কলকাতা থেকে জেলায়, দুর্গাপূজার মণ্ডপে এবার থিমের চমক
প্রতিবছরের মতো এবারও দুর্গাপূজার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠেছে থিমের বৈচিত্র্য। কোথাও বিশ্বের বিখ্যাত স্থাপত্যের প্রতিরূপ, কোথাও বাংলার সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতি, আবার কোথাও পরিবেশদূষণ, ক্ষুধা কিংবা শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রামের মতো সামাজিক বিষয়কে তুলে ধরা হয়েছে। সমসাময়িক রাজনৈতিক ঘটনাও জায়গা করে নিয়েছে মণ্ডপসজ্জায়। সব মিলিয়ে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি শিল্প, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সামাজিক সচেতনতার এক বর্ণিল মিলনমেলায় পরিণত হচ্ছে এবারের দুর্গোৎসব।
বিশ্বঐতিহ্যের স্বীকৃতিতে কলকাতার দুর্গাপূজার বাড়তি আকর্ষণ

দুর্গাপূজার জন্য কলকাতার খ্যাতি দীর্ঘদিনের। উৎসবের দিনগুলোতে শহরের অলিগলি থেকে প্রধান সড়ক—সবখানেই দেখা যায় দর্শনার্থীদের ঢল। বড় বাজেটের পূজা, শৈল্পিক মণ্ডপ, ব্যতিক্রমী প্রতিমা এবং চোখধাঁধানো আলোকসজ্জার কারণে কলকাতার দুর্গাপূজা শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, ভারতের অন্যান্য রাজ্য ও বিদেশের পর্যটকদের কাছেও বিশেষ আকর্ষণীয়।
২০২১ সালের ১৫ ডিসেম্বর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো কলকাতার দুর্গাপূজাকে ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’ বা মানবজাতির অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। এই স্বীকৃতি দুর্গাপূজার আন্তর্জাতিক পরিচিতি আরও বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে উৎসবটির সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শৈল্পিক গুরুত্বও বিশ্বপরিসরে নতুনভাবে আলোচনায় আসে।
কলকাতার দুর্গাপূজার বিশেষত্ব হলো, এখানে ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি শিল্প ও সৃজনশীলতার ব্যাপক প্রকাশ ঘটে। প্রতিটি মণ্ডপ যেন একেকটি আলাদা গল্প বলে। কোনো মণ্ডপে ফুটে ওঠে প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস, কোনোটি তুলে ধরে বাংলার গ্রামীণ জীবন, আবার কোনোটি সমসাময়িক সামাজিক সমস্যার প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
মহালয়ার জমকালো আয়োজন, উৎসবের আমেজে নতুন মাত্রা

এবারের দুর্গোৎসবের শুরুতেই বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করেছে মহালয়া উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠান। কলকাতার ইডেন গার্ডেনসে মহালয়ার দিন জমকালো আয়োজন করা হয়। ড্রোন শো, আতশবাজি, বর্ণিল আলোকসজ্জা, নাচ ও গানের পরিবেশনায় উৎসবের আবহ আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনাকে ঘিরে বাঙালির আবেগ ও প্রত্যাশা বরাবরই প্রবল। ভোরে মহিষাসুরমর্দিনী শোনার ঐতিহ্য থেকে শুরু করে প্রতিমা দর্শনের প্রস্তুতি—সবকিছু মিলিয়ে এই দিনটি দুর্গাপূজার আনন্দকে আরও গভীর করে তোলে। এবারের জমকালো আয়োজন সেই উৎসবের আবহকে আরও বিস্তৃত করেছে।
অন্যদিকে, আগের বছরগুলোতে বিসর্জনের পর কলকাতার রেড রোডে যে দুর্গা কার্নিভ্যাল আয়োজন করা হতো, এবার তা হচ্ছে না। ফলে উৎসবের জৌলুশ বাড়াতে মহালয়ার অনুষ্ঠানটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বড় আয়োজনের মধ্য দিয়ে পূজার আনন্দকে মানুষের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
হাওয়া মহল থেকে ভ্যাটিকান সিটি, মণ্ডপে বিশ্বস্থাপত্যের ছোঁয়া

এবার কলকাতার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে দেশ-বিদেশের বিখ্যাত স্থাপত্যের আদলে নকশা তৈরি করা হয়েছে। রাজস্থানের ঐতিহাসিক হাওয়া মহল, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির স্বামী নারায়ণ মন্দির, মিয়ানমারের ঐতিহ্যবাহী প্যাগোডা এবং ভ্যাটিকান সিটির স্থাপত্যশৈলীকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা আয়োজন। কোথাও উঠে এসেছে গুজরাটের সোমনাথ মন্দির, কোথাও আবার হরিদ্বারের ধর্মীয় পরিবেশকে মণ্ডপসজ্জায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
এসব মণ্ডপে দর্শনার্থীরা শুধু প্রতিমা দর্শনেই সীমাবদ্ধ থাকছেন না; বরং স্থাপত্যের নকশা, কারুকাজ, উপকরণের ব্যবহার এবং শিল্পীদের সৃজনশীলতার মধ্য দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। বাস্তব স্থাপত্যের আদল ফুটিয়ে তুলতে আয়োজকেরা মণ্ডপ নির্মাণে নকশা, রং, আলো ও বিভিন্ন উপকরণের সমন্বয় ঘটিয়েছেন।
বাগবাজার সর্বজনীনের পূজা এবার ১০৮তম বছরে পা দিয়েছে। ঐতিহ্যবাহী এই পূজার মণ্ডপ তৈরি করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির স্বামী নারায়ণ মন্দিরের আদলে। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ধরে রেখেও নতুন স্থাপত্যশৈলীকে উপস্থাপনের এই উদ্যোগ দর্শনার্থীদের বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করছে।
অন্যদিকে, উত্তর শহরতলির বিদ্রোহী স্পোর্টিং ক্লাবের মণ্ডপে তুলে ধরা হয়েছে ভ্যাটিকান সিটির আদল। নদীয়ার কল্যাণীর আইটিআই মোড়ের পূজায় দেখা যাবে মিয়ানমারের ঐতিহ্যবাহী প্যাগোডার অনুকরণে তৈরি মণ্ডপ। মালদহের বালুচর কল্যাণ সমিতির আয়োজনে নীল নদের তীর ও প্রাচীন মিসরের পিরামিডের আদলও দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে।
বন্দে মাতরম থেকে মহিষাসুরমর্দিনী, ঐতিহ্য ও ইতিহাসের নানা উপস্থাপনা

কলকাতার অন্যতম বড় পূজাগুলোর একটি সন্তোষ মিত্র স্কয়ার। এবার এই পূজার থিম ‘বন্দে মাতরম’। দেশাত্মবোধ ও ঐতিহাসিক আবহকে কেন্দ্র করে মণ্ডপ সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছেন আয়োজকেরা। অন্যদিকে, নাকতলা উদয়ন সংঘের থিম ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। দেবী দুর্গার পৌরাণিক মাহাত্ম্য ও অসুরবধের কাহিনিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে এই আয়োজন।
একডালিয়া এভারগ্রিনের মণ্ডপে গুজরাটের সোমনাথ মন্দিরের আদল তুলে ধরা হয়েছে। সল্টলেকের বিজে ব্লকেও সোমনাথ মন্দিরকে কেন্দ্র করে মণ্ডপসজ্জা করা হয়েছে। ফলে একই ঐতিহাসিক স্থাপত্যের অনুপ্রেরণা একাধিক পূজামণ্ডপে দেখা যাচ্ছে।
দমদম পার্ক ভারত চক্রের থিম বাংলার রথের ঐতিহ্য। বাংলার ধর্মীয় উৎসব, লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক রথযাত্রার স্মৃতিকে সামনে রেখে সাজানো হয়েছে এই আয়োজন। দমদম পার্ক সর্বজনীনে থাকছে পুতুলনাচের ব্যবস্থা, যা বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকবিনোদনের ধারাকে নতুন করে তুলে ধরবে।
বরাহনগরের নেতাজি কলোনির মণ্ডপে হরিদ্বারের আদল ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। অন্যদিকে, বেলেঘাটা ৩৩ পল্লির থিম ‘পোখরান-২’। ভারতের পারমাণবিক পরীক্ষার ইতিহাসকে কেন্দ্র করে এই থিম বেছে নেওয়া হয়েছে। এসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় উৎসবের মঞ্চে ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায় তুলে ধরার চেষ্টা করছেন আয়োজকেরা।
উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষে চলচ্চিত্রের স্মৃতি, ছড়ার বইয়ে শৈশবের আবহ

এ বছর বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষকে কেন্দ্র করে কলকাতার টালা পার্কের পূজামণ্ডপ সাজানো হয়েছে। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উত্তমকুমারের অবদান এবং দর্শকদের মনে তাঁর স্থায়ী জনপ্রিয়তাকে স্মরণ করার সুযোগ তৈরি করেছে এই থিম।
উত্তমকুমার শুধু একজন অভিনেতা ছিলেন না; বাংলা চলচ্চিত্রের একটি স্বর্ণালি অধ্যায়ের প্রতীক হিসেবেও তাঁকে বিবেচনা করা হয়। তাঁর অভিনয়, ব্যক্তিত্ব ও পর্দার উপস্থিতি কয়েক প্রজন্মের দর্শকের কাছে আজও সমানভাবে স্মরণীয়। জন্মশতবর্ষকে কেন্দ্র করে তাঁকে ঘিরে পূজামণ্ডপ সাজানোর উদ্যোগে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের আগ্রহ বাড়তে পারে।
এদিকে, হাতিবাগান নবীন পল্লির থিম শিশুতোষ ছড়ার বই ‘হাসিখুশি’। যোগীন্দ্রনাথ সরকারের লেখা এই বই বাংলা শিশুসাহিত্যের পরিচিত একটি নাম। ছড়া, শৈশবের স্মৃতি ও পরিচিত সাহিত্যিক আবহকে কেন্দ্র করে মণ্ডপ সাজানোর মধ্য দিয়ে বাংলার সাহিত্য ঐতিহ্যকে সামনে আনা হয়েছে।
এফডি ব্লকের থিম ‘নকশিকাঁথার মাঠ’। বাংলার লোকজ শিল্প, গ্রামীণ জীবন ও সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে কেন্দ্র করে এই আয়োজন। নকশিকাঁথার নকশা ও ঐতিহ্যবাহী শিল্পরীতির সঙ্গে বাংলার মানুষের জীবনযাত্রার সম্পর্ক রয়েছে দীর্ঘদিনের। সেই পরিচিত সাংস্কৃতিক উপাদানকে মণ্ডপের মাধ্যমে উপস্থাপনের উদ্যোগ দর্শনার্থীদের সামনে গ্রামীণ ঐতিহ্যের ভিন্ন একটি চিত্র তুলে ধরবে।
গঙ্গাদূষণ থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য, পরিবেশ রক্ষার বার্তা মণ্ডপে

এবারের দুর্গাপূজায় সামাজিক ও পরিবেশগত সমস্যা নিয়েও বিশেষভাবে ভাবছেন আয়োজকেরা। নলিন সরকার স্ট্রিটের থিম গঙ্গাদূষণ। কুমোরটুলি পার্কের থিম ‘ও গঙ্গা তুমি বইছ কেন?’—এই আয়োজনেও নদী ও পরিবেশের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
গঙ্গা নদী ভারতের কোটি মানুষের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু নদীদূষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা এবং মানুষের অসচেতনতা দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশের জন্য উদ্বেগের কারণ। পূজামণ্ডপে এই বিষয়গুলো তুলে ধরার মাধ্যমে দর্শনার্থীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।
একইভাবে, ৭১ পল্লিতে প্লাস্টিকের বোতল ও বস্তা ব্যবহার করে মণ্ডপ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্লাস্টিক বর্জ্যকে সৃজনশীল উপায়ে কাজে লাগানোর এই প্রচেষ্টা বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের ধারণাকে সামনে নিয়ে এসেছে। উৎসবের আয়োজনেও পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহারের গুরুত্ব যে বাড়ছে, এমন উদ্যোগ তারই ইঙ্গিত দেয়।
হিন্দুস্তান পার্কে দেশলাই কারখানার আদলে তৈরি হয়েছে মণ্ডপ। সাধারণত দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত একটি পরিচিত জিনিসকে কেন্দ্র করে এমন মণ্ডপ নির্মাণের উদ্যোগ দর্শনার্থীদের জন্য ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে, আদি বাবুবাগানের থিম ‘ক্ষুধা’। মানুষের মৌলিক চাহিদা, খাদ্যসংকট ও সামাজিক বৈষম্যের মতো বিষয়কে সামনে আনার চেষ্টা রয়েছে এই আয়োজনে।
কয়লাখনির শ্রমিকদের জীবন, শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম এবং সমাজের বিভিন্ন বাস্তবতাও উঠে এসেছে পশ্চিমবঙ্গের একাধিক মণ্ডপে। এসব থিম ধর্মীয় উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো নিয়ে ভাবার সুযোগ তৈরি করছে।
কলকাতার বাইরে জেলাগুলোতেও থিমের বৈচিত্র্য

দুর্গাপূজার থিমের প্রতিযোগিতা শুধু কলকাতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলাতেও পূজার আয়োজকেরা অভিনব মণ্ডপ নির্মাণে ব্যস্ত। স্থানীয় ঐতিহ্য, আন্তর্জাতিক স্থাপত্য, ধর্মীয় ইতিহাস এবং সামাজিক সমস্যাকে কেন্দ্র করে তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের আয়োজন।
পূর্ব মেদিনীপুরের হলদিয়ার চৈতন্যপুর সর্বজনীনের থিম ‘উড়ান’। নামের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলা, স্বপ্ন ও সম্ভাবনার ধারণা ফুটিয়ে তোলার সুযোগ রয়েছে এই আয়োজনে। পাশকুড়ার মৌচাক সেবা সংঘের মণ্ডপে প্রাচীন মিসরের দেবদেবী ও স্থাপত্যের অনুকরণ থাকছে। অন্যদিকে, দিঘার অলংকারপুর সর্বজনীনের থিম ‘পুরোনো সেই দিনের কথা’। অতীতের স্মৃতি ও হারিয়ে যাওয়া সময়ের আবহকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে এই আয়োজন।
উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জের দেশবন্ধু স্পোর্টিং ক্লাবের থিম ইন্ডিয়া গেট। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির পরিচিত ঐতিহাসিক স্থাপত্যকে কেন্দ্র করে এই মণ্ডপের পরিকল্পনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন জেলায় ধর্মীয় স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক নিদর্শনের অনুকরণে মণ্ডপ তৈরির প্রবণতা এবারের উৎসবকে আরও বৈচিত্র্যময় করেছে।
জলপাইগুড়ির মোহিতনগরের পূজায় উঠে এসেছে বৃদ্ধাশ্রমের বিষয়টি। প্রবীণ মানুষের জীবন, একাকিত্ব, পারিবারিক সম্পর্ক ও সামাজিক দায়িত্ববোধের মতো বিষয়কে সামনে আনার সুযোগ তৈরি করেছে এই থিম। অন্যদিকে, বিভিন্ন মণ্ডপে কুরুক্ষেত্র, রামায়ণ, পুরীর জগন্নাথদেবের রন্ধনশালা, বারানসির ঘাট এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
কোচবিহারের দিনহাটার বলরামপুর সর্বজনীনে হরিদ্বার থেকে আনা তিন কোটি রুদ্রাক্ষ দিয়ে মণ্ডপ তৈরির পরিকল্পনার কথাও উঠে এসেছে। এমন আয়োজন বাস্তবায়িত হলে তা দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে। ধর্মীয় উপকরণ, স্থাপত্য ও শিল্পের সমন্বয়ে মণ্ডপ সাজানোর এই উদ্যোগ উৎসবের বৈচিত্র্যকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
ঝাড়গ্রামে মোদির ঝালমুড়ি খাওয়ার দৃশ্য, মণ্ডপে সমসাময়িক রাজনীতি

এবারের দুর্গাপূজায় আলোচনায় এসেছে ঝাড়গ্রামের গিধনি স্পোর্টিং ক্লাবের মণ্ডপ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঝালমুড়ি খাওয়ার একটি আলোচিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে এই মণ্ডপের থিম। রাজনৈতিক ঘটনা, স্থানীয় স্মৃতি এবং বাংলার জনপ্রিয় খাবারকে একসঙ্গে উপস্থাপন করার কারণে আয়োজনটি আলাদা পরিচিতি পেয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে ঝাড়গ্রামে গিয়ে গত ১৯ এপ্রিল একটি দোকান থেকে ১০ টাকা দিয়ে ঠোঙায় ঝালমুড়ি কিনে খেয়েছিলেন মোদি। ঘটনাটি তখন রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনায় আসে। ঝালমুড়ি বিক্রি করেছিলেন দোকানমালিক বিক্রম কুমার সাউ। এবার সেই ঘটনাকে পূজার থিম হিসেবে বেছে নিয়েছে গিধনি স্পোর্টিং ক্লাব।
৮২ বছরে পা দেওয়া এই পূজামণ্ডপে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাকে স্থানীয় সংস্কৃতি ও লোকজ খাবারের সঙ্গে মিলিয়ে উপস্থাপন করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত খাবার ঝালমুড়ি বাংলার পথঘাট ও আড্ডার সংস্কৃতিরও অংশ। সেই খাবারকে কেন্দ্র করে একটি আলোচিত রাজনৈতিক মুহূর্তের পুনর্নির্মাণ মণ্ডপটিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।
এই আয়োজন দেখাচ্ছে, দুর্গাপূজার থিম এখন শুধু পুরাণ, ইতিহাস কিংবা স্থাপত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সমসাময়িক ঘটনা, জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব এবং স্থানীয় স্মৃতিকেও শিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরছেন আয়োজকেরা। ফলে কলকাতার বড় পূজাগুলোর পাশাপাশি ঝাড়গ্রামের এই আয়োজনও দর্শনার্থীদের আগ্রহের কেন্দ্রে চলে এসেছে।
আলোকসজ্জা, প্রতিমা ও শিল্পের সমন্বয়ে দর্শনার্থীদের আকর্ষণ

দুর্গাপূজায় থিমের পাশাপাশি প্রতিমার নির্মাণশৈলীও গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ। দেবী দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের প্রতিমায় বিভিন্ন শিল্পরীতি প্রয়োগ করা হয়। কোথাও ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের ধারা বজায় রাখা হয়েছে, কোথাও আবার আধুনিক নকশা ও সৃজনশীল উপস্থাপনার মাধ্যমে প্রতিমাকে আলাদা রূপ দেওয়া হয়েছে।
মণ্ডপের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিমা তৈরি, আলোকসজ্জার পরিকল্পনা এবং দর্শনার্থীদের চলাচলের ব্যবস্থা—সবকিছু মিলিয়ে একটি পূজার আয়োজনকে আকর্ষণীয় করে তুলতে হয়। বড় পূজাগুলোতে মাসের পর মাস ধরে চলে পরিকল্পনা ও নির্মাণকাজ। শিল্পী, কারিগর, আলোকসজ্জাকর্মী এবং আয়োজকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত পূজামণ্ডপগুলো দর্শনার্থীদের সামনে নতুন রূপে হাজির হয়।
মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে উৎসব শুরু হওয়ায় এবারও বিভিন্ন পূজামণ্ডপে মানুষের ভিড় বাড়বে বলে প্রত্যাশা করছেন আয়োজকেরা। বিশেষ করে যেসব মণ্ডপে বিশ্বখ্যাত স্থাপত্য, জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব কিংবা সামাজিক বার্তাকে থিম হিসেবে নেওয়া হয়েছে, সেগুলো দর্শনার্থীদের বাড়তি আগ্রহ তৈরি করতে পারে।
ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি সংস্কৃতি ও সামাজিক বার্তার মঞ্চ

দুর্গাপূজা বাঙালির কাছে শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের বিষয় নয়; এটি সামাজিক যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং সম্মিলিত আনন্দেরও উপলক্ষ। পূজাকে ঘিরে শিল্পী ও কারিগরদের কর্মসংস্থান তৈরি হয়, স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসে এবং পর্যটন খাতেও বাড়তি তৎপরতা দেখা যায়।
কলকাতার দুর্গাপূজা বিশেষভাবে পরিচিত তার সর্বজনীন চরিত্র ও সৃজনশীল মণ্ডপসজ্জার জন্য। বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষ উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেন। থিমের বৈচিত্র্য দর্শনার্থীদের সামনে নতুন নতুন বিষয় তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করে। ফলে পূজামণ্ডপ অনেক ক্ষেত্রে সাময়িক প্রদর্শনী বা সাংস্কৃতিক পরিসরের রূপও নেয়।
এবারের আয়োজনেও সেই প্রবণতা স্পষ্ট। কোথাও দেশাত্মবোধ ও ইতিহাস, কোথাও চলচ্চিত্র ও সাহিত্য, কোথাও পরিবেশ রক্ষা, আবার কোথাও ক্ষুধা, শ্রমজীবী মানুষের জীবন কিংবা প্রবীণদের বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। দেশ-বিদেশের স্থাপত্যের অনুকরণে তৈরি মণ্ডপগুলোও দর্শনার্থীদের সামনে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে পরিচিত করার সুযোগ তৈরি করছে।
সব মিলিয়ে কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের এবারের দুর্গাপূজায় ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটেছে। হাওয়া মহল, সোমনাথ মন্দির, ভ্যাটিকান সিটি কিংবা মিয়ানমারের প্যাগোডার আদলে তৈরি মণ্ডপ যেমন আন্তর্জাতিক স্থাপত্যের বৈচিত্র্য তুলে ধরছে, তেমনি গঙ্গাদূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য, ক্ষুধা ও বৃদ্ধাশ্রমের মতো বিষয় সামাজিক সচেতনতার বার্তা দিচ্ছে। আর ঝাড়গ্রামের ঝালমুড়ির থিম দেখাচ্ছে, সমসাময়িক ঘটনাও কীভাবে উৎসবের শিল্পিত উপস্থাপনার অংশ হয়ে উঠতে পারে।
দেবীর বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই উৎসবে তাই প্রতিমা দর্শনের পাশাপাশি মণ্ডপের গল্প, শিল্পীদের সৃজনশীলতা এবং সামাজিক বার্তাও হয়ে উঠছে বাড়তি আকর্ষণ। কলকাতা থেকে পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যন্ত জেলা—সবখানেই থিমের বৈচিত্র্য আর উৎসবের আবহ মিলিয়ে দুর্গাপূজা আবারও রূপ নিচ্ছে এক বর্ণিল সাংস্কৃতিক আয়োজনে।
কালের আলো/এএন/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array