খুঁজুন
                               
, ,
           

পকেটের টাকায় স্বাস্থ্যসেবা ৯২.৭% পরিবারের

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:১১ অপরাহ্ণ
পকেটের টাকায় স্বাস্থ্যসেবা ৯২.৭% পরিবারের

অসুস্থ হলে চিকিৎসা নেওয়া মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে সেই চিকিৎসার খরচই বহু পরিবারের জন্য আর্থিক সংকটের কারণ হয়ে উঠছে। স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে নিজের পকেট থেকে টাকা খরচ করতে হচ্ছে দেশের ৯২ দশমিক ৭ শতাংশ পরিবারকে। আর চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। অর্থাৎ রোগ নিরাময়ের জন্য চিকিৎসা নিতে গিয়ে অনেক মানুষকে পড়তে হচ্ছে নতুন অর্থনৈতিক দুর্ভোগে।

‘বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তিগত ব্যয়ের কারণে সৃষ্ট আর্থিক সংকট ও স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা বণ্টন মূল্যায়ন’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই চিত্র। বুধবার (২৮ অক্টোবর) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত কর্মশালায় গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।

  • ওষুধ-পরীক্ষার খরচে বাড়ছে আর্থিক চাপ, স্বাস্থ্য ব্যয়ে প্রতি ১০ জনে চারজন সংকটে 
  • ২০০৫ সালের তুলনায় ব্যক্তিগত ব্যয়ের বোঝা আরও বিস্তৃত, বলছে গবেষণা

স্বাস্থ্য ও পরিবার মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), বাংলাদেশ এবং সুইডিশ দূতাবাসের আর্থিক সহায়তায় গবেষণাটি পরিচালনা করেছে। এতে ২০০৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত জাতীয় খানা আয় ও ব্যয় জরিপের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।

গবেষণার তথ্য বলছে, দেশে দারিদ্র্য কমলেও স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে মানুষের আর্থিক সংকট বাড়ছে। চিকিৎসার ব্যয় সামলাতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়ছেন দরিদ্র ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী। ফলে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগের পাশাপাশি চিকিৎসার খরচ বহন করার সক্ষমতাও জনস্বাস্থ্যের একটি বড় উদ্বেগ হিসেবে সামনে এসেছে।

৫২.৫ শতাংশ থেকে ৯২.৭ শতাংশ: ব্যক্তিগত ব্যয়ের বিস্তার
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালে দেশের ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবারকে অসুস্থতার চিকিৎসার জন্য নিজস্ব অর্থ ব্যয় করতে হতো। ২০২২ সালে এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৯২ দশমিক ৭ শতাংশে। অর্থাৎ চিকিৎসার ব্যয় বহনে ব্যক্তিগত অর্থের ওপর নির্ভরতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তিগত ব্যয় বা ‘আউট-অব-পকেট এক্সপেনডিচার’ বলতে চিকিৎসা নিতে গিয়ে রোগী বা তাঁর পরিবারকে সরাসরি নিজের অর্থ থেকে যে খরচ বহন করতে হয়, তা বোঝায়। ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, হাসপাতালে ভর্তি এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার মতো খরচ এর অন্তর্ভুক্ত। এই ব্যয়ের চাপ পরিবারের আয় ও সঞ্চয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যেসব পরিবারের আয় সীমিত, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসার খরচ মেটাতে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো কিংবা ঋণ করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

চিকিৎসার খরচে দারিদ্র্যসীমার নিচে ১ কোটি ১০ লাখ মানুষ
গবেষণার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় মেটাতে গিয়ে দেশের ৬ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ—প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ—দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। এ তথ্য স্বাস্থ্যসেবার আর্থিক সুরক্ষা নিয়ে বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে। কারণ অসুস্থতার সময় চিকিৎসা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি চিকিৎসা নিতে গিয়ে পরিবারের খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতা হারিয়ে ফেলাও গুরুতর সমস্যা।

গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, দারিদ্র্য কমার সামগ্রিক প্রবণতা থাকলেও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কিছু মানুষের জন্য দারিদ্র্যের নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। অর্থাৎ শুধু স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; সেই সেবা গ্রহণ করতে গিয়ে মানুষ আর্থিকভাবে কতটা সুরক্ষিত থাকছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

গ্রামে সংকট ৪৭ শতাংশ, ধনীদের মধ্যে ২৮ শতাংশ
স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়জনিত আর্থিক সংকট সবার ক্ষেত্রে সমান নয়। গবেষণা অনুযায়ী, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ৪৭ শতাংশ এই সংকটের মুখোমুখি হয়। ধনীদের মধ্যে এ হার ২৮ শতাংশ।

এই ব্যবধান দেখায়, চিকিৎসার ব্যয় বহনের সক্ষমতা আর্থিক অবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তুলনামূলকভাবে সচ্ছল পরিবার চিকিৎসার খরচ সামলানোর বেশি সুযোগ পেলেও নিম্ন আয়ের পরিবারকে একই ব্যয় মেটাতে গিয়ে বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হতে পারে।

গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানো, প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ সেবা পাওয়া এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য শহরে যাওয়ার ব্যয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য আনা নীতিনির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সবচেয়ে বেশি আর্থিক দুর্ভোগ বরিশালে, পেছনে সেবার সীমাবদ্ধতা ও যাতায়াত ব্যয়
বিভাগভিত্তিক হিসাবে স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি আর্থিক দুর্ভোগের মুখে পড়ছে বরিশাল বিভাগের মানুষ। এ হার ৪১ শতাংশ। অথচ ২০০৫ সালে এই বিভাগেই সংকটের হার ছিল সবচেয়ে কম। বরিশালে এ পরিস্থিতির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের ফোকাল পয়েন্ট সুব্রত পাল বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে বরিশালে স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্তির সুযোগ না বাড়ায় এবং বরিশাল থেকে ঢাকায় উন্নত চিকিৎসা নিতে যাতায়াত খরচ এক্ষেত্রে একটা বড় বিষয়। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, স্বাস্থ্য ব্যয়ের বোঝা কমাতে দেশের সব জায়গায় সমান গুরুত্ব দিয়ে স্বাস্থ্যসেবাকে সহজলভ্য করতে হবে।’

তাঁর বক্তব্যে স্বাস্থ্যসেবার ভৌগোলিক বৈষম্যের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। নিজ এলাকায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়া না গেলে রোগীকে অন্য শহরে যেতে হয়। তখন চিকিৎসার মূল ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় যাতায়াত, থাকা-খাওয়া এবং পরিবারের সদস্যদের অতিরিক্ত খরচ। এসব ব্যয় একত্রে একটি পরিবারের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু বড় শহরের হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো নয়, বিভাগীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং বিশেষজ্ঞ সেবার সুযোগ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।

সবচেয়ে বড় খরচ ওষুধে, মাসে তিন হাজার টাকার বেশি
গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তিগত ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ যাচ্ছে ওষুধের পেছনে। এর পর রয়েছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, হাসপাতালে ভর্তি এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার খরচ।

২০২২ সালে একটি পরিবারকে স্বাস্থ্যসেবার জন্য গড়ে প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকার বেশি ব্যয় করতে হয়েছে। এই ব্যয় ২০০৫ সালের তুলনায় প্রায় তিন গুণ। দরিদ্র পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এ খরচের চাপ তুলনামূলকভাবে বেশি।

ওষুধের ব্যয় বেশি হওয়া এবং চিকিৎসার অন্যান্য খরচ একসঙ্গে পরিবারের বাজেটকে চাপে ফেলতে পারে। আয় সীমিত হলে চিকিৎসার অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে খাবার, সন্তানের পড়াশোনা কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমানোর পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমানোর আলোচনায় ওষুধের সাশ্রয়ী প্রাপ্যতা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ এবং হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসার ব্যয়কে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

ফার্মেসিমুখী মানুষ বাড়ছে, বাড়ছে বেসরকারি হাসপাতালে সেবাও
গবেষণায় স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের ধরনেও পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে। ২০০৫ সালে ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ ফার্মেসি থেকে সেবা নিতেন। ২০২২ সালে এই হার বেড়ে ৫৫ শতাংশের বেশি হয়েছে। একই সময়ে বেসরকারি হাসপাতালে সেবা নেওয়া মানুষের হারও বেড়েছে।

এই পরিবর্তন স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ফার্মেসি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা বাড়ার ইঙ্গিত দেয়। তবে শুধু সেবা গ্রহণের হার দিয়ে এর কারণ নিশ্চিত করা যায় না। মানুষের প্রয়োজন, স্থানীয়ভাবে চিকিৎসার সুযোগ, সেবার প্রাপ্যতা এবং ব্যয়ের ধরন—এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে পরিবর্তনের পূর্ণ চিত্র বোঝা প্রয়োজন।

স্বাগত বক্তব্যে স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের পরিচালক এস এম আবু হোরায়রা বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে সাধারণ মানুষকে পকেট থেকে অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে হচ্ছে। অসুস্থতার সময় চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। কোনো কোনো পরিবারে দরিদ্রতা নেমে আসে।’

উন্নয়নের আশ্বাস প্রতিমন্ত্রীর
অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবার খরচের এই ফলাফলের দায় বা কৃতিত্ব কোনোটাই আমাদের নয়। এই দায় ফ্যাসিস্ট সরকারের। এই চিত্র বলে দিচ্ছে ২০০৫ সালে বিএনপি স্বাস্থ্য খাতকে কেমন অবস্থায় রেখে গিয়েছিল, আর ১৭ বছরে ফ্যাসিস্ট সরকার কী বেহাল দশা করেছে।’

তবে এই গবেষণার ফলাফলকে ভিত্তি করে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন এবং মানুষের পকেট থেকে স্বাস্থ্য ব্যয়ের চাপ কমাতে বর্তমান সরকার কাজ করছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে স্বাস্থ্য ব্যয়ের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক দায় নির্ধারণের বিষয়টি উঠে এসেছে। অন্যদিকে গবেষণার পরিসংখ্যান স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়জনিত সংকটের ব্যাপ্তি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা তুলে ধরেছে। এ সংকট মোকাবিলায় গবেষণার ফলাফলকে নীতিনির্ধারণ, সেবার মানোন্নয়ন এবং আর্থিক সুরক্ষা বাড়ানোর কাজে কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

গবেষণার ফলাফল থেকে নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব
অনুষ্ঠানে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ৩.৮.২ সূচক পরিমাপের ওপর তথ্য উপস্থাপন করেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বাংলাদেশের এনপিও মো. তৌহিদুল ইসলাম। গবেষণার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বাংলাদেশের জাতীয় পরামর্শক সায়েম আহমেদ। স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক মো. এনামুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলমগীর হোসেন এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ রাজেশ নারওয়ালসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

কালের আলো/ওয়াইএ/এমকে

দক্ষ নাবিক তৈরিই লক্ষ্য, প্রশিক্ষণে আপসহীন হওয়ার নির্দেশ সচিবের

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:১৬ অপরাহ্ণ
দক্ষ নাবিক তৈরিই লক্ষ্য, প্রশিক্ষণে আপসহীন হওয়ার নির্দেশ সচিবের

সমুদ্রের বুকে একটি ভুলের মূল্য অনেক বড়। সেখানে পেশাগত দক্ষতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা, শৃঙ্খলা ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিধি সম্পর্কে জ্ঞান—সবকিছুরই পরীক্ষা হয় বাস্তব পরিস্থিতিতে। তাই মেরিন একাডেমিতে ভর্তি হওয়া মানেই শুধু একটি পেশায় প্রবেশ নয়; বরং আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ নাবিক হয়ে ওঠার কঠিন প্রস্তুতি। আর সেই প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি কিংবা মানের সঙ্গে আপসের সুযোগ নেই—এমন বার্তাই দিয়েছেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান এনডিসি।

  • আন্তর্জাতিক মেরিটাইম খাতে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি মেরিন একাডেমিগুলোকে
  • মানসম্মত প্রশিক্ষণ নিশ্চিতের নির্দেশ সচিব আতাউর রহমানের
  • নতুন শিক্ষাবর্ষে ভর্তি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি পেশাগত যোগ্যতা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণে জোর

২০২৬-২০২৭ শিক্ষাবর্ষে দেশের সরকারি ও বেসরকারি মেরিন একাডেমিগুলোতে নাবিক ভর্তির প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় তিনি প্রশিক্ষণের গুণগত মানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশনা দেন। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ঢাকায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে তাঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি মেরিন একাডেমির প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।

ভর্তি দিয়ে শুরু, দক্ষতার প্রমাণ প্রশিক্ষণ শেষে
মেরিন শিক্ষার সাফল্য শুধু ভর্তি কার্যক্রম কিংবা প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। একজন প্রশিক্ষণার্থী আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী দায়িত্ব পালনে কতটা প্রস্তুত, তাঁর কারিগরি দক্ষতা কেমন এবং পেশাগত যোগ্যতা কতটা কার্যকর—এসব বিষয়ই শেষ পর্যন্ত তাঁর কর্মজীবনের সক্ষমতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে একাডেমি প্রধানদের কঠোর প্রশিক্ষণের নির্দেশনা দেন সচিব। তিনি বলেন, ‘আপনারা যাদেরকে ভর্তি করবেন, তাদেরকে অত্যন্ত কঠিন ও কঠোর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। প্রশিক্ষণের মান ও যোগ্যতার ব্যাপারে কোনো ধরনের কম্প্রোমাইজ করা যাবে না।’

তাঁর এই বক্তব্যটি মেরিন প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরে। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে কাজের সুযোগ কাজে লাগাতে হলে প্রশিক্ষণার্থীদের কেবল পাঠ্যক্রম শেষ করলেই চলবে না; তাঁদের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতাকে বাস্তব কর্মক্ষেত্রের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। এ জন্য প্রশিক্ষণের প্রতিটি ধাপে গুণগত মান বজায় রাখা এবং যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন জরুরি।

আন্তর্জাতিক সমুদ্রে পরিচয় হবে কাজের মানে
বাংলাদেশি নাবিকদের আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) বিধিবিধান অনুসরণের সক্ষমতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সচিব। তিনি বলেছেন, ‘ক্যাডেট ও ক্রুদের কোয়ালিটি বা মান এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে তারা আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) সকল নিয়মকানুন যথাযথভাবে অনুসরণ করে বিশ্ব দরবারে সাড়া ফেলতে পারে।’

তাঁর এই নির্দেশনার গুরুত্ব শুধু প্রশিক্ষণকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক জাহাজে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পেশাগত দক্ষতা, নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা এবং প্রযোজ্য বিধিবিধান মেনে চলার সক্ষমতা অপরিহার্য। তাই মেরিন একাডেমিগুলোর প্রশিক্ষণব্যবস্থায় তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক প্রস্তুতি ও পেশাগত শৃঙ্খলাকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের নাবিকদের দক্ষতা ও যোগ্যতা আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে তুলে ধরার সুযোগ আরও বিস্তৃত হতে পারে।

তরুণদের জন্য বড় সম্ভাবনা
দেশের তরুণদের জন্য আরও বেশি কারিগরিভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বিষয়টিও সভায় গুরুত্ব পায়। সচিব বলেন, ‘আমাদের সন্তানদের জন্য টেকনিক্যাল কাজের আরও বেশি সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। আর এর মূল চাবিকাঠি হলো আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি শিক্ষা।’ এই বক্তব্যে মেরিন শিক্ষার অর্থনৈতিক তাৎপর্য উঠে এসেছে। দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা তরুণদের এমন পেশার জন্য প্রস্তুত করতে পারে, যেখানে নির্দিষ্ট কারিগরি জ্ঞান, প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের সক্ষমতা প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে মেরিন একাডেমিগুলো শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রের উপযোগী দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবেও ভূমিকা রাখতে পারে।

দক্ষ নাবিকের হাত ধরে অর্থনীতিতে অবদান
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষ নাবিকদের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স প্রবাহে অবদান রাখার সম্ভাবনা তৈরি করে। এ কারণে মেরিন খাতের উন্নয়নকে দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সঙ্গেও যুক্ত করে দেখছেন নৌপরিবহন সচিব। তিনি বলেন, ‘এই সেক্টরকে আরও বেশি উন্নত করতে হবে। আমাদের প্রধান দায়িত্বই হলো দক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের নাবিক তৈরি করা, যারা ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবে আমাদের দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক ও বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে।’ সচিবের বক্তব্যের মূল সুর হলো, দক্ষ নাবিক তৈরি করা শুধু একটি প্রশিক্ষণগত দায়িত্ব নয়; এটি তরুণদের আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুত করা এবং দেশের অর্থনীতিতে তাঁদের সম্ভাব্য অবদান বাড়ানোর সঙ্গেও সম্পর্কিত।

ভর্তি ফি নির্ধারণ, মান নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ
সভায় জানানো হয়, ২০২৬-২০২৭ শিক্ষাবর্ষে মেরিন একাডেমিগুলোতে ভর্তির আবেদন ও প্রক্রিয়াকরণসহ সর্বমোট চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৩০০ টাকা। ভর্তি কার্যক্রমের এই সিদ্ধান্তের পাশাপাশি প্রশিক্ষণের মান নিশ্চিত করার বিষয়টিও সভার অন্যতম প্রধান আলোচ্য ছিল। কারণ ভর্তি প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার পর প্রশিক্ষণার্থীদের দক্ষ করে গড়ে তোলাই একাডেমিগুলোর মূল দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের মানদণ্ড বজায় রাখা, ব্যবহারিক শিক্ষার কার্যকারিতা বাড়ানো এবং পেশাগত যোগ্যতা মূল্যায়ন করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সচিবের নির্দেশনাকে স্বাগত
সভায় উপস্থিত সরকারি ও বেসরকারি মেরিন একাডেমির প্রধানরা সচিবের নির্দেশনাকে স্বাগত জানান। বাংলাদেশের মেরিন খাতকে বিশ্বমানে উন্নীত করতে সম্মিলিতভাবে কাজ করার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেন তাঁরা। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হবে নির্দেশনাগুলোকে প্রশিক্ষণের বাস্তব ব্যবস্থাপনায় কার্যকরভাবে প্রতিফলিত করা। ভর্তি থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণ সমাপ্তি পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে গুণগত মান নিশ্চিত করা গেলে আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রের উপযোগী নাবিক তৈরির লক্ষ্য আরও সুসংহত হতে পারে। সনদ একজন প্রশিক্ষণার্থীর শিক্ষা সমাপ্তির পরিচয় দিতে পারে, কিন্তু আন্তর্জাতিক সমুদ্রে তাঁর সক্ষমতার পরিচয় দেবে অর্জিত দক্ষতা। সচিবের নির্দেশনার মূল তাৎপর্যও এখানেই—বাংলাদেশের মেরিন একাডেমিগুলোকে এমন নাবিক তৈরি করতে হবে, যাঁদের যোগ্যতা ও কাজের মান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সক্ষমতাকে তুলে ধরবে।

কালের আলো/আরআই/এমকে

শয্যা ৫০০, রোগী আড়াই হাজার; খুলনা মেডিকেলে চরম দুর্ভোগ

খুলনা সংবাদদাতা, কালের আলো
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:০৪ অপরাহ্ণ
শয্যা ৫০০, রোগী আড়াই হাজার; খুলনা মেডিকেলে চরম দুর্ভোগ

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (খুমেক) শয্যাসংকট দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে। ৫০০ শয্যার এ হাসপাতালে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসছেন দুই থেকে আড়াই হাজারেরও বেশি রোগী। অতিরিক্ত রোগীর চাপে শয্যা না পেয়ে ওয়ার্ডের মেঝে, বারান্দা, সিঁড়ির পাশ এমনকি চলাচলের পথেও বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে রোগীদের। এতে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা এবং স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ছে।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান ভরসা এ হাসপাতাল। রোগীর চাপ সামলাতে হাসপাতালটির শয্যাসংখ্যা ২৫০ থেকে বাড়িয়ে ৫০০ করা হলেও বাস্তব পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। প্রয়োজনের তুলনায় অবকাঠামো, চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবল কম থাকায় প্রতিদিনই ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা।

মেঝে-বারান্দায় চলছে চিকিৎসা

হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, শয্যা না পেয়ে শত শত রোগীকে মেঝে ও বারান্দায় তোশক কিংবা পাটি বিছিয়ে থাকতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও সিঁড়ির পাশ ও মানুষের চলাচলের পথেও রোগীদের অবস্থান করতে দেখা যায়। এতে রোগীদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ছে।

কলারোয়া থেকে সন্তানকে চিকিৎসা করাতে আসা আসমা বেগম বলেন, তাঁর সন্তান হাম রোগে আক্রান্ত। দুই দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি করলেও অনেক চেষ্টা করেও একটি শয্যা পাননি। বাধ্য হয়ে বারান্দার মেঝেতেই সন্তানের চিকিৎসা করাচ্ছেন তিনি।

দৌলতপুর থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে আসা ফিরোজও শয্যা না পেয়ে বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনি জানান, হাসপাতালে অবস্থানকালে তাঁদের দুটি মুঠোফোন চুরি হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, হাসপাতাল এলাকায় চোর ও দালালদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ নেই।

চিকিৎসার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ

রোগী ও তাঁদের স্বজনদের অভিযোগ, শয্যা না থাকায় অনেককে ঠান্ডা ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে মেঝেতে থাকতে হচ্ছে। গুরুতর অসুস্থ রোগীদেরও কখনো কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা বারান্দায় অপেক্ষা করতে হয়। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা রোগীদের জন্য এ পরিস্থিতি আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

অতিরিক্ত রোগীর চাপে চিকিৎসাসেবার পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হচ্ছে। শয্যাসংকটের পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা, রোগীদের নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণ সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

আড়াই হাজার রোগীর সেবা দেওয়া কঠিন

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, ৫০০ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে আড়াই হাজার রোগী ভর্তি থাকেন। রোগীর সংখ্যা কিছুটা বেশি হলে সীমিত সামর্থ্যে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হলেও দুই হাজারের বেশি রোগীর নিয়মিত সেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সুজাত আহমেদ বলেন, ‘আমরা রোগীদের ফিরিয়ে দিতে পারি না। মানবিক কারণে সবাইকে ভর্তি নিতে হয়। কিন্তু ৫০০ শয্যার জন্য বরাদ্দকৃত ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং চিকিৎসক-নার্স দিয়ে আড়াই হাজার রোগীর সেবা দেওয়া প্রায় অসম্ভব।’

তিনি আরও জানান, অতিরিক্ত রোগীর চাপের কারণে হাসপাতালের বিদ্যমান অবকাঠামো ও চিকিৎসা উপকরণ দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে চিকিৎসাসেবার মান বজায় রাখাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

দুই হাজার শয্যার দাবি

হাসপাতালের বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবল নিয়োগের ওপর জোর দিয়েছেন উপপরিচালক ডা. সুজাত আহমেদ।

তাঁর মতে, হাসপাতালটিকে দুই হাজার শয্যায় উন্নীত করা এবং সে অনুযায়ী ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জনবল নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় বিপুলসংখ্যক রোগীকে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হবে না।

সংশ্লিষ্টদের মতে, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রোগীর চাপ সামলাতে শুধু শয্যাসংখ্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; এর সঙ্গে চিকিৎসক-নার্স নিয়োগ, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নয়নও নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষের চিকিৎসার প্রধান আশ্রয়স্থলটিতে রোগীদের দুর্ভোগ কমানো কঠিন হবে।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

ভবন আছে শয্যা আছে, চিকিৎসক নেই চার কেন্দ্রে

ঝিনাইদহ সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৫৭ অপরাহ্ণ
ভবন আছে শয্যা আছে, চিকিৎসক নেই চার কেন্দ্রে

ভবন আছে, শয্যা আছে, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামও রয়েছে। চিকিৎসক ও কর্মীদের থাকার জন্য ডরমেটরি এবং বিদ্যুৎ চলে গেলে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে জেনারেটরও স্থাপন করা হয়েছে। তবু চিকিৎসক সংকটে উদ্বোধনের আট বছর পরও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি ঝিনাইদহের চারটি ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র। ফলে এসব কেন্দ্রে প্রত্যাশিত স্বাস্থ্যসেবা না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিশেষ করে প্রসূতি নারী ও শিশুদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেতে ছুটতে হচ্ছে দূরের হাসপাতালে।

২০১৮ সালে উদ্বোধন, আট বছরেও পূর্ণাঙ্গ সেবা নেই
গ্রামীণ মানুষের দোরগোড়ায় মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ঝিনাইদহে চারটি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। কেন্দ্রগুলো ২০১৮ সালে উদ্বোধন করা হলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসক না থাকায় এখনো সেগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি।

কেন্দ্রগুলো রয়েছে শৈলকুপা উপজেলার দুধসর ও কাঁচেরকোল গ্রামে, ঝিনাইদহ সদর উপজেলার দক্ষিণ কাষ্টসাগরা এলাকায় এবং কালীগঞ্জ পৌরসভা এলাকায়। প্রতিটি কেন্দ্রে ১০টি শয্যা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে গর্ভবতী মায়েদের প্রসবকালীন সেবা, সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার এবং শিশুদের চিকিৎসা দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তবে অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও জনবলসংকটের কারণে স্বাস্থ্যসেবার সেই লক্ষ্য পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

ভবন ও সরঞ্জাম প্রস্তুত, মিলছে না প্রয়োজনীয় চিকিৎসা
প্রতিটি কেন্দ্রের তিনতলা ভবনে চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, শয্যা ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি রয়েছে। চিকিৎসক ও কর্মীদের আবাসনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হলে ব্যবহারের জন্য রয়েছে জেনারেটর।

কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসক নিয়োগ না হওয়ায় এসব সুবিধা কাজে লাগিয়ে পূর্ণাঙ্গ সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে সরকারি অর্থে নির্মিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো থেকে স্থানীয় জনগণ যে ধরনের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার কথা, তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী। বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে দূরের হাসপাতালে নেওয়ার ঝুঁকি ও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। গ্রামীণ এলাকায় কাছাকাছি প্রসূতিসেবার ব্যবস্থা না থাকায় রোগী ও তাঁদের স্বজনদের দুর্ভোগ আরও বাড়ছে।

হাসপাতাল আছে, কিন্তু ডাক্তার নেই
দুধসর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল আওয়াল বলেন, এলাকার মা ও শিশুদের চিকিৎসার সুবিধা নিশ্চিত করতে হাসপাতালটি নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু চিকিৎসক না থাকায় তাঁরা ঠিকমতো চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না। বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের জরুরি প্রয়োজনে দূরের হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়।

একই গ্রামের বাসিন্দা রাশিদা বেগম বলেন, দরিদ্র মানুষের জন্য কেন্দ্রটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত। ভবন ও শয্যা থাকলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা না থাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা প্রত্যাশিত সুবিধা পাচ্ছেন না। দ্রুত চিকিৎসক নিয়োগ দিয়ে কেন্দ্রটিতে সেবার ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। mকাঁচেরকোল গ্রামের বাসিন্দা জাহিদুল ইসলাম বলেন, বিপুল অর্থ ব্যয়ে হাসপাতাল নির্মাণ করা হলেও মানুষ প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছে না। দ্রুত জনবল নিয়োগ দিয়ে কেন্দ্রগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা হলে এলাকার হাজারো মানুষ উপকৃত হবেন।

প্রতিটি কেন্দ্রে দুজন চিকিৎসক নিয়োগের সুপারিশ
ঝিনাইদহ পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ মোজাম্মেল করিম জানান, মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রগুলো চালু রাখার উদ্যোগ রয়েছে। তবে চিকিৎসক নিয়োগ না হওয়ায় পূর্ণাঙ্গ সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, প্রতিটি কেন্দ্রে দুজন করে চিকিৎসক নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে কেন্দ্রগুলোতে স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়ানো সম্ভব হবে।

দ্রুত জনবল নিয়োগের দাবি স্থানীয়দের
মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে চারটি কেন্দ্র পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের মতে, নতুন করে অবকাঠামো নির্মাণের চেয়ে বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগ করে সেবা নিশ্চিত করা এখন জরুরি। বিশেষ করে প্রসূতি নারীদের জরুরি চিকিৎসা এবং শিশুদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা স্থানীয় পর্যায়ে নিশ্চিত করা গেলে দূরের হাসপাতালে যাতায়াতের ভোগান্তি কমবে। দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত সক্ষমতা কাজে লাগাতে দ্রুত চিকিৎসক নিয়োগ ও পূর্ণাঙ্গ সেবা চালুর কার্যকর উদ্যোগ চান তাঁরা।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি