স্টারলিংক নিয়ে মুখোমুখি মাস্ক-ভারত
ভারতের বিশাল বাজারে প্রবেশের অপেক্ষায় ইলন মাস্কের স্টারলিংক। প্রয়োজনীয় লাইসেন্স পাওয়ার পরও দেশটিতে বাণিজ্যিক সেবা চালু করতে পারছে না স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানটি। আর এই বিলম্ব নিয়েই এবার সরাসরি মুখোমুখি হয়েছে স্টারলিংক ও ভারত সরকার।
স্পেসএক্সের কর্ণধার ইলন মাস্ক অভিযোগ করেছেন, ভারতের কিছু ‘অলিগার্ক’ ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী নিজেদের একচেটিয়া ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে স্টারলিংকের প্রবেশ ঠেকিয়ে দিচ্ছে। তবে তার এই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে নয়াদিল্লি।
ভারতের যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দাবি, স্যাটেলাইট যোগাযোগ সেবার জন্য দেশটিতে একটি ন্যায্য ও বৈষম্যহীন নিয়ন্ত্রক কাঠামো রয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে আটকে রাখার সুযোগ নেই; বরং লাইসেন্সপ্রাপ্ত সব কোম্পানিকেই একই ধরনের নিরাপত্তা যাচাই ও নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণ করতে হচ্ছে।
মাস্কের অভিযোগ, ‘একচেটিয়া ব্যবসা’ রক্ষায় বাধা
বুধবার (৭ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ইলন মাস্ক প্রশ্ন তোলেন, ভারতে স্টারলিংকের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করতে কারা বাধা দিচ্ছে। তার অভিযোগ, ভারতের কিছু প্রভাবশালী ‘অলিগার্ক’ নিজেদের একচেটিয়া ব্যবসায়িক প্রভাব বজায় রাখার স্বার্থে স্টারলিংকের প্রবেশ আটকে দিচ্ছেন। মাস্কের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ভারতের বাজারে স্টারলিংকের প্রবেশ নিয়ে দীর্ঘদিনের জটিলতা নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনায় এসেছে। তবে ভারতের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে—স্টারলিংককে আলাদাভাবে আটকে রাখা হচ্ছে না।
পাল্টা জবাব দিল ভারত
মাস্কের অভিযোগের পর বৃহস্পতিবার ভারতের যোগাযোগ মন্ত্রণালয় জানায়, স্যাটেলাইট যোগাযোগ পরিষেবার লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে সব প্রতিষ্ঠানের জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য। মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, লাইসেন্স পাওয়ার পর প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকেই নির্ধারিত নিরাপত্তা শর্ত পূরণ করতে হয়। বর্তমানে লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা মূল্যায়ন চলছে। অর্থাৎ, ভারতের দাবি—স্টারলিংকের জন্য আলাদা কোনো বাধা তৈরি করা হয়নি; বরং দেশটির নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মধ্য দিয়েই এগোতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে।
তিন প্রতিষ্ঠান পেয়েছে লাইসেন্স
ভারতে স্যাটেলাইট যোগাযোগ পরিষেবা চালুর দৌড়ে বর্তমানে তিনটি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইলন মাস্কের স্টারলিংক, ভারতী গ্রুপ-সমর্থিত ইউটেলস্যাট ওয়ানওয়েব এবং জিও প্ল্যাটফর্মসের মালিকানাধীন জিও স্যাটেলাইট কমিউনিকেশনস। এ ছাড়া জেফ বেজোসের অ্যামাজন লিও-ও লাইসেন্সের অপেক্ষায় রয়েছে। ভারতীয় মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, লাইসেন্স পাওয়া তিন প্রতিষ্ঠানই বর্তমানে প্রায় একই নিয়ন্ত্রক পর্যায়ে রয়েছে। নিরাপত্তা যাচাই শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো স্পেকট্রাম বরাদ্দের জন্য পরবর্তী ধাপে যেতে পারবে।
এক বছরের বেশি সময় ধরে অপেক্ষায় স্টারলিংক
স্টারলিংক ভারতে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স পেয়েছে এক বছরেরও বেশি সময় আগে। কিন্তু এখনো দেশটিতে বাণিজ্যিক পরিষেবা চালুর চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি প্রতিষ্ঠানটি। এদিকে প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ভারতে সেবা চালুর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর বড় অংশ ইতোমধ্যে প্রস্তুত।
ইন্ডিয়া মোবাইল কংগ্রেস ২০২৬-এ স্পেসএক্সের স্টারলিংক বিজনেস অপারেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট লরেন ড্রেয়ার জানান, ভারতে ইতোমধ্যে ২০টি গেটওয়ে সাইট স্থাপন করা হয়েছে। এসব সাইটে রয়েছে শত শত অ্যান্টেনা। শুধু অবকাঠামো নয়, ভারতীয় নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণ করতে ব্যবহারকারীদের তথ্য দেশটির ভেতরেই সংরক্ষণের ব্যবস্থাও করেছে স্টারলিংক।
তাহলে আটকে আছে কোথায়?
স্টারলিংকের বাণিজ্যিক যাত্রা শুরুর পথে এখন মূল বাধা হিসেবে সামনে এসেছে নিরাপত্তা যাচাই ও স্পেকট্রাম বরাদ্দের প্রক্রিয়া। ভারত বলছে, প্রক্রিয়াটি সব লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই সমান। আর মাস্কের অভিযোগ—প্রভাবশালী ব্যবসায়িক স্বার্থ স্টারলিংকের প্রবেশে বাধা তৈরি করছে। এই দুই বিপরীত বক্তব্যের মধ্যেই ভারতের প্রায় দেড়শ কোটি মানুষের বিশাল বাজারে স্টারলিংকের প্রবেশ এখনো অনিশ্চিত।
সামনে বড় বাজার, তাই লড়াইটাও বড়
স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের বৈশ্বিক বাজারে ভারতকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে দেখা হয়। দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে দ্রুতগতির ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে স্টারলিংকের মতো স্যাটেলাইটভিত্তিক সেবার বড় সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ভারতের নিরাপত্তা, তথ্য সংরক্ষণ ও স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনা নিয়ে কঠোর অবস্থান স্টারলিংকের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে প্রশ্ন এখন একটাই—মাস্কের অভিযোগের পর কি দ্রুত মিলবে স্টারলিংকের চূড়ান্ত অনুমোদন, নাকি ভারতের কঠোর নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়ায় আরও দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হবে বিশ্বের অন্যতম আলোচিত স্যাটেলাইট ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠানটিকে?
কালের আলো/জেএন

আপনার মতামত লিখুন
Array