দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় নীরব চাপ তৈরি করেছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা—স্থানীয় ভাষায় যা পরিচিত ‘টেসলা’ নামে। যাত্রী পরিবহনে স্বল্প খরচ ও সহজলভ্যতার কারণে নগর থেকে মফস্বল—সবখানেই দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে এসব যান। কিন্তু এই জনপ্রিয়তার আড়ালে বিদ্যুৎ চুরির মাধ্যমে ব্যাপক রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। জটিল এক সমীকরণ তৈরি হয়েছে সড়ক নিরাপত্তাতেও।
- বিদ্যুৎ চুরির বিশাল সিন্ডিকেট
- বছরে ২১ হাজার কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন
- জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকলেও বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা অনুযায়ী, দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশই প্রতিদিন ব্যয় হচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জে। জাতীয় গ্রিড থেকে প্রতিদিন প্রায় ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে শুধু এসব যান চার্জ দিতে। অথচ এর বড় একটি অংশই ব্যবহার হচ্ছে অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে। ফলে বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিপরীতে সরকারি কোষাগারে জমা পড়ছে না প্রত্যাশিত রাজস্ব।
একেকটি রিকশায় দিনে ৯ ইউনিট বিদ্যুৎ
একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় সাধারণত ৪ থেকে ৬টি ১২ ভোল্টের ব্যাটারি থাকে। এসব ব্যাটারি চার্জ দিতে ঘণ্টায় প্রায় ১ হাজার ১০০ ওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। আট ঘণ্টা চার্জে রাখলে একটি রিকশার পেছনে খরচ হয় প্রায় ৯ ইউনিট বিদ্যুৎ।
কত অটোরিকশা চলছে, তার হিসাবেও নেই একমত
ব্যাটারিচালিত যানবাহনের প্রকৃত সংখ্যা নিয়েও রয়েছে বড় ধরনের তথ্যঘাটতি।সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) হিসাবে দেশে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ লাখ। তবে সিপিডি ও বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে এই সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ। এই বিশাল বহরের মধ্যে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই প্রায় ২০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
বিদ্যুৎ চুরি থেকে বছরে হাজার কোটি টাকার ক্ষতি
অবৈধ সংযোগের কারণে সরকার শুধু বিদ্যুৎ হারাচ্ছে না, হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্বও। সংশ্লিষ্ট গবেষণার তথ্যমতে, এই খাতের অবৈধ সংযোগের কারণে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও বড় একটি অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি।
সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে থাকা প্রায় ২০ লাখ অটোরিকশার প্রতিটি থেকে গ্যারেজ ভাড়া ও চার্জ বাবদ দিনে গড়ে ১০০ টাকা আদায় করা হয়। অর্থাৎ শুধু ঢাকাতেই প্রতিদিন এ খাতে লেনদেন হয় প্রায় ২০ কোটি টাকা। বছরে যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা। দেশজুড়ে একই ধরনের লেনদেন বিবেচনায় নিলে গ্যারেজ ও চার্জকেন্দ্রিক এই অবৈধ অর্থনীতির আকার বছরে প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ ‘টেসলা’ এখন শুধু একটি যানবাহন নয়; এর চারপাশে গড়ে উঠেছে গ্যারেজ, চার্জিং, বডি তৈরি, যন্ত্রাংশ আমদানি এবং বিভিন্ন পর্যায়ের লেনদেনকে ঘিরে বিশাল এক অর্থনৈতিক বলয়।
জনপ্রিয়তার কারণও স্পষ্ট
দ্রুত যাতায়াত, সহজলভ্যতা এবং তুলনামূলক কম ভাড়ার কারণে প্রায় ৮২ শতাংশ যাত্রী ব্যাটারিচালিত রিকশাকে প্রধান বাহন হিসেবে ব্যবহার করেন বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। এ খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৬০ লাখ চালকের পরিবার জড়িয়ে আছে। তাদের অনেকের জীবিকা নির্ভর করছে এই যানটির ওপর। ফলে হঠাৎ করে ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধ করে দেওয়া হলে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এখানেই তৈরি হয়েছে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ—একদিকে বিদ্যুৎ চুরি ও অবৈধ অর্থনীতি বন্ধ করা, অন্যদিকে লাখ লাখ মানুষের জীবিকা ও সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ী যাতায়াত নিশ্চিত করা।
বিদ্যুতের পাশাপাশি সড়কেও বড় ঝুঁকি
‘টেসলা’র সংকট শুধু বিদ্যুৎ ব্যবহারে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সড়ক নিরাপত্তার প্রশ্নও। গবেষণার তথ্য বলছে, এসব অটোরিকশার প্রায় ৭৫ শতাংশ চালকেরই যান চালানোর পূর্ব অভিজ্ঞতা বা ট্রাফিক আইন সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা নেই। প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার ঘাটতি থাকায় সড়কে তৈরি হচ্ছে বাড়তি ঝুঁকি। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার অভাবে শুধু এক বছরেই অটোরিকশাসংক্রান্ত দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৩৭৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
‘টেসলা’ বন্ধ নয়, প্রয়োজন নিয়ন্ত্রণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবতা হলো—ব্যাটারিচালিত রিকশা একদিনে দেশের সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবিকা এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত। তাই প্রয়োজন নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে একটি সমন্বিত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। একই সঙ্গে অবৈধ যন্ত্রাংশ আমদানিকারক, রিকশার বডি প্রস্তুতকারক এবং বিদ্যুৎ চুরির সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
বুয়েটের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘অবৈধ হলেও চালকেরা চাঁদা দিয়েই সড়কে গাড়ি চালাচ্ছেন। ঘাটে ঘাটে বিশাল এক অর্থনীতি জড়িয়ে আছে। তাই এই খাত নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সরকারকে অত্যন্ত কৌশলী হতে হবে।’
কালের আলো/এসআর/এএএন
আপনার মতামত লিখুন
Array