পৃথিবীর কয়েকশ মাইল ওপরে মহাকাশে একটি ছোট স্যাটেলাইট মোতায়েনের পর সেটিকে নিয়ে একটি চীনা কৃত্রিম উপগ্রহকে প্রদক্ষিণ করে আবার নিজস্ব মহাকাশযানের দিকে ফিরে গেছে একটি গোপনীয় চীনা মহাকাশযান। জুনে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করেছে মার্কিন মহাকাশ-ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠান লিওল্যাবস।
ঘটনাটি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো অজানা। তবে মার্কিন সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, চীনের এই গোপনীয় মনুষ্যবিহীন মহাকাশযান এবং যুক্তরাষ্ট্রের একই ধরনের গোপন মহাকাশযান—দুটিই ভবিষ্যতের সামরিক মহাকাশ অভিযানের দ্রুত পরিবর্তনশীল চিত্র তুলে ধরছে।
রয়টার্সের নথি, মহাকাশ-ট্র্যাকিং তথ্য এবং বর্তমান ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সম্ভাব্য সংঘাত যেন পৃথিবীর সীমা ছাড়িয়ে মহাকাশেও বিস্তৃত হতে পারে—এমন প্রস্তুতি নিচ্ছে ওয়াশিংটন ও বেইজিং।
সামরিক সংশ্লিষ্ট চীনা গবেষকেরা এমন প্রযুক্তি উন্নয়ন করছেন, যার মাধ্যমে একটি স্যাটেলাইট অন্য মহাকাশযানকে অনুসরণ, এমনকি ধরে ফেলতে পারবে। কিছু গবেষণায় এমন ব্যবস্থার কথাও উঠে এসেছে, যা মহাকাশে থাকা স্যাটেলাইটকে অতিরিক্ত জ্বালানি সরবরাহ করতে পারে।
পেটেন্ট-সংক্রান্ত নথি, সামরিক ক্রয়সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি এবং একাডেমিক গবেষণাপত্র পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পেয়েছে রয়টার্স।
মার্কিন স্পেস ফোর্সের প্রধান জেনারেল চান্স সাল্টজম্যান জুলাইয়ে বলেন, চীন দ্রুত মহাকাশ সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। স্থল ও মহাকাশ—উভয় জায়গা থেকেই লক্ষ্যবস্তুতে হস্তক্ষেপ বা তা ধ্বংস করার মতো অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করছে বেইজিং। তাঁর ভাষায়, চীনের হুমকি ‘উল্লেখযোগ্য’।
ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলো দেখিয়েছে, আধুনিক সামরিক ব্যবস্থায় স্যাটেলাইট কতটা গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক দশক ধরে স্যাটেলাইট যোগাযোগ, নেভিগেশন ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
কিন্তু এখন সামরিক শক্তিগুলো স্যাটেলাইটকে শুধু সহায়ক অবকাঠামো হিসেবে দেখছে না। এগুলোকে সক্রিয় সামরিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে।
শত্রুর স্যাটেলাইটের কার্যক্রমে জ্যামিং করা, লেজার দিয়ে সেন্সর অকার্যকর করা কিংবা সরাসরি অন্য মহাকাশযানকে ধরে ফেলার মতো সক্ষমতা তৈরির চেষ্টা চলছে।
মার্কিন বিমানবাহিনীর এয়ার ওয়ার কলেজের সাবেক অধ্যাপক এভারেট ডলম্যান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সক্ষমতা ব্যাহত করা গেলে পৃথিবীতে পরিচালিত মার্কিন সামরিক ব্যবস্থার বড় অংশ অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে।
তাঁর মতে, মহাকাশযানগুলো দ্রুত গতিপথ পরিবর্তন করতে এবং স্যাটেলাইট বা মালামাল বহন করতে পারে বলে ভবিষ্যতে এগুলোকে ‘স্পেস ফাইটার’ হিসেবেও দেখা হতে পারে।
মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সহযোগিতাও বাড়ছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য মহাকাশে প্রথমবারের মতো যৌথ সামরিক অভিযান পরিচালনা করে।
মহাকাশ-গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান স্লিংশট অ্যারোস্পেসের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোর একটি ঘাঁটি থেকে মার্কিন মহাকাশ বাহিনী একটি স্যাটেলাইটকে যুক্তরাজ্যের একটি স্যাটেলাইটের খুব কাছে নিয়ে যায়। একই সময়ে চীনের Shiyan 12-01 স্যাটেলাইটটি তাদের প্রায় ৮৩ কিলোমিটার নিচ দিয়ে অতিক্রম করে।
তিনজন সাবেক সামরিক মহাকাশ বিশেষজ্ঞ রয়টার্সকে বলেছেন, এই অভিযানটি চীনের প্রতি একটি কৌশলগত বার্তা হয়ে থাকতে পারে।
সাবেক ব্রিটিশ বিমানবাহিনী কর্মকর্তা অ্যান্ড্রু টার্নারের মতে, এটি প্রায় নিশ্চিতভাবেই চীনকে মিত্রদের ঐক্য, সক্ষমতা এবং ব্রিটিশ স্যাটেলাইটে হস্তক্ষেপ না করার বিষয়ে সতর্কবার্তা দেওয়ার একটি কৌশলগত সংকেত ছিল।
যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন যৌথ অভিযানটির কথা প্রকাশ্যে জানালেও চীনা স্যাটেলাইটের কাছাকাছি পরিচালনার বিষয়টি প্রকাশ করেনি।
মার্কিন স্পেস কমান্ডের প্রধান জেনারেল স্টিফেন হোয়াইটিং বারবার সতর্ক করে বলেছেন, প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো এমন সক্ষমতা তৈরি করছে, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা অকার্যকর করা সম্ভব হতে পারে।
তাঁর মতে, সম্ভাব্য কোনো সংঘাতের শুরুতেই প্রতিপক্ষ মার্কিন মহাকাশ সম্পদে হামলা চালানোর চেষ্টা করতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু মহাকাশ সম্পদ রক্ষার জন্য নয়, প্রয়োজনে শত্রুর মহাকাশ সম্পদকে হুমকি বা আঘাত করার সক্ষমতাও রাখতে হবে।
পশ্চিমা কর্মকর্তারা মহাকাশে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে স্থলভিত্তিক লেজার, ইলেকট্রনিক জ্যামার, সাইবার হামলা এবং অ্যান্টি-স্যাটেলাইট ক্ষেপণাস্ত্রের কথা উল্লেখ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া—তিন দেশই এমন চালনাযোগ্য স্যাটেলাইট পরিচালনা করছে, যেগুলো অন্য মহাকাশযানের কাছে গিয়ে সেটি পর্যবেক্ষণ করতে পারে। ভবিষ্যতে এসব প্রযুক্তি লেজার বা অন্য অস্ত্র বহনের জন্যও ব্যবহার করা যেতে পারে বলে পশ্চিমা কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন।
যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে নিজস্ব সক্ষমতার একটি বিরল তথ্য প্রকাশ করেছে। জুনে মার্কিন স্পেস ফোর্স জানায়, তারা L3Harris Technologies-এর তৈরি একটি স্থলভিত্তিক তড়িৎচৌম্বক অস্ত্র ব্যবস্থায় সক্ষমতা যুক্ত করেছে, যা প্রতিপক্ষের স্যাটেলাইটকে অকার্যকর বা বিঘ্নিত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের প্রধান মহাকাশ শক্তি হলেও চীন দ্রুত স্যাটেলাইটের সংখ্যা এবং মহাকাশ মিশনের জটিলতা বাড়াচ্ছে।
চীনা স্যাটেলাইটগুলো এমন কৌশল প্রদর্শন করেছে, যাকে মার্কিন কর্মকর্তারা কক্ষপথের ‘ডগফাইটিং’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। এতে একাধিক স্যাটেলাইট সমন্বিতভাবে খুব কাছাকাছি অবস্থানে চলাচল করে।
চীনের মহাকাশযান একটি অকেজো স্যাটেলাইটকে ধরে সেটির কক্ষপথ পরিবর্তন করতেও সক্ষম হয়েছে বলে জানা গেছে।
গত বছর চীন কক্ষপথে স্যাটেলাইটে জ্বালানি সরবরাহের সম্ভাব্য একটি পরীক্ষাও চালিয়েছে বলে এক মার্কিন মহাকাশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন। সফলভাবে এ প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে পারলে তা হবে বড় ধরনের অগ্রগতি। কারণ সাধারণত উৎক্ষেপণের সময় একটি স্যাটেলাইট যতটুকু জ্বালানি বহন করে, তার কার্যক্ষমতা অনেকটাই তার ওপর নির্ভর করে।
জ্বালানি পুনরায় সরবরাহের সুযোগ তৈরি হলে কোনো স্যাটেলাইট দীর্ঘ সময় ধরে অন্য মহাকাশযানকে অনুসরণ বা পর্যবেক্ষণ করতে পারবে।
চীনা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো একই সঙ্গে আরও উন্নত ‘পর্স্যুট স্যাটেলাইট’ বা অনুসরণকারী উপগ্রহ তৈরির কাজ করছে। কিছু পেটেন্ট নথিতে এমন ধারণার কথাও রয়েছে, যেখানে একাধিক মহাকাশযান জাল ব্যবহার করে অন্য স্যাটেলাইটকে ধরে ফেলতে পারে।
চীনের সামরিক ঘনিষ্ঠ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠান এসব প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করছে বলে রয়টার্সের পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।
মহাকাশে সামরিক প্রতিযোগিতা বাড়ার পাশাপাশি পৃথিবীর কক্ষপথও দ্রুত ভিড়ে পরিণত হচ্ছে। স্পেসএক্সের স্টারলিংক নেটওয়ার্কে বর্তমানে প্রায় ১১ হাজার স্যাটেলাইট রয়েছে এবং ভবিষ্যতে মহাকাশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সক্ষম বড় ডেটা সেন্টারের নেটওয়ার্ক তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
চীনও এর প্রতিদ্বন্দ্বী স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় মহাকাশভিত্তিক প্রতিরোধক ব্যবস্থার ধারণা রয়েছে।
ফলে মহাকাশ এখন আর শুধু গবেষণা বা যোগাযোগের ক্ষেত্র নয়; ক্রমেই এটি সামরিক শক্তি, প্রতিরোধ এবং সম্ভাব্য সংঘাতের নতুন মঞ্চে পরিণত হচ্ছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা মহাকাশের অস্ত্রায়নের বিরোধিতা করে এবং শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের পক্ষে। একই সঙ্গে বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের ‘গোল্ডেন ডোম’সহ বিভিন্ন উদ্যোগকে মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা উসকে দেওয়ার জন্য দায়ী করেছে।
তবে বাস্তবতা হলো—যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও তাদের মিত্ররা মহাকাশে নিজেদের সক্ষমতা দ্রুত বাড়াচ্ছে। আর এই প্রতিযোগিতা যত এগোচ্ছে, ভবিষ্যতের কোনো বড় সামরিক সংঘাত পৃথিবীর পাশাপাশি মহাকাশেও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি ততই বাড়ছে।
সূত্র: Reuters
কালের আলো/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array