পেনশন, আবাসন ও যুদ্ধ নিয়ে উত্তাল ইউরোপ
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, পেনশন অধিকার, আবাসন সংকট, দুর্নীতি ও যুদ্ধবিরোধী অবস্থানকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্স, আলবেনিয়া, ইতালি, স্পেন ও পর্তুগালে নানা দাবিতে রাজপথে নেমেছেন হাজারো মানুষ। কোথাও সরকারের পদত্যাগ ও নীতির পরিবর্তনের দাবি উঠেছে, কোথাও সামাজিক অধিকার রক্ষায় সরব হয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। কয়েকটি দেশে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।
ক্রমবর্ধমান বিক্ষোভ ও আগের সহিংসতার ঘটনার পর ইউরোপের বিভিন্ন শহরে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে কর্তৃপক্ষ। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন ও জনসমাগমস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কিছু এলাকায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক অধিকার এবং সরকারের নীতির বিরুদ্ধে জমে থাকা অসন্তোষকে সামনে নিয়ে এসেছে।
ফ্রান্সে বিক্ষোভ ঘিরে সংঘর্ষ গ্রেপ্তার কয়েক হাজার
ফ্রান্সের কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। দেশটিতে বিক্ষোভের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর প্রায় এক হাজার সদস্য আহত হয়েছেন। শুধু রাজধানী প্যারিসেই আহত হয়েছেন প্রায় ১০০ বিক্ষোভকারী ও স্থানীয় বাসিন্দা।
বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিরাপত্তা বাহিনী বিভিন্ন এলাকায় তৎপরতা বাড়িয়েছে। সহিংসতার আশঙ্কায় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও জনবহুল এলাকায় নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে। ফ্রান্সের পরিস্থিতি ইউরোপের অন্যান্য দেশের বিক্ষোভের সঙ্গে মিলিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন দেশের আন্দোলনের কারণ এক না হলেও জীবনযাত্রার ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ অনেক ক্ষেত্রেই বিক্ষোভের পেছনে ভূমিকা রাখছে।
আলবেনিয়ায় সরকারবিরোধী আন্দোলনে উত্তেজনা
আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় শনিবার (২৪ অক্টোবর) সরকারবিরোধী বিক্ষোভে হাজারো মানুষ অংশ নেন। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। দেশটিতে অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় থেকে ধারাবাহিক বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।
এই আন্দোলনের মধ্যে সরকারি ভবনে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। পাশাপাশি কয়েক ডজন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষে ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। সরকারবিরোধী আন্দোলনকে ঘিরে তিরানায় উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। বিক্ষোভের কারণে সরকারি স্থাপনার নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আন্দোলনকারীদের দাবির পাশাপাশি সংঘর্ষে আহতদের সংখ্যা ও গ্রেপ্তারের ঘটনাও পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরছে।
ইতালিতে যুদ্ধ ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদ
ইতালির মিলান, রোম, তুরিন, নেপলস, বোলোনিয়া ও ফ্লোরেন্সসহ বিভিন্ন শহরে হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। যুদ্ধের বিরোধিতা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদ ছিল আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিক্ষোভ চলাকালে কিছু অংশগ্রহণকারী বোতল, পাথর ও আতশবাজি নিক্ষেপ করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইতালির পুলিশ জানিয়েছে, শনিবার (২৪ অক্টোবর) দেশটির আটটি শহরে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ থেকে নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এ ছাড়া ৩৭১ জনকে সাময়িকভাবে আটক করা হয়। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ১১০ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। ইতালিতে এই বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে যুদ্ধের প্রভাব, অর্থনৈতিক চাপ এবং সরকারি নীতির বিরুদ্ধে মানুষের অসন্তোষ সামনে এসেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচ, আবাসন এবং অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। এসব চাপকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দেশে প্রতিবাদ জোরালো হচ্ছে। তবে বিক্ষোভের মধ্যে সহিংসতার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একদিকে আন্দোলনকারীরা তাঁদের দাবি জানাচ্ছেন, অন্যদিকে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিরাপত্তা বাহিনীকে তৎপর থাকতে হচ্ছে।
স্পেনে পেনশন অধিকার রক্ষায় রাজপথে অবসরভোগীরা
স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে পেনশনভোগী ও তাঁদের সমর্থকেরা অবসরকালীন অধিকার রক্ষার দাবিতে মিছিল করেছেন। তাঁদের প্রধান দাবি, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পেনশনের পরিমাণ বাড়াতে হবে, যাতে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে গিয়ে আর্থিক সংকটে না পড়েন। বিক্ষোভকারীরা ন্যূনতম পেনশন ন্যূনতম মজুরির সমান করার দাবিও জানিয়েছেন। পাশাপাশি নারী ও পুরুষের পেনশনের মধ্যে বৈষম্য কমানো এবং সরকারি পেনশনব্যবস্থা বেসরকারীকরণের উদ্যোগ প্রতিহত করার দাবি তুলেছেন তাঁরা।
পেনশনভোগীদের মতে, মূল্যস্ফীতির কারণে খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় বেড়ে গেলে নির্দিষ্ট আয়ের ওপর নির্ভরশীল অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েন। তাই পেনশন বাড়ানোর পাশাপাশি অবসরকালীন সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। মাদ্রিদের এই কর্মসূচি ইউরোপের বয়স্ক জনগোষ্ঠীর আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক অধিকার নিয়ে চলমান বিতর্ককে সামনে এনেছে। পেনশনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ এবং সরকারি সহায়তার পরিমাণ নিয়ে বিভিন্ন দেশে যে উদ্বেগ রয়েছে, স্পেনের আন্দোলন তারই একটি উদাহরণ।
পর্তুগালে সাশ্রয়ী আবাসনের দাবিতে বিক্ষোভ
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে সাশ্রয়ী আবাসনের দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন সাধারণ মানুষ। বাড়ি ও ফ্ল্যাটের উচ্চমূল্য এবং আবাসনসংকটের কারণে অনেকের পক্ষে উপযুক্ত বাসস্থান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে আবাসনব্যবস্থায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা।
আবাসনসংকট ইউরোপের বিভিন্ন শহরে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বাড়িভাড়া ও সম্পত্তির মূল্য বৃদ্ধি পেলে বিশেষ করে তরুণ, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবার এবং নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। ফলে সাশ্রয়ী বাসস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা নিয়ে সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে।
লিসবনের বিক্ষোভে সেই অসন্তোষই প্রকাশ পেয়েছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, আবাসনকে শুধু বাজারের পণ্য হিসেবে বিবেচনা না করে মানুষের মৌলিক প্রয়োজন হিসেবে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাসস্থানের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
ইউরোপজুড়ে বিক্ষোভে সামনে আসছে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট
ফ্রান্স থেকে আলবেনিয়া, ইতালি, স্পেন ও পর্তুগাল—দেশভেদে বিক্ষোভের কারণ ও দাবির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কোথাও সরকারবিরোধী আন্দোলন, কোথাও যুদ্ধের প্রতিবাদ, আবার কোথাও পেনশন ও আবাসনসংকটকে কেন্দ্র করে মানুষ প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। তবে এসব আন্দোলনের মধ্যে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সামাজিক অধিকার এবং সরকারি নীতির প্রতি অসন্তোষের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিক্ষোভের সঙ্গে সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার ও আহত হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের দাবিগুলো কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, সেটিও সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে একই সময়ে এ ধরনের বিক্ষোভের ঘটনা জনজীবনের ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে মানুষের উদ্বেগের প্রতিফলন। এসব আন্দোলনের পর পরিস্থিতি কোন দিকে এগোয় এবং সংশ্লিষ্ট সরকারগুলো দাবির বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়, তা এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়। সূত্র: ইউরোনিউজ, এপি
কালের আলো/এসএ/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]