‘তোমার বয়সী সবাই চাকরি করছে, তুমি এখনো কী করছ?’ কিংবা ‘অমুকের বিয়ে হয়ে গেছে, তোমার কবে?’—পরিবারের অনুষ্ঠান, আত্মীয়ের বাড়ি কিংবা পরিচিতজনের আড্ডায় এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় অনেককে। প্রশ্নগুলো কখনো কৌতূহল থেকে করা হলেও বারবার একই ধরনের মন্তব্য শুনতে শুনতে অনেকের মধ্যে তৈরি হয় অস্বস্তি, হতাশা ও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি।
সমস্যা আরও বাড়ে যখন নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত অন্য কারও সাফল্য বা অর্জনের সঙ্গে তুলনা করা হয়। কে আগে চাকরি পেলেন, কার বিয়ে হলো, কে কত আয় করছেন—এসব দিয়ে একজন মানুষের জীবনের সাফল্য বিচার করা যায় না। কারণ প্রত্যেকের পরিস্থিতি, সুযোগ, সামর্থ্য ও লক্ষ্য আলাদা।
তাই অন্যের সঙ্গে তুলনা করে কথা শুনলে মন খারাপ না করে পরিস্থিতি সামলানোর কৌশল জানা জরুরি। নিজের মানসিক শান্তি বজায় রাখা, ভদ্রভাবে জবাব দেওয়া এবং ব্যক্তিগত বিষয়ে সীমারেখা তৈরি করার মাধ্যমে এমন পরিস্থিতি অনেকটাই সামলানো সম্ভব।
অন্যের সঙ্গে নিজের জীবন মেলাবেন না
কেউ আপনার আগে চাকরি পেয়েছেন, বিয়ে করেছেন কিংবা আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন—এ কারণে আপনি পিছিয়ে পড়েছেন, এমন নয়। জীবনের প্রতিটি ধাপ সবার জন্য একই সময়ে আসে না। কারও পড়াশোনা শেষ করতে সময় লাগে, কেউ পরিবারের দায়িত্ব সামলান, আবার কেউ নিজের পছন্দ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে চান।
অন্যের অর্জনকে নিজের ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে নিজের অগ্রগতির দিকে মনোযোগ দিন। আপনি কোথায় ছিলেন, এখন কোথায় আছেন এবং সামনে কী করতে চান—এসব বিবেচনা করুন। অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার বদলে নিজের লক্ষ্য অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে না
বিয়ে, চাকরি, আয় কিংবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কেউ প্রশ্ন করলেই বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ব্যক্তিগত বিষয়ে কতটুকু জানাবেন, তা আপনার সিদ্ধান্ত।
কেউ অস্বস্তিকর প্রশ্ন করলে শান্তভাবে বলতে পারেন, ‘সময় হলে জানাব’, ‘নিজের মতো করে চেষ্টা করছি’ কিংবা ‘এটা নিয়ে আপাতত কথা বলতে চাই না।’ সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়েও ভদ্রভাবে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করা যায়।
মনে রাখবেন, নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনা না করতে চাওয়া মানেই কাউকে অসম্মান করা নয়।
রাগের মাথায় পাল্টা জবাব নয়
একই ধরনের কথা বারবার শুনলে বিরক্তি বা রাগ হওয়া স্বাভাবিক। বিশেষ করে কাছের মানুষ যখন অন্যের সঙ্গে তুলনা করেন, তখন কষ্ট আরও বেশি হতে পারে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে পাল্টা অপমান করে কথা বললে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে জবাব দেওয়ার আগে কিছুক্ষণ থামুন। ধীরে শ্বাস নিন, নিজেকে শান্ত করুন এবং প্রয়োজন হলে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করুন। আবেগ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলে নিজের বক্তব্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরা সহজ হয়।
অন্যের মন্তব্য আপনার জীবনের মূল্য নির্ধারণ করে না—এই বিষয়টি মনে রাখাও জরুরি।
ভদ্রভাবে নিজের অবস্থান বুঝিয়ে বলুন
কেউ বারবার অন্যের সঙ্গে তুলনা করলে চুপ করে সব সহ্য করা কিংবা ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়াই একমাত্র পথ নয়। শান্তভাবে নিজের অবস্থান জানানো যেতে পারে।
যেমন বলতে পারেন, ‘সবার পরিস্থিতি এক রকম নয়। প্রত্যেকে নিজের মতো করে এগিয়ে যায়।’ আবার বলা যায়, ‘ওর জন্য ভালো হয়েছে, আমিও নিজের লক্ষ্য অনুযায়ী চেষ্টা করছি।’
এ ধরনের উত্তর অন্যের সাফল্যকে ছোট না করেই নিজের অবস্থান তুলে ধরতে সাহায্য করে। এতে অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে না জড়িয়েও কথোপকথন সামলানো যায়।
লোকের কথা শুনে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেবেন না
সামাজিক চাপের কারণে অনেকেই বিয়ে, চাকরি কিংবা ক্যারিয়ার নিয়ে নিজের প্রস্তুতি ও পছন্দের বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ভাবেন। শুধু মানুষের প্রশ্ন বা সমালোচনা বন্ধ করতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
বিয়ের ক্ষেত্রে নিজের ইচ্ছা, মানসিক প্রস্তুতি ও উপযুক্ত পরিস্থিতি বিবেচনা করা প্রয়োজন। চাকরি বা ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রেও অন্যের সঙ্গে তুলনা করে হতাশ হওয়ার পরিবর্তে নিজের দক্ষতা বাড়ানো এবং বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণে মনোযোগ দেওয়া উচিত।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন—এটি কি সত্যিই আমার চাওয়া, নাকি অন্যের প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা? এই প্রশ্নের উত্তর নিজের প্রয়োজন বুঝতে সাহায্য করতে পারে।
বারবার খোঁচা দিলে সীমারেখা তৈরি করুন
কেউ আপনার অস্বস্তি বোঝার পরও একই বিষয়ে বারবার প্রশ্ন করলে স্পষ্টভাবে জানানো প্রয়োজন যে বিষয়টি আপনার ভালো লাগছে না।
বলতে পারেন, ‘আপনারা আমার ভালো চান, সেটা বুঝি। কিন্তু এই বিষয়টি নিয়ে বারবার কথা হলে আমি অস্বস্তি বোধ করি। সময় হলে নিজেই জানাব।’
নিজের সীমারেখা নির্ধারণ করা অভদ্রতা নয়। বরং সম্মান বজায় রেখে ব্যক্তিগত বিষয়ে অযাচিত আলোচনা কমানোর একটি উপায়। তবে সবাই আপনার বক্তব্য বুঝবেন বা মেনে নেবেন, এমন প্রত্যাশা না রাখাই ভালো।
নিজের যোগ্যতা অন্যের মন্তব্য দিয়ে বিচার করবেন না
কারও ভালো চাকরি হয়েছে কিংবা কারও বিয়ে হয়ে গেছে বলে তিনি আপনার চেয়ে বেশি সফল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কারণ নেই। জীবনের সাফল্য শুধু বিয়ে, চাকরি কিংবা আয় দিয়ে মাপা যায় না।
আপনি কী শিখছেন, নিজের দায়িত্ব কতটা পালন করছেন, নতুন কী দক্ষতা অর্জন করছেন এবং নিজের জীবনে কী পরিবর্তন আনছেন—এসবও গুরুত্বপূর্ণ। অন্যের মন্তব্যকে নিজের যোগ্যতার চূড়ান্ত বিচার হিসেবে না দেখে বাস্তবতার আলোকে মূল্যায়ন করুন।
নিজের ছোট ছোট অগ্রগতিও স্বীকার করুন। এতে আত্মবিশ্বাস ধরে রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যে মনোযোগ দেওয়া সহজ হতে পারে।
প্রয়োজন হলে কথোপকথন থেকে সরে আসুন
সবাই আপনার পরিস্থিতি বুঝবেন, এমন নয়। শান্তভাবে বোঝানোর পরও কেউ যদি একই বিষয়ে খোঁচা দিতে থাকেন, তাহলে বারবার নিজেকে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই।
প্রয়োজনে অন্য প্রসঙ্গে কথা বলুন, অন্য কারও সঙ্গে সময় কাটান কিংবা সেখান থেকে কিছুক্ষণের জন্য সরে আসুন। কোনো আলোচনা যদি বারবার মানসিক অস্বস্তি তৈরি করে, তাহলে সেই আলোচনা থেকে দূরত্ব বজায় রাখাও যুক্তিসংগত।
এ ধরনের পরিস্থিতি নিয়মিত মানসিক চাপ, হতাশা কিংবা আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি তৈরি করলে বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে কথা বলতে পারেন। প্রয়োজন হলে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়াও উপকারী হতে পারে।
নিজের জীবন নিজের গতিতে এগিয়ে নিন
অন্যের সঙ্গে তুলনা করে কথা শুনলে মন খারাপ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে নিজের প্রয়োজন, পছন্দ ও সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করার দরকার নেই।
নিজেকে সামলানো মানে সব কথা মেনে নেওয়া কিংবা চুপ করে থাকা নয়। বরং আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে নিজের অবস্থান বোঝানো, প্রয়োজনমতো সীমারেখা তৈরি করা এবং নিজের লক্ষ্য অনুযায়ী এগিয়ে চলাই গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষের মন্তব্য সব সময় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু সেই মন্তব্যের জবাবে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবেন এবং নিজের সিদ্ধান্ত কীভাবে নেবেন, তা অনেকটাই আপনার হাতে। অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবন মেলানোর বদলে নিজের পথকে গুরুত্ব দিন—কারণ আপনার জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আপনারই।
কালের আলো/এএএন/জেএন
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]