সাইবার অপরাধ ঠেকাতে পুলিশের নতুন প্রস্তুতি
অপরাধের ধরন যখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে, তখন সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুলিশের সক্ষমতার কাঠামোও ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে সাইবার অপরাধ, ডিজিটাল ফরেনসিক, আর্থিক অপরাধ ও প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলায় প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি বিশেষায়িত দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ পুলিশ স্টাফ কলেজের (পিএসসি) পরিচালনা বোর্ডের ২১তম সভায় উঠে এসেছে এমনই একটি সমন্বিত পরিকল্পনার চিত্র।
রাজধানীর মিরপুরে পিএসসির বোর্ডরুমে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সভায় সাইবার নিরাপত্তায় স্থায়ী কাঠামো গড়ে তোলা থেকে শুরু করে পুলিশ সদস্যদের আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও উদ্ভাবন, উচ্চশিক্ষা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা-বিস্তৃত পরিসরে আলোচনা হয়। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পিএসসির ভূমিকা কেবল প্রশিক্ষণকেন্দ্র হিসেবে সীমিত না থেকে পুলিশিংয়ের জ্ঞান, গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে রূপ নিতে পারে।
সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট প্রতিষ্ঠা, গবেষণা ও উদ্ভাবন সেন্টার চালু, উচ্চশিক্ষার নতুন কোর্স, আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা-সব মিলিয়ে পিএসসিকে কেন্দ্র করে পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি বিস্তৃত রূপরেখা পাওয়া যাচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশ বাহিনীকে সাইবার স্পেসসহ যেকোনো ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় সর্বাত্মক প্রস্তুত থাকতে হবে। সেই লক্ষ্যেই প্রয়োজনীয় আধুনিক সুবিধা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।
একটি পূর্ণাঙ্গ ও প্রাতিষ্ঠানিক সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট
বর্তমানে পুলিশ সদর দপ্তর, ঢাকা মহানগর পুলিশের সাইবার ইউনিট এবং অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল অপরাধের তদন্ত ও ফরেনসিক অ্যানালাইসিস পরিচালনা করছে। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের বিস্তৃতি ও জটিলতা বাড়ায় এসব সক্ষমতাকে আরও সমন্বিত করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। সভাপতির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পুলিশ বাহিনীতে প্রকৌশল, আইটি ও কম্পিউটার সায়েন্সের ব্যাকগ্রাউন্ডসম্পন্ন অনেক সদস্য রয়েছেন। তাঁদের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে একজন অতিরিক্ত আইজিপির নেতৃত্বে একটি পূর্ণাঙ্গ ও প্রাতিষ্ঠানিক সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা চলছে।

এই পরিকল্পনার গুরুত্ব শুধু একটি নতুন ইউনিট গঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ে ছড়িয়ে থাকা প্রযুক্তিগত দক্ষতা, তদন্ত সক্ষমতা ও ফরেনসিক অবকাঠামোকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর ফলে ডিজিটাল প্রমাণ বিশ্লেষণ, সাইবার অপরাধ শনাক্তকরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তে সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি ও সক্ষমতা বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
পুলিশের সক্ষমতা ও মনোবল বৃদ্ধিতে গুরুত্ব
সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর পাশাপাশি দক্ষ জনবলকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ কারণে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকেও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার তাগিদ এসেছে সভায়। মন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পুলিশের সক্ষমতা ও মনোবল বৃদ্ধিতে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে মাস্টার ট্রেইনার পর্যায়ের কর্মকর্তাদের আরও কার্যকরভাবে দক্ষ করে তুলতে অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
প্রয়োজনে বিদেশ থেকে প্রশিক্ষক এনে কিংবা আধুনিক সুযোগ-সুবিধা গড়ে তুলে কর্মকর্তাদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির কথাও জানান তিনি। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, ভবিষ্যতের পুলিশিংয়ে প্রযুক্তিগত জ্ঞানকে অতিরিক্ত দক্ষতা হিসেবে নয়, বরং অপরাধ মোকাবিলার মৌলিক সক্ষমতা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য রয়েছে।

পদোন্নতি ও পদায়নের অগ্রাধিকার শর্ত
সভায় বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণগুলোকে পদোন্নতি ও পদায়নের অগ্রাধিকার শর্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবও আলোচিত হয়। এর মধ্য দিয়ে প্রশিক্ষণকে চাকরিজীবনের নিয়মিত আনুষ্ঠানিকতার পরিবর্তে পেশাগত অগ্রগতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার একটি কাঠামো তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের বৈদেশিক অংশে প্রশিক্ষণের জন্য অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি আলোচনায় আসে। যার অর্থাৎ দাঁড়াচ্ছে দেশের ভেতরের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বিদেশি অভিজ্ঞতা ও আধুনিক পদ্ধতির সঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তাদের পরিচিত করার সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পূর্ণাঙ্গ ও স্বতন্ত্র গবেষণা ও উদ্ভাবন সেন্টার
পিএসসির অধীনে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বতন্ত্র গবেষণা ও উদ্ভাবন সেন্টার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব সভায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। পুলিশের বাস্তব অভিজ্ঞতা, অপরাধের পরিবর্তিত প্রবণতা এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনকে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রশিক্ষণ ও নীতিনির্ধারণে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে। একই ধারায় মাস্টার্স ইন ফরেনসিক সায়েন্স এবং মাস্টার্স ইন ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম অ্যান্ড গভর্ন্যান্স কোর্স চালুর পরিকল্পনাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ফরেনসিক বিজ্ঞান ও আর্থিক অপরাধ এখন আধুনিক আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দুটি ক্ষেত্র। ফলে এসব বিষয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি হলে পুলিশ কর্মকর্তাদের বিশেষায়িত জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি গবেষণাভিত্তিক দক্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হবে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় প্রশিক্ষণের পরিধি
আন্তর্জাতিক পুলিশ একাডেমি সংস্থার (ইন্টারপা) সদস্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশে প্রশিক্ষণ আয়োজন এবং বিদেশে প্রশিক্ষণার্থী পাঠানোর জন্য কার্যক্রম গ্রহণের বিষয়ও সভায় আলোচিত হয়েছে। পাশাপাশি সার্ক দেশগুলোর জন্য প্রশিক্ষণ আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশিক্ষণ বিনিময় শুধু কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়াবে না। বিভিন্ন দেশের পুলিশিং পদ্ধতি, অপরাধ মোকাবিলার কৌশল এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের প্রশিক্ষণ কাঠামোয় যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করবে। বিশেষ করে সাইবার অপরাধের মতো সীমান্ত অতিক্রমকারী অপরাধের ক্ষেত্রে এ ধরনের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ কার্যকর হতে পারে।
অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে নীতিগত সংস্কার
সভায় পিএসসির অবকাঠামো উন্নয়ন, কলেজের বিধিসমূহের সরকারি অনুমোদন এবং ভূমি ব্যবহারের জন্য এমআরটির প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়। পাশাপাশি পিএসসির রজত জয়ন্তী উদযাপনের বিষয়টি সামনে আসে। সভার শুরুতে ২০তম পরিচালনা বোর্ড সভার কার্যবিবরণী উপস্থাপন করা হয় এবং প্রয়োজনীয় সংশোধন সাপেক্ষে তা অনুমোদন দেওয়া হয়। আগের সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়। ফলে এবারের সভায় শুধু নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ নয়, আগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অবস্থাও মূল্যায়নের আওতায় এসেছে।

পরিচালনা বোর্ডের ২১তম সভায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ও পরিচালনা বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোঃ কামরুজ্জামান চৌধুরী, ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি) মোঃ আলী হোসেন ফকির, বিপিএটিসির রেক্টর সাঈদ মাহবুব খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ. বি. এম. ওবায়দুল ইসলাম, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোঃ হাসানুল মতিন, আইন ও বিচার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোঃ খাদেম উল কায়েস এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ শামীম সোহেলসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। সভা শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুলিশ স্টাফ কলেজের ক্যাম্পাস পরিদর্শন করেন।
এমএএএমকে

আপনার মতামত লিখুন
Array