খুঁজুন
                               
, ,
           

বসতে চেয়েছিলেন অসুস্থ শিক্ষক, কেউ এগিয়ে আসেননি—মেট্রোরেলে মানবিকতার পরীক্ষা

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:১৫ অপরাহ্ণ
বসতে চেয়েছিলেন অসুস্থ শিক্ষক, কেউ এগিয়ে আসেননি—মেট্রোরেলে মানবিকতার পরীক্ষা

ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছিল ৬৪ বছর বয়সী শিক্ষক ড. নজীবুর রহমানের। অসুস্থ বোধ করায় সহযাত্রীদের কাছে বসার জায়গা চেয়েছিলেন তিনি। পরিবারের অভিযোগ, কেউ তাঁকে আসন ছেড়ে দেননি। এর এক থেকে দুই মিনিটের মধ্যে মেট্রোরেলের মেঝেতে পড়ে যান তিনি। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

চার দিন আগে ঘটে যাওয়া এই মৃত্যু এখন শুধু একটি পরিবারের শোকের ঘটনা নয়; গণপরিবহনে মানুষের মানবিকতা, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ এবং জরুরি মুহূর্তে সহায়তার প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। প্রবীণ ও অসুস্থ যাত্রীর জন্য নির্ধারিত অগ্রাধিকার আসন কতটা নিয়ম মেনে ব্যবহার করা হচ্ছে, আর কেউ বিপদে পড়লে সহযাত্রীরা কতটা এগিয়ে আসছেন—ড. নজীবুরের মৃত্যুর পর সেই প্রশ্নগুলো নতুন করে সামনে এসেছে।

  • ড. নজীবুর রহমানের মৃত্যুর পর অগ্রাধিকার আসনের ব্যবহার ও সহযাত্রীদের দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন 
  • জরুরি চিকিৎসা ও সহমর্মিতা বাড়ানোর তাগিদ

তাঁর ছেলে নাকিবুর রহমানের ভাষায়, বসার সুযোগ পেলে তাঁর বাবা অন্তত কিছুটা স্বস্তি পেতেন। তবে আসন না পাওয়াই তাঁর মৃত্যুর কারণ, এমন দাবি করেননি তিনি। এই আক্ষেপের মধ্যেই রয়েছে ঘটনাটির মানবিক তাৎপর্য—কোনো মানুষের অসুস্থতা চোখে পড়লে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব কি কেবল নির্ধারিত নিয়মের, নাকি নাগরিক বিবেকেরও?

কয়েক মিনিটেই বদলে গেল সব
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নজীবুর রহমান ঘটনার দিন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়েছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে বিকেল তিনটার দিকে শাহবাগ মেট্রোস্টেশন থেকে উত্তরা যাওয়ার জন্য ট্রেনে ওঠেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক, তাঁর সহকর্মী। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রেনে আসন না পেয়ে দুজনই দাঁড়িয়ে যাত্রা শুরু করেন। ভিড়ের মধ্যে ধাক্কাধাক্কিতে তাঁরা একে অপরের কাছ থেকে কিছুটা দূরে সরে যান।

বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে ট্রেনটি শেওড়াপাড়া এলাকায় পৌঁছালে ড. নজীবুর অসুস্থ বোধ করতে শুরু করেন। তাঁর ছেলে নাকিবুরের অভিযোগ, এ সময় বাবা আশপাশের যাত্রীদের কাছে কয়েকবার বসার জায়গা চান। কিন্তু কেউ তাঁকে আসন ছেড়ে দেননি। কিছুক্ষণ পর তিনি মেঝেতে পড়ে গেলে আশপাশের যাত্রীরা তাঁকে ধরে তোলার চেষ্টা করেন। হৈচৈ শুনে তাঁর সহকর্মীও সেখানে পৌঁছান। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পেরে তাঁকে সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে তাঁকে উত্তরার উত্তর স্টেশনে নেওয়া হয়।

নাকিবুরের ভাষ্য অনুযায়ী, আনসার সদস্যদের সহায়তায় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ যোগাযোগ করা হয়। পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নেওয়া হয়। বিকেল পাঁচটার দিকে চিকিৎসকেরা জানান, তিনি আর বেঁচে নেই। ড. নজীবুরের উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস ছিল বলে জানিয়েছেন তাঁর ছেলে। তবে তাঁর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট চিকিৎসাগত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

‘বাবাকে বসতে দিলে অন্তত একটু স্বস্তি পেতেন’
বাবার মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নাকিবুর রহমান আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘আমি বলছি না বাবাকে বসতে দিলে তিনি মারা যেতেন না। তবুও কেউ যদি আমার বাবাকে বসার সুযোগ দিতেন, তিনি একটু হলেও স্বস্তি পেতেন। হয়তো এভাবে নিচে পড়ে যেতেন না।’ নাকিবুর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য। পাশাপাশি তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। তাঁর বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—তিনি কাউকে সরাসরি দায়ী করতে চান না; বরং অসুস্থ একজন মানুষের অনুরোধে সাড়া দেওয়ার মতো মানবিক আচরণের গুরুত্ব তুলে ধরতে চান।

তিনি বলেন, ‘বাবার মৃত্যুর ঘটনায় কাউকে দোষারোপ করছি না। সেখানে যাত্রীরা তাঁকে ধরে তোলার চেষ্টা করেছেন। আনসার সদস্যরাও সহযোগিতা করেছেন।’ তবে অসুস্থ হওয়ার আগেই কেউ পাশে দাঁড়ালে তাঁর বাবা কিছুটা স্বস্তি পেতে পারতেন—এমনটাই মনে করেন তিনি।

নাকিবুরের মতে, গণপরিবহন সবার জন্য। সেখানে প্রবীণ, শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও অসুস্থ মানুষও চলাচল করেন। সব সময় কাউকে আসন ছেড়ে দিতেই হবে, বিষয়টি এমন নয়; কিন্তু কারও শারীরিক কষ্ট চোখে পড়লে তাঁর প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

পরিবারের কাছে খবর পৌঁছাতেও ছিল জটিলতা
ড. নজীবুরের স্ত্রী ও ছোট ছেলে তখন ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরবে ছিলেন। তাঁর ফোন লকড থাকায় সেটি থেকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি বলে জানান নাকিবুর। বাবার সহকর্মীদের কাছ থেকে খবর পেয়ে তিনি হাসপাতালে পৌঁছান। পরিবারের সদস্যদের অনুপস্থিতিতে শেষকৃত্যের আয়োজনও করতে হয়। উত্তরার ৫ নম্বর সেক্টরের আইইএস মসজিদ প্রাঙ্গণে এশার নামাজের পর তাঁর জানাজা হয়। পরে গৌরনদী উপজেলায় তাঁকে দাফন করা হয়। তাঁর অপর দুই সন্তান নিউজিল্যান্ডে থাকেন।

অগ্রাধিকার আসন আছে, প্রয়োগে ঘাটতি কোথায়?
মেট্রোরেলের প্রতিটি বগিতে অগ্রাধিকার আসনের ওপর স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। প্রবীণ নাগরিক, গর্ভবতী নারী, শিশুসহ অভিভাবক এবং শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আসন ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে সেখানে। কিন্তু নির্দেশনা থাকলেই যে তার যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে, বাস্তব চিত্রে সব সময় তা দেখা যায় না।

এমআরটি-৬ লাইনের কয়েকটি স্টেশনে যাত্রীদের চলাচল পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, অগ্রাধিকার আসনে প্রবীণদের পাশাপাশি তরুণ ও মধ্যবয়সী পুরুষেরাও বসে আছেন। কোনো স্টেশনে প্রবীণ যাত্রী উঠলে কেউ কেউ আসন ছেড়ে দেন, আবার কেউ বসেই থাকেন।

কয়েকজন যাত্রীর ভাষ্য, মতিঝিল থেকে উত্তরা যাওয়ার পথে ভিড় বাড়তে থাকায় আসন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কেউ কেউ দীর্ঘ পথ দাঁড়িয়ে যাওয়ার পরিবর্তে আসন খালি হওয়ার অপেক্ষা করেন। তবে অগ্রাধিকার আসন ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নির্দেশনা অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

শাহবাগ স্টেশনে এক প্রবীণ যাত্রীকে দেখে নিজের আসন ছেড়ে দেন শিক্ষার্থী মেহেদি হাসান। তাঁর মতে, তরুণদের জন্য কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যতটা সহজ, প্রবীণদের জন্য তা ততটা নয়। মেহেদি বলেন, ‘মেট্রোতে আমাদের যেতে সময় লাগে কয়েক মিনিট। এই সময় দাঁড়িয়ে থাকলে আমাদের কিছু হবে না। কিন্তু প্রবীণদের দাঁড়িয়ে যেতে কষ্ট হয়। এমনিতেই ঠেলাঠেলিতে তারা অসুস্থ হয়ে যেতে পারেন।’

ফার্মগেট থেকে মতিঝিল যাওয়ার পথে কথা হয় ৬৮ বছর বয়সী শাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে। তাঁর অভিজ্ঞতা, অনেক সময় কম বয়সী যাত্রীরা তাঁকে বসার সুযোগ করে দেন। তবে সব সময় আসন পাওয়া যায় না। তাঁর মতে, গণপরিবহনে প্রবীণদের অগ্রাধিকার দেওয়ার শিক্ষা পরিবার থেকেই শুরু হওয়া উচিত।

স্টেশনে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা কতটা জরুরি?
মেট্রোরেলে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ যাতায়াত করেন। এই বিপুল যাত্রীসমাগমের মধ্যে কেউ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত কীভাবে সহায়তা দেওয়া হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান জানান, মেট্রোরেলে যাতায়াতের সময় তিনি কখনো খালি আসন পাননি। তাঁর পর্যবেক্ষণ, অনেক ক্ষেত্রে কম বয়সী যাত্রীরা আসনে বসে থাকেন, যা প্রবীণ ও অসুস্থ যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়াতে পারে।

তিনি মনে করেন, অগ্রাধিকার আসন ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি গণপরিবহনে জরুরি সহায়তার ব্যবস্থাও জোরদার করা প্রয়োজন। এ জন্য স্কুল-কলেজ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে প্রচারের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

সাইদুর রহমান বলেন, ‘প্রতিটি স্টেশনে নির্ধারিত একটি প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখা উচিত। যাতে কেউ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রাথমিক চিকিৎসা পেতে পারেন।’ প্রবীণ ও অসুস্থ যাত্রীর জন্য আসন নিশ্চিত করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত পরিস্থিতি বুঝে কর্মীদের জানানো, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা ডেকে দেওয়া এবং তাঁকে নিরাপদে সহায়তা করাও জরুরি। এ ক্ষেত্রে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের জরুরি সাড়াদানের প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মানবিকতা কি শুধু নিয়ম মেনে চলার বিষয়?
গণমাধ্যমকর্মী নাজমুস সাকিব রহমানের মতে, ড. নজীবুরের মৃত্যুর ঘটনা মানুষের সাধারণ বিবেচনাবোধের ঘাটতি নিয়ে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। তিনি বলেন, ‘ড. নজীবুরের মৃত্যুর ঘটনা আমাদের কাণ্ডজ্ঞান বা কমনসেন্সের সংকট সামনে নিয়ে এসেছে। আমরা অনেক সময় নিয়মকানুন জানি, কিন্তু কখন কোথায় মানবিক আচরণ করতে হবে, সেই বোধটুকু হারিয়ে ফেলি।’ তাঁর বক্তব্য, গণপরিবহনে সহানুভূতি দেখানো কেবল ভালো আচরণ নয়, পারস্পরিক দায়িত্ববোধেরও অংশ। তিনি আরও বলেন, ‘গণপরিবহনে সহানুভূতি পারস্পরিক দায়িত্ববোধের অংশ। আজ একজন অন্যের সহযোগিতা চাইছেন, কাল সেই পরিস্থিতিতে আমরাও পড়তে পারি। তাই পরিস্থিতি বুঝে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পাশে দাঁড়ানো সবচেয়ে জরুরি।’

যে প্রশ্নগুলো থেকে যায়
ড. নজীবুর রহমানের মৃত্যুর সঙ্গে অগ্রাধিকার আসন না পাওয়ার অভিযোগ সামনে এলেও আসন পেলে তাঁর মৃত্যু ঠেকানো যেত কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট চিকিৎসাগত কারণও এখানে নিশ্চিত নয়। তাই ঘটনাটিকে কোনো একক যাত্রী বা একটি আচরণের ফল হিসেবে চিহ্নিত করার পরিবর্তে, অসুস্থ যাত্রীর প্রতি সহায়তার সুযোগ এবং জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। এই ঘটনা অন্তত তিনটি বিষয়ে নতুন করে মনোযোগ দাবি করে।

প্রথমত, অগ্রাধিকার আসনের নির্দেশনা শুধু বগিতে লিখে রাখলেই হবে না; যাত্রীদের তা মানতে উৎসাহিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, মেট্রোরেল স্টেশন ও ট্রেনে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা সম্পর্কে যাত্রীদের স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার। তৃতীয়ত, প্রবীণ, অসুস্থ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের প্রতি সহমর্মিতা তৈরিতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণপরিবহন কর্তৃপক্ষকে ভূমিকা রাখতে হবে।

ড. নজীবুরের ছেলে নাকিবুর রহমান নিজেই বলেছেন, তিনি কাউকে দোষারোপ করতে চান না। তাঁর এই অবস্থান শোকের মধ্যেও একটি বৃহত্তর সামাজিক বার্তা দেয়—মানুষের চলাচলকে নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করতে নিয়মের পাশাপাশি মানবিক আচরণও অপরিহার্য। একটি আসন হয়তো জীবন বাঁচানোর নিশ্চয়তা নয়। কিন্তু অসুস্থ মানুষের কষ্ট বুঝতে পারা, তাঁর পাশে দাঁড়ানো এবং দ্রুত সহায়তার ব্যবস্থা করা আমাদের নাগরিক দায়িত্ব। ড. নজীবুর রহমানের মৃত্যু তাই শুধু অগ্রাধিকার আসনের ব্যবহার নয়, গণপরিবহনে আমরা একে অন্যের প্রতি কতটা দায়িত্বশীল—সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।

কালের আলো/এমএসএএকে/এমকে

একসঙ্গে রাতের খাবার খেয়ে আলাদা হন তাহসিফ-দ্বীপ

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:২০ অপরাহ্ণ
একসঙ্গে রাতের খাবার খেয়ে আলাদা হন তাহসিফ-দ্বীপ

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সৌরির নিখোঁজ হওয়ার আগের রাতের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে নতুন তথ্য জানিয়েছেন তার পরিচিত আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দ্বীপ। তার দাবি, গত ২৭ অক্টোবর তাহসিফের সঙ্গে মোটরসাইকেল মেরামত থেকে শুরু করে রাতের খাবার খাওয়া পর্যন্ত একসঙ্গেই ছিলেন তিনি। পরে উত্তরার হাউস বিল্ডিং এলাকায় দুজন আলাদা হয়ে যান। এরপর তাহসিফকে ফোন করলেও তার মোবাইল বন্ধ পান দ্বীপ।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) মোবাইল ফোনে বাংলা ট্রিবিউনকে এসব তথ্য জানান দ্বীপ। তিনি দাবি করেন, তাহসিফের সঙ্গে তার প্রায় ছয় বছরের পরিচয়। তাহসিফ তার কাছে কাছের বড় ভাইয়ের মতো ছিলেন।

মোটরসাইকেল মেরামত করতে একসঙ্গে বের হন
দ্বীপের ভাষ্য অনুযায়ী, তাহসিফের মোটরসাইকেলটি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল এবং সেটি চালু হচ্ছিল না। এ বিষয়ে পরামর্শ চাইলে তিনি তাহসিফের বাসায় যান। সেখানে দুজনে প্রায় ১০ থেকে ২০ মিনিট চেষ্টা করে মোটরসাইকেলটি চালু করেন। পরে মোটরসাইকেলটি একটি ওয়ার্কশপে নিয়ে প্রয়োজনীয় মেরামত করানো হয় এবং তেল পরিবর্তন করা হয়। কাজ শেষে তাহসিফ তাকে রাতের খাবারের আমন্ত্রণ জানান।

রুআপ শপিং কমপ্লেক্সের রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার
দ্বীপ জানান, উত্তরার রুআপ শপিং কমপ্লেক্সের ‘কুকরুক্কু’ রেস্তোরাঁয় দুজনে একসঙ্গে রাতের খাবার খান। খাওয়ার সময় তাহসিফের আচরণে অস্বাভাবিক কিছু তার চোখে পড়েনি বলেও দাবি করেন তিনি। দ্বীপের ভাষ্য, রাতের খাবারের সময় তাহসিফের এক বন্ধু ফোন করেছিলেন বলে তার মনে আছে। তবে সেই সময় কথাবার্তা স্বাভাবিক ছিল বলে জানান তিনি।

হাউস বিল্ডিং এলাকায় আলাদা হন দুজন
রাতের খাবার শেষে দুজন আলাদা মোটরসাইকেলে করে রওনা দেন। দ্বীপের দাবি, উত্তরার হাউস বিল্ডিং এলাকায় এসে তিনি ইউটার্ন নিয়ে একদিকে চলে যান, আর তাহসিফ অন্যদিকে চলে যান। রাত ১২টার দিকে তাদের বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা জানান তিনি। তাহসিফ কোথায় যাবেন, তা তাকে স্পষ্ট করে বলেননি বলে দাবি দ্বীপের। তার ভাষ্য, তাহসিফ বয়সে বড় হওয়ায় তিনি সাধারণত কোথায় যাচ্ছেন, তা সরাসরি জিজ্ঞাসা করতেন না।

ফোন বন্ধ পেয়ে প্রথমে অন্য ধারণা করেছিলেন
দ্বীপ জানান, বাসায় পৌঁছে তাহসিফকে ফোন করে নিজের পৌঁছানোর খবর দিতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তখন তাহসিফের মোবাইল ফোন বন্ধ পান। রেস্তোরাঁয় তাহসিফ তার পাওয়ার ব্যাংক দিয়ে ফোন চার্জ দিচ্ছিলেন। তাই চার্জ শেষ হয়ে ফোন বন্ধ হয়ে গেছে বলে ধারণা করেছিলেন দ্বীপ। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আবার ফোন করলেও একই অবস্থা দেখতে পান বলে জানান তিনি। তাহসিফের সঙ্গে শেষ দেখা হওয়ার সময় কোনো অস্বাভাবিক আচরণ চোখে পড়েনি বলেও দাবি করেন দ্বীপ।

নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় কাউকে সন্দেহ করছেন না দ্বীপ
তাহসিফের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় কাউকে সন্দেহ করেন কি না, জানতে চাইলে দ্বীপ বলেন, এখন পর্যন্ত কাউকে সন্দেহ করার মতো অবকাশ তার নেই। তার দাবি, তাহসিফের সঙ্গে কথাবার্তা স্বাভাবিক ছিল এবং পরিচয়ের পর থেকে এমন কোনো কথোপকথন হয়নি, যা থেকে কোনো দুর্ঘটনার আশঙ্কা করা যেত। দ্বীপ বলেন, ‘বাকি ১০ জন যেমন রহস্যের মধ্যে আছে, আমিও একদম একই রহস্যের মধ্যে আছি।’ তাহসিফের পরিবারের পক্ষ থেকে দ্বীপ তাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন বলে যে কথা বলা হয়েছে, সে প্রসঙ্গে দ্বীপ জানান, মোটরসাইকেল মেরামতের বিষয়েই মূলত তাদের দেখা হয়েছিল। পরে তারা একসঙ্গে রাতের খাবার খান।

নিরাপত্তাকর্মী সরবরাহের ব্যবসায়ও সম্পর্ক ছিল
দ্বীপ জানান, তাহসিফের সঙ্গে নিরাপত্তাকর্মী সরবরাহের ব্যবসা নিয়েও তার সম্পর্ক ছিল। এ ব্যবসাকে কেন্দ্র করে পরিচিতদের মধ্যে ব্যক্তিগত মনোমালিন্য থাকতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে বিষয়টি তেমন বড় কিছু ছিল না বলে দাবি তার। তাহসিফের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও তার পরিচয় ছিল বলে জানান দ্বীপ। তার ভাষ্য, তাহসিফ মাঝেমধ্যে তাকে বলতেন, তিনি না থাকলে যেন তার ছোট ভাইকে দেখে রাখেন। তবে কেন তাহসিফ এমন কথা বলতেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে চাননি দ্বীপ।

ভাইরাল ভিডিও নিয়ে তাহসিফের সঙ্গে আলোচনা হয়নি
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগ নিয়ে তাহসিফের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে দ্বীপ বলেন, তিনি বিষয়টি সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন। এ নিয়ে তাহসিফের সঙ্গে তার কোনো আলোচনা হয়নি।

দ্বীপ আরও জানান, সম্প্রতি তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক শেষ করেছেন। তাহসিফের মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে মর্গ থেকে নেওয়ার সময় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এরপর পরিবারের উদ্বেগের কথা বিবেচনা করে আর বাইরে বের হননি বলে জানান তিনি। তাহসিফের নিখোঁজ হওয়ার আগের রাতের ঘটনাগুলো নিয়ে দ্বীপের বক্তব্য সামনে এলেও, তার নিখোঁজ হওয়ার পেছনে কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে এই বক্তব্য থেকে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

সাদমানের শতক, তাইজুলের ঘূর্ণিতে চাপে ক্যারিবীয়রা

ক্রীড়া প্রতিবেদক,কালের আলো
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:০৬ অপরাহ্ণ
সাদমানের শতক, তাইজুলের ঘূর্ণিতে চাপে ক্যারিবীয়রা

মিরপুর টেস্টের দ্বিতীয় দিনটি ব্যাট হাতে সাদমান ইসলাম এবং বল হাতে তাইজুল ইসলামের নৈপুণ্যে নিজেদের করে নিয়েছে বাংলাদেশ। সাদমানের দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে প্রথম ইনিংসে ২৭২ রান সংগ্রহের পর তাইজুলের জোড়া আঘাতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে চাপে ফেলেছে স্বাগতিকরা। দিন শেষে ৪ উইকেট হারিয়ে ১৩৪ রান তুলেছে ক্যারিবীয়রা। ফলে হাতে ৬ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের চেয়ে এখনো ১৩৮ রানে পিছিয়ে রয়েছে সফরকারীরা।

সাদমানের ব্যাটে বাংলাদেশের ২৭২ রান
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় দিনের খেলা শুরু হয় বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের বাকি অংশ নিয়ে। দিনের শুরুতে স্বাগতিকদের ইনিংস থামে ২৭২ রানে। দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ১০৫ রান করেন ওপেনার সাদমান ইসলাম।

২৩৪ বলের ধৈর্যশীল ইনিংসে ১১টি চার মারেন সাদমান। টেস্টে তার ব্যাটিং দৃঢ়তা বাংলাদেশের সংগ্রহকে সম্মানজনক অবস্থানে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া তাওহীদ হৃদয় ৪২, মুমিনুল হক ২৮ এবং লিটন দাস অপরাজিত ৩৪ রান করেন। তবে শেষ দিকে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারানোয় বড় সংগ্রহের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারেনি বাংলাদেশ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে বাঁহাতি স্পিনার জোমেল ওয়ারিকান ছিলেন সবচেয়ে সফল বোলার। ৫৩ রান খরচায় ৫ উইকেট নেন তিনি। শামার জোসেফ ও জশুয়া বিশপ দুটি করে এবং জেডেন সিলস একটি উইকেট শিকার করেন।

শুরুতে ভালো খেলেও চাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজ
২৭৩ রানের লক্ষ্য সামনে রেখে ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুটা মন্দ করেনি ওয়েস্ট ইন্ডিজ। দুই ওপেনার জন ক্যাম্পবেল ও ব্র্যান্ডন কিং প্রথম উইকেটে যোগ করেন ২৯ রান। তবে ১৫ রান করা কিংকে ফিরিয়ে জুটি ভাঙেন বাংলাদেশের পেসার হাসান মাহমুদ। এরপর তেজনারায়ণ চন্দরপালকে সঙ্গে নিয়ে ইনিংস এগিয়ে নিতে থাকেন ক্যাম্পবেল। দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে ফিফটি তুলে নেন এই ক্যারিবীয় ওপেনার। কিন্তু তার সেই ইনিংস বেশি দূর এগোতে দেননি মেহেদী হাসান মিরাজ। ৭৬ বলে ৬টি চার ও ২টি ছক্কায় ৫৪ রান করে সাজঘরে ফেরেন ক্যাম্পবেল। তার বিদায়ে ম্যাচে ফেরার সুযোগ পায় বাংলাদেশ।

তাইজুলের জোড়া আঘাতে বিপাকে ক্যারিবীয়রা
ক্যাম্পবেলের বিদায়ের পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটিংয়ে চাপ আরও বাড়িয়ে দেন বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম। দলীয় ৯৭ রানে ৭ রান করা কাভেম হজকে ফিরিয়ে দেন তিনি। এরপর দলীয় স্কোরে আর কোনো রান যোগ হওয়ার আগেই আমির জাঙ্গুকে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলেন এই স্পিনার। কোনো রান না করেই মাঠ ছাড়েন জাঙ্গু। মাত্র ৮ রানের ব্যবধানে দুই উইকেট হারিয়ে বিপাকে পড়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। বাংলাদেশের স্পিন আক্রমণের সামনে দ্রুত উইকেট হারানোয় স্বাগতিকদের প্রথম ইনিংসের রান টপকানোর পথও কঠিন হয়ে পড়ে সফরকারীদের জন্য।

আলোকস্বল্পতায় আগেভাগে দিনের খেলা শেষ
তাইজুলের জোড়া আঘাতের পর তেজনারায়ণ চন্দরপাল ও জাস্টিন গ্রেভস মিলে দলকে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। দিনের বাকি সময়ে আর উইকেট না হারিয়ে ইনিংস এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন তারা। শেষ পর্যন্ত আলোকস্বল্পতার কারণে নির্ধারিত সময়ের আগেই দিনের খেলা শেষ করার সিদ্ধান্ত নেন আম্পায়াররা।

দ্বিতীয় দিন শেষে ৪৮ ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সংগ্রহ ১৩৪ রান। তেজনারায়ণ চন্দরপাল ৪৩ এবং জাস্টিন গ্রেভস ১৫ রানে অপরাজিত আছেন। বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের চেয়ে এখনো ১৩৮ রানে পিছিয়ে রয়েছে সফরকারীরা। সাদমানের সেঞ্চুরিতে গড়া সংগ্রহের পর তাইজুলের গুরুত্বপূর্ণ দুই উইকেট বাংলাদেশের জন্য স্বস্তি এনে দিয়েছে। তৃতীয় দিনে ওয়েস্ট ইন্ডিজ কত দ্রুত এই ব্যবধান কমাতে পারে, আর বাংলাদেশ তাদের বাকি উইকেটগুলো তুলে নিতে পারে কি না—সেদিকেই থাকবে নজর।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

দক্ষ নাবিক তৈরিই লক্ষ্য, প্রশিক্ষণে আপসহীন হওয়ার নির্দেশ সচিবের

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:১৬ অপরাহ্ণ
দক্ষ নাবিক তৈরিই লক্ষ্য, প্রশিক্ষণে আপসহীন হওয়ার নির্দেশ সচিবের

সমুদ্রের বুকে একটি ভুলের মূল্য অনেক বড়। সেখানে পেশাগত দক্ষতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা, শৃঙ্খলা ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিধি সম্পর্কে জ্ঞান—সবকিছুরই পরীক্ষা হয় বাস্তব পরিস্থিতিতে। তাই মেরিন একাডেমিতে ভর্তি হওয়া মানেই শুধু একটি পেশায় প্রবেশ নয়; বরং আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ নাবিক হয়ে ওঠার কঠিন প্রস্তুতি। আর সেই প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি কিংবা মানের সঙ্গে আপসের সুযোগ নেই—এমন বার্তাই দিয়েছেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান এনডিসি।

  • আন্তর্জাতিক মেরিটাইম খাতে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি মেরিন একাডেমিগুলোকে
  • মানসম্মত প্রশিক্ষণ নিশ্চিতের নির্দেশ সচিব আতাউর রহমানের
  • নতুন শিক্ষাবর্ষে ভর্তি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি পেশাগত যোগ্যতা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণে জোর

২০২৬-২০২৭ শিক্ষাবর্ষে দেশের সরকারি ও বেসরকারি মেরিন একাডেমিগুলোতে নাবিক ভর্তির প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় তিনি প্রশিক্ষণের গুণগত মানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশনা দেন। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ঢাকায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে তাঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি মেরিন একাডেমির প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।

ভর্তি দিয়ে শুরু, দক্ষতার প্রমাণ প্রশিক্ষণ শেষে
মেরিন শিক্ষার সাফল্য শুধু ভর্তি কার্যক্রম কিংবা প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। একজন প্রশিক্ষণার্থী আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী দায়িত্ব পালনে কতটা প্রস্তুত, তাঁর কারিগরি দক্ষতা কেমন এবং পেশাগত যোগ্যতা কতটা কার্যকর—এসব বিষয়ই শেষ পর্যন্ত তাঁর কর্মজীবনের সক্ষমতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে একাডেমি প্রধানদের কঠোর প্রশিক্ষণের নির্দেশনা দেন সচিব। তিনি বলেন, ‘আপনারা যাদেরকে ভর্তি করবেন, তাদেরকে অত্যন্ত কঠিন ও কঠোর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। প্রশিক্ষণের মান ও যোগ্যতার ব্যাপারে কোনো ধরনের কম্প্রোমাইজ করা যাবে না।’

তাঁর এই বক্তব্যটি মেরিন প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরে। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে কাজের সুযোগ কাজে লাগাতে হলে প্রশিক্ষণার্থীদের কেবল পাঠ্যক্রম শেষ করলেই চলবে না; তাঁদের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতাকে বাস্তব কর্মক্ষেত্রের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। এ জন্য প্রশিক্ষণের প্রতিটি ধাপে গুণগত মান বজায় রাখা এবং যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন জরুরি।

আন্তর্জাতিক সমুদ্রে পরিচয় হবে কাজের মানে
বাংলাদেশি নাবিকদের আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) বিধিবিধান অনুসরণের সক্ষমতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সচিব। তিনি বলেছেন, ‘ক্যাডেট ও ক্রুদের কোয়ালিটি বা মান এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে তারা আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) সকল নিয়মকানুন যথাযথভাবে অনুসরণ করে বিশ্ব দরবারে সাড়া ফেলতে পারে।’

তাঁর এই নির্দেশনার গুরুত্ব শুধু প্রশিক্ষণকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক জাহাজে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পেশাগত দক্ষতা, নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা এবং প্রযোজ্য বিধিবিধান মেনে চলার সক্ষমতা অপরিহার্য। তাই মেরিন একাডেমিগুলোর প্রশিক্ষণব্যবস্থায় তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক প্রস্তুতি ও পেশাগত শৃঙ্খলাকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের নাবিকদের দক্ষতা ও যোগ্যতা আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে তুলে ধরার সুযোগ আরও বিস্তৃত হতে পারে।

তরুণদের জন্য বড় সম্ভাবনা
দেশের তরুণদের জন্য আরও বেশি কারিগরিভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বিষয়টিও সভায় গুরুত্ব পায়। সচিব বলেন, ‘আমাদের সন্তানদের জন্য টেকনিক্যাল কাজের আরও বেশি সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। আর এর মূল চাবিকাঠি হলো আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি শিক্ষা।’ এই বক্তব্যে মেরিন শিক্ষার অর্থনৈতিক তাৎপর্য উঠে এসেছে। দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা তরুণদের এমন পেশার জন্য প্রস্তুত করতে পারে, যেখানে নির্দিষ্ট কারিগরি জ্ঞান, প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের সক্ষমতা প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে মেরিন একাডেমিগুলো শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রের উপযোগী দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবেও ভূমিকা রাখতে পারে।

দক্ষ নাবিকের হাত ধরে অর্থনীতিতে অবদান
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষ নাবিকদের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স প্রবাহে অবদান রাখার সম্ভাবনা তৈরি করে। এ কারণে মেরিন খাতের উন্নয়নকে দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সঙ্গেও যুক্ত করে দেখছেন নৌপরিবহন সচিব। তিনি বলেন, ‘এই সেক্টরকে আরও বেশি উন্নত করতে হবে। আমাদের প্রধান দায়িত্বই হলো দক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের নাবিক তৈরি করা, যারা ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবে আমাদের দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক ও বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে।’ সচিবের বক্তব্যের মূল সুর হলো, দক্ষ নাবিক তৈরি করা শুধু একটি প্রশিক্ষণগত দায়িত্ব নয়; এটি তরুণদের আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুত করা এবং দেশের অর্থনীতিতে তাঁদের সম্ভাব্য অবদান বাড়ানোর সঙ্গেও সম্পর্কিত।

ভর্তি ফি নির্ধারণ, মান নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ
সভায় জানানো হয়, ২০২৬-২০২৭ শিক্ষাবর্ষে মেরিন একাডেমিগুলোতে ভর্তির আবেদন ও প্রক্রিয়াকরণসহ সর্বমোট চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৩০০ টাকা। ভর্তি কার্যক্রমের এই সিদ্ধান্তের পাশাপাশি প্রশিক্ষণের মান নিশ্চিত করার বিষয়টিও সভার অন্যতম প্রধান আলোচ্য ছিল। কারণ ভর্তি প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার পর প্রশিক্ষণার্থীদের দক্ষ করে গড়ে তোলাই একাডেমিগুলোর মূল দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের মানদণ্ড বজায় রাখা, ব্যবহারিক শিক্ষার কার্যকারিতা বাড়ানো এবং পেশাগত যোগ্যতা মূল্যায়ন করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সচিবের নির্দেশনাকে স্বাগত
সভায় উপস্থিত সরকারি ও বেসরকারি মেরিন একাডেমির প্রধানরা সচিবের নির্দেশনাকে স্বাগত জানান। বাংলাদেশের মেরিন খাতকে বিশ্বমানে উন্নীত করতে সম্মিলিতভাবে কাজ করার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেন তাঁরা। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হবে নির্দেশনাগুলোকে প্রশিক্ষণের বাস্তব ব্যবস্থাপনায় কার্যকরভাবে প্রতিফলিত করা। ভর্তি থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণ সমাপ্তি পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে গুণগত মান নিশ্চিত করা গেলে আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রের উপযোগী নাবিক তৈরির লক্ষ্য আরও সুসংহত হতে পারে। সনদ একজন প্রশিক্ষণার্থীর শিক্ষা সমাপ্তির পরিচয় দিতে পারে, কিন্তু আন্তর্জাতিক সমুদ্রে তাঁর সক্ষমতার পরিচয় দেবে অর্জিত দক্ষতা। সচিবের নির্দেশনার মূল তাৎপর্যও এখানেই—বাংলাদেশের মেরিন একাডেমিগুলোকে এমন নাবিক তৈরি করতে হবে, যাঁদের যোগ্যতা ও কাজের মান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সক্ষমতাকে তুলে ধরবে।

কালের আলো/আরআই/এমকে