‘একদিন এই পৃথিবীটা বাউলের পৃথিবী হবে’- শাহ আবদুল করিম
আজ ১২ সেপ্টেম্বর। বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের প্রয়াণদিবস। ২০০৯ সালের এই দিনে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান ভাটির এই মহাপুরুষ। মৃত্যুর ১৭ বছর পরও তার গান ও দর্শন সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে আগের মতোই জীবন্ত।
জাগতিক কোনো উদ্দেশ্য পূরণে গান করতেন না শাহ আবদুল করিম। তার গানের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের কাছে নিজের আদর্শ ও দর্শন পৌঁছে দেওয়া। গান নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের প্রয়াত সংগীতশিল্পী কলিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্যের সঙ্গে এক আলাপচারিতায় সেই দর্শনের কথাই উঠে এসেছিল।
‘কথা বোঝা গেলেই হলো’
আলাপচারিতায় কলিকাপ্রসাদ শাহ আবদুল করিমকে প্রশ্ন করেছিলেন, অনেকে তার গান বিকৃত সুরে গায়, আবার কেউ কেউ তার নামও উল্লেখ করেন না। এসব দেখে তার খারাপ লাগে কি না।
জবাবে শাহ আবদুল করিম বলেছিলেন, ‘কথা বোঝা গেলেই হলো। আমার আর কিচ্ছু দরকার নাই।’
উত্তরটি শুনে বিস্মিত হয়েছিলেন কলিকাপ্রসাদ। নিজের সৃষ্টি অন্য কেউ সামনে বসে বিকৃতভাবে গাইলেও একজন শিল্পী কীভাবে কিছু মনে না করে থাকতে পারেন—সেটিই ছিল তার প্রশ্ন।
একজন শ্রোতাই যথেষ্ট
এরপর শাহ আবদুল করিম কলিকাপ্রসাদকেই একটি প্রশ্ন করেন। বলেন, কোনো অনুষ্ঠানে হাজার হাজার চেয়ার রাখা আছে, কিন্তু গান শুনতে কোনো মানুষ আসেনি; শুধু সামনের সারিতে একজন শ্রোতা বসে আছেন—তাহলে তিনি গান গাইতে পারবেন কি না।
কলিকাপ্রসাদ জানান, তিনি হয়তো পারবেন না।
তখন শাহ আবদুল করিম হাসতে হাসতে বলেন, তিনি পারবেন। কারণ তার গান শুধু গান নয়; গানের ভেতর দিয়ে তিনি একটি আদর্শ প্রচার করতে চান। সেই আদর্শ যদি একজন মানুষের কাছেও পৌঁছায়, তাতেই তিনি সন্তুষ্ট।
তার ভাষায়, সুর ঠিক না থাকলেও, গায়ক হিসেবে তার নাম উচ্চারিত না হলেও সমস্যা নেই—গানের কথার মধ্য দিয়ে সেই আদর্শ মানুষের কাছে পৌঁছালেই তার উদ্দেশ্য সফল।
‘পৃথিবীটা বাউলের পৃথিবী হবে’
শাহ আবদুল করিমের সেই আদর্শ কী—কলিকাপ্রসাদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আবারও হাসেন। এরপর বলেন,
‘একদিন এই পৃথিবীটা বাউলের পৃথিবী হবে।’
ছোট্ট এই বাক্যের মধ্যেই যেন ধরা পড়ে তার দীর্ঘ সংগীতজীবনের দর্শন। মানুষের কথা, মানুষের অধিকার, সাম্য ও মানবিকতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল তার গানের অন্যতম শক্তি।
২০০৯ সালে তিনি চলে গেলেও তার গান থেমে যায়নি। বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তার গান নতুন কণ্ঠে, নতুন সুরে ফিরে আসছে। আর সেই গানের কথার মধ্য দিয়ে আজও বেঁচে আছেন ভাটির বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম।
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array