খুঁজুন
                               
, ,
           

শিক্ষকের পোশাকে রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা!

আহসান হাবিব বরুন
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৩১ অপরাহ্ণ
শিক্ষকের পোশাকে রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা!

বাংলাদেশ একটি প্রগাঢ় ইতিহাস ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা রাষ্ট্র। এই ভূখণ্ডের অগণিত ত্যাগ, রক্তের মহাকাব্য এবং মূল্যবোধের স্তম্ভগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের জাতীয় পরিচয়। এই জাতি গঠনে এবং তার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে যেসব শ্রেণি সর্বাগ্রে আলো ছড়িয়েছে, তাঁদের মধ্যে শিক্ষকসমাজ অন্যতম। শিক্ষক কেবল শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মাঝে পাঠদানকারী কোনো সাধারণ চাকরিজীবী নন; তিনি জাতির বিবেক, মূল্যবোধের ধারক এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেশপ্রেম ও সামাজিক দায়িত্ববোধে দীক্ষিত করার দিশারী। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একশ্রেণির শিক্ষকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী গোপন তৎপরতা এবং ষড়যন্ত্রের গুরুতর অভিযোগ সংবাদ মাধ্যমে উঠে এসেছে—যা পুরো জাতিকে স্তব্ধ ও গভীরভাবে মর্মাহত করেছে।

যেখানে শিক্ষককে সামাজিক ও জাতীয় কাঠামোতে সবচেয়ে মর্যাদাবান ও শ্রদ্ধেয় শ্রেণি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেখানেই যখন কতিপয় শিক্ষক ব্যক্তিস্বার্থ, রাজনৈতিক তোষণ কিংবা দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন, তখন এর চেয়ে বেদনাদায়ক ও লজ্জাজনক বিষয় আর কিছু হতে পারে না।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ দেশের শিক্ষকমণ্ডলী ছিলেন মুক্তির আন্দোলনের অগ্রসেনানী। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা খুব ভালো করেই জানত—একটি জাতিকে পঙ্গু ও মেধাশূন্য করতে হলে আগে তার বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষকদের নিধন করতে হবে। সেই লক্ষ্যে ২৫ মার্চ কালরাতে এবং ১৪ ডিসেম্বরের নির্মম বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু প্রথিতযশা অধ্যাপক ও শিক্ষক প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন।

অধ্যাপক ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, ড. জি সি দেব, অধ্যাপক সন্তোষচন্দ্র ভট্টাচার্য, মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর মতো শিক্ষাগুরুরা রক্ত দিয়ে এই লাল-সবুজ পতাকাকে অর্থবহ করে গেছেন। তাঁরা জীবনের বিনিময়ে শিখিয়ে গেছেন—শিক্ষকের মূল পরিচয় তাঁর নীতি, সততা এবং অদম্য দেশপ্রেম।

কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে এবং বিশেষ করে সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে যখন আমরা দেখি—একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক চেতনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে কিছু শিক্ষক গোপনে জোট বাঁধছেন, রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতায় মদদ দিচ্ছেন, তখন স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে—ঐতিহ্যের সেই মহান স্তম্ভগুলো আজ কোথায় এসে দাঁড়াল?

সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত চাঞ্চল্যকর তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশের ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষক একটি টেলিগ্রামভিত্তিক গোপন গ্রুপের মাধ্যমে রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত ছিলেন। এই তথ্যের পরিপ্রক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯২ জন শিক্ষকের মধ্যে ইতোমধ্যে ৫৮ জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই অভিযোগ খতিয়ে দেখতে প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা)-কে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের উচ্চপর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

অভিযোগ উঠেছে, ‘বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ’ নামক একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বা গোপন টেলিগ্রাম গ্রুপের মাধ্যমে তারা এই কার্যক্রম সমন্বয় করছিলেন। শিক্ষা যদি হয় আলোর নাম, তবে তা কেন কোনো গোপন অন্ধকার চ্যাটগ্রুপের আড়ালে পরিচালিত হবে? শিক্ষকের চেতনা যদি হয় সততা ও উন্মুক্ততা, তবে কেন রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা বিনষ্টের চক্রান্তে গোপন ছক কষা হবে?

শিক্ষার চত্বরে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিরুদ্ধে এমন গোপন আঁতাত কোনোভাবেই একজন আদর্শ শিক্ষকের নৈতিকতার সঙ্গে মেলে না। যারা ক্ষমতার লোভ, দলীয় অন্ধ আনুগত্য কিংবা ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিকে দুর্বল করতে চান, আমি মনে করি তারা আর যা-ই হোক—প্রকৃত শিক্ষক পদের যোগ্য নন। তারা শিক্ষক নামক পবিত্র পদের আড়ালে এই জাতির জন্য এক বড় কলঙ্ক।

সাধারণত পেশাগত শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে চাকরিচ্যুতি বা বরখাস্ত করার বিধান থাকে। কিন্তু ‘রাষ্ট্রবিরোধী গোপন তৎপরতা’ বা দেশের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলার ষড়যন্ত্র কোনো সাধারণ শৃঙ্খলাভঙ্গের অপরাধ নয়। এটি সরাসরি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, আইনি শৃঙ্খলা এবং কোটি মানুষের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।

একজন সাধারণ নাগরিক অপরাধ করলে যে ক্ষতি হয়, একজন শিক্ষক যখন রাষ্ট্রবিরোধী কাজে লিপ্ত হন, তখন তার বহুমাত্রিক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ওপর। শিক্ষকের ওপর সমাজ ও রাষ্ট্র যে বিপুল আস্থা রাখে, রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতার মাধ্যমে সেই আস্থার চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়।

রাষ্ট্রদ্রোহ ও গোপন চক্রান্ত জাতীয় নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি। তাই শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবে চাকরিচ্যুত করে তাদের ছেড়ে দিলে তা অপরাধের ভয়াবহতাকে লঘুপাত করার সামিল হবে। আইনের সুনির্দিষ্ট ধারায় তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো বিদ্যাপীঠ রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্তের উর্বর ভূমিতে পরিণত হতে না পারে।

দীর্ঘদিন ধরে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মেধা ও দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষক নিয়োগের যে অপসংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, এটি তারই এক বিষময় ফল। যখন একজন শিক্ষক মেধার জোরে নয়, বরং রাজনৈতিক তোষামোদীর মাধ্যমে পদমর্যাদা পান, তখন তিনি শিক্ষাদানের চেয়ে রাজনৈতিক প্রভুদের এজেন্ডা বাস্তবায়নেই বেশি ব্যস্ত থাকেন।

উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো মুক্তচিন্তা, গবেষণা, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চার কেন্দ্রস্থল। যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা গোপন গ্রুপ তৈরি করে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠেন, তখন শিক্ষার সার্বিক পরিবেশ ধসে পড়ে।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা দরকার যে,শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের অনুসরণ করে। শিক্ষকরা যদি সততা ও জাতীয় স্বার্থের বিপরীতে গিয়ে ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নেন, তবে তা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে চরম হতাশা ও নৈতিক অবক্ষয় তৈরি করে।

শিক্ষকতার মূল কাজ গবেষণা ও শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ দেওয়া। কিন্তু রাজনীতিকীকরণের কারণে শিক্ষকরা যখন রাষ্ট্রবিরোধী বা দলীয় চক্রান্তে যুক্ত হন, তখন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান তলানিতে গিয়ে ঠেকে। আন্তর্জাতিক সূচকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থানই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

এখানে আমি এ কথাও বলব যে,তদন্ত প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে—আইনের বিচার হতে হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং তথ্য-প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, তাদের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 গণমাধ্যমের সংবাদের ওপর ভিত্তি করে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হলেও, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রতিটি শিক্ষকের ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতা ও অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে হবে। যেন কোনো নিরপরাধ শিক্ষক রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা বিভ্রান্তির শিকার না হন।

তবে যদি তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়—তবে রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয়ের তোয়াক্কা না করে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

এই গ্লানিকর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি:

দলীয় বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ করে মেধা, গবেষণা ও নৈতিক চরিত্রকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রসংবিধানে রাষ্ট্রদ্রোহ ও জাতীয় নিরাপত্তাবিরোধী আচরণের ক্ষেত্রে স্পষ্ট ও কঠোর শাস্তিমূলক ধারা যুক্ত করতে হবে।

গোপন রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধ করে শিক্ষাঙ্গনে সুস্থ, উন্মুক্ত ও গঠনমূলক একাডেমিক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও শিক্ষকের ঐতিহ্যগত সামাজিক দায়িত্ববোধের আলোকে শিক্ষকতার মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে হবে।

পরিশেষে বলতে চাই,বাংলাদেশের স্থপতি ও শহীদেরা যে স্বপ্নের বাংলাদেশ চেয়েছিলেন, সেখানে শিক্ষকসমাজ থাকবে জাতির পথপ্রদর্শক হয়ে। শিক্ষকের পোশাকে কোনো ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা কিংবা ষড়যন্ত্র এ দেশের সচেতন জনগণ বরদাশত করবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত শেষ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। যারা তদন্তে অপরাধী হিসেবে প্রমাণিত হবেন, তাদেরকে কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়াই শেষ কথা নয়; দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। কেবল শাস্তির মধ্য দিয়েই নিশ্চিত করা সম্ভব যে-ভবিষ্যতে আর কেউ শিক্ষকের পবিত্র পোশাক ও মর্যাদাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে জাতির স্বার্থ ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর দুঃসাহস দেখাবে না।

লেখক:সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক 

ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্রের ঝঙ্কার: স্বাধীন দেশে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর দৌরাত্ম্য আর কতকাল?

এম মহাসিন মিয়া:
প্রকাশিত: সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৫৫ অপরাহ্ণ
পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্রের ঝঙ্কার: স্বাধীন দেশে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর দৌরাত্ম্য আর কতকাল?

প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র্য ও সৌন্দর্যের লীলাভূমি স্বাধীন বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ পার্বত্য চট্টগ্রাম আজ আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর লাগামহীন দৌরাত্ম্যে বিভীষিকাময় এক জনপদে পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতা অর্জনের দীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও এই ভূখণ্ডের একটি বিশেষ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ আজও শান্তির বদলে প্রতিনিয়ত গানপাউডার আর বারুদের গন্ধ শুঁকে দিনাতিপাত করছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের অনবদ্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ঢেকে দিয়েছে অবৈধ অস্ত্রের মহড়া, আধিপত্য বিস্তারের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম এবং পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনগণকে জিম্মি করে রাখার অপকৌশল। পাহাড়ে শান্তিশৃঙ্খলা ও দেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখতে রাষ্ট্র ও সরকারের পক্ষ থেকে যুগে যুগে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হলেও সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর অনড় অবস্থান, অপতৎপরতা এবং সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা কায়েমের অশুভ আকাঙ্ক্ষার কারণে প্রত্যাশিত স্থায়িত্ব লাভ করেনি পার্বত্য অঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশ। ফলে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সার্বভৌম ভূখণ্ডে এমন সশস্ত্র নৈরাজ্য আর কতকাল বহাল থাকবে, তা আজ গোটা জাতির কাছে এক মস্ত বড় প্রশ্ন ও চরম উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

‎সম্প্রতি খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার পানছড়িতে ঘটে যাওয়া এক রক্তক্ষয়ী ঘটনা পাহাড়ে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর উগ্রতা ও আধিপত্য বিস্তারের চিত্রকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার চেঙ্গি ইউনিয়নের তারাবন এলাকায় গত ৫ সেপ্টেম্বর- ২০২৬ তারিখে পাহাড়ি দুটি প্রধান আঞ্চলিক দল, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস-মূল) এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-মূল) এর মধ্যে এক ভয়াবহ সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। সকালের দিকে জেএসএস ক্যাডারদের মহড়া ও ফাঁকা গুলির পর বিকেলে তা রূপ নেয় মুখোমুখি এক রক্তক্ষয়ী গোলাগুলিতে। বিবর্ণ চাকমার নেতৃত্বাধীন ২৫-৩০ জনের জেএসএস দল এবং সুমেন চাকমার পরিচালনায় ৩৫-৪০ জনের সুসজ্জিত ইউপিডিএফ বাহিনীর মধ্যে একটানা আড়াই ঘণ্টাব্যাপী আক্ষরিক অর্থেই যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই দুই পক্ষের মধ্যকার প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ রাউন্ড অনবরত গুলিবিনিময়ের ফলে পুরো তারাবন ও জগা পাড়া এলাকা মুহূর্তে এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। কোনো প্রাণহানি নিশ্চিত না হলেও অনবরত বিকট গুলির শব্দে অবরুদ্ধ সাধারণ মানুষের মনে এক বিভীষিকাময় ভীতি তৈরি হয়েছিল।

‎পানছড়ির উত্তাপ প্রশমিত হতে না হতেই ৬ সেপ্টেম্বর- ২০২৬ তারিখে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটির সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় পর্যটন উপত্যকা সাজেকে ইউপিডিএফ (প্রসীত) ও জেএসএস (সন্তু) গ্রুপের সশস্ত্র ক্যাডারদের বিপজ্জনক মহড়া ও মুখোমুখি অবস্থান পাহাড়ের পরিস্থিতিকে আরও থমথমে করে তোলে। দেশের শীর্ষতম পর্যটন কেন্দ্র সাজেক উপত্যকার নোয়াপাড়া, ৮নং পাড়া, কিচিংপাড়া ও ব্রীজপাড়ার মতো স্পর্শকাতর ও ঘনবসতিপূর্ণ স্থানগুলোতে ইউপিডিএফের প্রায় নব্বইজন এবং জেএসএস গ্রুপের সত্তর-আশিজন ক্যাডার ভারি অস্ত্রশস্ত্রসহ কৌশলগত অবস্থান নেয়। ইউপিডিএফের পক্ষে সুমন চাকমা, কহেন চাকমা ও পরান্টু চাকমা এবং জেএসএসের পক্ষে বিক্রম চাকমা ও মুচং চাকমার মতো শীর্ষ সশস্ত্র কমান্ডারের সরাসরি নেতৃত্বে শতাধিক ক্যাডারের এমন মহড়া যে কোনো মুহূর্তে এক ভয়াবহ রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছিল। একদিকে সাধারণ স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে জীবনভীতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন, অন্যদিকে সাজেকে বেড়াতে আসা অগণিত পর্যটকদের নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। মূলত পাহাড়ে পর্যটন শিল্পকে ধ্বংস করা এবং সাধারণ মানুষকে চাপে রাখার কৌশল হিসেবেই সাজেকের মতো জায়গায় সশস্ত্র ক্যাডাররা এই অবস্থান নিয়েছিল।

‎পাহাড়জুড়ে কায়েম করা এই নৈরাজ্যের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় সুপরিচিত পর্যটন এলাকা রিসাং ঝর্ণা সংলগ্ন অঞ্চলে ইউপিডিএফ (প্রসীত) বাহিনীর অতর্কিত গুলিবর্ষণে। গভীর রাতে নিরবতা ভঙ্গ করে সেনাবাহিনীর মাটিরাঙ্গা জোনের অন্তর্ভুক্ত সাপমারা আর্মি ক্যাম্পের কয়েক কিলোমিটার উত্তরে এই সশস্ত্র দলটি প্রথম দফায় ১০-১২ রাউন্ড এবং পরবর্তী দফায় গভীর রাত ১২টা থেকে ৩টার মধ্যে আরও প্রায় ৩০ রাউন্ড ফাঁকা গুলি বর্ষণ করে গা ঢাকা দেয়। সর্বমোট ৪০-৪২ রাউন্ড ভারী অস্ত্রের গুলি চালিয়ে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন এবং পর্যটন খাতে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর মূল উদ্দেশ্য। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি রিসাং ঝর্ণার মতো জায়গায় ঘুরতে আসা পর্যটকদের মনে এই জাতীয় রাতের আঁধারে গুলিবর্ষণ গভীর আতঙ্কের জন্ম দেয়। শান্ত জনপদ মাটিরাঙ্গায় এমন প্রকাশ্য অস্ত্রের ঝঙ্কার প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের জীবন বা এলাকার অর্থনৈতিক অগ্রগতির তোয়াক্কা না করে এই সশস্ত্র দলগুলো কেবল নিজেদের কায়েমী স্বার্থ হাসিল এবং সাধারণ মানুষকে সার্বক্ষণিক ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে বন্দি করে রাখতে চায়।

‎সাম্প্রতিক পার্বত্য চট্টগ্রামের এই তিনটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা কোনো আকস্মিক অগ্নিকাণ্ড নয়, বরং এটি তাদের দীর্ঘদিনের সুপরিকল্পিত আধিপত্য বিস্তারের ছকেরই অংশ। জেএসএস-মূল, ইউপিডিএফ-মূল, ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক, জেএসএস-সংস্কার সহ বিভিন্ন উপশাখায় বিভক্ত এই সংগঠনগুলো মুখে তাঁদের জুম্ম জনগণের অধিকার আদায়ের কথা বললেও বাস্তবে তারা সন্ত্রাসী কার্যক্রমেই লিপ্ত। নিজেদের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক প্রভাববলয় বা ‘টার্ফ’ ধরে রাখা এবং চাঁদাবাজির রুট সচল রাখার জন্য তারা একে অপরের বিরুদ্ধে চরম শত্রুতায় লিপ্ত হয়। গোষ্ঠীগত এই দ্বন্দ্বের বলি হতে হয় নিরীহ পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীকে, যাদের দৈনন্দিন কাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষি কাজ হুমকির মুখে পড়ে। নিজেদের মধ্যে অঞ্চল ভাগাভাগি এবং আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে পুরো পাহাড়ের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ভেস্তে যাচ্ছে। তথাকথিত অধিকার আদায়ের নামে নিজেদের জাতির মানুষের বুক খালি করা এবং সার্বিক জনজীবনকে অচল করে দেওয়া ছাড়া এই আঞ্চলিক দলগুলোর আর কোনো জনকল্যাণমুখী ভূমিকা সাধারণ মানুষের চোখে পড়ে না।

‎পার্বত্য অঞ্চলে সশস্ত্র দলগুলোর টিকে থাকার প্রধান রসদ এবং অর্থায়নের মূল উৎস হলো এক ভয়াবহ চাঁদা আদায় ও তোলাবাজি নেটওয়ার্ক। পাহাড়ের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে জেলা শহর পর্যন্ত প্রতিটি বাজার, যানবাহন, জুমচাষ, বাঁশ কাটা, ফল বিক্রি এমনকি সাধারণ চাকরিজীবীদের বেতন থেকেও নিয়মিত জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করা হয়। কোনো সাধারণ নাগরিক বা ব্যবসায়ী যদি এই অবৈধ চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে তার কপালে জোটে অমানসিক নির্যাতন, অপহরণ কিংবা নির্মম হত্যাকাণ্ড। শুধু চাঁদা আদায়ই নয়, পাহাড়ের গহীন অরণ্যকে ব্যবহার করে অবৈধ অস্ত্রের কারবার, মাদক চোরাচালান এবং সীমান্ত পারের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সাথে গোপন যোগসাজশের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করছে এই সংগঠনগুলো। এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ কালো টাকা দিয়েই তারা আধুনিক ও ভারী সব অস্ত্রশস্ত্র ক্রয় করছে, যা দিয়ে দিন দিন তারা নিজেদের সামরিক শক্তি বাড়িয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ জানানোর দুঃসাহস দেখাচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষ আজ নিজস্ব ভূখণ্ডে থেকেও এক প্রকার মুক্তিপণ দিয়ে জীবনযাপনের চরম অপমানজনক পরিস্থিতি সহ্য করতে বাধ্য হচ্ছে।

‎গুম, খুন এবং অপহরণ পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর এক প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কোনো ব্যক্তি যদি এই সংগঠনগুলোর মতাদর্শের বাইরে গিয়ে স্বাধীন মতামত প্রকাশ করে কিংবা তাদের চাঁদা দাবির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়, তাকে রাতের আঁধারে তুলে নিয়ে যাওয়া এখন পাহাড়ে নিত্যদিনের ঘটনা। অসংখ্য পাহাড়ি তরুণকে জোরপূর্বক ক্যাডার দলে রিক্রুট করা হচ্ছে এবং তা না মানলে পুরো পরিবারকে ভিটেমাটি ছাড়া করার হুমকি দেওয়া হয়। মানবাধিকারের বুলি ছড়ানো দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এনজিও সংস্থা পাহাড়ে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বা সেনাবাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে সোচ্চার হলেও, আঞ্চলিক সন্ত্রাসী দলগুলোর হাতে অগণিত নিরীহ মানুষের এই নির্মম গুম ও খুনের ঘটনায় অদ্ভুত নীরবতা পালন করে। এই সন্ত্রাসী দলগুলো সাধারণ পাহাড়িদের ভয় দেখিয়ে এমন এক স্তব্ধতার সংস্কৃতি তৈরি করেছে, যেখানে প্রতিবাদের কোনো ভাষা অবশিষ্ট থাকে না। স্বজনহারা পরিবারগুলোর আর্তনাদ পাহাড়ের উপত্যকাগুলোতে প্রতিধ্বনি হলেও সন্ত্রাসী ক্যাডারদের রক্তচক্ষু ও প্রতিশোধের ভয়ে কেউ পুলিশ বা আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সাহস পর্যন্ত পায় না।

‎বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পার্বত্য অঞ্চলের রয়েছে বিপুল সম্ভাবনাময় ভূমিকা, বিশেষ করে পর্যটন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহারে। কিন্তু সাজেক, রিসাং ঝর্ণা, পানছড়ি বা বান্দরবানের মতো আকর্ষণীয় এলাকাগুলোতে প্রতিনিয়ত সশস্ত্র সংঘাত ও গোলাগুলির খবর ছড়িয়ে পড়ায় পর্যটন খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশি-বিদেশি পর্যটকরা যখন পাহাড়ে নিজেদের জীবন ও নিরাপত্তার হুমকি অনুভব করেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তারা এসব স্থান ভ্রমণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। ফলে পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য, হোটেল-রিসোর্ট শিল্প এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের রুটি-রুজির ওপর নেমে আসে চরম বিপর্যয়। শুধু পর্যটনই নয়, এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে পাহাড়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যেমন, রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ এবং বিদ্যুৎ সংযোগ সম্প্রসারণের কাজ বারবার থমকে যায়। ঠিকাদারদের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি এবং চাঁদা না দিলে নির্মাণকাজে নিয়োজিত কর্মীদের অপহরণ বা হত্যা করার মাধ্যমে পুরো অঞ্চলের উন্নয়ন থমকে দেওয়ার অপচেষ্টা করে চলেছে এই গোষ্ঠীগুলো। ফলে পার্বত্য অঞ্চলকে মূল অর্থনীতির ধারার সাথে যুক্ত করা চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।

‎স্বাধীন বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কোনো অবস্থাতেই নিজের ভূখণ্ডের একটি নির্দিষ্ট অংশে সমান্তরাল সশস্ত্র শাসন বা সন্ত্রাসী ক্যাডারদের রাজত্ব মেনে নিতে পারে না। পাহাড়ের অখণ্ডতা রক্ষা, সাধারণ জনগণের মৌলিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং দেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থে এখনই এই আঞ্চলিক দলগুলোর বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির শর্তাবলি যারা বছরের পর বছর ধরে লঙ্ঘন করে আসছে এবং অবৈধ অস্ত্র সমর্পণ না করে উল্টো তা দিয়ে রাষ্ট্রকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সময় এসেছে। পাহাড়ে আস্তানা গড়া প্রতিটি অবৈধ অস্ত্রের জোগানদাতা ও ক্যাডারদের চিরুনি অভিযানের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনতে হবে। সার্বভৌম রাষ্ট্রে কোনো বিশেষ অঞ্চলকে অপরাধীদের নিরাপদ অভয়ারণ্যে পরিণত হতে দেওয়া যায় না, এবং এ বিষয়ে কোনো প্রকার শিথিলতা বা আপসকামিতা মেনে নেওয়ার সুযোগ নেই।

‎সবমিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় ও উপত্যকাগুলোতে স্থায়ী শান্তি, সম্প্রীতি ও প্রগতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে হলে সশস্ত্র দলগুলোর দৌরাত্ম্য চিরতরে বন্ধ করতে হবে। পাহাড়ে বসবাসরত পাহাড়ি ও বাঙালি, উভয় জনগোষ্ঠীর শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষ আজ সশস্ত্র দলগুলোর হাত থেকে মুক্তি পেতে ব্যাকুল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের উচিত অবিলম্বে পার্বত্য অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদার করা, সকল অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সমন্বিত যৌথ অভিযান জোরদার করা এবং চাঁদাবাজি-অস্ত্র ব্যবসা বন্ধে কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো। একই সাথে পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ যুবসমাজকে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর প্রলোভন ও ভয়ভীতি থেকে মুক্ত করে মূলধারার শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। রাষ্ট্রকে পরিষ্কার বার্তা দিতে হবে যে, সার্বভৌম বাংলাদেশে ক্ষমতার একমাত্র উৎস জনগণ ও সংবিধান, কোনো অবৈধ অস্ত্রের নলের মুখ নয়। সরকারের সমউপযোগী, কঠোর ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তই কেবল পারে পার্বত্য অঞ্চল থেকে সশস্ত্র সহিংসতার কালো ছায়া দূর করে দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে এবং পাহাড়িদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।

‎লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
‎ইমেইল: mmohasinmiah013@gmail.com

ক্ষুদ্র উদ্যোগে ২২ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য সরকারের

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৫০ অপরাহ্ণ
ক্ষুদ্র উদ্যোগে ২২ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য সরকারের

ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটিরশিল্পের পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিকে কাজে লাগিয়ে দেশে মোট ২২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে প্রায় ১৩ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। নতুন কর্মসূচির আওতায় আরও ৯ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে কর্মসংস্থান ব্যাংকের উদ্যোগে ‘ক্ষুদ্র ব্যবসা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অর্থায়ন তহবিল’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, কর্মসংস্থান ব্যাংক ইতোমধ্যে প্রায় ১৩ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে। নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে আরও ৯ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হলে মোট ২২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিতে বড় শিল্প ও বড় প্রকল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটিরশিল্প এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে গুরুত্ব দিতে হবে। দেশের অনেক পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই ধরনের ব্যবসা বা পেশার সঙ্গে যুক্ত। তাদের প্রয়োজনীয় অর্থ, প্রযুক্তি ও বাজারসংযোগের সুযোগ দেওয়া গেলে ছোট উদ্যোগগুলো ভবিষ্যতে বড় ব্যবসায় পরিণত হতে পারে।

আমির খসরু বলেন, সৃজনশীল খাতের বিকাশে শুধু ঋণ দেওয়াই যথেষ্ট নয়। উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়ন, পণ্যের নকশা, ব্র্যান্ডিং ও বিপণনেও সহায়তা দিতে হবে। এতে একটি পণ্যের মূল্য ও বাজার সম্ভাবনা আরও বাড়ানো সম্ভব।

আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় পণ্যের সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দেন অর্থমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক মানের পণ্য তৈরি করা গেলে অ্যামাজন, আলিবাবাসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সেগুলো বিশ্ববাজারে বিক্রি করা সম্ভব বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে। এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

ইউরোপের বাজারে ২০২৭ সালে ইলেকট্রিক গাড়ি আনছে শাওমি

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৪৯ অপরাহ্ণ
ইউরোপের বাজারে ২০২৭ সালে ইলেকট্রিক গাড়ি আনছে শাওমি

চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান Xiaomi এবার স্মার্টফোনের গণ্ডি পেরিয়ে ইউরোপের বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে বড় পরিসরে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। জার্মানির বার্লিনে অনুষ্ঠিত আইএফএ-২০২৬ মেলায় প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ২০২৭ সালের মধ্যে ইউরোপের রাস্তায় শাওমির ইলেকট্রিক গাড়ি দেখা যাবে।

শাওমির পরিকল্পনার বিশেষত্ব হলো, গাড়িকে শুধু পরিবহনের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং তাদের বৃহত্তর ‘হিউম্যান × কার × হোম’ স্মার্ট ইকোসিস্টেমের অংশ হিসেবে গড়ে তোলা। এর মাধ্যমে স্মার্টফোন, গাড়ি ও বাড়ির বিভিন্ন সংযুক্ত ডিভাইস একই নেটওয়ার্কের আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

মেলায় শাওমি দেখিয়েছে, গাড়িতে বসেই কীভাবে স্মার্ট হোমের বিভিন্ন ডিভাইস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতে পারে। গাড়ি থেকে বাড়ির পর্দা খোলা-বন্ধ করা কিংবা এয়ারকন্ডিশনিং চালু করার মতো কাজ করা যাবে। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে শাওমির গাড়িই হয়ে উঠতে পারে স্মার্ট হোম নিয়ন্ত্রণের আরেকটি কেন্দ্র।

প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও হাইপারওএস অপারেটিং সিস্টেমের মাধ্যমে গাড়ি, স্মার্টফোন ও বাড়ির ডিভাইসগুলোর মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা হবে। দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহারকারীকে প্রতিটি ডিভাইস আলাদাভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না দিয়ে পারিপার্শ্বিক তথ্য বিশ্লেষণ করে এআই নিজেই বিভিন্ন ডিভাইসের মধ্যে সমন্বয় করবে—এমন লক্ষ্য রয়েছে শাওমির।

আইএফএ-২০২৬ মেলায় শাওমি তাদের ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাস্তব পদক্ষেপও নিয়েছে। ৩ সেপ্টেম্বরের প্রেস কনফারেন্সে জার্মানির আটটি অটোমোটিভ রিটেইল গ্রুপের সঙ্গে আগ্রহপত্র (LOI) স্বাক্ষর করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—এমিল ফ্রে জার্মানি, আর্নস্ট ডেলো গ্রুপ, অটোহাউস ডিনেবিয়ার, হান অটোমোবাইল, লুয়েগ মোবিলিটি গ্রুপ, ফেট অ্যান্ড উইর্টজ, এসপিটি অ্যাভিওর এবং পেনস্ক-জ্যাকবস। শাওমির পরিকল্পনায় জার্মানি শুধু প্রাথমিক বাজার; পরবর্তী সময়ে ইউরোপের অন্যান্য দেশেও একই ধরনের অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।

আইএফএতে শাওমি প্রদর্শন করেছে শাওমি ভিশন গ্রান তুরিসমো নামের একটি ইলেকট্রিক হাইপারকার কনসেপ্ট। গ্রান তুরিসমো রেসিং গেম সিরিজকে কেন্দ্র করে তৈরি এই কনসেপ্টে ভবিষ্যৎ গাড়ির ডিজাইন, অ্যারোডাইনামিক্স ও ডিজিটাল ইন্টারঅ্যাকশনের বিভিন্ন ধারণা তুলে ধরা হয়েছে।

তবে ভিশন গ্রান তুরিসমো আপাতত কনসেপ্ট পর্যায়েই রয়েছে। এটি শিগগির বাজারে আসতে যাওয়া কোনো নির্দিষ্ট প্রোডাকশন মডেলের সরাসরি পূর্বাভাস নয়।

ইলেকট্রিক গাড়ি ও স্মার্ট প্রযুক্তিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগও বাড়াচ্ছে শাওমি। ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী গবেষণা ও উন্নয়নে ২৪ বিলিয়ন ইউরোর বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

এই অর্থ এআই, অপারেটিং সিস্টেম, সেমিকন্ডাক্টর, স্মার্ট ভেহিকল, রোবোটিক্স ও স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিংসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি খাতে ব্যয় করা হবে।

সব মিলিয়ে, শাওমির লক্ষ্য শুধু ইউরোপে আরেকটি ইলেকট্রিক গাড়ির ব্র্যান্ড হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা নয়; বরং গাড়ি, ফোন ও স্মার্ট হোমকে একই প্রযুক্তিগত ইকোসিস্টেমে যুক্ত করে একটি পূর্ণাঙ্গ স্মার্ট-লাইফ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা।

সুত্রঃ Euronews

কালের আলো/এসএ