাড়লে সতর্ক হোন

সেপসিসের প্রাথমিক লক্ষণ অনেক সময় সাধারণ সংক্রমণের মতো মনে হতে পারে। জ্বর, শরীর কাঁপা, দ্রুত শ্বাস নেওয়া এবং হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে এসব লক্ষণ একা সেপসিস নিশ্চিত করে না; রোগীর সামগ্রিক অবস্থা ও চিকিৎসকের মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।

সংক্রমণের পাশাপাশি শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া, দ্রুত হৃৎস্পন্দন কিংবা স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত শ্বাস নেওয়া উদ্বেগের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে থাকলে অপেক্ষা না করে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।

গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার লক্ষণ

সেপসিসের বিপজ্জনক দিক হলো, এতে শরীরের একাধিক অঙ্গের কার্যক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে। কিছু লক্ষণ দেখে পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে ওঠার আশঙ্কা বোঝা যায়।

মস্তিষ্ক: রোগী হঠাৎ বিভ্রান্ত হয়ে পড়তে পারেন, অসংলগ্ন কথা বলতে পারেন কিংবা স্বাভাবিকভাবে সাড়া দিতে ব্যর্থ হতে পারেন। গুরুতর অবস্থায় অচেতন হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।

কিডনি: প্রস্রাবের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। এটি কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার লক্ষণ হতে পারে।

ফুসফুস: শ্বাসকষ্ট বেড়ে যেতে পারে এবং রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যেতে পারে।

রক্তসংবহন: রক্তচাপ কমে গেলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে পর্যাপ্ত রক্ত পৌঁছানো বাধাগ্রস্ত হতে পারে। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কিংবা ত্বক ফ্যাকাশে বা ছোপছোপ দেখানোর মতো লক্ষণও দেখা দিতে পারে।

লিভার ও রক্তের উপাদান: গুরুতর অবস্থায় জন্ডিসের লক্ষণ দেখা দিতে পারে, রক্তে অণুচক্রিকার সংখ্যা কমে যেতে পারে এবং ল্যাকটেটের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। এসব পরিবর্তন পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়।

এসব লক্ষণের কোনোটি দেখা দিলে সেপসিস হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত নিজে থেকে নেওয়া উচিত নয়। তবে সংক্রমণের সঙ্গে এমন উপসর্গ থাকলে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।

কারা সেপসিসের বেশি ঝুঁকিতে

বয়স্ক ব্যক্তি, নবজাতক, অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং যাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, তাঁদের সেপসিসের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। ডায়াবেটিস, কিডনি বা লিভারের দীর্ঘমেয়াদি রোগ এবং ক্যানসারে আক্রান্ত ব্যক্তিদেরও সংক্রমণের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী, অস্ত্রোপচারের পর থাকা ব্যক্তি কিংবা যাঁদের শরীরে ক্যাথেটার বা অন্য কোনো চিকিৎসা-সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে, তাঁদের ক্ষেত্রেও সংক্রমণের লক্ষণ গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে হয়।

সেপসিসের চিকিৎসায় কী করা হয়

সেপসিস একটি মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি। সন্দেহ হলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করতে হয়। রোগীর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখার প্রয়োজনও হতে পারে।

অ্যান্টিবায়োটিক ও পরীক্ষা: ব্যাকটেরিয়াজনিত সেপসিস সন্দেহ হলে চিকিৎসকেরা দ্রুত উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করেন। সম্ভব হলে চিকিৎসায় অযথা দেরি না করে আগে রক্তের কালচারসহ প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরীক্ষার ফল, সংক্রমণের উৎস এবং রোগীর অবস্থা অনুযায়ী পরে ওষুধ পরিবর্তন করা হতে পারে।

শিরায় তরল ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ: রক্তচাপ কমে গেলে বা রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত হলে রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী শিরায় তরল দেওয়া হয়। হৃদ্‌যন্ত্র ও কিডনির অবস্থা বিবেচনা করে তরলের পরিমাণ নির্ধারণ করতে হয়। প্রয়োজন হলে রক্তচাপ বাড়ানোর ওষুধও দেওয়া হয়।

অক্সিজেন ও অঙ্গের সহায়তা: রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে অক্সিজেন দেওয়া হয়। গুরুতর শ্বাসকষ্টে ভেন্টিলেশনের প্রয়োজন হতে পারে। কিডনি বা অন্য অঙ্গের কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হলে বিশেষায়িত সহায়ক চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।

সংক্রমণের উৎস নিয়ন্ত্রণ: শরীরে পুঁজ জমলে তা নিষ্কাশন, সংক্রমিত ক্যাথেটার অপসারণ কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সংক্রমণের উৎস নিয়ন্ত্রণ করা হতে পারে।

নিবিড় পর্যবেক্ষণ: চিকিৎসার সময় রক্তচাপ, শ্বাসপ্রশ্বাস, অক্সিজেনের মাত্রা, প্রস্রাবের পরিমাণ এবং কিডনিসহ বিভিন্ন অঙ্গের কার্যক্ষমতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। রোগীর অবস্থার পরিবর্তন অনুযায়ী চিকিৎসায় সমন্বয় আনা হয়।

সেপসিস প্রতিরোধে যা করবেন

সেপসিস প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো সংক্রমণ প্রতিরোধ করা এবং সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া। এ জন্য কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

  • খাওয়ার আগে, শৌচাগার ব্যবহারের পর এবং হাত ময়লা হলে সাবান-পানি দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুতে হবে।
  • শরীরের কাটা-ছেঁড়া ও ক্ষতস্থান পরিষ্কার রাখতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিষ্কার ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে।
  • ইনফ্লুয়েঞ্জা ও নিউমোনিয়াসহ প্রাসঙ্গিক সংক্রমণ প্রতিরোধী টিকা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিতে হবে।
  • ডায়াবেটিস, কিডনি ও ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে এবং নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করা যাবে না। অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ও মেয়াদ সম্পর্কে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
  • জ্বর বা সংক্রমণের সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, বিভ্রান্তি, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, প্রস্রাব কমে যাওয়া কিংবা রক্তচাপ কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।

সেপসিসের ক্ষেত্রে লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর দেরি করা বিপজ্জনক হতে পারে। তাই সংক্রমণের পাশাপাশি রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে ঘরোয়া চিকিৎসায় সময় নষ্ট না করে হাসপাতালে নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক: ডা. খাজা নাজিমুদ্দিন, অধ্যাপক ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ।

কালের আলো/এসএ

বাংলাদেশে ৩০ হাজার কন্যাশিশু বাণিজ্যিক যৌন শোষণের শিকার

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:৫৮ অপরাহ্ণ
বাংলাদেশে ৩০ হাজার কন্যাশিশু বাণিজ্যিক যৌন শোষণের শিকার
বাংলাদেশে প্রায় ৩০ হাজার কন্যাশিশু বাণিজ্যিক যৌন শোষণের শিকার হচ্ছে বলে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মানবপাচারবিষয়ক প্রতিবেদন ‘ট্রাফিকিং ইন পারসনস (টিআইপি) রিপোর্ট’-এর বরাতে প্রকাশিত তথ্যে এ চিত্র উঠে এসেছে। একই তথ্যে বলা হয়েছে, যৌন পেশায় যুক্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৪৫ শতাংশ শৈশবেই এ পেশায় প্রবেশ করতে বাধ্য হয়েছেন।

শিশুদের নিরাপত্তা, অধিকার ও সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্টদের জন্য এ তথ্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। কারণ, শিশুদের যৌন শোষণ শুধু তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে না, বরং শিক্ষা, স্বাভাবিক বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ জীবনকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে।

প্রেমের ফাঁদ ও চাকরির প্রলোভনে শোষণের ঝুঁকি

প্রতিবেদনে উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী, প্রেমের সম্পর্কের প্রলোভন, চাকরির প্রতিশ্রুতি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা কর্মকাণ্ডের আড়ালে শিশুদের যৌন শোষণের ঝুঁকিতে ফেলা হচ্ছে। অপরাধীরা কখনো বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তুলে, আবার কখনো ভালো ভবিষ্যৎ বা আর্থিক সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে শিশুদের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করে।

বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার শিশুদের জন্য নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। অনলাইনে পরিচয়ের সূত্র ধরে প্রতারণা, প্রলোভন কিংবা শোষণের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ফলে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের সচেতন করা জরুরি।

বিশ্বজুড়ে জোরপূর্বক শ্রমে বিপুল অবৈধ মুনাফা

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে জোরপূর্বক শ্রম থেকে বছরে প্রায় ২৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধ মুনাফা হয়। এর মধ্যে আনুমানিক ১৭২ বিলিয়ন ডলার আসে বাণিজ্যিক যৌন শোষণ থেকে।

এই পরিসংখ্যান মানবশোষণের অর্থনৈতিক বাংলাদেশে ৩০ হাজার কন্যাশিশু বাণিজ্যিক যৌন শোষণের শিকারব্যাপ্তি তুলে ধরে। মানুষের অসহায়ত্ব ও দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে পরিচালিত এ ধরনের অপরাধের প্রভাব ব্যক্তি ও পরিবারের গণ্ডি ছাড়িয়ে সমাজের নিরাপত্তা এবং মানবাধিকারের ওপরও পড়ে।

শিশুদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

শিশুদের যৌন শোষণ ও পাচার প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সামাজিক সুরক্ষা সংস্থার সমন্বিত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের সঙ্গে বিশ্বাসভিত্তিক যোগাযোগ তৈরি, অনলাইন নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রতারণা বা শোষণের লক্ষণ শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

একই সঙ্গে শিশু নিখোঁজ হওয়া, প্রলোভন দেখিয়ে কোথাও নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা কিংবা শোষণের সন্দেহজনক ঘটনা দেখা গেলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। ভুক্তভোগী শিশুর পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা এবং তাকে দোষারোপ না করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়াও জরুরি।

প্রতিবেদনে উল্লেখিত সংখ্যাগুলোর ভিত্তি, সময়কাল ও হিসাবের পদ্ধতি মূল প্রতিবেদন থেকে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে শিশুদের যৌন শোষণ ও মানবপাচার প্রতিরোধে কার্যকর সুরক্ষা, সচেতনতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

কালের আলো /জেএন/এসএ