নারীর ক্ষমতায়নে শুধু প্রশিক্ষণ নয়, পরিবারকেও যুক্ত করতে হবে: ববি হাজ্জাজ
নারীর টেকসই ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে শুধু প্রশিক্ষণ কিংবা কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি পরিবারকে সম্পৃক্ত করা, আত্মবিশ্বাস বাড়ানো, অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এবং সমাজের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
তিনি বলেছেন, বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া কিশোরী ও তরুণীদের দক্ষতা উন্নয়নের কর্মসূচি প্রণয়নের সময় দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে। গ্রামীণ ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর নারীদের এগিয়ে নিতে পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
সোমবার (১২ অক্টোবর) রাজধানীর বনানীর শেরাটন হোটেলে কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (কোইকা) ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত ‘হার স্কিলস, হার ফিউচার’ প্রকল্পের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
নারীর উন্নয়নে পরিবারকে সম্পৃক্ত করার তাগিদ
ববি হাজ্জাজ বলেন, বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় একজন নারীকে তার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। নারীর সক্ষমতা বিকাশ ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পথ সুগম করতে পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করা জরুরি।
তার মতে, নারীর জন্য প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। পরিবার সহযোগিতামূলক ভূমিকা পালন করলে নারীরা নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগানোর এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও আত্মবিশ্বাসী হতে পারবেন।
বিশেষ করে গ্রামীণ ও আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের মেয়েদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তাদের শিক্ষা, দক্ষতা অর্জন, কর্মজীবনে প্রবেশ ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক সিদ্ধান্ত ও সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত।
আত্মবিশ্বাস ও যোগাযোগদক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ
নারীর ক্ষমতায়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ব্যক্তিগত, শিক্ষাগত ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করে সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। একজন নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলার আগে তার আত্মবিশ্বাস, নিজের অধিকার সম্পর্কে ধারণা এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা গড়ে তোলাও প্রয়োজন।
তিনি বলেন, কর্মসংস্থান কিংবা উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে যোগাযোগদক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নিজের দক্ষতা, কাজ, পণ্য বা সেবার গুণাগুণ অন্যের কাছে কার্যকরভাবে তুলে ধরতে পারা একজন নারীর কর্মজীবনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ বাড়াতে পারে।
তাই নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে কারিগরি প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি, যোগাযোগদক্ষতা অর্জন এবং নিজেদের সক্ষমতা প্রকাশের সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে বদলাতে হবে পারিবারিক দৃষ্টিভঙ্গি
বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ প্রসঙ্গে ববি হাজ্জাজ বলেন, পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, সামাজিক চাপ ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা অনেক ক্ষেত্রে মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা তৈরি করে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় পরিবারগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের জন্য কাজ করতে হবে।
তার মতে, মেয়েদের শিক্ষা অব্যাহত রাখা, দক্ষতা অর্জনের সুযোগ বাড়ানো এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ তৈরি করা গেলে নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও বাড়বে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় আইনগত সুরক্ষা ও সচেতনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি জরুরি। কর্মসংস্থান ও আয়মূলক কার্যক্রমে নারীর অংশগ্রহণ পরিবার ও সমাজে তাদের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে।
এ কারণে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ও নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের সঙ্গে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের কর্মসূচিগুলো সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
ঝরে পড়া কিশোরীদের জন্য সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া কিশোরী ও তরুণীদের জন্য কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণের ওপরও গুরুত্ব দেন ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, এসব কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের নিজেদের সক্ষমতা বিকাশের সুযোগ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবার ও সমাজের সহযোগিতা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের উদ্যোগ সফল করতে সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
‘হার স্কিলস, হার ফিউচার’ প্রকল্পের সমাপনী অনুষ্ঠান
কোইকা ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত ‘হার স্কিলস, হার ফিউচার’ প্রকল্পের সমাপনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইউনিসেফ বাংলাদেশের চিফ অব এডুকেশন দীপা শঙ্কর।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ইউনিসেফ বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী প্রতিনিধি জিলিয়ান মেলসপ এবং কোইকা বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর জিহুন কিম। এ সময় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে নারীর দক্ষতা উন্নয়ন, শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া কিশোরী ও তরুণীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তাদের জন্য কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সুযোগ তৈরির সঙ্গে পারিবারিক ও সামাজিক সহযোগিতার গুরুত্ব উঠে আসে।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি





আপনার মতামত লিখুন
Array