খুঁজুন
                               
, ,
           

শিক্ষকের পোশাকে রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা!

আহসান হাবিব বরুন
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৩১ অপরাহ্ণ
শিক্ষকের পোশাকে রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা!

বাংলাদেশ একটি প্রগাঢ় ইতিহাস ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা রাষ্ট্র। এই ভূখণ্ডের অগণিত ত্যাগ, রক্তের মহাকাব্য এবং মূল্যবোধের স্তম্ভগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের জাতীয় পরিচয়। এই জাতি গঠনে এবং তার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে যেসব শ্রেণি সর্বাগ্রে আলো ছড়িয়েছে, তাঁদের মধ্যে শিক্ষকসমাজ অন্যতম। শিক্ষক কেবল শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মাঝে পাঠদানকারী কোনো সাধারণ চাকরিজীবী নন; তিনি জাতির বিবেক, মূল্যবোধের ধারক এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেশপ্রেম ও সামাজিক দায়িত্ববোধে দীক্ষিত করার দিশারী। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একশ্রেণির শিক্ষকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী গোপন তৎপরতা এবং ষড়যন্ত্রের গুরুতর অভিযোগ সংবাদ মাধ্যমে উঠে এসেছে—যা পুরো জাতিকে স্তব্ধ ও গভীরভাবে মর্মাহত করেছে।

যেখানে শিক্ষককে সামাজিক ও জাতীয় কাঠামোতে সবচেয়ে মর্যাদাবান ও শ্রদ্ধেয় শ্রেণি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেখানেই যখন কতিপয় শিক্ষক ব্যক্তিস্বার্থ, রাজনৈতিক তোষণ কিংবা দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন, তখন এর চেয়ে বেদনাদায়ক ও লজ্জাজনক বিষয় আর কিছু হতে পারে না।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ দেশের শিক্ষকমণ্ডলী ছিলেন মুক্তির আন্দোলনের অগ্রসেনানী। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা খুব ভালো করেই জানত—একটি জাতিকে পঙ্গু ও মেধাশূন্য করতে হলে আগে তার বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষকদের নিধন করতে হবে। সেই লক্ষ্যে ২৫ মার্চ কালরাতে এবং ১৪ ডিসেম্বরের নির্মম বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু প্রথিতযশা অধ্যাপক ও শিক্ষক প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন।

অধ্যাপক ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, ড. জি সি দেব, অধ্যাপক সন্তোষচন্দ্র ভট্টাচার্য, মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর মতো শিক্ষাগুরুরা রক্ত দিয়ে এই লাল-সবুজ পতাকাকে অর্থবহ করে গেছেন। তাঁরা জীবনের বিনিময়ে শিখিয়ে গেছেন—শিক্ষকের মূল পরিচয় তাঁর নীতি, সততা এবং অদম্য দেশপ্রেম।

কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে এবং বিশেষ করে সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে যখন আমরা দেখি—একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক চেতনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে কিছু শিক্ষক গোপনে জোট বাঁধছেন, রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতায় মদদ দিচ্ছেন, তখন স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে—ঐতিহ্যের সেই মহান স্তম্ভগুলো আজ কোথায় এসে দাঁড়াল?

সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত চাঞ্চল্যকর তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশের ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষক একটি টেলিগ্রামভিত্তিক গোপন গ্রুপের মাধ্যমে রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত ছিলেন। এই তথ্যের পরিপ্রক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯২ জন শিক্ষকের মধ্যে ইতোমধ্যে ৫৮ জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই অভিযোগ খতিয়ে দেখতে প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা)-কে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের উচ্চপর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

অভিযোগ উঠেছে, ‘বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ’ নামক একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বা গোপন টেলিগ্রাম গ্রুপের মাধ্যমে তারা এই কার্যক্রম সমন্বয় করছিলেন। শিক্ষা যদি হয় আলোর নাম, তবে তা কেন কোনো গোপন অন্ধকার চ্যাটগ্রুপের আড়ালে পরিচালিত হবে? শিক্ষকের চেতনা যদি হয় সততা ও উন্মুক্ততা, তবে কেন রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা বিনষ্টের চক্রান্তে গোপন ছক কষা হবে?

শিক্ষার চত্বরে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিরুদ্ধে এমন গোপন আঁতাত কোনোভাবেই একজন আদর্শ শিক্ষকের নৈতিকতার সঙ্গে মেলে না। যারা ক্ষমতার লোভ, দলীয় অন্ধ আনুগত্য কিংবা ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিকে দুর্বল করতে চান, আমি মনে করি তারা আর যা-ই হোক—প্রকৃত শিক্ষক পদের যোগ্য নন। তারা শিক্ষক নামক পবিত্র পদের আড়ালে এই জাতির জন্য এক বড় কলঙ্ক।

সাধারণত পেশাগত শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে চাকরিচ্যুতি বা বরখাস্ত করার বিধান থাকে। কিন্তু ‘রাষ্ট্রবিরোধী গোপন তৎপরতা’ বা দেশের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলার ষড়যন্ত্র কোনো সাধারণ শৃঙ্খলাভঙ্গের অপরাধ নয়। এটি সরাসরি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, আইনি শৃঙ্খলা এবং কোটি মানুষের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।

একজন সাধারণ নাগরিক অপরাধ করলে যে ক্ষতি হয়, একজন শিক্ষক যখন রাষ্ট্রবিরোধী কাজে লিপ্ত হন, তখন তার বহুমাত্রিক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ওপর। শিক্ষকের ওপর সমাজ ও রাষ্ট্র যে বিপুল আস্থা রাখে, রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতার মাধ্যমে সেই আস্থার চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়।

রাষ্ট্রদ্রোহ ও গোপন চক্রান্ত জাতীয় নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি। তাই শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবে চাকরিচ্যুত করে তাদের ছেড়ে দিলে তা অপরাধের ভয়াবহতাকে লঘুপাত করার সামিল হবে। আইনের সুনির্দিষ্ট ধারায় তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো বিদ্যাপীঠ রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্তের উর্বর ভূমিতে পরিণত হতে না পারে।

দীর্ঘদিন ধরে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মেধা ও দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষক নিয়োগের যে অপসংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, এটি তারই এক বিষময় ফল। যখন একজন শিক্ষক মেধার জোরে নয়, বরং রাজনৈতিক তোষামোদীর মাধ্যমে পদমর্যাদা পান, তখন তিনি শিক্ষাদানের চেয়ে রাজনৈতিক প্রভুদের এজেন্ডা বাস্তবায়নেই বেশি ব্যস্ত থাকেন।

উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো মুক্তচিন্তা, গবেষণা, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চার কেন্দ্রস্থল। যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা গোপন গ্রুপ তৈরি করে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠেন, তখন শিক্ষার সার্বিক পরিবেশ ধসে পড়ে।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা দরকার যে,শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের অনুসরণ করে। শিক্ষকরা যদি সততা ও জাতীয় স্বার্থের বিপরীতে গিয়ে ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নেন, তবে তা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে চরম হতাশা ও নৈতিক অবক্ষয় তৈরি করে।

শিক্ষকতার মূল কাজ গবেষণা ও শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ দেওয়া। কিন্তু রাজনীতিকীকরণের কারণে শিক্ষকরা যখন রাষ্ট্রবিরোধী বা দলীয় চক্রান্তে যুক্ত হন, তখন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান তলানিতে গিয়ে ঠেকে। আন্তর্জাতিক সূচকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থানই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

এখানে আমি এ কথাও বলব যে,তদন্ত প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে—আইনের বিচার হতে হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং তথ্য-প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, তাদের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 গণমাধ্যমের সংবাদের ওপর ভিত্তি করে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হলেও, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রতিটি শিক্ষকের ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতা ও অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে হবে। যেন কোনো নিরপরাধ শিক্ষক রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা বিভ্রান্তির শিকার না হন।

তবে যদি তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়—তবে রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয়ের তোয়াক্কা না করে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

এই গ্লানিকর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি:

দলীয় বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ করে মেধা, গবেষণা ও নৈতিক চরিত্রকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রসংবিধানে রাষ্ট্রদ্রোহ ও জাতীয় নিরাপত্তাবিরোধী আচরণের ক্ষেত্রে স্পষ্ট ও কঠোর শাস্তিমূলক ধারা যুক্ত করতে হবে।

গোপন রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধ করে শিক্ষাঙ্গনে সুস্থ, উন্মুক্ত ও গঠনমূলক একাডেমিক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও শিক্ষকের ঐতিহ্যগত সামাজিক দায়িত্ববোধের আলোকে শিক্ষকতার মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে হবে।

পরিশেষে বলতে চাই,বাংলাদেশের স্থপতি ও শহীদেরা যে স্বপ্নের বাংলাদেশ চেয়েছিলেন, সেখানে শিক্ষকসমাজ থাকবে জাতির পথপ্রদর্শক হয়ে। শিক্ষকের পোশাকে কোনো ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা কিংবা ষড়যন্ত্র এ দেশের সচেতন জনগণ বরদাশত করবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত শেষ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। যারা তদন্তে অপরাধী হিসেবে প্রমাণিত হবেন, তাদেরকে কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়াই শেষ কথা নয়; দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। কেবল শাস্তির মধ্য দিয়েই নিশ্চিত করা সম্ভব যে-ভবিষ্যতে আর কেউ শিক্ষকের পবিত্র পোশাক ও মর্যাদাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে জাতির স্বার্থ ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর দুঃসাহস দেখাবে না।

লেখক:সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক 

ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নে এক মঞ্চে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপদেষ্টা, এফডিসির গণ্ডি পেরিয়ে আধুনিকায়নের বার্তা

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
প্রকাশিত: বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:২০ অপরাহ্ণ
চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নে এক মঞ্চে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপদেষ্টা, এফডিসির গণ্ডি পেরিয়ে আধুনিকায়নের বার্তা

একসময় বাংলাদেশের সিনেমা শুধু বিনোদন দেয়নি। কথা বলেছে সমাজের কথা। জায়গা করে নিয়েছে মানুষের হৃদয়ে। সেই ঐতিহ্যের স্মৃতিচারণ চলতি বছরের ‘ফিল্ম ডিরেক্টরস ডে’-এর মঞ্চে। চলচ্চিত্র শিল্পের বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কীভাবে ভবিষ্যতের পথ তৈরি করা যায়, সে বিষয়েও মিলেছে স্পষ্ট বার্তা। একই মঞ্চে বক্তব্য রেখেছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান এমপি, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এমপি এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।

  • আধুনিক অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় সরকারের 
  • মানসম্মত নির্মাণ থেকে পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন পরিকল্পনা—তিন নীতিনির্ধারকের বক্তব্যে অভিন্ন প্রত্যয়

তিন নীতিনির্ধারকের বক্তব্যে চলচ্চিত্র উন্নয়নের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। মানসম্মত ও অর্থবহ চলচ্চিত্র নির্মাণ, এফডিসির গণ্ডি পেরিয়ে পুরো শিল্পের উন্নয়ন এবং আধুনিক অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা—তাঁদের বক্তব্যের মূল সুর ছিল এসব বিষয়কে কেন্দ্র করেই। প্রয়োজনীয় সহযোগিতার কথাও জানিয়েছেন তাঁরা। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে বিএফডিসি অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি আয়োজিত ‘ফিল্ম ডিরেক্টরস ডে ২০২৬’ অনুষ্ঠানে মূলত দেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে নতুনভাবে বিকশিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে সরকার।

একটি সময় সিনেমার বার্তা হৃদয়ে গেঁথে যেত
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান বলেন, ‘একটি সময় সিনেমা যে বার্তা দিতো, তা আমরা হয়তো চোখ দিয়ে দেখতাম কিন্তু তা আমাদের হৃদয়ে গেঁথে যেত। প্রতিটি সিনেমায় নিজস্ব চরিত্র ও স্পষ্ট বার্তা থাকা উচিত। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেনসহ গুণী নির্মাতাদের প্রতিটি সিনেমায় সামাজিক ও মানবিক বার্তা ছিল।’ আগামী দিনে মানসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাণের আহ্বান জানিয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাই সবাই মিলে আগামীতে এমন কাজ করতে, যাতে আমাদের চলচ্চিত্রগুলো আবার কথা বলে।

সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে সমাজের বাস্তবতা বদলেছে। বর্তমানে বহু তরুণ মাদকের ভয়াবহতায় জড়িয়ে পড়ছে, যা সমাজের জন্য বিশাল ক্ষতি। এর পাশাপাশি সমাজে নানাবিধ বৈষম্য রয়েছে। এই সংকট থেকে সমাজকে পথ দেখাতে শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে আমাদের চলচ্চিত্র নির্মাতারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন।’ চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নে বর্তমান সরকারের আন্তরিকতার কথা উল্লেখ করে আন্দালিভ রহমান বলেন, ‘আমরা সবাই একসাথে কাজ করলে বাংলাদেশের সিনেমাকে আবারো তার পুরোনো ও গৌরবোজ্জ্বল জায়গায় নিয়ে যেতে পারবো, ইনশাআল্লাহ।’

চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
দেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে নতুনভাবে বিকশিত করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করছে সরকার বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশনা দিয়েছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নে করণীয়, বাস্তবায়ন কৌশল এবং প্রয়োজনীয় সরকারি সহযোগিতাসহ একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করে উপস্থাপন করা হবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার শুধু এফডিসির উন্নয়ন নয়, বরং সামগ্রিক চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। অতীতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে যেসব গুণী পরিচালক, প্রযোজক, অভিনেতা ও অভিনেত্রী অসাধারণ কাজ করেছেন, সেই ঐতিহ্যকে সামনে রেখে চলচ্চিত্রের মান ও শিল্পের সক্ষমতা আরও বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছি, যার মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণ করে চলচ্চিত্র শিল্পের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও দপ্তরকে আরও কার্যকর করা যাবে। এফডিসিও এ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’

চলচ্চিত্রের গুণীজনদের উদ্দেশে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নে নেতৃত্ব দেবেন এ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ ও গুণী ব্যক্তিরাই। সরকার তাদের পাশে থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে।’ চলচ্চিত্র অঙ্গনের মানুষদের সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ থেকেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছেন উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, তিনি অতীতেও এফডিসিতে এসেছেন এবং ভবিষ্যতেও চলচ্চিত্র শিল্পের মানুষদের সঙ্গে নিয়ে ও তাদের পাশে থেকে কাজ করবেন।

আধুনিক অবকাঠামো ও পূর্ণাঙ্গ রূপরেখার প্রত্যয়
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, বর্তমান সরকার ও প্রধানমন্ত্রী দেশের চলচ্চিত্রের স্বকীয়তা ও গৌরব ফিরিয়ে আনতে আগ্রহী। চলচ্চিত্র খাতের বর্তমান সংকট কাটিয়ে আধুনিক পরিকাঠামো গড়ে তুলতে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা তৈরি করা হবে। তিনি জানান, চলচ্চিত্র ও এফডিসির উন্নয়নে কী কী করা প্রয়োজন, সে বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে এবং শিগগিরই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ বাস্তবায়নের দিকে এগোনো হবে। নিজের চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহের কথাও জানিয়ে জাহেদ উর রহমান বলেন, একসময় তিনিও ফিল্মমেকার হতে চেয়েছিলেন।

সম্মাননায় গুণীজন, গানে সাবিনা
‘ফিল্ম ডিরেক্টরস ডে ২০২৬’ উপলক্ষে চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি অঙ্গনে অবদানের জন্য বরেণ্য কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন ও বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ফরিদুর রেজা সাগরকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়। এছাড়া চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুদ পারভেজ (সোহেল রানা), প্রখ্যাত পরিচালক এ জে মিন্টু, প্রযোজক ও অভিনেতা কাজী হায়াৎ, চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব ও বীর মুক্তিযোদ্ধা দেলোয়ার জাহান ঝন্টু, পরিচালক ড. মতিন রহমান এবং মশিউদ্দীন শাকেরসহ চলচ্চিত্র অঙ্গনের গুণীজনদের সম্মাননা জানানো হয়।

অনুষ্ঠানে অনুভূতি প্রকাশ করে সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘ছোটবেলায় তিনি প্রতিদিন এফডিসিতে রেকর্ডিং করতেন। এই প্রাঙ্গণ থেকে হাজার হাজার কালজয়ী গান সৃষ্টি হয়েছে। চলচ্চিত্র পরিচালকদের কারণেই তিনি আজ সাবিনা ইয়াসমিন হতে পেরেছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। পরে অতিথি ও দর্শকদের অনুরোধে গান পরিবেশন করেন বরেণ্য এই শিল্পী।

এর আগে শান্তির প্রতীক পায়রা উড়িয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করা হয়। স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি শাহীন সুমন। অনুষ্ঠানে সমিতির মহাসচিব শাহীন কবির টুটুল, বিএফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা তানিসহ চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, অভিনয়শিল্পী, কলাকুশলী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।

কালের আলো/এমএএএমকে

টিসিবির জন্য ১০ হাজার টন মসুর ডাল কিনবে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৩৬ অপরাহ্ণ
টিসিবির জন্য ১০ হাজার টন মসুর ডাল কিনবে সরকার

সরকারি ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) কার্ডধারী নিম্ন আয়ের পরিবারের মধ্যে ভর্তুকি মূল্যে বিক্রির জন্য ১০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এতে ব্যয় হবে প্রায় ৭৭ কোটি টাকা বা ৭৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী, স্থানীয়ভাবে উন্মুক্ত দরপত্র (জাতীয়) পদ্ধতিতে এ মসুর ডাল কেনা হবে। বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে রয়েছে টিসিবি।

টিসিবি ১০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল কেনার জন্য স্থানীয়ভাবে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করলে তিনটি দরপত্র জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে তিনটি দরপ্রস্তাবই কারিগরিভাবে রেসপনসিভ বিবেচিত হয়।

দরপত্রের সব প্রক্রিয়া শেষে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির (টিইসি) সুপারিশ অনুযায়ী রেসপনসিভ সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান জয়তুন অটো রাইস অ্যান্ড ডাল মিলস লিমিটেড, খুলনা থেকে মসুর ডাল কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে টিসিবির গুদাম পর্যন্ত পরিবহন খরচসহ প্রতি কেজি ৭৬ টাকা ৭৯ পয়সা দরে ১০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল কেনা হবে। এতে মোট ব্যয় হবে ৭৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এ অর্থের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাউন্টার গ্যারান্টি থাকবে।

প্রস্তাবে বলা হয়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে টিসিবির মসুর ডাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ২ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ১৭ হাজার ৫২৮ মেট্রিক টন মসুর ডাল কেনা হয়েছে।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

সৌদি আরব থেকে ১৯৪ কোটি টাকার ইউরিয়া আমদানির অনুমোদন

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:২৩ অপরাহ্ণ
সৌদি আরব থেকে ১৯৪ কোটি টাকার ইউরিয়া আমদানির অনুমোদন

সৌদি আরবের সাবিক এগ্রি-নিউট্রিয়েন্টস কোম্পানি থেকে ৪০ হাজার মেট্রিক টন (+১০ শতাংশ) বাল্ক গ্র্যানুলার ইউরিয়া সার আমদানির অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এতে ব্যয় হবে ১৯৩ কোটি ৫৫ লাখ ৮৩ হাজার ৭২০ টাকা।

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) মাধ্যমে এ সার আমদানি করা হবে। আমদানির ব্যয় কৃষি ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ বাজেট থেকে পরিশোধ করা হবে।

বৈঠক সূত্রে জানা যায়, সরকার ২০০৭ সাল থেকে জিটুজি (সরকার থেকে সরকার) চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের সাবিক থেকে ইউরিয়া সার আমদানি করে আসছে। ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য সাবিক এগ্রি-নিউট্রিয়েন্টস কোম্পানির সঙ্গে মোট ৮ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার আমদানির চুক্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন চুক্তির আওতায় এবং জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনায় অতিরিক্ত ৫ লাখ মেট্রিক টন আমদানির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

চুক্তিতে নির্ধারিত প্রাইসিং ফর্মুলা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বাজারদর বিবেচনায় পঞ্চম লটে ৪০ হাজার মেট্রিক টন (+১০ শতাংশ) বাল্ক গ্র্যানুলার ইউরিয়া সার আমদানির প্রস্তাব করা হয়। এতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৫৬ লাখ ৬৬ হাজার ৪০০ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৯৩ কোটি ৫৫ লাখ ৮৩ হাজার ৭২০ টাকা। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতি মেট্রিক টন ইউরিয়া সারের দাম পড়বে ৩৯১ দশমিক ৬৬ মার্কিন ডলার।

সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের ফলে এখন নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সৌদি আরবের সাবিক থেকে এ লটের ইউরিয়া সার আমদানি করা হবে।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ