তারুণ্য ধরে রাখতে খাদ্যতালিকায় রাখুন ৫ ধরনের খাবার
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বকে বলিরেখা, শুষ্কতা ও ঢিলেভাব দেখা দেওয়া স্বাভাবিক। তবে সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত যত্নের মাধ্যমে ত্বকের সুস্থতা ধরে রাখা এবং বয়সের ছাপ পড়ার প্রক্রিয়া কিছুটা ধীর করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে দামি প্রসাধনীর পাশাপাশি প্রতিদিনের খাবারেও নজর দেওয়া জরুরি। পুষ্টিবিদ ও গবেষকদের মতে, রঙিন ফলমূল, শাকসবজি, বাদাম, স্বাস্থ্যকর চর্বি এবং গাঁজন করা খাবার ত্বকের স্বাভাবিক গঠন ও আর্দ্রতা বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে।
ত্বক শুধু সৌন্দর্যের অংশ নয়, এটি শরীরের গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষাবর্মও। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বকে কোলাজেন ও ইলাস্টিনের মতো প্রোটিনের গঠন ও পরিমাণে পরিবর্তন আসে। ফলে ত্বক আগের মতো টানটান থাকে না, দেখা দেয় সূক্ষ্ম রেখা ও বলিরেখা। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি, বায়ুদূষণ, ধূমপান ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও ত্বকের অকাল বার্ধক্যের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে খাদ্যতালিকায় কিছু পুষ্টিকর উপাদান রাখলে ত্বককে সুস্থ রাখতে সহায়তা পাওয়া যায়।
রঙিন ফল ও সবজিতে মিলবে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট
গাজর, টমেটো, মিষ্টি কুমড়া, ক্যাপসিকাম ও বিভিন্ন রঙের শাকসবজিতে রয়েছে ক্যারোটিনয়েডসহ নানা উপকারী উদ্ভিজ্জ উপাদান। এগুলোর কিছু অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে এবং শরীরের কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।
গাজর ও মিষ্টি কুমড়ায় থাকা বিটা-ক্যারোটিন শরীরে ভিটামিন এ তৈরিতে সহায়তা করে। এই ভিটামিন ত্বকের স্বাভাবিক গঠন ও কোষের কার্যক্রম বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে টমেটোর লাইকোপিন নিয়েও ত্বকের সুরক্ষায় সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে গবেষণা হয়েছে।
এসব খাবারের সঙ্গে অল্প পরিমাণ স্বাস্থ্যকর তেল খেলে চর্বিতে দ্রবণীয় ক্যারোটিনয়েড শোষণে সুবিধা হতে পারে। তবে খাবার খাওয়ার মাধ্যমে সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে পর্যাপ্ত সুরক্ষা পাওয়া যায় না। বাইরে যাওয়ার সময় সানস্ক্রিন ব্যবহার ও অন্যান্য সূর্য-সুরক্ষার অভ্যাসও জরুরি।
আম ও লেবুজাতীয় ফলে উপকার
আম, কমলা, মাল্টা, পেয়ারা ও লেবুর মতো ফল ত্বকের যত্নে সহায়ক পুষ্টি জোগায়। আমে রয়েছে ক্যারোটিনয়েড, আর লেবুজাতীয় ফলসহ পেয়ারা ও অন্যান্য ফলে পাওয়া যায় ভিটামিন সি।
কোলাজেন তৈরিতে ভিটামিন সি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই প্রোটিন ত্বকের গঠন ও দৃঢ়তা বজায় রাখতে সাহায্য করে। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ ফল রাখা ভালো।
আম নিয়ে কিছু গবেষণায় নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে ফলটি খাওয়ার সঙ্গে ত্বকের বলিরেখার পরিবর্তনের সম্পর্ক দেখা হয়েছে। তবে এ ধরনের সীমিত গবেষণা থেকে সবার ক্ষেত্রে একই ফল পাওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। আম পুষ্টিকর হলেও অতিরিক্ত খাওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং বৈচিত্র্যময় ফল খাওয়া এবং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের ভারসাম্য বজায় রাখাই গুরুত্বপূর্ণ।
ত্বকের আর্দ্রতায় বাদাম ও স্বাস্থ্যকর চর্বি
ত্বককে স্বাভাবিক ও কোমল রাখতে খাদ্যতালিকায় স্বাস্থ্যকর চর্বি থাকা প্রয়োজন। কাঠবাদাম, চিনাবাদাম, পেস্তাবাদাম ও বিভিন্ন ধরনের বীজে ভিটামিন ই, অসম্পৃক্ত চর্বি এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়।
ভিটামিন ই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। অন্যদিকে স্বাস্থ্যকর চর্বি শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও ত্বকের সুরক্ষাব্যবস্থা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে। কিছু গবেষণায় বাদাম খাওয়ার সঙ্গে ত্বকের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের ইতিবাচক সম্পর্ক দেখা গেলেও, শুধু বাদাম খেলেই বলিরেখা দূর হবে—এমন সিদ্ধান্তের যথেষ্ট ভিত্তি নেই।
সামুদ্রিক তৈলাক্ত মাছ, যেমন স্যামন, সার্ডিন ও ম্যাকারেলে রয়েছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড। এই পুষ্টি উপাদান শরীরের স্বাভাবিক প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। যাঁরা মাছ খান না, তাঁরা খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টির প্রয়োজন অনুযায়ী উদ্ভিজ্জ উৎস, যেমন তিসি বা চিয়া বীজ রাখতে পারেন।
অন্ত্রের সুস্থতার সঙ্গে ত্বকের সম্পর্ক
শরীরের অন্ত্র ও ত্বকের মধ্যে জটিল সম্পর্ক রয়েছে, যাকে গবেষণায় ‘গাট-স্কিন অ্যাক্সিস’ বলা হয়। অন্ত্রের জীবাণুসমষ্টি, রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ও প্রদাহের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে ত্বকের স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা চলছে।
শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণশস্য ও বাদামের মতো আঁশসমৃদ্ধ খাবার অন্ত্রের উপকারী জীবাণুর জন্য সহায়ক। টক দইয়ের মতো কিছু গাঁজন করা খাবারেও জীবিত উপকারী অণুজীব থাকতে পারে।
তবে অন্ত্র সুস্থ রাখলেই সোরিয়াসিস বা অ্যালার্জির মতো রোগ প্রতিরোধ করা যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। এসব রোগের পেছনে বংশগত বৈশিষ্ট্য, পরিবেশ ও রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাসহ নানা বিষয় কাজ করে। তাই ত্বকে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
পানি পান ও সুষম খাদ্যাভ্যাসও জরুরি
ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা বজায় রাখতে পর্যাপ্ত পানি পান গুরুত্বপূর্ণ। শরীরে পানির ঘাটতি হলে ত্বক শুষ্ক দেখাতে পারে। তবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি পান করলেই বলিরেখা দূর হবে, এমন প্রমাণ নেই।
পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা, ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং দীর্ঘ সময় সরাসরি রোদে থাকা থেকে বিরত থাকা ত্বকের সুস্থতা ধরে রাখতে সহায়ক। বাইরে যাওয়ার সময় ত্বকের ধরন ও পরিবেশ অনুযায়ী সানস্ক্রিন ব্যবহার করাও গুরুত্বপূর্ণ।
তারুণ্য ধরে রাখতে বাস্তবসম্মত যত্ন
খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন পুরোপুরি থামানো সম্ভব নয়। তবে পুষ্টিকর ও ভারসাম্যপূর্ণ খাবার শরীরের পাশাপাশি ত্বকের স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। প্রতিদিনের খাবারে রঙিন সবজি, পরিমিত ফল, বাদাম, স্বাস্থ্যকর চর্বি এবং পর্যাপ্ত প্রোটিন রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে।
মনে রাখতে হবে, কোনো একটি খাবার বা পানীয় তারুণ্য ধরে রাখার জাদুকরি উপায় নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদে সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ত্বকের যত্ন এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই ত্বককে সুস্থ ও সতেজ রাখতে সবচেয়ে কার্যকর ভিত্তি তৈরি করে।
কালের আলো/এসএ/জেএন




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]