সিনেমা হলের সুদিন ফেরাতে উদ্যোগ তথ্য প্রতিমন্ত্রীর, ১ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব পর্যালোচনায়
দেশের চলচ্চিত্রশিল্পের বিকাশ, সিনেমা হলের আধুনিকায়ন এবং দর্শকদের আবার প্রেক্ষাগৃহমুখী করতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এমপি। এ লক্ষ্যে হল মালিকদের সমস্যা সমাধান, মানসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণ, ই-টিকেটিং ব্যবস্থা চালু এবং দেশীয় চলচ্চিত্রের আমদানি-রপ্তানির সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। সিনেমা হল বাঁচাতে আলোচনায় আসা ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার (১২ অক্টোবর) সকালে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, চলচ্চিত্রশিল্পের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্দেশনা দিয়েছেন। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। প্রযোজক, পরিচালক, শিল্পী সমিতিসহ চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় সিনেমা হল মালিকদের সমস্যাগুলো জানতে এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়েছে।
- আধুনিকায়ন, অর্থায়ন ও দর্শক বৃদ্ধিতে সমন্বিত পরিকল্পনা
- ভালো সিনেমা নির্মাণ, দক্ষ শিল্পী তৈরি ও ই-টিকেটিং চালুর ওপর গুরুত্ব
- চলচ্চিত্র রপ্তানির সম্ভাবনাও কাজে লাগাতে চায় সরকার
হল আধুনিকায়নে অর্থায়নের সম্ভাবনা
সিনেমা হলের আধুনিকায়ন ও টিকে থাকার ক্ষেত্রে অর্থায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পুরোনো হলগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন, দর্শকসুবিধা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে প্রেক্ষাগৃহকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার সুযোগ রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের বিষয়টি চলচ্চিত্র প্রদর্শন খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় পরিণত হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, হল মালিকদের উত্থাপিত কিছু দাবি বাস্তবায়নে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। কিছু বিষয় আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে আলোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সিনেমা হল বাঁচাতে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের যে বিষয়টি আলোচনায় এসেছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। এ অর্থ ছাড়ের বিষয়ে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত থাকলে তা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, সিনেমা হলের আধুনিকায়নে অর্থ ছাড়ের বিষয়টি নিয়ে অর্থমন্ত্রী ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। বরাদ্দের অর্থ শুধু সিনেপ্লেক্সের জন্য নয়, প্রচলিত সিনেমা হলগুলোর ক্ষেত্রেও কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রচলিত সিনেমা হলগুলোর আধুনিকায়নের সুযোগ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
বড় পর্দার আকর্ষণ ফিরিয়ে আনতে গুরুত্ব
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে প্রেক্ষাগৃহের স্বতন্ত্র অভিজ্ঞতা ও সম্ভাবনার ওপর গুরুত্ব উঠে এসেছে। আধুনিক পরিবেশ, উন্নত দর্শকসেবা এবং মানসম্মত চলচ্চিত্রের সমন্বয় ঘটানো গেলে দর্শকদের হলমুখী করার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর ফলে মোবাইল ফোন কিংবা হোম থিয়েটারের কারণে সিনেমা হল বিলুপ্ত হয়ে যাবে—এমন ধারণার সঙ্গে একমত নন ইয়াসের খান চৌধুরী। তিনি বলেছেন, সিনেমা হলে গিয়ে বড় পর্দায় সম্মিলিতভাবে চলচ্চিত্র উপভোগ করার অভিজ্ঞতা ঘরে বসে বা মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা থেকে আলাদা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও সিনেমা হল ও সিনেপ্লেক্স সফলভাবে চলছে। তাই বাংলাদেশের সিনেমা হলগুলো কেন টিকে থাকতে পারছে না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
দর্শক বাড়াতে মানসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণ
দেশীয় চলচ্চিত্রের দর্শকসংকট প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, অনেক সিনেমা হলে পর্যাপ্ত দর্শক পাওয়া যাচ্ছে না। কোনো কোনো সিঙ্গেল স্ক্রিনে বিপুল আসনসংখ্যার বিপরীতে দর্শকের উপস্থিতি অত্যন্ত কম। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে হল মালিক, প্রযোজক ও পরিচালকদের যৌথভাবে আলোচনা করে দর্শকের চাহিদা অনুযায়ী মানসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শনের উদ্যোগ নিতে হবে। ভালো চলচ্চিত্র নির্মিত হলে প্রযোজক, হল মালিক ও দর্শক—সব পক্ষই উপকৃত হবে।
তিনি আরও বলেন, সিনেমা হলের দর্শক বাড়াতে ভালো মানের চলচ্চিত্র নির্মাণের বিকল্প নেই। শুধু বিদেশি চলচ্চিত্র আমদানির ওপর নির্ভর না করে বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে চলচ্চিত্র আমদানি ও প্রদর্শনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিদেশি চলচ্চিত্র আমদানির অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার আন্তরিক থাকবে। তবে আমদানি ও রপ্তানির মাধ্যমে দেশের রাজস্ব আয় এবং জনগণের স্বার্থ কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, তা-ও বিবেচনায় নিতে হবে।
চলচ্চিত্র রপ্তানি ও দক্ষ শিল্পী তৈরিতে উদ্যোগ
দেশীয় চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও তুলে ধরেছেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের চলচ্চিত্র বিদেশে প্রদর্শন ও রপ্তানির মাধ্যমে রাজস্ব আয়ের সুযোগ রয়েছে কি না, তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে। এ ক্ষেত্রে রপ্তানি থেকে অর্জিত আয়ের কতটা বাংলাদেশের জনগণ ও অর্থনীতির উপকারে আসছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
চলচ্চিত্রে দক্ষ শিল্পী তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, অভিনেতা-অভিনেত্রী ও পরিচালকদের দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) মাধ্যমে ‘প্রতিভার সন্ধানে’ কর্মসূচি চালু করা হচ্ছে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে ভবিষ্যতেও প্রতিভাবান শিল্পী উঠে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ই-টিকেটিংয়ে বাড়বে স্বচ্ছতা
সিনেমা হলগুলোতে ই-টিকেটিং ব্যবস্থা চালুর ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে ইতোমধ্যে বিএফডিসিকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আধুনিক টিকেটিং ব্যবস্থা চালু হলে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর পাশাপাশি হল মালিকদের কার্যক্রমেও স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা আসতে পারে। এ ব্যবস্থা বাস্তবায়নে হল মালিকদেরও আন্তরিক হতে হবে।
লিখিত দাবি জমা দিতে আহ্বান
প্রতিমন্ত্রী চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির নেতৃবৃন্দকে তাঁদের দাবি-দাওয়াগুলো লিখিতভাবে মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার আহ্বান জানান। এসব দাবি পর্যালোচনা করে বাস্তবায়নযোগ্য উদ্যোগগুলো দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি। মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি আওলাদ হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শরফুদ্দীন এলাহী চৌধুরীসহ সংগঠনের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা দেশের সিনেমা হলগুলোর সংকট, আধুনিকায়ন, অর্থায়ন, চলচ্চিত্র আমদানি-রপ্তানি এবং দর্শক বাড়ানোর বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরেন।
চলচ্চিত্রশিল্পের উন্নয়নে সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থায়ন, মানসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং আধুনিক প্রদর্শনব্যবস্থার সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা ও বাস্তবায়নযোগ্য প্রস্তাবের ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে দেশের সিনেমা হলগুলোর উন্নয়ন এবং দর্শকদের প্রেক্ষাগৃহে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা আরও গতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কালের আলো/এএএন/এসআর

আপনার মতামত লিখুন
Array