সড়কে এআইয়ের চোখ, নজরদারিতে ছিদ্র
ঢাকার সড়কে যানজট যেন নগরজীবনের অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতা। প্রতিদিনের দীর্ঘ অপেক্ষায় নষ্ট হচ্ছে মানুষের লাখো কর্মঘণ্টা, যার অর্থনৈতিক মূল্যও দাঁড়াচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকায়। সেই ক্ষতি কমাতে এবার প্রযুক্তির চোখে রাজধানীর সড়ক ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্ত, দুর্ঘটনা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা দেওয়ার লক্ষ্যে বসানো হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)–চালিত ক্যামেরা।
- সবুজ নম্বরপ্লেট পড়তে পারছে না ক্যামেরা
- পরিচয়হীন অটোরিকশাতেও আটকে যাচ্ছে প্রযুক্তি
- বিদ্যুৎ বিভ্রাটেও ছেদ পড়ছে মনিটরিংয়ে
কিন্তু প্রযুক্তির চোখ যতই তীক্ষ্ণ হোক, বাস্তবতার কিছু ফাঁক এখনো তাকে আটকে দিচ্ছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় নির্দিষ্ট নম্বরপ্লেট শনাক্ত না হওয়া, পরিচয়বিহীন যানবাহন, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং একাধিক যান পাশাপাশি চললে গতির তথ্য আলাদাভাবে ধরতে না পারার মতো সীমাবদ্ধতা সামনে এসেছে।
নজরদারির পরিধি বাড়ছে
গত মাস থেকে রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্তে ‘প্যান-টিল্ট-জুম’ বা পিটিজেড ক্যামেরা ব্যবহার শুরু করেছে পুলিশ। প্রাথমিক পর্যায়ে ১৫টি ক্যামেরা ও আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী তিন মাসে আরও ৫০টি এবং পরবর্তী ছয় মাসে ৫৫টি ক্যামেরা বসানো হবে। অর্থাৎ ধাপে ধাপে রাজধানীর ১২০টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট চলে আসবে এআই নজরদারির আওতায়।
সফটওয়্যারে ইতিমধ্যে উল্টো পথে গাড়ি চালানো, সিগন্যাল অমান্য, জেব্রা ক্রসিংয়ে গাড়ি থামানো, স্টপ লাইন অমান্য, লেন আটকে রাখা, আকস্মিক লেন পরিবর্তন, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা এবং অবৈধ পার্কিংয়ের মতো বিভিন্ন অনিয়ম শনাক্তের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ক্যামেরা সবসময় পড়তে পারছে না
প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি হচ্ছে গাড়ির নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, রাতের বেলায় বিআরটিএর দেওয়া সবুজ রঙের কিছু নম্বরপ্লেট এআই ক্যামেরা ঠিকভাবে পড়তে পারছে না। ফলে আইন ভঙ্গের ঘটনা ক্যামেরায় ধরা পড়লেও সংশ্লিষ্ট গাড়ির পরিচয় নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
আরেকটি সমস্যা তৈরি করছে পরিচয়হীন অটোরিকশা। নম্বর বা নির্দিষ্ট পরিচিতি না থাকায় এসব যানবাহনের গতিবিধি শনাক্ত ও পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। অর্থাৎ ক্যামেরার দৃষ্টিসীমায় অপরাধ ধরা পড়লেও অপরাধী যানকে চিহ্নিত করার পর্যায়ে এসে প্রযুক্তির সক্ষমতা থমকে যাচ্ছে।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আনিসুর রহমান বলেন, অস্পষ্ট নম্বরপ্লেট, মালিকানা ও ঠিকানা পরিবর্তনসহ নানা জটিলতা রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে কাজ চলছে। রাতের বেলায় সবুজ নম্বরপ্লেট পড়তে না পারার বিষয়টিও তিনি স্বীকার করে বলেন, রঙের কারণে এ সমস্যা হচ্ছে।
মহাসড়কের অভিজ্ঞতাও স্বস্তির নয়
রাজধানীর আগে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বড় পরিসরে এআই ক্যামেরার ব্যবহার শুরু হয়েছে। গত আগস্ট থেকে মহাসড়কের ৪৯০টি পয়েন্টে প্রায় দেড় হাজার ক্যামেরা কাজ করছে। সেখানে আইনভঙ্গ কমে আসার পাশাপাশি চালকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির প্রাথমিক প্রভাবও দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছে হাইওয়ে পুলিশ।
তবে সেখানেও প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা পুরোপুরি কাটেনি। বড় গাড়ির আড়ালে হঠাৎ ছোট গাড়ি চলে এলে আলাদাভাবে তার গতি শনাক্তে সমস্যা হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে ট্রান্সফরমার চুরি, বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও পাওয়ার ফেইলরের কারণে ক্যামেরার নজরদারিতেও ছেদ পড়ছে।
হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশন) মুনতাসিরুল ইসলাম বলেন, ক্যামেরা স্থাপনের পর মানুষ আগের তুলনায় সচেতন হয়েছে এবং মামলার সংখ্যাও কমছে। তবে লোডশেডিং, ট্রান্সফরমার চুরি ও পাওয়ার ফেইলরের কারণে মাঝেমধ্যে মনিটরিংয়ে সমস্যা হচ্ছে, যা দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে।
পরিচয় নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ
এআই ক্যামেরার কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করছে একটি মৌলিক বিষয়ের ওপর—রাস্তায় চলা প্রতিটি গাড়িকে নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা যাচ্ছে কি না। ডিএমপির কর্মকর্তা আনিসুর রহমানও মনে করেন, অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে না আনলে শুধু ক্যামেরা দিয়ে ঢাকার যানজট কমানো কঠিন। একই সঙ্গে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন পুরোপুরি চালু হলে যানজট কমাতে তা সহায়ক হতে পারে বলে তিনি জানান।
পুলিশ পরিদর্শক রাহাত খানের মতে, গাড়ির নম্বরপ্লেট একই ধরনের ও সহজে পাঠযোগ্য করা গেলে শুধু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাই নয়, অপরাধ নিয়ন্ত্রণেও সুবিধা হবে। তার ভাষায়, গাড়ির পরিচয় নিশ্চিত করা গেলে নজরদারির কার্যকারিতাও বাড়বে।
রাজধানীতে এআই ক্যামেরা বসানো নিঃসন্দেহে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভর পরিবর্তনের বড় পদক্ষেপ। কিন্তু ক্যামেরা যত বেশি বসবে, ততই স্পষ্ট হবে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর দুর্বলতা।
নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, মানসম্মত ও অভিন্ন নম্বরপ্লেট, হালনাগাদ মালিকানা তথ্য, পরিচয়বিহীন যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং নির্ভুল সফটওয়্যার—সবকিছুকে একই কাঠামোয় আনতে না পারলে ক্যামেরার নজরদারি শতভাগ কার্যকর হবে না। অর্থাৎ ঢাকার সড়কে এখন প্রশ্ন শুধু ‘ক্যামেরা কতটি’ নয়; বরং ক্যামেরা যা দেখছে, সেই তথ্য দিয়ে কত দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে।
কালের আলো/এসএ/এমকে

আপনার মতামত লিখুন
Array