সাগর-চর-জাহাজের নান্দনিকতায় নতুন পর্যটন গন্তব্য কাউয়ারচর
সাগরকন্যা কুয়াকাটার পরিচিত পর্যটন স্পটের বাইরে ধীরে ধীরে নতুন আকর্ষণ হয়ে উঠছে কাউয়ারচর। কুয়াকাটার ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকতের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত এ চরজুড়ে রয়েছে বিস্তীর্ণ বেলাভূমি, খোলা আকাশ, সমুদ্রের বাতাস ও নিরিবিলি পরিবেশ। একদিকে রামনাবাদ নদী ও সাগরের মোহনা, অন্যদিকে চরাঞ্চল। পাশাপাশি এখান থেকে পায়রা বন্দরের লাইটার জাহাজের চলাচলও দেখা যায়।
ছুটির দিন ও পর্যটন মৌসুমে কুয়াকাটার জিরো পয়েন্টে মানুষের ভিড় বাড়ায় নিরিবিলি পরিবেশের সন্ধানে অনেক পর্যটক কাউয়ারচরে আসছেন। সাতক্ষীরা থেকে আসা পর্যটক শিহাব পারভেজ বলেন, মূল সৈকতের তুলনায় কাউয়ারচর অনেক শান্ত। পরিবার নিয়ে সময় কাটানোর জন্য জায়গাটি ভালো।

তবে পর্যটকদের সংখ্যা বাড়ার পথে বড় বাধা যোগাযোগব্যবস্থা। পিরোজপুরের পর্যটক মো. মোশারেফ হাওলাদার বলেন, কাউয়ারচর বড় পর্যটন স্পট হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। কিন্তু বেড়িবাঁধ থেকে সৈকতে যাওয়ার ভালো রাস্তা নেই। সড়ক যোগাযোগ উন্নত হলে পর্যটক আরও বাড়বে।
পর্যটনে বদলাতে পারে স্থানীয় অর্থনীতি
কাউয়ারচরের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকাও জড়িত। মাছ ধরা, কৃষিকাজ ও ছোট ব্যবসার পাশাপাশি পর্যটন বাড়লে পরিবহন, গাইড, খাবারের দোকান, হস্তশিল্প ও স্থানীয় পণ্যের ব্যবসার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
স্থানীয় জেলে মো. শাহ আলম আকন বলেন, পর্যটকেরা এলেও ভালো যাতায়াতের ব্যবস্থা না থাকায় তারা বেশি সময় থাকেন না। যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হলে স্থানীয়রাও দোকানপাট করে আয় করতে পারবেন।

স্থানীয় মোটরসাইকেলচালক মো. শাহিন জোমাদ্দার জানান, পর্যটকেরা কাউয়ারচরে এসে সাগর, চর ও আশপাশের প্রকৃতি উপভোগ করেন। কিন্তু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় কিছুক্ষণ পরই ফিরে যান।
কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াছিন ছাদেক বলেন, কাউয়ারচর কুয়াকাটা পর্যটন এলাকার অন্যতম বড় সৈকত। এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি পায়রা বন্দরের জাহাজ চলাচলও পর্যটকদের আকর্ষণ করে। উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন প্রকল্পের সুপারিশ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
এলজিইডির কলাপাড়া উপজেলা প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান বলেন, কুয়াকাটা থেকে লেম্বুর বন, মিশ্রিপাড়া ও গঙ্গামতি পর্যন্ত পাকা সড়ক হয়েছে। আগামী বাজেটে কাউয়ারচর পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রকৃতি রক্ষা করে পর্যটন
কাউয়ারচরের অন্যতম সম্পদ এর প্রাকৃতিক পরিবেশ। তাই পর্যটন উন্নয়নের নামে অপরিকল্পিত স্থাপনা ও যানবাহনের চাপ বাড়িয়ে পরিবেশ নষ্ট না করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে লাল কাঁকড়াসহ উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ জরুরি।
পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করা গেলে পরিবেশবান্ধব ছোট আবাসন, ক্যাফে, স্থানীয় খাবারের দোকান, পর্যটন গাইড, সাইকেল ভাড়া ও নৌভ্রমণের মতো সেবা চালু হতে পারে। এতে পর্যটকদের অবস্থানের সময় বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় হোটেল, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসাতেও অর্থনৈতিক সুফল ছড়িয়ে পড়তে পারে।
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুল মোতালেব শরীফ বলেন, কাউয়ারচর থেকেও সূর্যোদয় উপভোগ করা যায়। পর্যটকেরা জায়গাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রশংসা করেন।
ট্যুরিস্ট পুলিশের কুয়াকাটা অঞ্চলের এসআই মো. নজরুল ইসলাম বলেন, কাউয়ারচরে পর্যটক তুলনামূলক কম। এর অন্যতম কারণ যাতায়াতের ভালো ব্যবস্থা না থাকা। তবে পর্যটক থাকুক বা না থাকুক, নিরাপত্তার জন্য সেখানে নিয়মিত টহল দেওয়া হয়।

পরিকল্পিত যোগাযোগব্যবস্থা, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো এবং স্থানীয় মানুষকে পর্যটন কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা গেলে কাউয়ারচর কুয়াকাটার পর্যটন মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ নতুন গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array