আইনশৃঙ্খলার নাজুক উত্তরাধিকার
ইউনূস আমলের ব্যর্থতা—এখন সরকারকে ঘিরে ষড়যন্ত্র
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আবারও জনমনে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ড, টার্গেট কিলিং, বন্দুক হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা সাধারণ মানুষকে স্তম্ভিত করেছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দিয়ে বিচার করলে এর পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। দেশের নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটি বড় অংশ বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগেই তৈরি হয়েছিল। সেই সংকটের উত্তরাধিকার নিয়েই দায়িত্ব নিয়েছে বর্তমান সরকার।
একই সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির জন্য ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার সিদ্ধান্ত, ব্যর্থতা ও আইন প্রয়োগে দুর্বলতার দায়ও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছিল, অপরাধী চক্রের পুনরুত্থান, মব সন্ত্রাসের বিস্তার এবং বিচারহীনতার যে অভিযোগ উঠেছিল—তার প্রভাব এখনও কাটেনি। ফলে অতীতের সংকটের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে সংঘবদ্ধ অপরাধ ও সহিংসতার ঘটনা।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে সারা দেশে ৯১৫টি হত্যাকাণ্ডের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ১০টিরও বেশি হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় সশস্ত্র হামলা, রাজনৈতিক সংঘাত ও অপরাধী গোষ্ঠীর আধিপত্য বিস্তারের লড়াই পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের বিস্তার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা ও মনোবলের সংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয় হয়ে ওঠা বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম কারণ। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল যখন সংঘাতে রূপ নেয়, তখন অপরাধী গোষ্ঠীগুলোও নিজেদের স্বার্থে সেই পরিস্থিতি ব্যবহার করে। এর ফলে সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে হামলা ও হত্যার ঝুঁকি বাড়ে।
ইউনূস সরকারের দায় কোথায়
বর্তমান সরকার আইনশৃঙ্খলার যে পরিস্থিতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে, তার পেছনে আগের দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকট ছিল—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দীর্ঘ সময় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থেকেও সেই সংকট পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। বরং ওই সময়ে নেওয়া কিছু সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রথমত, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কারাগার থেকে বিভিন্ন শ্রেণির বন্দির মুক্তি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। চিহ্নিত অপরাধী ও জঙ্গি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ মুক্তির পর আবার সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। সমালোচকদের মতে, যথাযথ নজরদারি ছাড়া অপরাধী চক্রের পরিচিত সদস্যরা বাইরে আসায় তাদের পুনরায় সক্রিয় হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
দ্বিতীয়ত, ইউনূস সরকারের সময়ে মব সন্ত্রাসের বিস্তার নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং প্রকাশ্যে মানুষকে মারধরের মতো ঘটনায় অনেক সময় তাৎক্ষণিক ও দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা উৎসাহিত হয়েছে—এমন মতও দিয়েছেন অনেকে।
তৃতীয়ত, বিচারহীনতার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও দুর্বল করেছে। প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা, রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয়ের কারণে হামলা এবং বিভিন্ন স্থাপনা ও স্মৃতিচিহ্নে ভাঙচুরের ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে অপরাধীদের মধ্যে দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হয়। রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগে দুর্বলতা দেখা দিলে সাধারণ মানুষের মধ্যেও আইনের প্রতি আস্থা কমে যায়।
চতুর্থত, পুলিশের মনোবল ও কার্যক্ষমতার সংকটও বড় কারণ। ৫ আগস্টের পর পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা, থানায় আক্রমণ এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে বাহিনীটি গভীর সংকটে পড়ে। পরবর্তী সময়ে পুলিশকে পুনর্গঠন ও তাদের মনোবল ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি পেশাগত সক্ষমতা নিশ্চিত করার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি বলে সমালোচনা রয়েছে।
পঞ্চমত, আইনের শাসনের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয়, জনতার শক্তি কিংবা প্রভাবের কারণে কেউ যেন আইনের ঊর্ধ্বে উঠে যেতে না পারে—এটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। এই জায়গায় দুর্বলতা তৈরি হলে অপরাধীরা উৎসাহিত হয় এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধ নষ্ট হয়।
সংকটের সুযোগে সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র?
এদিকে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিকে কেন্দ্র করে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে জনমত তৈরির চেষ্টা চলছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে। সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অবস্থান থাকা স্বাভাবিক; কিন্তু কোনো সংকটকে ইচ্ছাকৃতভাবে আরও ঘনীভূত করে রাষ্ট্র ও সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করার চেষ্টা থাকলে সেটি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি—বিভিন্ন সংকটের নেপথ্যে কোনো বিশেষ মহলের পরিকল্পিত তৎপরতা আছে কি না, তা নিয়ে অভিযোগ ও আলোচনা রয়েছে। তবে এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না রেখে গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা সংস্থার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা জরুরি। বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—একদিকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া, অন্যদিকে কোনো পরিকল্পিত উসকানি বা ষড়যন্ত্রের সুযোগ না দেওয়া। এ ক্ষেত্রে সরকারের ভেতর থেকেও দায়িত্বশীল ও সংযত বক্তব্য আসতে হবে। উত্তেজনাকর মন্তব্য বা পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করতে পারে।
এখন প্রয়োজন কঠোরতা ও আস্থা ফেরানো
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে বর্তমান সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের উদ্যোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সক্রিয় করা এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে পদক্ষেপ—এসব কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন। তবে শুধু অভিযান নয়, অপরাধের দ্রুত বিচার এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সমানভাবে আইন প্রয়োগই হবে সবচেয়ে কার্যকর বার্তা। অপরাধী যে দলেরই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশকে জবাবদিহির মধ্যে রেখে তাদের প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ও মনোবল ফিরিয়ে দিতে হবে। বর্তমান আইনশৃঙ্খলা সংকটের দায় একক কোনো সময় বা সরকারের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার পূর্ণ সমাধান হবে না। কিন্তু দেশের নাজুক পরিস্থিতি উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া এবং ড. ইউনূস সরকারের আমলে সংঘটিত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও ব্যর্থতার কারণে সংকট আরও গভীর হওয়ার অভিযোগও উপেক্ষা করা যায় না। এর সঙ্গে যদি বর্তমান সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণে কোনো পরিকল্পিত অপতৎপরতা থেকে থাকে, সেটিও কঠোরভাবে শনাক্ত ও প্রতিহত করতে হবে।
কালের আলো/এসআর/এএএন

আপনার মতামত লিখুন
Array