খুঁজুন
                               
, ,
           

অভিজ্ঞতার নোঙর, প্রত্যাশার পাল—কোস্টগার্ডের নতুন কাণ্ডারি মঈনুল হাসান

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:১৯ পূর্বাহ্ণ
অভিজ্ঞতার নোঙর, প্রত্যাশার পাল—কোস্টগার্ডের নতুন কাণ্ডারি মঈনুল হাসান

একটি করভেটের কমান্ড থেকে শুরু করে অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল, ফাস্ট অ্যাটাক ক্রাফট ও মিসাইল বোটের নেতৃত্ব; উত্তাল সমুদ্রে নেভিগেশন থেকে নৌ এভিয়েশনের বিকাশ কিংবা নৌবহরের নেতৃত্ব থেকে কৌশলগত পরিকল্পনা এবং দেশের জলসীমা থেকে হাজার মাইল দূরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন—দীর্ঘ সামরিক জীবনের প্রতিটি বাঁকে অভিজ্ঞতার নতুন অধ্যায় লিখেছেন রিয়ার এডমিরাল মো. মঈনুল হাসান। তিন দশকের বেশি সময়ের সেই বর্ণাঢ্য পথচলার পর এবার তাঁর হাতে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের নেতৃত্ব। গত বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বাহিনীর মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। দায়িত্ব হস্তান্তর ও গ্রহণ বইয়ে স্বাক্ষরের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এই অভিজ্ঞ নৌ কর্মকর্তা। তিনি আগের মহাপরিচালক রিয়ার এডমিরাল মো. জিয়াউল হকের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন।

অবশ্য সমুদ্রের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তাই নতুন নয়। বরং বলা যায়, তাঁর সামরিক জীবনের বড় একটি অংশই কেটেছে সমুদ্র, নৌযান, নেভিগেশন ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। দীর্ঘ সেই সামরিক অভিজ্ঞতাই এখন বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের নেতৃত্বে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। দায়িত্ব গ্রহণ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পদমর্যাদার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। নতুন মহাপরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণকে ঘিরে বাহিনীতে যেমন নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তেমনি তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা সামনে রেখে কোস্টগার্ডের ভবিষ্যৎ সক্ষমতা নিয়েও তৈরি হয়েছে আশাবাদ।

  • কমান্ডে অভিজ্ঞ, নেতৃত্বে পরীক্ষিত
  • তিন দশকের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার
  • আস্থার নতুন অধ্যায়, সম্ভাবনার হাতছানি

জানা যায়, সমুদ্রের বিস্তীর্ণ নীল জলরেখা থেকে দেশের প্রত্যন্ত নদীপথ—নিরাপত্তার এই দীর্ঘ সীমানাজুড়ে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের দায়িত্ব যতটা বিস্তৃত, চ্যালেঞ্জও ততটাই বহুমাত্রিক। মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধ, জলদস্যুতা দমন, সমুদ্র ও উপকূলের নিরাপত্তা, নদীপথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কিংবা দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো—প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রয়োজন অভিজ্ঞতা, দূরদর্শিতা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা। এসব দিক বিবেচনা করেই সরকার কোস্টগার্ডের ডিজি হিসেবে বেছে নিয়েছে তাকে। তাঁর অভিজ্ঞতা, কৌশলগত জ্ঞান ও নেতৃত্বের দক্ষতা কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড সামনের দিনগুলোতে আরও আধুনিক, দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর বাহিনী হিসেবে নতুন উচ্চতায় পৌঁছবে বলে মনে করেন অনেকেই।

সমুদ্রই যাঁর কর্মজীবনের বড় পাঠশালা
রিয়ার এডমিরাল মঈনুল হাসানের সামরিক ক্যারিয়ার শুরু ১৯৮৯ সালের ১ জুলাই বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যোগদানের মাধ্যমে। ১৯৯২ সালের ১ জানুয়ারি নৌবাহিনীর এক্সিকিউটিভ শাখায় কমিশন পাওয়ার পর তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন সমুদ্র, নৌবহর, প্রশিক্ষণ, নেভিগেশন, নৌ এভিয়েশন, পরিকল্পনা ও কৌশলগত ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্তরে। তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত সমুদ্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা। দক্ষ নেভিগেটর হিসেবে তিনি একটি করভেট, দুটি অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল, তিনটি মিডিয়াম ও স্মল ফাস্ট অ্যাটাক ক্রাফট এবং একটি মিসাইল বোটের অধিনায়কত্ব করেছেন।

অর্থাৎ সমুদ্র নিরাপত্তা তাঁর কাছে কেবল নীতিনির্ধারণের বিষয় নয়; জাহাজের কমান্ড, নেভিগেশন, অপারেশন এবং বাস্তব ঝুঁকি মোকাবিলার মধ্য দিয়ে অর্জিত অভিজ্ঞতারও নাম। কোস্টগার্ডের মতো সমুদ্র ও নদীকেন্দ্রিক একটি বাহিনীর নেতৃত্বে এই অভিজ্ঞতা বেশ বড় এক সম্পদ। কমান্ডার চট্টগ্রাম নৌ অঞ্চল এবং কমান্ডার বাংলাদেশ নেভাল ফ্লিট হিসেবে দায়িত্ব পালন তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একই সঙ্গে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নেভি ট্রেনিং অ্যান্ড ডকট্রিন কমান্ডের প্রথম কমান্ড্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন তাঁর নেতৃত্ব ও প্রশিক্ষণভিত্তিক দক্ষতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

নৌ এভিয়েশনেও রেখেছেন দক্ষতার স্বাক্ষর
সমুদ্রের পাশাপাশি আকাশপথেও রয়েছে তাঁর বিস্তর অভিজ্ঞতা। কমান্ডিং অফিসার, ফ্লাইং উইং হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। পরে কমোডর নেভাল এভিয়েশন এবং নৌ সদর দপ্তরে নৌ এভিয়েশনের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমান সময়ে সমুদ্র নিরাপত্তা কেবল জাহাজনির্ভর নয়। নজরদারি বিমান, হেলিকপ্টার, ড্রোন, স্যাটেলাইটভিত্তিক তথ্য এবং আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা সমুদ্র নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। নৌ এভিয়েশনে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাই কোস্টগার্ডকে ভবিষ্যতে আরও প্রযুক্তিনির্ভর করার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করেন অনেকেই।

দেশ-বিদেশের উচ্চতর শিক্ষা
সামরিক কমান্ডের পাশাপাশি উচ্চতর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণেও নিজেকে প্রস্তুত করেছেন রিয়ার এডমিরাল মঈনুল হাসান। মিরপুরের ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ, ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ ও ভারতের ওয়েলিংটনের ডিফেন্স সার্ভিসেস স্টাফ কলেজের কৃতি গ্র্যাজুয়েট তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের নেভাল ওয়ার কলেজ, রোড আইল্যান্ড থেকে নেভাল কমান্ড কলেজ কোর্স সম্পন্ন করেছেন। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ থেকে ডিফেন্স স্টাডিজে এমএসসি এবং ভারতের তামিলনাড়ু ইউনিভার্সিটি থেকে স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। সাভারের বাংলাদেশ পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ট্রেনিং সেন্টার থেকেও সিনিয়র স্টাফ কোর্স সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে পিএইচডি করছেন। এই একাডেমিক ও পেশাগত প্রস্তুতি তাঁর সামরিক অভিজ্ঞতাকে কৌশলগত চিন্তার সঙ্গে যুক্ত করেছে। ফলে বাহিনীর তাৎক্ষণিক অপারেশন থেকে দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা—দুই দিকেই তাঁর নেতৃত্বের ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

যে বাহিনীর নেতৃত্বে, সেটিকেও চেনেন ভেতর থেকে
মঈনুল হাসানের নতুন দায়িত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বাংলাদেশ কোস্টগার্ড তাঁর কাছে অপরিচিত নয় মোটেও। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের উপমহাপরিচালক হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। নৌ সদর দপ্তরে নৌ পরিকল্পনা ও নৌ এভিয়েশনের পরিচালক এবং নেভাল সেক্রেটারি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে নীতিনির্ধারণ, প্রশাসন ও অপারেশন—তিন ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা তাঁর ক্যারিয়ারে যুক্ত হয়েছে। এ কারণে মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির কাঠামো ও কার্যক্রম বুঝতে তাঁকে নতুন করে দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হবে না। বরং বিদ্যমান সক্ষমতাকে কীভাবে অধিকতর কার্যকর করা যায়, সেদিকে দ্রুত মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

আন্তর্জাতিক মিশনে সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা
২০০৭–২০০৮ সালে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন ইন আইভরি কোস্টে সামরিক পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মঈনুল হাসান। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সামরিক মহড়া, সম্মেলন ও সেমিনারেও বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করেছেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কাজের এই অভিজ্ঞতা তাঁকে বহুজাতিক পরিবেশে সমন্বয়, কৌশলগত যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামো সম্পর্কে বাস্তব ধারণা দিয়েছে।

পদক ও স্বীকৃতিতে উজ্জ্বল কর্মজীবন
দীর্ঘ সামরিক জীবনের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সর্বোচ্চ শান্তিকালীন পদক ‘নৌবাহিনী পদক’, ‘বিশিষ্ট সেবা পদক’ এবং বাংলাদেশ কোস্টগার্ড পদক অর্জন করেছেন। এসব স্বীকৃতি তাঁর দায়িত্ব পালনের দক্ষতা, পেশাদারিত্ব ও অবদানেরই প্রতিফলন।

কোস্টগার্ডের সামনে খুলতে পারে নতুন সম্ভাবনার পথ
বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের ডিজি হিসেবে রিয়ার এডমিরাল মঈনুল হাসানের দায়িত্ব গ্রহণ তাই কেবল একটি পদে নতুন একজন কর্মকর্তার আগমন নয়; বরং সমুদ্রকেন্দ্রিক অভিজ্ঞতা ও কৌশলগত নেতৃত্বে খুলতে পারে নতুন সম্ভাবনার পথ। আরও আধুনিক প্রযুক্তি, আরও শক্তিশালী অপারেশন, দেশের সমুদ্র, উপকূল ও নদীপথের নিরাপত্তায় আরও দৃঢ় অবস্থানের মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠানের হাল ধরা। সামনে চ্যালেঞ্জ হয়তো অনেক, কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য তাঁর অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারও যে কম নয়।

কালের আলো/এমএএএমকে

জাল-প্লাস্টিকের ফাঁসে হুমকিতে লেম্বুরবনের জীববৈচিত্র্য

পটুয়াখালী সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৪৭ পূর্বাহ্ণ
জাল-প্লাস্টিকের ফাঁসে হুমকিতে লেম্বুরবনের জীববৈচিত্র্য

কুয়াকাটার লেম্বুরবন সৈকতে সমুদ্রভাঙনের পাশাপাশি প্লাস্টিক ও পরিত্যক্ত মাছ ধরার জালের দূষণ নতুন সংকট তৈরি করেছে। সৈকতের পাশে থাকা গাছগুলোর শিকড় ও কাণ্ডে জড়িয়ে আছে ছেঁড়া জাল ও নানা ধরনের প্লাস্টিক বর্জ্য। এতে একদিকে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে ঝুঁকিতে পড়ছে উপকূলীয় ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য।

সমুদ্রের ঢেউ ও স্রোতের টানে লেম্বুরবন সৈকতের বালু সরে যাওয়ায় অনেক গাছের শিকড় উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। এসব শিকড়ের ফাঁকে আটকে থাকা প্লাস্টিক ও জালের স্তূপ এবং কাণ্ডে জড়িয়ে থাকা পরিত্যক্ত জাল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

স্থানীয় জেলে সোহেল মাঝি জানান, মাছ ধরার সময় জাল ছিঁড়ে গেলে বা হারিয়ে গেলে অনেক সময় তা সমুদ্রে থেকে যায়। আবার নৌকা থেকে ফেরার পর ছেঁড়া জাল সৈকত বা আশপাশের ঝোপঝাড়ে ফেলে রাখার ঘটনাও ঘটে। নির্দিষ্ট স্থানে জাল ও জালের বর্জ্য ফেলার ব্যবস্থা থাকলে জেলেরা সেখানে এসব বর্জ্য জমা দিতে পারবেন বলে মনে করেন তিনি।

লেম্বুরবনের ব্যবসায়ী ফারুক বলেন, পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সৈকতে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্যও জমছে। এর মধ্যে ছেঁড়া মাছ ধরার জালও দেখা যায়। এসব বর্জ্য সৈকতের সৌন্দর্য নষ্ট করার পাশাপাশি গাছপালা ও পরিবেশের ক্ষতি করছে।

পরিবেশকর্মী নজরুল ইসলাম বলেন, সৈকতে ছড়িয়ে থাকা জালের কারণে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হচ্ছে। দীর্ঘদিনেও প্লাস্টিক ও নাইলনের জাল সহজে নষ্ট হয় না। এসব জালে বন্যপ্রাণী আটকে যেতে পারে এবং পর্যটকদের জন্যও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কুয়াকাটাকে পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে কার্যকর বিচ ম্যানেজমেন্ট প্রয়োজন।

‘সুস্থ সাগর’ প্রকল্পের গবেষণা সহকারী মো. বখতিয়ার রহমান জানান, পরিত্যক্ত, হারিয়ে যাওয়া বা ফেলে দেওয়া মাছ ধরার সরঞ্জামকে আন্তর্জাতিকভাবে ‘অ্যাব্যান্ডন্ড, লস্ট অর ডিসকার্ডেড ফিশিং গিয়ার’ বা ‘ঘোস্ট গিয়ার’ বলা হয়। এসব জালে মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া, কচ্ছপ, ডলফিন ও তিমিসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণী আটকে মারা যেতে পারে।

তার ভাষ্য, সমুদ্রের তলদেশে আটকে থাকা জাল প্রবাল, সি-গ্রাসসহ বিভিন্ন জলজ আবাসস্থলের ক্ষতি করে। কৃত্রিম উপাদানে তৈরি জাল সহজে পচে না; বরং সময়ের সঙ্গে ভেঙে প্লাস্টিক দূষণ বাড়ায়। হারিয়ে যাওয়া জাল দীর্ঘদিন পানিতে থেকে মাছ ধরতে থাকলে তাকে ‘ঘোস্ট ফিশিং’ বলা হয়, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করে।

বখতিয়ার রহমান বলেন, শুধু সচেতনতা তৈরি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। জাল কেনা, ব্যবহার, হারিয়ে গেলে রিপোর্ট, উদ্ধার ও পুনর্ব্যবহার—পুরো প্রক্রিয়াকে ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। জালে মালিক বা নৌকার পরিচয় নম্বর যুক্ত করা, পুরোনো জাল ফেরত দিলে প্রণোদনা দেওয়া এবং কুয়াকাটা, আলীপুর ও মহিপুরে জাল সংগ্রহকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

বন বিভাগের লেম্বুরবন বিট কর্মকর্তা আমির হামজা বলেন, উপকূলীয় গাছগুলো মাটি ও বালু ধরে রাখার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু ঢেউ ও স্রোতের কারণে বালু সরে গিয়ে গাছের শিকড় উন্মুক্ত হওয়ায় সেগুলো ঝুঁকিতে পড়েছে। এর সঙ্গে জাল জড়িয়ে থাকলে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও টিকে থাকা আরও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই দ্রুত ও সতর্কতার সঙ্গে জাল অপসারণ প্রয়োজন।

ট্যুরিস্ট পুলিশ কুয়াকাটা জোনের পরিদর্শক মো. নাজমুল হাসান বলেন, সাগরে মাছ ধরার সময় জাল টেনে তুলতে না পারলে অনেক জেলে তা কেটে দেন। জালে প্যাঁচ লাগলেও কখনো কখনো জাল কেটে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়। পরে স্রোতের সঙ্গে এসব জাল সৈকতে চলে আসে। এতে পরিবেশের পাশাপাশি সৈকতের সৌন্দর্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তিনি জানান, বিষয়টি মহিপুর ও আলীপুর মাছবাজারের গদি মালিকদের অবহিত করা হবে। একই সঙ্গে সৈকত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে পৌরসভাকে জানানো হবে। লেম্বুরবন, তিন নদীর মোহনা, কাউয়ারচর ও গঙ্গামতির চরে দায়িত্ব পালনের সময় জেলেদের পরিত্যক্ত জাল না ফেলার বিষয়ে সচেতন করা হবে। এরপরও কেউ শনাক্ত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান বলেন, সৈকতে পড়ে থাকা পরিত্যক্ত মাছ ধরার জাল ও অন্যান্য বর্জ্য পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে এবং এসব জাল অপসারণে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে সৈকতে যাতে এ ধরনের বর্জ্য না ফেলা হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সচেতন করা হবে।

সমুদ্রভাঙনে উন্মুক্ত হয়ে পড়া শিকড় আর তাতে জড়িয়ে থাকা পরিত্যক্ত জাল কুয়াকাটার উপকূলীয় বনাঞ্চলের নাজুক অবস্থারই জানান দিচ্ছে। দ্রুত বর্জ্য অপসারণ ও পরিত্যক্ত মাছ ধরার জালের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না করা গেলে এখানকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি 

মাঠজুড়ে গর্ত-জলাবদ্ধতা, সুপেয় পানির সংকটে শিক্ষার্থীরা

কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৪০ পূর্বাহ্ণ
মাঠজুড়ে গর্ত-জলাবদ্ধতা, সুপেয় পানির সংকটে শিক্ষার্থীরা

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নের ইটালুকান্দা আদর্শগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠের একাংশে বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। বৃষ্টির পানিতে সীমানাপ্রাচীরের পাশের মাটি ধসে এ গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন মাঠ সংস্কার না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা ও চলাচলে ভোগান্তি বাড়ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের সীমানাপ্রাচীরের একাংশ এখনো অসম্পূর্ণ। প্রাচীরের পাশে বৃষ্টির পানির প্রবাহে মাটি ধসে বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও গর্তে পানি জমে পুকুরের মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এতে মাঠে শিক্ষার্থীদের চলাচল ও খেলাধুলা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

বিদ্যালয়ে প্রবেশের রাস্তাটিও বেহাল। স্থানীয় একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগে নির্মিত রাস্তাটির বিভিন্ন স্থানে মাটি সরে গেছে। গাইডওয়াল না থাকায় বৃষ্টির পানিতে রাস্তার পাশের মাটি ধসে পড়ছে। ফলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইব্রাহিম খলিল সরকার বলেন, ভবনের বড় কোনো সংকট না থাকলেও বিদ্যালয়ে বেশ কিছু অবকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। বিশেষ করে সীমানাপ্রাচীরের পাশে মাটি ধসে বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। সেখানে গাইডওয়াল নির্মাণ করে মাটি ভরাট করা হলে মাঠটি শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা ও চলাচলের উপযোগী করা সম্ভব হবে।

তিনি আরও বলেন, বিদ্যালয়ের শৌচাগারটিও ভগ্নদশায় রয়েছে। এর পাশাপাশি একমাত্র নলকূপটি দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট থাকায় শিক্ষার্থীদের সুপেয় পানির সংকটে পড়তে হচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।

ইটালুকান্দা গ্রামের সমাজসেবক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বিদ্যালয়ের মাঠের বর্তমান অবস্থা শিক্ষার্থীদের জন্য দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত মাঠ ভরাট এবং গাইডওয়াল নির্মাণ করা প্রয়োজন।

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা মাঠের গর্ত ভরাট, সীমানাপ্রাচীরের পাশে গাইডওয়াল নির্মাণ, নষ্ট নলকূপ মেরামত এবং শৌচাগার সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।

রৌমারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল হাই চৌধুরী বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। সংশ্লিষ্ট শিক্ষক বিষয়টি জানালে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

বকেয়া বিল ও পুনর্বাসন জটিলতায় আটকে ছিল প্রকল্প, দ্রুত কাজ শুরুর নির্দেশ

জামালপুর প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৩২ পূর্বাহ্ণ
বকেয়া বিল ও পুনর্বাসন জটিলতায় আটকে ছিল প্রকল্প, দ্রুত কাজ শুরুর নির্দেশ

দীর্ঘদিনের ধীরগতি ও নানা জটিলতা কাটিয়ে জামালপুরের মাদারগঞ্জ ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজে গতি ফেরাতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদনের পর বৃহস্পতিবার (২ অক্টোবর) বিদ্যুৎ বিভাগের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছে।

পরিদর্শনকালে প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন, ঠিকাদারের বকেয়া বিল পরিশোধ এবং প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাদ দেওয়ার বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের পরিকল্পনা অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব নূর আহমেদ ও উপসচিব আহসান সাদী পরিদর্শনে অংশ নেন। এ সময় প্রকল্পের অগ্রগতি, কারিগরি সমস্যা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় পুনর্বাসন কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এখনো ১৪ থেকে ১৫টি পরিবার পুনর্বাসনের অপেক্ষায় রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে অতিরিক্ত সচিব আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে সব জটিলতা নিরসনের জন্য প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা আরপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে নির্দেশ দেন।

সভায় প্রকল্পের নকশা ও কার্যপরিধি পরিবর্তনের বিষয়টিও উঠে আসে। ভারতীয় ইপিসি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অমরা রাজা ইনফ্রা প্রাইভেট লিমিটেডের প্রতিনিধি ভেঙ্কটেশ প্রসাদ অভিযোগ করেন, প্রকল্পের ৬২ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর একতরফাভাবে বেশ কিছু কাজ বাদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ২০০ কোটি টাকা বকেয়া বিল পরিশোধ না হওয়ায় প্রকল্পের কাজের গতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি বলেন, স্ট্যাটিক ভিএআর জেনারেটর (এসভিজি) এবং দুই বছরের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজও বাদ দেওয়া হয়েছে। এসভিজি না থাকলে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার দূরের ঘাটাইল উপকেন্দ্রের মাধ্যমে মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ কঠিন হতে পারে।

এ ছাড়া আরপিসিএলের বড় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনার পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলেও সভায় জানানো হয়।

বিষয়গুলো শুনে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা অসন্তোষ প্রকাশ করেন। কারিগরি বাস্তবতা বিবেচনা না করে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত কারা নিয়েছে, তা তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। তদন্তে দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।

পাশাপাশি ভারত সরকারের লাইন অব ক্রেডিটের আওতায় নেওয়া ঋণের অব্যবহৃত অর্থের ওপর প্রতি ছয় মাসে দশমিক ৫ শতাংশ কমিটমেন্ট ফি এড়াতে দ্রুত বকেয়া বিল পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকার পর সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদনের মাধ্যমে প্রকল্পটি পুনরায় সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাস্তবায়নকারী সংস্থা আরপিসিএল ইতোমধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ শুরুর অনুমতিও দিয়েছে।

পরিদর্শন শেষে অতিরিক্ত সচিব নূর আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে তারা পরিদর্শনে এসেছেন। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে কাজের গতি ত্বরান্বিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, সরকারের নিবিড় তদারকিতে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে প্রকল্পটির কাজ দ্রুত এগোবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জাতীয় গ্রিডে ১০০ মেগাওয়াট পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি