খুঁজুন
                               
, ,
           

যমুনায় মহাবিপন্ন বাঘাআইড় শিকার, প্রকাশ্যে চলছে বেচাকেনা

জামালপুর সংবাদদাতা
প্রকাশিত: রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৫০ পূর্বাহ্ণ
যমুনায় মহাবিপন্ন বাঘাআইড় শিকার, প্রকাশ্যে চলছে বেচাকেনা

জামালপুরের মাদারগঞ্জে যমুনা নদী থেকে মহাবিপন্ন বাঘাআইড় মাছ শিকার করে প্রকাশ্যে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। মাদারগঞ্জ ও বগুড়ার সারিয়াকান্দি এলাকার সীমানাসংলগ্ন যমুনা নদীর অববাহিকা থেকে নিয়মিত এসব মাছ ধরা হচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। সংরক্ষিত এই প্রজাতির মাছ শিকার ও বেচাকেনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিবেশকর্মীরা।

স্থানীয় সূত্র জানায়, মাদারগঞ্জ উপজেলার প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র বালিজুড়ি বাজারে প্রায় প্রতিদিনই বড় আকারের বাঘাআইড় মাছ বিক্রির জন্য আনা হচ্ছে। এসব মাছের ওজন সাধারণত ৩০ থেকে ১০০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। সম্প্রতি গত বৃহস্পতিবার বাজারটিতে ৪৪ কেজি ওজনের একটি বাঘাআইড়সহ বেশ কয়েকটি মাছ বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি মাছের দাম ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা বলে জানা গেছে।

বড়শি ও জালে শিকার

যমুনা নদীর অববাহিকায় মাছ শিকারে নিয়োজিত জেলেরা জানান, শীত মৌসুমে নদীতে বড় আকারের বাঘাআইড় মাছ বেশি ধরা পড়ে। ‘পাগলা বড়শি’ ও বিশেষ ধরনের জাল ব্যবহার করে এসব মাছ শিকার করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জেলে দাবি করেন, আইনগত নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে তাঁরা অবগত নন। স্থানীয় আড়তদাররা ভালো দাম দেওয়ায় তাঁরা বাঘাআইড় শিকারে আগ্রহী হন।

জেলেদের ভাষ্য, অতীতে যমুনা নদীতে ১০০ থেকে ২০০ কেজি ওজনের বাঘাআইড় মাছও ধরা পড়ত। সেসব মাছ গরুর গাড়িতে করে বাজারে নেওয়া হতো। বর্তমানে মাছের আকার আগের তুলনায় ছোট হলেও শীত মৌসুমে নিয়মিত বড় বাঘাআইড় ধরা পড়ছে।

শিকার ও বিক্রি নিষিদ্ধ

বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২-এর তফসিল-২ অনুযায়ী বাঘাআইড়কে সংরক্ষিত প্রজাতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। আইন অনুযায়ী, সংরক্ষিত এই প্রজাতির মাছ শিকার, কেনাবেচা, পরিবহন কিংবা নিজের হেফাজতে রাখা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আইন লঙ্ঘনের দায়ে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড অথবা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

জামালপুরের পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীবিষয়ক উন্নয়নকর্মী জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, “মহাবিপন্ন বাঘাআইড় শিকারের মধ্য দিয়ে আমাদের জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এটি প্রাকৃতিক ভারসাম্যের জন্য এক বড় হুমকি। এ ধরনের অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।”

বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা জানান, বাঘাআইড় বন্যপ্রাণী আইনে সংরক্ষিত একটি প্রজাতি। তাই এটি ধরা ও বিক্রি করা নিষিদ্ধ। অবৈধ কার্যক্রম বন্ধে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

এদিকে, এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মাদারগঞ্জ উপজেলার ভারপ্রাপ্ত মৎস্য কর্মকর্তা কামরুজ্জামানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি 

লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২১০ হেক্টর বেশি আমন আবাদ

নড়াইল সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:২১ পূর্বাহ্ণ
লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২১০ হেক্টর বেশি আমন আবাদ

অনুকূল আবহাওয়া, কৃষকদের আগ্রহ এবং সরকারের সময়োপযোগী কৃষি প্রণোদনায় চলতি মৌসুমে নড়াইলে রোপা আমন ধানের আবাদ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। জেলার তিন উপজেলায় এবার ৪৩ হাজার ৬৭৫ হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষ হয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২১০ হেক্টর বেশি। আবাদ বাড়ায় চলতি মৌসুমে জেলায় আমনের ভালো ফলনের প্রত্যাশা করছেন কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তারা। আবহাওয়া শেষ পর্যন্ত অনুকূলে থাকলে বাম্পার ফলন হতে পারে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।

লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে আবাদ
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে নড়াইলের তিন উপজেলায় মোট ৪৩ হাজার ৪৬৫ হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে মাঠপর্যায়ে কৃষি বিভাগের তদারকি, কৃষকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং অনুকূল পরিবেশের কারণে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে আবাদ হয়েছে।

কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এবারের আবাদি জমি থেকে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৯১ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে উৎপাদনের এ লক্ষ্য পূরণ হলে জেলার খাদ্যশস্য উৎপাদনে আমন গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

তিন উপজেলাতেই বেড়েছে আবাদ
উপজেলাভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, নড়াইল সদর উপজেলায় ২০ হাজার ১৪০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও আবাদ হয়েছে ২০ হাজার ১৬৩ হেক্টরে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৩ হেক্টর বেশি জমিতে চাষ করেছেন কৃষকরা।

লোহাগড়া উপজেলায় ১১ হাজার ২৬৫ হেক্টর জমিতে আবাদ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে চাষ হয়েছে ১১ হাজার ৪৫০ হেক্টরে। এ উপজেলায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৮৫ হেক্টর বেশি জমিতে আমন আবাদ হয়েছে। অন্যদিকে কালিয়া উপজেলায় ১২ হাজার ৬০ হেক্টর জমিতে চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও আবাদ হয়েছে ১২ হাজার ৬২ হেক্টরে। এ উপজেলায়ও লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে দুই হেক্টর বেশি জমিতে আমন চাষ হয়েছে।

কৃষি প্রণোদনায় বাড়ছে কৃষকের আগ্রহ
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নড়াইল জেলা কার্যালয়ের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নিপু মজুমদার জানান, জেলার তিন উপজেলাতেই কৃষকরা অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে রোপা আমন চাষে অংশ নিয়েছেন। তাঁদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ফলে নির্ধারিত আবাদ লক্ষ্যমাত্রা সফলভাবে অর্জিত হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মুহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে কৃষকদের বিনামূল্যে বিভিন্ন ধরনের কৃষি প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে প্রতিবছর রোপা আমন চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। তিনি আরও বলেন, খেত থেকে পাকা ধান কেটে ঘরে তোলা পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে নড়াইল জেলায় আমনের বাম্পার ফলন হবে বলে তাঁরা আশাবাদী। আবাদি জমির পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ায় নড়াইলের আমন মৌসুমে ইতিবাচক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন কৃষকদের প্রত্যাশা, শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকবে এবং ঘরে উঠবে কাঙ্ক্ষিত ফসল।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

উৎপাদন খরচ বাড়ছে, মুনাফা নিয়ে শঙ্কায় চাষিরা

ফরিদপুর সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:০৮ পূর্বাহ্ণ
উৎপাদন খরচ বাড়ছে, মুনাফা নিয়ে শঙ্কায় চাষিরা

শীত মৌসুমে দেশের পেঁয়াজের বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ফরিদপুর ও পাবনা অঞ্চলে উৎপাদিত মুড়িকাটা পেঁয়াজ। বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পর নতুন মৌসুমের আবাদ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। তবে মৌসুমের শুরুতেই সারের সংকট, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তাঁরা। বিশেষ করে ডিএপি সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় পেঁয়াজের উৎপাদন ও কাঙ্ক্ষিত মুনাফা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কৃষকদের আশঙ্কা, উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে খরচ বাড়লেও বাজারে পেঁয়াজের বিক্রিমূল্য সেই অনুপাতে না বাড়লে লোকসানের মুখে পড়তে পারেন তাঁরা। এতে আগামীতে পেঁয়াজের আবাদ ধরে রাখাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

সরকারি দামের চেয়ে বেশি দিয়েও মিলছে না সার
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ শুরু হওয়ায় জমি প্রস্তুত, সার প্রয়োগ, সেচ, রোপণ ও পরিচর্যার কাজে ব্যস্ততা বেড়েছে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় সার না পাওয়ায় অনেকটা বিপাকে পড়েছেন চাষিরা। বিশেষ করে ডিএপি সারের সংকট তাঁদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি নির্ধারিত দাম বস্তাপ্রতি এক হাজার ৫০ টাকা হলেও কোথাও কোথাও এক হাজার ৮০০ টাকা দিয়েও চাহিদামতো সার পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বাড়তি দাম দিয়েও প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের। সারের পাশাপাশি মুড়িকাটা পেঁয়াজের গুটি কিনতেও বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি মণ গুটি দুই হাজার ৮০০ থেকে তিন হাজার টাকা দরে কিনতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। এর সঙ্গে জমি প্রস্তুত, সেচ, রোপণ, শ্রমিকের মজুরি ও পরিচর্যার খরচ যোগ হয়ে উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়ছে।

বাড়তি বিনিয়োগে মুনাফা নিয়ে অনিশ্চয়তা
ফরিদপুর সদর উপজেলার অম্বিকাপুর মাঠে কথা হয় পেঁয়াজচাষি রহিম মোল্লা, আবুল কালাম ও জাকির শেখসহ কয়েকজনের সঙ্গে। তাঁরা জানান, পেঁয়াজ উৎপাদনের প্রায় সব উপকরণের দাম বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদিত পেঁয়াজের বিক্রিমূল্য সেই অনুপাতে বাড়বে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, বাড়তি টাকা বিনিয়োগ করে আবাদ করলেও প্রত্যাশিত মুনাফা পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। উৎপাদন কম হলে কিংবা মৌসুমে বাজারে পেঁয়াজের দাম পড়ে গেলে লোকসানের ঝুঁকি আরও বাড়বে। জেলার চর মাধবদীয়ার পেঁয়াজচাষি তুহিন মণ্ডল, আজমল ব্যাপারী ও হোসেন শেখও একই উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, উৎপাদন খরচ বিবেচনায় কৃষকের ন্যায্য বিক্রয়মূল্য নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে এ ফসলের আবাদ ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। তাঁরা মৌসুমের শুরুতেই ন্যায্যমূল্যে সার সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষি উপকরণের বাজার তদারকি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।

আবাদ ব্যাহত হলে বাজারেও প্রভাব পড়তে পারে
ফরিদপুর সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, মুড়িকাটা পেঁয়াজ দেশের শীতকালীন বাজারে সরবরাহ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফরিদপুর অঞ্চলের আগাম উৎপাদিত পেঁয়াজ বাজারের চাহিদা পূরণে সহায়তা করে। ফলে এ ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হলে বাজারের সরবরাহ ও দামের ওপরও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।ফরিদপুর কৃষক সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মানিক মজুমদার বলেন, চাষিরা সময়মতো সার, কীটনাশক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ না পেলে পেঁয়াজের উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। তাই কৃষকদের প্রয়োজনীয় উপকরণ সময়মতো সরবরাহ করা জরুরি।

৫ হাজার ৮৮৫ হেক্টর জমিতে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা
ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহাদুজ্জামান জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে পাঁচ হাজার ৮৮৫ হেক্টর। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উৎপাদনের উপকরণ সরবরাহ, চাষিদের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

ফরিদপুর সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সহসভাপতি অ্যাডভোকেট শিপ্রা গোস্বামী বলেন, কৃষি উৎপাদন বাড়াতে শুধু আবাদি জমির পরিমাণ বৃদ্ধি করলেই হবে না। সময়মতো সার ও জ্বালানি সরবরাহ এবং উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বাজারমূল্য নিশ্চিত করাও জরুরি।তিনি মনে করেন, বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ের চাপে কৃষকের মুনাফা কমে গেলে পেঁয়াজের উৎপাদন ও বাজারে সরবরাহ ধরে রাখা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

অচল টিউবওয়েল, নিরাপদ পানির সংকটে হাওড়ের মানুষ

সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ
অচল টিউবওয়েল, নিরাপদ পানির সংকটে হাওড়ের মানুষ

সুনামগঞ্জের দিরাই ও শাল্লা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় দেখা দিয়েছে নিরাপদ খাবার পানির তীব্র সংকট। পুরোনো টিউবওয়েলগুলো থেকে পানি না ওঠায় কয়েক হাজার পরিবার পড়েছে চরম দুর্ভোগে। কোথাও একটি সরকারি টিউবওয়েলের ওপর নির্ভরশীল ১৫টি পরিবার, আবার কোনো গ্রামে শত শত পরিবারের জন্য অচল হয়ে আছে একাধিক নলকূপ। পানির অভাবে রান্না, গোসলসহ দৈনন্দিন কাজও ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এ সংকট চললেও প্রয়োজনীয় গভীর নলকূপ স্থাপন এবং বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের কার্যকর ব্যবস্থা এখনো নিশ্চিত হয়নি। ফলে অনেক পরিবারকে দূরদূরান্ত থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় বাধ্য হয়ে পুকুরের দূষিত পানিও ব্যবহার করছেন বাসিন্দারা।

পানির স্তর নেমেছে ৪০-৪৫ ফুট গভীরে
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত পরিবর্তনের পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলনের কারণে হাওড়াঞ্চলে পানির স্থিতিশীল স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে। অনেক এলাকায় পানির স্তর ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ ফুট গভীরে চলে গেছে। ফলে প্রচলিত হ্যান্ডপাম্প দিয়ে আগের মতো পানি তোলা সম্ভব হচ্ছে না। দিরাই ও শাল্লা উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভায় শুষ্ক মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে মার্চ ও এপ্রিল মাসে প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার হ্যান্ডপাম্প থেকে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যায় না।

এক টিউবওয়েলের ওপর নির্ভর ১৫ পরিবার
দিরাই পৌরসভার পূর্ব চন্ডিপুর গ্রামের সাবিনা বেগম জানান, তাঁদের ১৫টি পরিবারের পানির একমাত্র ভরসা ছিল একটি সরকারি টিউবওয়েল। কিন্তু সেটিতে পানি না ওঠায় সবাইকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। শিশুদের গোসল করানোর জন্য দূরের এলাকায় যেতে হচ্ছে। এমনকি রান্নাবান্নার কাজেও পাশের পুকুরের পচা পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

শাল্লা উপজেলার বাসিন্দা সন্দীপন তালুকদার বলেন, তাঁদের গ্রামে প্রায় ৪০০ পরিবারের বসবাস। সেখানে ১৪টি টিউবওয়েল অচল হয়ে পড়েছে। খাবার পানি সংগ্রহ করতেই মানুষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। গোসলসহ দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোও কঠিন হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে চান্দপুর এলাকার বাসিন্দা গীর্ব্বান প্রসাদ রায় শংকু জানান, গ্রামের পুরোনো অধিকাংশ টিউবওয়েলেই পানি উঠছে না। নিরাপদ খাবার পানির জন্য নারীদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছুটতে হচ্ছে। গভীর নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক সময় ভিড়ও তৈরি হচ্ছে।

গভীর নলকূপ স্থাপনের দাবিতে নারীদের অবস্থান
পানির সংকট নিরসনে বৃহস্পতিবার চান্দপুর গ্রামের অন্তত ৪০ জন নারী উপজেলা পরিষদে অবস্থান নেন। তাঁরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে গভীর নলকূপ স্থাপনের দাবি জানান। নারীদের অভিযোগ, গ্রামের অন্তত ৫০টি পরিবার দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ খাবার পানির সংকটে রয়েছে। পুরোনো কোনো টিউবওয়েলেই পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাচ্ছে না। তাই দ্রুত গভীর নলকূপ স্থাপন করে পানির ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

ইউনিয়নভেদে অচল অধিকাংশ টিউবওয়েল
রফিনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শৈলেন চন্দ্র দাস জানান, তাঁর ইউনিয়নের প্রায় ৮০ শতাংশ টিউবওয়েল থেকে পানি উঠছে না। ইউনিয়নের ১১টি নতুন পাড়ায় একটি টিউবওয়েলও নেই। এতে এসব এলাকার বাসিন্দারা বিশুদ্ধ খাবার পানি সংগ্রহে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। তাঁর মতে, ইউনিয়নে দেড়শ গভীর নলকূপ স্থাপন করা গেলে নিরাপদ পানির চাহিদা পূরণে সহায়তা হবে। তাড়ল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলী আহমদও একই ধরনের সংকটের কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, ইউনিয়নের প্রায় ৯০ শতাংশ টিউবওয়েল বিকল হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ইউনিয়নে অন্তত ৫০০টি টিউবওয়েল প্রয়োজন।

দুই উপজেলায় প্রয়োজন সাত হাজার টিউবওয়েল
জনস্বাস্থ্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, দিরাই ও শাল্লা উপজেলার প্রায় ৭৫ হাজার পরিবার এবং চার লাখের বেশি মানুষের নিরাপদ পানির চাহিদা পূরণে অন্তত সাত হাজার টিউবওয়েল প্রয়োজন। তবে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় প্রচলিত হ্যান্ডপাম্পের পরিবর্তে বিকল্প প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী উজ্জ্বল খান বলেন, ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত পরিবর্তন এবং ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলনের কারণে তাঁদের আওতাধীন ৯টি ইউনিয়নে পানির স্থিতিশীল স্তর ক্রমাগত নিচে নামছে। অনেক এলাকায় পানির স্তর ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ ফুট গভীরে নেমে গেছে। তিনি জানান, এ পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকে প্রচলিত ৬ নম্বর হ্যান্ডপাম্পের পরিবর্তে সাবমারসিবল পাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে শুষ্ক মৌসুমে ১৩টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার হ্যান্ডপাম্প থেকে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাচ্ছে না।

পৌরসভায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ প্রকল্প ঝুলে আছে
দিরাই পৌরসভায়ও নিরাপদ পানির সংকট প্রকট। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পৌর এলাকায় অন্তত ৪০ হাজার মানুষের বসবাস। তবে পৌরসভাটি প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত না হওয়ায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কাছ থেকে স্যানিটেশনসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সনজিব সরকার জানান, পানি পরিশোধন করে সরবরাহের কাজের প্রস্তুতি চলছে। এর আগে সাবেক মেয়র প্রকল্পের জন্য ভূমি বরাদ্দ দিলেও কাজ বাস্তবায়িত হয়নি। পৌরসভায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ প্রকল্পের টেন্ডার হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। সব মিলিয়ে দিরাই ও শাল্লার হাওড়াঞ্চলে নিরাপদ খাবার পানির সংকট এখন জনজীবনের বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শুধু প্রকল্প গ্রহণ নয়, দ্রুত গভীর নলকূপ স্থাপন ও কার্যকর পানি সরবরাহব্যবস্থা চালু করতে হবে।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি