অভিজ্ঞতার নোঙর, প্রত্যাশার পাল—কোস্টগার্ডের নতুন কাণ্ডারি মঈনুল হাসান
একটি করভেটের কমান্ড থেকে শুরু করে অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল, ফাস্ট অ্যাটাক ক্রাফট ও মিসাইল বোটের নেতৃত্ব; উত্তাল সমুদ্রে নেভিগেশন থেকে নৌ এভিয়েশনের বিকাশ কিংবা নৌবহরের নেতৃত্ব থেকে কৌশলগত পরিকল্পনা এবং দেশের জলসীমা থেকে হাজার মাইল দূরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন—দীর্ঘ সামরিক জীবনের প্রতিটি বাঁকে অভিজ্ঞতার নতুন অধ্যায় লিখেছেন রিয়ার এডমিরাল মো. মঈনুল হাসান। তিন দশকের বেশি সময়ের সেই বর্ণাঢ্য পথচলার পর এবার তাঁর হাতে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের নেতৃত্ব। গত বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বাহিনীর মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। দায়িত্ব হস্তান্তর ও গ্রহণ বইয়ে স্বাক্ষরের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এই অভিজ্ঞ নৌ কর্মকর্তা। তিনি আগের মহাপরিচালক রিয়ার এডমিরাল মো. জিয়াউল হকের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন।
অবশ্য সমুদ্রের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তাই নতুন নয়। বরং বলা যায়, তাঁর সামরিক জীবনের বড় একটি অংশই কেটেছে সমুদ্র, নৌযান, নেভিগেশন ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। দীর্ঘ সেই সামরিক অভিজ্ঞতাই এখন বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের নেতৃত্বে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। দায়িত্ব গ্রহণ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পদমর্যাদার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। নতুন মহাপরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণকে ঘিরে বাহিনীতে যেমন নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তেমনি তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা সামনে রেখে কোস্টগার্ডের ভবিষ্যৎ সক্ষমতা নিয়েও তৈরি হয়েছে আশাবাদ।
- কমান্ডে অভিজ্ঞ, নেতৃত্বে পরীক্ষিত
- তিন দশকের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার
- আস্থার নতুন অধ্যায়, সম্ভাবনার হাতছানি
জানা যায়, সমুদ্রের বিস্তীর্ণ নীল জলরেখা থেকে দেশের প্রত্যন্ত নদীপথ—নিরাপত্তার এই দীর্ঘ সীমানাজুড়ে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের দায়িত্ব যতটা বিস্তৃত, চ্যালেঞ্জও ততটাই বহুমাত্রিক। মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধ, জলদস্যুতা দমন, সমুদ্র ও উপকূলের নিরাপত্তা, নদীপথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কিংবা দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো—প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রয়োজন অভিজ্ঞতা, দূরদর্শিতা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা। এসব দিক বিবেচনা করেই সরকার কোস্টগার্ডের ডিজি হিসেবে বেছে নিয়েছে তাকে। তাঁর অভিজ্ঞতা, কৌশলগত জ্ঞান ও নেতৃত্বের দক্ষতা কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড সামনের দিনগুলোতে আরও আধুনিক, দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর বাহিনী হিসেবে নতুন উচ্চতায় পৌঁছবে বলে মনে করেন অনেকেই।
সমুদ্রই যাঁর কর্মজীবনের বড় পাঠশালা
রিয়ার এডমিরাল মঈনুল হাসানের সামরিক ক্যারিয়ার শুরু ১৯৮৯ সালের ১ জুলাই বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যোগদানের মাধ্যমে। ১৯৯২ সালের ১ জানুয়ারি নৌবাহিনীর এক্সিকিউটিভ শাখায় কমিশন পাওয়ার পর তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন সমুদ্র, নৌবহর, প্রশিক্ষণ, নেভিগেশন, নৌ এভিয়েশন, পরিকল্পনা ও কৌশলগত ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্তরে। তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত সমুদ্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা। দক্ষ নেভিগেটর হিসেবে তিনি একটি করভেট, দুটি অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল, তিনটি মিডিয়াম ও স্মল ফাস্ট অ্যাটাক ক্রাফট এবং একটি মিসাইল বোটের অধিনায়কত্ব করেছেন।
অর্থাৎ সমুদ্র নিরাপত্তা তাঁর কাছে কেবল নীতিনির্ধারণের বিষয় নয়; জাহাজের কমান্ড, নেভিগেশন, অপারেশন এবং বাস্তব ঝুঁকি মোকাবিলার মধ্য দিয়ে অর্জিত অভিজ্ঞতারও নাম। কোস্টগার্ডের মতো সমুদ্র ও নদীকেন্দ্রিক একটি বাহিনীর নেতৃত্বে এই অভিজ্ঞতা বেশ বড় এক সম্পদ। কমান্ডার চট্টগ্রাম নৌ অঞ্চল এবং কমান্ডার বাংলাদেশ নেভাল ফ্লিট হিসেবে দায়িত্ব পালন তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একই সঙ্গে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নেভি ট্রেনিং অ্যান্ড ডকট্রিন কমান্ডের প্রথম কমান্ড্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন তাঁর নেতৃত্ব ও প্রশিক্ষণভিত্তিক দক্ষতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
নৌ এভিয়েশনেও রেখেছেন দক্ষতার স্বাক্ষর
সমুদ্রের পাশাপাশি আকাশপথেও রয়েছে তাঁর বিস্তর অভিজ্ঞতা। কমান্ডিং অফিসার, ফ্লাইং উইং হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। পরে কমোডর নেভাল এভিয়েশন এবং নৌ সদর দপ্তরে নৌ এভিয়েশনের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমান সময়ে সমুদ্র নিরাপত্তা কেবল জাহাজনির্ভর নয়। নজরদারি বিমান, হেলিকপ্টার, ড্রোন, স্যাটেলাইটভিত্তিক তথ্য এবং আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা সমুদ্র নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। নৌ এভিয়েশনে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাই কোস্টগার্ডকে ভবিষ্যতে আরও প্রযুক্তিনির্ভর করার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করেন অনেকেই।
দেশ-বিদেশের উচ্চতর শিক্ষা
সামরিক কমান্ডের পাশাপাশি উচ্চতর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণেও নিজেকে প্রস্তুত করেছেন রিয়ার এডমিরাল মঈনুল হাসান। মিরপুরের ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ, ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ ও ভারতের ওয়েলিংটনের ডিফেন্স সার্ভিসেস স্টাফ কলেজের কৃতি গ্র্যাজুয়েট তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের নেভাল ওয়ার কলেজ, রোড আইল্যান্ড থেকে নেভাল কমান্ড কলেজ কোর্স সম্পন্ন করেছেন। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ থেকে ডিফেন্স স্টাডিজে এমএসসি এবং ভারতের তামিলনাড়ু ইউনিভার্সিটি থেকে স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। সাভারের বাংলাদেশ পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ট্রেনিং সেন্টার থেকেও সিনিয়র স্টাফ কোর্স সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে পিএইচডি করছেন। এই একাডেমিক ও পেশাগত প্রস্তুতি তাঁর সামরিক অভিজ্ঞতাকে কৌশলগত চিন্তার সঙ্গে যুক্ত করেছে। ফলে বাহিনীর তাৎক্ষণিক অপারেশন থেকে দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা—দুই দিকেই তাঁর নেতৃত্বের ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
যে বাহিনীর নেতৃত্বে, সেটিকেও চেনেন ভেতর থেকে
মঈনুল হাসানের নতুন দায়িত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বাংলাদেশ কোস্টগার্ড তাঁর কাছে অপরিচিত নয় মোটেও। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের উপমহাপরিচালক হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। নৌ সদর দপ্তরে নৌ পরিকল্পনা ও নৌ এভিয়েশনের পরিচালক এবং নেভাল সেক্রেটারি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে নীতিনির্ধারণ, প্রশাসন ও অপারেশন—তিন ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা তাঁর ক্যারিয়ারে যুক্ত হয়েছে। এ কারণে মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির কাঠামো ও কার্যক্রম বুঝতে তাঁকে নতুন করে দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হবে না। বরং বিদ্যমান সক্ষমতাকে কীভাবে অধিকতর কার্যকর করা যায়, সেদিকে দ্রুত মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

আন্তর্জাতিক মিশনে সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা
২০০৭–২০০৮ সালে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন ইন আইভরি কোস্টে সামরিক পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মঈনুল হাসান। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সামরিক মহড়া, সম্মেলন ও সেমিনারেও বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করেছেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কাজের এই অভিজ্ঞতা তাঁকে বহুজাতিক পরিবেশে সমন্বয়, কৌশলগত যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামো সম্পর্কে বাস্তব ধারণা দিয়েছে।
পদক ও স্বীকৃতিতে উজ্জ্বল কর্মজীবন
দীর্ঘ সামরিক জীবনের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সর্বোচ্চ শান্তিকালীন পদক ‘নৌবাহিনী পদক’, ‘বিশিষ্ট সেবা পদক’ এবং বাংলাদেশ কোস্টগার্ড পদক অর্জন করেছেন। এসব স্বীকৃতি তাঁর দায়িত্ব পালনের দক্ষতা, পেশাদারিত্ব ও অবদানেরই প্রতিফলন।
কোস্টগার্ডের সামনে খুলতে পারে নতুন সম্ভাবনার পথ
বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের ডিজি হিসেবে রিয়ার এডমিরাল মঈনুল হাসানের দায়িত্ব গ্রহণ তাই কেবল একটি পদে নতুন একজন কর্মকর্তার আগমন নয়; বরং সমুদ্রকেন্দ্রিক অভিজ্ঞতা ও কৌশলগত নেতৃত্বে খুলতে পারে নতুন সম্ভাবনার পথ। আরও আধুনিক প্রযুক্তি, আরও শক্তিশালী অপারেশন, দেশের সমুদ্র, উপকূল ও নদীপথের নিরাপত্তায় আরও দৃঢ় অবস্থানের মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠানের হাল ধরা। সামনে চ্যালেঞ্জ হয়তো অনেক, কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য তাঁর অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারও যে কম নয়।
কালের আলো/এমএএএমকে

আপনার মতামত লিখুন
Array