কুয়েতের মরুভূমিতে বাংলাদেশিদের ‘গাড়ির কবরস্থান’ ব্যবসা
মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশ কুয়েতের শহরাঞ্চল থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে সালমি। সৌদি আরবের সীমান্তঘেঁষা এই রুক্ষ প্রান্তর প্রথম দেখায় কেবলই ধু-ধু মরুভূমি। কিন্তু এই নির্জন এলাকার বুকেই গড়ে উঠেছে কুয়েতের অন্যতম বড় অটোমোবাইল ভাঙারি ও ব্যবহৃত যন্ত্রাংশের বাজার। স্থানীয়ভাবে পরিচিত এই অটোহাবকে অনেকে বলেন ‘গাড়ির কবরস্থান’।
তবে সালমির এই ‘কবরস্থান’ আসলে শেষ নয়; বরং এখান থেকেই শুরু হয় গাড়ির নতুন জীবন। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত, মেরামত করতে ব্যয়বহুল কিংবা বিভিন্ন কারণে রাস্তায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়া গাড়ি এখানে এসে পরিণত হয় মূল্যবান যন্ত্রাংশের উৎসে। আর এই বিশাল পুনর্ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রাংশের বাজারের বড় অংশজুড়ে রয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা।
কুয়েতের মতো উচ্চ আয়ের দেশে প্রতিনিয়ত রাস্তায় নামছে নতুন ও দামি গাড়ি। কিন্তু দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কিংবা সামান্য কারিগরি ত্রুটির কারণে কোনো গাড়ি মেরামতের অনুপযোগী হয়ে পড়লে সেটির জায়গা হয় সালমির অটোহাবে।
শুধু পুরোনো গাড়িই নয়, তুলনামূলক নতুন গাড়িও কখনো কখনো এখানে চলে আসে। কুয়েতের কঠোর ট্রাফিক আইন ও যানবাহনের মানসংক্রান্ত নিয়মের কারণে কোনো গাড়ি বৈধতা হারালেও সেটি সালমির ভাঙারি বাজারে জায়গা পেতে পারে।
এখানে গাড়িগুলো থেকে খুলে নেওয়া হয় ইঞ্জিন, গিয়ারবক্স, দরজা, হেডলাইট, বডির বিভিন্ন অংশ, বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশসহ নানা ধরনের পার্টস। এরপর সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পুনরায় বিক্রি করা হয়।
সালমির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো দাম। শহরের বড় বড় শোরুম বা পার্টসের দোকানে যেসব যন্ত্রাংশ কিনতে অনেক বেশি অর্থ খরচ করতে হয়, সালমিতে একই মডেলের ব্যবহৃত অথচ আসল যন্ত্রাংশ পাওয়া যায় তুলনামূলক অনেক কম দামে।
ফলে কুয়েতের স্থানীয় গাড়ির মালিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের প্রবাসীরা নিয়মিত ছুটে আসেন এই বাজারে। কারও গাড়ির নির্দিষ্ট কোনো পার্টস প্রয়োজন হলে শহরের দোকানের বদলে অনেকেই প্রথমে সালমিতে খোঁজ করেন।
এক ক্রেতা মোহাম্মদ সেলিম হাওলাদার জানান, শহরের একটি দোকানে তাঁর গাড়ির একটি পার্টসের দাম চাওয়া হয়েছিল ৬০ কুয়েতি দিনার। পরে সালমি থেকে একই ধরনের আসল পার্টস মাত্র ১০ দিনারে কিনেছেন তিনি। তাঁর মতে, একই পণ্যের দামে প্রায় ছয় গুণের পার্থক্য।
সালমির স্ক্র্যাপ ও ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশের ব্যবসায় বাংলাদেশিদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। একসময় যারা সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কুয়েতে এসেছিলেন, তাঁদের অনেকেই ধীরে ধীরে এই ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। কেউ কর্মচারী হিসেবে শুরু করে পরে নিজস্ব ব্যবসা দাঁড় করিয়েছেন, আবার কেউ সরাসরি বিনিয়োগ করে ব্যবসা শুরু করেছেন।
ঢাকার ফারুক আহমদ দীর্ঘদিন ধরে সালমিতে স্ক্র্যাপ ও গাড়ির পার্টসের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর অভিজ্ঞতায়, এই কাজের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখানকার আবহাওয়া।
গ্রীষ্মকালে সালমির তাপমাত্রা অনেক সময় ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। প্রচণ্ড রোদ, উত্তপ্ত বালু এবং ভারী লোহার যন্ত্রাংশ নিয়ে কাজ করতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এমন পরিবেশে কাজ করা শারীরিকভাবে অত্যন্ত কষ্টকর।
তবু বাড়তি আয়ের আশায় এই কঠিন পরিবেশেই কাজ করে যাচ্ছেন শত শত বাংলাদেশি।
সিলেটের কামাল হোসেন গত তিন বছর ধরে সালমির স্ক্র্যাপ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। এর আগে শহরে চাকরি করতেন তিনি। তবে নির্দিষ্ট বেতনের চাকরিতে ভবিষ্যৎ গড়ার মতো আয় করা কঠিন ছিল বলে মনে করেন তিনি।
সালমিতে এসে ব্যবসার মাধ্যমে তুলনামূলক বেশি আয় করার সুযোগ পেয়েছেন বলে জানান কামাল। তাঁর মতো আরও অনেক বাংলাদেশি তরুণ এখন এই ব্যবসায় ঝুঁকছেন।
প্রবাস জীবনে পরিবারকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করা এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে মরুভূমির কঠিন পরিবেশকেও তাঁরা মেনে নিচ্ছেন।
ফেনীর কোম্পানীগঞ্জের রাশেদ ইরফান সালমিতে গাড়ির যন্ত্রাংশের ব্যবসা করেন। তাঁর দাবি, বিশ্বের প্রায় সব নামিদামি ব্র্যান্ডের গাড়ির বিভিন্ন মডেলের যন্ত্রাংশ এখানে পাওয়া যায়।
বিশেষ করে যেসব পুরোনো মডেলের গাড়ির পার্টস শহরের সাধারণ দোকানে পাওয়া কঠিন, সেগুলোর জন্য সালমি গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা। ক্রেতারা প্রয়োজনীয় পার্টসের সন্ধানে মরুভূমির এই বাজারে ছুটে আসেন।
তবে ব্যবসার সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু সমস্যার কথাও জানিয়েছেন রাশেদ। তাঁর সবচেয়ে বড় অভিযোগ, সালমিতে রাতে থাকার মতো পর্যাপ্ত আবাসিক সুবিধা নেই।
সারাদিন কাজ শেষে কর্মীদের অনেক দূরের লোকালয়ে ফিরে যেতে হয়। প্রতিদিনের দীর্ঘ যাতায়াত তাঁদের শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি আরও বাড়িয়ে দেয়।
সালমির অটোহাব শুধু পরিত্যক্ত গাড়ির স্তূপ নয়; এটি একটি বড় পুনর্ব্যবহারযোগ্য অর্থনীতির অংশ। একটি গাড়ি যখন নতুন হিসেবে রাস্তায় চলার উপযোগিতা হারায়, তখন তার বিভিন্ন যন্ত্রাংশ অন্য গাড়ির জীবন বাড়াতে কাজে লাগে।
একদিকে এতে গাড়ির মালিকেরা কম দামে প্রয়োজনীয় আসল যন্ত্রাংশ পান, অন্যদিকে পরিত্যক্ত গাড়ির মূল্যবান অংশ পুনরায় অর্থনীতিতে ফিরে আসে। এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিরাও নিজেদের জন্য তৈরি করেছেন বড় একটি ব্যবসার ক্ষেত্র।
প্রচণ্ড গরম, দীর্ঘ যাতায়াত আর কঠিন কর্মপরিবেশের মধ্যেও তাঁদের শ্রমে সালমির মরুভূমিতে গড়ে উঠেছে এক ব্যতিক্রমী অর্থনৈতিক জগৎ—যেখানে ধাতব আবর্জনা হয়ে উঠছে সম্পদ, আর ‘গাড়ির কবরস্থান’ থেকে জন্ম নিচ্ছে নতুন ব্যবসার সম্ভাবনা।
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array