খুঁজুন
                               
, ,
           

দেশে ঋণখেলাপি অথচ বিদেশে সম্পদের পাহাড়

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
প্রকাশিত: সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:৩০ অপরাহ্ণ
দেশে ঋণখেলাপি অথচ বিদেশে সম্পদের পাহাড়

দেশে ব্যাংকের টাকা পরিশোধ না করে বছরের পর বছর আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন বড় ঋণখেলাপিদের অনেকে। কারও নামে থাকা সম্পদ ঋণের বিপরীতে আদায়যোগ্য পাওনার তুলনায় নগণ্য, আবার কারও খোঁজই মিলছে না দেশে। এরই মধ্যে ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার করে সেখানে বাড়ি, জমি, ব্যবসা কিংবা বিনিয়োগ গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে। ফলে ব্যাংকের পাওনা আদায়ের লড়াই এবার আর শুধু দেশের আদালতে সীমাবদ্ধ থাকছে না; নজর যাচ্ছে ঋণখেলাপিদের বিদেশি সম্পদের দিকে।

২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে-এমন ৪২ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিদেশে থাকা অর্থ-সম্পদের তথ্য খুঁজতে আটটি আন্তর্জাতিক আইন ও পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, সিঙ্গাপুর, বেলজিয়ামসহ ১২ দেশে চলছে অনুসন্ধান। সম্পদ পাওয়া গেলে সেটি আইনগতভাবে জব্দ ও শেষ পর্যন্ত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় সহায়তা করবে এসব প্রতিষ্ঠান।

কারা নজরদারিতে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, প্রাথমিকভাবে ৪২ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এই অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়েছে। তাদের প্রত্যেকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২০০ কোটি টাকার বেশি। তবে এদের সবার অর্থ যে বিদেশে পাচার হয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া হয়নি। ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ না করা, ঋণগ্রহীতার অনুপস্থিতি এবং বিদেশে সম্পদ থাকার সম্ভাবনার মতো বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধান এগোচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, এসব ঋণের কিছু অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে থাকতে পারে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিক বা ঋণগ্রহীতাকে দেশে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই বিদেশে থাকা অর্থ-সম্পদের অবস্থান শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কোথায় খোঁজা হচ্ছে
অনুসন্ধানের আওতায় এসেছে ১২টি দেশ-যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, সিঙ্গাপুর, বেলজিয়াম, নিউজিল্যান্ড, হংকং, চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব দেশে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের সম্ভাব্য গন্তব্য থাকার কারণেই নজর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে রিয়েল এস্টেট, ব্যাংক আমানত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কোম্পানির শেয়ার ও অন্যান্য বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর হয়ে থাকতে পারে। ফলে অনুসন্ধানে শুধু ব্যক্তির নামে থাকা সম্পদ নয়, অর্থের প্রকৃত মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের কাঠামোও যাচাই করা হচ্ছে।

কী খুঁজছেন বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো
ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণখেলাপিদের আর্থিক লেনদেনের সূত্র অনুসরণ করছে। বাড়ি, জমি, অ্যাপার্টমেন্ট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক হিসাব, কোম্পানির মালিকানা ও বিনিয়োগ-সবই রয়েছে অনুসন্ধানের তালিকায়।

দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে গ্র্যান্ট থর্নটন, আরআই কনসোর্টিয়াম, বেকার ম্যাকেঞ্জি ও পিডব্লিউসি, ডিএলএ পাইপার ও ক্রল, ইওয়াই ও ডেন্টনস, রহমান রাভেলি ও ইন্টারপাথ, বিসিজি ও এইচএইচআর এবং অ্যানিমাস অ্যাসোসিয়েটস।

তবে সম্পদের তথ্য পাওয়া এবং অর্থ উদ্ধার-দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। কোনো দেশে সম্পদ শনাক্ত হওয়ার পর সেটি জব্দ করতে হলে সেই দেশের আইন ও আদালতের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

ব্যাংকের ঝুঁকি কম, চাপ বেশি
এই উদ্যোগে পারিশ্রমিক দেওয়ার পদ্ধতিই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। সম্পদ উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত নিয়োগ পাওয়া বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোনো পারিশ্রমিক দিতে হবে না। সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধার করতে পারলেই চুক্তি অনুযায়ী উদ্ধার করা অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ পাবে তারা।

ফলে ব্যাংকের শুরুতেই বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা খরচের প্রয়োজন হচ্ছে না। একই সঙ্গে অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠানের জন্যও তৈরি হচ্ছে ফল দেখানোর চাপ। শুধু কোনো সম্পদের তথ্য তুলে দিলেই তাদের দায়িত্ব শেষ হচ্ছে না; চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে সম্পদ উদ্ধারে আইনি সহায়তা দেওয়া।

সবচেয়ে কঠিন ধাপ টাকা দেশে ফেরানো
বিদেশে সম্পদ পাওয়া গেলেই ব্যাংকের পাওনা আদায় হয়ে যাবে-এমন নিশ্চয়তা নেই। সম্পদের মালিকানা নিয়ে বিরোধ, আদালতের অনুমোদন, জব্দের আইনি প্রক্রিয়া, সম্পদ বিক্রি এবং বিক্রয়লব্ধ অর্থ বাংলাদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে একাধিক বাধা আসতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরো প্রক্রিয়া কয়েক বছরও গড়াতে পারে।

এ কারণেই স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থপাচারবিরোধী আইন সম্পর্কে অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা হয়েছে। দেশে অর্থঋণ আদালতে মামলা চললেও বিদেশি সম্পদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও আদালতের ওপরই নির্ভর করতে হবে ব্যাংকগুলোকে।

এর আগে বিদেশে পাচার করা অর্থ উদ্ধারে সরকার গঠিত যৌথ তদন্ত দলের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে কাজ শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ, কাস্টমসের গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং আয়কর বিভাগের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল। একই সঙ্গে এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ আদায়েও বিদেশি আইন প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।

অনুসন্ধান থেকে প্রত্যাবাসন
বড় খেলাপিদের বিদেশি সম্পদ অনুসন্ধানের এই উদ্যোগ তাই ব্যাংকের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও এটি কোনো তাৎক্ষণিক সমাধান নয়। দীর্ঘদিনের আটকে থাকা ঋণ আদায়ে এবার দেশের আদালতের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থাকেও কাজে লাগানো হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগের সাফল্যের মাপকাঠি হবে বিদেশে কত সম্পদ পাওয়া গেল, তা নয়। বরং সেই সম্পদের কতটা আইনগতভাবে জব্দ করা গেল এবং কত টাকা বাস্তবে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে ব্যাংকের পাওনা সমন্বয় করা সম্ভব হলো-সেখানেই নির্ধারিত হবে এই আন্তর্জাতিক অভিযানের কার্যকারিতা।

কালের আলো/এম/এএইচ

 

জনতা ব্যাংকের ইউএই-কাণ্ড

জনতা ব্যাংকের ৩০৪ কোটি: নিষ্পত্তি নাকি হিসাবের গরমিল?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৩৩ পূর্বাহ্ণ
জনতা ব্যাংকের ৩০৪ কোটি: নিষ্পত্তি নাকি হিসাবের গরমিল?

সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) জনতা ব্যাংকের প্রায় ৩০৪ কোটি টাকার ঋণ নিয়ে ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্যে ভিন্ন চিত্র সামনে এসেছে। জনতা ব্যাংক বলছে, এটি বহু পুরোনো ঋণ এবং দীর্ঘ আইনি ও সালিসি প্রক্রিয়া শেষে ২০০৩ সালেই দুই দেশের সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্মতিতে এর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছিল। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে ইউএইর চার শাখায় বিপুল অঙ্কের ঋণ অবলোপন, হিসাবের অসঙ্গতি এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতার তথ্য উঠে এসেছে।

ব্যাংকের দাবি, ২০০৩ সালেই দায় নিষ্পন্ন

রোববার (৪ অক্টোবর) জনতা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মুহ. ফজলুর রহমান বলেন, ইউএই কার্যক্রম নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে কিছু তথ্যগত অসঙ্গতি রয়েছে।

তার দাবি, শেখ খলিফা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ফাইন্যান্স মরিস ও মেট্রোপলিটন এন্টারপ্রাইজের ঋণটি বহু পুরোনো। পাওনা আদায়ে ব্যাংকের উদ্যোগ, কূটনৈতিক তৎপরতা, আইনগত প্রক্রিয়া এবং সালিসি কার্যক্রমের পর বিধিবিধান মেনেই ঋণটি নিষ্পত্তি করা হয়েছে।

জনতা ব্যাংকের নথি অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালের সালিসি আদালতের নির্দেশনা এবং দুই দেশের সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্মতির ভিত্তিতে ২০০৩ সালেই ওই ঋণের চূড়ান্ত দায় নিষ্পন্ন হয়।

ব্যাংক আরও জানিয়েছে, গণমাধ্যমে প্রয়াত ইউএই প্রেসিডেন্ট শেখ খলিফা বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের ছবি ব্যবহার করা হলেও প্রকৃত ঋণগ্রহীতা ছিলেন শেখ খলিফা বিন মোহাম্মদ আল নাহিয়ান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে ৪৩৯ কোটি টাকার ঋণ অবলোপন

অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে ইউএইতে জনতা ব্যাংকের চার শাখায় মোট ২০ কোটি ৫১ লাখ দিরহাম বা প্রায় ৪৩৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা ঋণ অবলোপনের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঋণ ছিল ২৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের।

এর মধ্যে শেখ খলিফা-সংশ্লিষ্ট ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৪ কোটি ২৮ লাখ ৮০ হাজার দিরহাম, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩০৪ কোটি টাকার সমপরিমাণ।

প্রতিবেদনে আরও প্রায় ৬৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকার একটি ঋণ ‘ভুলক্রমে’ অবলোপনের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—৪৩৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা হচ্ছে ইউএইর চার শাখায় ২৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মোট অবলোপিত ঋণ। আর ৬৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকার ঋণকে প্রতিবেদনে আলাদাভাবে ‘ভুলক্রমে’ অবলোপনের ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ৩০৪ কোটি টাকার ঋণের বিষয়টি বৃহত্তর ইউএই কার্যক্রমের হিসাব ও ঋণ ব্যবস্থাপনার প্রশ্নের সঙ্গেও আলোচনায় এসেছে।

হিসাবের গরমিল নিয়েও প্রশ্ন

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে শুধু ঋণ অবলোপন নয়, ইউএই শাখাগুলোর হিসাব ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

শারজাহ শাখার সান্ড্রি ডিপোজিট ও সান্ড্রি অ্যাসেটের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্যের তথ্য প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পাশাপাশি দুবাই শাখার বিভিন্ন হিসাবেও গরমিলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ইউএই সিইও কার্যালয়ের ছয়টি ল্যাপটপ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন দল। তবে জনতা ব্যাংকের দাবি, ল্যাপটপগুলোর অস্তিত্ব রয়েছে এবং সেগুলো দাপ্তরিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

তিন ভারতীয় নাগরিক নিয়োগ নিয়েও ব্যাখ্যা

ইউএই কার্যক্রমে তিন ভারতীয় নাগরিক নিয়োগের বিষয়েও ব্যাংকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। জনতা ব্যাংকের বক্তব্য, ইউএইতে স্থানীয় কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে ১৯৮২ সালের স্থানীয় নিয়োগ-সংক্রান্ত বিধিমালা অনুসরণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমতির বাধ্যবাধকতা নেই বলেও ব্যাংক দাবি করেছে।

অন্যদিকে ইতালির জনতা এক্সচেঞ্জ কোম্পানি (জেইসি) বন্ধ না করার বিষয়ে ব্যাংক জানিয়েছে, প্রবাসী আয় এবং বাংলাদেশের ভাবমূর্তির বিষয় বিবেচনায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি চালু রাখা হয়েছে।

এখন মূল প্রশ্ন নথির সামঞ্জস্য নিয়ে

ফলে বিতর্কটি শুধু ৩০৪ কোটি টাকার ঋণ ‘অবলোপন’ হয়েছিল কি না—এমন একক প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকছে না। জনতা ব্যাংকের বক্তব্য অনুযায়ী, এটি দীর্ঘদিনের একটি ঋণ, যা আইনি ও সালিসি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ২০০৩ সালেই নিষ্পত্তি হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে একই ইউএই কার্যক্রমে বড় অঙ্কের ঋণ অবলোপন, হিসাবের অসঙ্গতি এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতার তথ্য উঠে এসেছে।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে ৩০৪ কোটি টাকার ঋণকে সরাসরি অবৈধ বা দুর্নীতির অর্থ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে—এমন দাবি করার সুযোগ নেই। একইভাবে শুধু প্রতিবেদনে ঋণ অবলোপনের তথ্য থাকলেই ২০০৩ সালের নিষ্পত্তি প্রশ্নবিদ্ধ প্রমাণিত হয় না।

এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ২০০৩ সালের নিষ্পত্তির নথি, সালিসি সিদ্ধান্ত, দুই দেশের সরকারের সম্মতির প্রমাণ, ঋণ অবলোপনের অনুমোদন এবং পরবর্তী হিসাবরেকর্ড পরস্পরের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—তা যাচাই করা।

এসব নথি ও হিসাবের ধারাবাহিকতা পরিষ্কার হলে বোঝা যাবে, ৩০৪ কোটি টাকার বিষয়টি কেবল একটি পুরোনো ও নিষ্পত্তি হওয়া ঋণের ঘটনা, নাকি এর সঙ্গে ইউএইতে জনতা ব্যাংকের বৃহত্তর ঋণ ব্যবস্থাপনা ও হিসাবের অসঙ্গতির কোনো যোগসূত্র রয়েছে।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

এলপি গ্যাসে কারচুপি, ১০২ প্রতিষ্ঠানকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৫২ পূর্বাহ্ণ
এলপি গ্যাসে কারচুপি, ১০২ প্রতিষ্ঠানকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং সরকার নির্ধারিত দামে এলপি গ্যাস বিক্রি নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী বিশেষ তদারকি অভিযান চালিয়েছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। রাজধানীসহ ৩০ জেলায় পরিচালিত এ অভিযানে বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে ১০২টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ১০ লাখ ৩১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

রোববার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, অধিদপ্তরের ৪৪টি দল একযোগে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অভিযান পরিচালনা করে।

অভিযানে পণ্যের মূল্যতালিকা প্রদর্শন, ক্রয়-বিক্রয়ের ভাউচার সংরক্ষণ ও প্রদান, সঠিক ওজন এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করা হয়। নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো এবং গ্যাস সিলিন্ডারের অতিরিক্ত দাম আদায় বন্ধ করাই ছিল অভিযানের উদ্দেশ্য।

সাভারের আমতলা ও কুটুরিয়া বাজারের দুটি এলপি গ্যাস ডিলার পয়েন্টে অভিযান চালিয়ে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়। এ সময় হাজী আব্দুর রহমান এন্টারপ্রাইজকে ১০ হাজার টাকা এবং ইকবাল এন্টারপ্রাইজকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

অধিদপ্তর জানায়, প্রতিষ্ঠান দুটির বিরুদ্ধে যথাযথভাবে ক্রয়-বিক্রয়ের ভাউচার সংরক্ষণ না করা, প্রদর্শিত মূল্যতালিকার চেয়ে বেশি দামে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি এবং বিশেষ পাইপের মাধ্যমে গ্যাস স্থানান্তর করে ওজনে কারচুপির অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। অভিযানে কারচুপিতে ব্যবহৃত বিশেষ পাইপ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সিল-স্টিকারও জব্দ করা হয়।

এর মধ্যে সরবরাহ সংকটের কারণে অক্টোবর মাসে এলপি গ্যাসের দামও বাড়িয়েছে সরকার। রোববার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে। সেপ্টেম্বরে একই সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ভোক্তাদের পণ্য কেনার আগে মূল্যতালিকা যাচাই, সঠিক ওজন নিশ্চিত করা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য, উৎপাদনের তারিখ ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ দেখে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। গ্যাস সিলিন্ডার কেনার সময় ওজন, সিল ও দৃশ্যমান ত্রুটি পরীক্ষা এবং ক্রয়ের রশিদ বা ভাউচার সংগ্রহেরও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

কোনো অনিয়ম বা প্রতারণার শিকার হলে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের হটলাইন ১৬১২১ নম্বরে অভিযোগ জানাতে বলা হয়েছে।

বাজারে শৃঙ্খলা, ন্যায্যমূল্য ও পণ্যের স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে এ ধরনের তদারকি অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে অধিদপ্তর।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

বাংলা কিউআরের হাত ধরে বদলে যাচ্ছে ব্যাংকিংয়ের হিসাব

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৩৭ পূর্বাহ্ণ
বাংলা কিউআরের হাত ধরে বদলে যাচ্ছে ব্যাংকিংয়ের হিসাব

দেশে ব্যাংকিং সেবার ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ব্যাংকের শাখা কিংবা ওয়েবসাইটের পরিবর্তে স্মার্টফোনের অ্যাপ ব্যবহার করেই এখন ব্যাংকিংয়ের বড় অংশের কাজ সারছেন গ্রাহকরা। এ পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে আন্তঃব্যাংক ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা বাংলা কিউআর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই শেষে দেশে ব্যাংকিং অ্যাপ ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২ কোটি ৯ লাখ ৭৫ হাজার ছাড়িয়েছে। এক বছর আগে, গত বছরের আগস্টে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৭১ লাখ ৬৬ হাজার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যবহারকারী বেড়েছে প্রায় ১ কোটি ৩৮ লাখ, যা প্রায় তিন গুণ।

২০২৩ সালে আন্তঃব্যাংক কোডভিত্তিক লেনদেনের জন্য বাংলা কিউআর চালু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে সব প্রতিষ্ঠানের কোডভিত্তিক লেনদেন বাংলা কিউআরের মাধ্যমে করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এতে বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) অ্যাপ ব্যবহার করে একই কিউআর কোড স্ক্যানের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বাংলা কিউআরের ফলে নির্দিষ্ট কোনো ব্যাংকের গ্রাহককে শুধু সেই ব্যাংকের মাধ্যমেই লেনদেন করতে হচ্ছে না। যেকোনো ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাপ ব্যবহার করে অর্থ পরিশোধ করা যাচ্ছে। এতে সাধারণ গ্রাহকের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের মধ্যেও কিউআরভিত্তিক লেনদেনের আগ্রহ বাড়ছে।

অ্যাপ ব্যবহারকারীর পাশাপাশি লেনদেনের পরিমাণও বেড়েছে। গত জুলাইয়ে ব্যাংকিং অ্যাপের মাধ্যমে ১ লাখ ৭৪ হাজার ১২৯ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। এক বছর আগে, গত আগস্টে এই পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১২ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা। অবশ্য একক মাস হিসেবে সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছিল গত জুনে—১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা।

অন্যদিকে কমছে ব্রাউজারভিত্তিক ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের ব্যবহার। গত জুলাই শেষে ব্যাংকের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সেবা নেওয়া গ্রাহকের সংখ্যা ছিল ২৪ লাখ ৮৯ হাজার। বিপরীতে অ্যাপ ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৯ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি।

অ্যাপ ও ব্রাউজার মিলিয়ে গত জুলাই শেষে মোট ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহারকারী দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৩৪ লাখ ৬৪ হাজারের বেশি। গত বছরের আগস্টে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ১৯ লাখ ৬৭ হাজার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, একসময় অ্যাপভিত্তিক লেনদেনকে মূলত এমএফএসের সঙ্গে সম্পর্কিত মনে করা হতো। বাংলা কিউআর চালুর পর ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এর গুরুত্ব বুঝতে শুরু করেছে। যেসব ব্যাংকের নিজস্ব অ্যাপ ছিল না, তাদেরও এ ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ফলে বাংলা কিউআর এখন শুধু একটি পেমেন্ট ব্যবস্থা নয়; এটি ব্যাংকের ডিজিটাল সেবা, অ্যাপ ব্যবহার এবং গ্রাহকের দৈনন্দিন আর্থিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করছে।

ব্যাংকিং অ্যাপের ব্যবহার বৃদ্ধির এই প্রবণতা ইঙ্গিত দিচ্ছে, গ্রাহকদের ব্যাংকিং অভ্যাসে বড় পরিবর্তন এসেছে। ভবিষ্যতে বাংলা কিউআর ও অ্যাপভিত্তিক সেবা আরও বিস্তৃত হলে স্মার্টফোনই হয়ে উঠতে পারে দৈনন্দিন ব্যাংকিংয়ের প্রধান মাধ্যম।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি