৩০ বছরেও রহস্যের আবরণে সালমান শাহর মৃত্যু
সেদিন ছিল শুক্রবার। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। ঠিক ৩০ বছর আগে শরতের সকালে ঢাকাই চলচ্চিত্র অঙ্গনে নেমে এসেছিল গভীর শোক। মাত্র ২৫ বছর বয়সে চলে যান বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহ। পারিবারিক নাম শহীদ চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন। মাত্র চার বছরের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে যিনি হয়ে উঠেছিলেন কোটি দর্শকের প্রিয় তারকা।
১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জে জন্ম নেওয়া সালমান শাহ ছিলেন কমর উদ্দিন চৌধুরী ও নীলা চৌধুরীর বড় ছেলে। ১৯৭১ সালে জন্ম, ১৯৯৬ সালে মৃত্যু—মাত্র ২৫ বছরের জীবনে তিনি যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন, তা আজও বিস্ময় জাগায়।
তবে তাঁর অকালমৃত্যুর তিন দশক পরও একটি প্রশ্নের উত্তর মেলেনি—কীভাবে, কেন মৃত্যু হয়েছিল সালমান শাহর? বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা আলোচনা, অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্য থাকলেও মৃত্যুর রহস্য এখনো পুরোপুরি কাটেনি। বিষয়টি নিয়ে আইনি প্রক্রিয়াও চলমান।
সালমান শাহ তখন রাজধানীর নিউ ইস্কাটন রোডের ইস্কাটন প্লাজার একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন। ৬ সেপ্টেম্বর সকালে প্রায় সাতটার দিকে তাঁর বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী ছেলের সঙ্গে দেখা করতে বাসায় যান। তবে সেখানে গিয়ে তিনি ছেলের দেখা পাননি।
সালমানের মা নীলা চৌধুরী পরবর্তী সময়ে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, বাসার নিচে দারোয়ান প্রথমে তাঁর স্বামীকে ওপরে যেতে বাধা দেন। পরে তিনি জোর করে ওপরে গেলেও প্রায় দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করেন।
বেলা ১১টার দিকে নীলা চৌধুরীর বাসায় একটি ফোন আসে। তাঁকে দ্রুত সালমানের বাসায় যেতে বলা হয়। সেখানে গিয়ে তিনি ছেলেকে বিছানায় দেখতে পান। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, সালমানের হাত-পায়ের নখ নীল হয়ে গিয়েছিল। এরপর তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ইস্কাটনের বাসা থেকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা সালমান শাহকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ময়নাতদন্ত হয়।
ময়নাতদন্তের পর সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে শুরু থেকেই তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানানো হয়। পরিবারের দাবি ছিল, সালমানকে হত্যা করা হয়েছে।
নীলা চৌধুরী অভিযোগ করেছিলেন, তাঁরা হত্যা মামলা করতে চাইলেও পুলিশ সেটি অপমৃত্যুর মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করেছিল। পুলিশের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল, তদন্তে হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেলে মামলাটি সেই অনুযায়ী রূপ নেবে।
দীর্ঘ সময় ধরে সালমান শাহর মৃত্যু নিয়ে তদন্ত, আদালত ও বিভিন্ন পর্যায়ে আইনি প্রক্রিয়া চলেছে। ফলে তিন দশক পরও তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে প্রশ্ন ও বিতর্ক পুরোপুরি শেষ হয়নি।
সালমান শাহর মৃত্যুর আগের দিন, ৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ‘প্রেমপিয়াসী’ সিনেমার ডাবিং করতে এফডিসিতে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন ছবিটির নায়িকা শাবনূর।
বিভিন্ন সময়ের প্রকাশিত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য অনুযায়ী, সালমান তাঁর বাবাকে ফোন করে স্ত্রী সামিরাকে নিয়ে এফডিসির সাউন্ড কমপ্লেক্সে আসতে বলেন। পরে সেখানে সামিরা দেখতে পান, সালমান ও শাবনূর ডাবিং রুমে হাসি-ঠাট্টা করছেন।
এ ঘটনা নিয়ে সামিরার সঙ্গে সালমানের মনোমালিন্য হয়েছিল বলে বিভিন্ন সময়ের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে ওই রাতের পর বাসায় ঠিক কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শীর নির্ভরযোগ্য বয়ান নেই। ফলে এ নিয়ে নানা ধরনের বক্তব্য ও জল্পনা তৈরি হয়েছে।
রাত ১১টার দিকে পরিচালক বাদল খন্দকার সালমানকে নিউ ইস্কাটনের বাসায় পৌঁছে দিয়ে চলে যান। পরদিন সকালে সালমানের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে।
মাত্র চার বছরের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে সালমান শাহ অভিনয় করেছেন ২৭টি চলচ্চিত্রে। ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’, ‘তুমি আমার’, ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘বিক্ষোভ’, ‘প্রেমযুদ্ধ’, ‘দেনমোহর’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘আঞ্জুমান’, ‘বিচার হবে’, ‘এই ঘর এই সংসার’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘সত্যের মৃত্যু নেই’, ‘জীবন সংসার’, ‘মায়ের অধিকার’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’ ও ‘আনন্দ অশ্রু’র মতো চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় আজও দর্শকদের মনে গেঁথে আছে।
অভিনয়ের পাশাপাশি পোশাক, চুলের স্টাইল ও ব্যক্তিত্বেও তিনি নব্বইয়ের দশকের তরুণদের কাছে ছিলেন অনুকরণীয়। শাবনূরের সঙ্গে তাঁর জুটি ঢাকাই চলচ্চিত্রে আলাদা জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
আজ ৩০ বছর পেরিয়ে গেলেও সালমান শাহর জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি। নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছেও তিনি পরিচিত এক নাম। তাঁর মৃত্যু নিয়ে রহস্যের অবসান না হলেও চলচ্চিত্রে তাঁর স্বল্পস্থায়ী উপস্থিতি তাঁকে দিয়েছে স্থায়ী এক আসন।
সালমান শাহ নেই, কিন্তু তাঁর অভিনয়, চলচ্চিত্র ও অনন্য স্টাইলের মধ্য দিয়ে তিনি আজও বেঁচে আছেন দর্শকদের হৃদয়ে।
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array