পকেটের টাকায় স্বাস্থ্যসেবা ৯২.৭% পরিবারের
অসুস্থ হলে চিকিৎসা নেওয়া মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে সেই চিকিৎসার খরচই বহু পরিবারের জন্য আর্থিক সংকটের কারণ হয়ে উঠছে। স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে নিজের পকেট থেকে টাকা খরচ করতে হচ্ছে দেশের ৯২ দশমিক ৭ শতাংশ পরিবারকে। আর চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। অর্থাৎ রোগ নিরাময়ের জন্য চিকিৎসা নিতে গিয়ে অনেক মানুষকে পড়তে হচ্ছে নতুন অর্থনৈতিক দুর্ভোগে।
‘বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তিগত ব্যয়ের কারণে সৃষ্ট আর্থিক সংকট ও স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা বণ্টন মূল্যায়ন’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই চিত্র। বুধবার (২৮ অক্টোবর) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত কর্মশালায় গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।
- ওষুধ-পরীক্ষার খরচে বাড়ছে আর্থিক চাপ, স্বাস্থ্য ব্যয়ে প্রতি ১০ জনে চারজন সংকটে
- ২০০৫ সালের তুলনায় ব্যক্তিগত ব্যয়ের বোঝা আরও বিস্তৃত, বলছে গবেষণা
স্বাস্থ্য ও পরিবার মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), বাংলাদেশ এবং সুইডিশ দূতাবাসের আর্থিক সহায়তায় গবেষণাটি পরিচালনা করেছে। এতে ২০০৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত জাতীয় খানা আয় ও ব্যয় জরিপের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।
গবেষণার তথ্য বলছে, দেশে দারিদ্র্য কমলেও স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে মানুষের আর্থিক সংকট বাড়ছে। চিকিৎসার ব্যয় সামলাতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়ছেন দরিদ্র ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী। ফলে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগের পাশাপাশি চিকিৎসার খরচ বহন করার সক্ষমতাও জনস্বাস্থ্যের একটি বড় উদ্বেগ হিসেবে সামনে এসেছে।
৫২.৫ শতাংশ থেকে ৯২.৭ শতাংশ: ব্যক্তিগত ব্যয়ের বিস্তার
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালে দেশের ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবারকে অসুস্থতার চিকিৎসার জন্য নিজস্ব অর্থ ব্যয় করতে হতো। ২০২২ সালে এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৯২ দশমিক ৭ শতাংশে। অর্থাৎ চিকিৎসার ব্যয় বহনে ব্যক্তিগত অর্থের ওপর নির্ভরতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তিগত ব্যয় বা ‘আউট-অব-পকেট এক্সপেনডিচার’ বলতে চিকিৎসা নিতে গিয়ে রোগী বা তাঁর পরিবারকে সরাসরি নিজের অর্থ থেকে যে খরচ বহন করতে হয়, তা বোঝায়। ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, হাসপাতালে ভর্তি এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার মতো খরচ এর অন্তর্ভুক্ত। এই ব্যয়ের চাপ পরিবারের আয় ও সঞ্চয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যেসব পরিবারের আয় সীমিত, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসার খরচ মেটাতে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো কিংবা ঋণ করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
চিকিৎসার খরচে দারিদ্র্যসীমার নিচে ১ কোটি ১০ লাখ মানুষ
গবেষণার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় মেটাতে গিয়ে দেশের ৬ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ—প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ—দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। এ তথ্য স্বাস্থ্যসেবার আর্থিক সুরক্ষা নিয়ে বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে। কারণ অসুস্থতার সময় চিকিৎসা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি চিকিৎসা নিতে গিয়ে পরিবারের খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতা হারিয়ে ফেলাও গুরুতর সমস্যা।
গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, দারিদ্র্য কমার সামগ্রিক প্রবণতা থাকলেও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কিছু মানুষের জন্য দারিদ্র্যের নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। অর্থাৎ শুধু স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; সেই সেবা গ্রহণ করতে গিয়ে মানুষ আর্থিকভাবে কতটা সুরক্ষিত থাকছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রামে সংকট ৪৭ শতাংশ, ধনীদের মধ্যে ২৮ শতাংশ
স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়জনিত আর্থিক সংকট সবার ক্ষেত্রে সমান নয়। গবেষণা অনুযায়ী, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ৪৭ শতাংশ এই সংকটের মুখোমুখি হয়। ধনীদের মধ্যে এ হার ২৮ শতাংশ।
এই ব্যবধান দেখায়, চিকিৎসার ব্যয় বহনের সক্ষমতা আর্থিক অবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তুলনামূলকভাবে সচ্ছল পরিবার চিকিৎসার খরচ সামলানোর বেশি সুযোগ পেলেও নিম্ন আয়ের পরিবারকে একই ব্যয় মেটাতে গিয়ে বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হতে পারে।
গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানো, প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ সেবা পাওয়া এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য শহরে যাওয়ার ব্যয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য আনা নীতিনির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সবচেয়ে বেশি আর্থিক দুর্ভোগ বরিশালে, পেছনে সেবার সীমাবদ্ধতা ও যাতায়াত ব্যয়
বিভাগভিত্তিক হিসাবে স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি আর্থিক দুর্ভোগের মুখে পড়ছে বরিশাল বিভাগের মানুষ। এ হার ৪১ শতাংশ। অথচ ২০০৫ সালে এই বিভাগেই সংকটের হার ছিল সবচেয়ে কম। বরিশালে এ পরিস্থিতির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের ফোকাল পয়েন্ট সুব্রত পাল বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে বরিশালে স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্তির সুযোগ না বাড়ায় এবং বরিশাল থেকে ঢাকায় উন্নত চিকিৎসা নিতে যাতায়াত খরচ এক্ষেত্রে একটা বড় বিষয়। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, স্বাস্থ্য ব্যয়ের বোঝা কমাতে দেশের সব জায়গায় সমান গুরুত্ব দিয়ে স্বাস্থ্যসেবাকে সহজলভ্য করতে হবে।’
তাঁর বক্তব্যে স্বাস্থ্যসেবার ভৌগোলিক বৈষম্যের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। নিজ এলাকায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়া না গেলে রোগীকে অন্য শহরে যেতে হয়। তখন চিকিৎসার মূল ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় যাতায়াত, থাকা-খাওয়া এবং পরিবারের সদস্যদের অতিরিক্ত খরচ। এসব ব্যয় একত্রে একটি পরিবারের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু বড় শহরের হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো নয়, বিভাগীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং বিশেষজ্ঞ সেবার সুযোগ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বড় খরচ ওষুধে, মাসে তিন হাজার টাকার বেশি
গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তিগত ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ যাচ্ছে ওষুধের পেছনে। এর পর রয়েছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, হাসপাতালে ভর্তি এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার খরচ।
২০২২ সালে একটি পরিবারকে স্বাস্থ্যসেবার জন্য গড়ে প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকার বেশি ব্যয় করতে হয়েছে। এই ব্যয় ২০০৫ সালের তুলনায় প্রায় তিন গুণ। দরিদ্র পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এ খরচের চাপ তুলনামূলকভাবে বেশি।
ওষুধের ব্যয় বেশি হওয়া এবং চিকিৎসার অন্যান্য খরচ একসঙ্গে পরিবারের বাজেটকে চাপে ফেলতে পারে। আয় সীমিত হলে চিকিৎসার অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে খাবার, সন্তানের পড়াশোনা কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমানোর পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমানোর আলোচনায় ওষুধের সাশ্রয়ী প্রাপ্যতা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ এবং হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসার ব্যয়কে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
ফার্মেসিমুখী মানুষ বাড়ছে, বাড়ছে বেসরকারি হাসপাতালে সেবাও
গবেষণায় স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের ধরনেও পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে। ২০০৫ সালে ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ ফার্মেসি থেকে সেবা নিতেন। ২০২২ সালে এই হার বেড়ে ৫৫ শতাংশের বেশি হয়েছে। একই সময়ে বেসরকারি হাসপাতালে সেবা নেওয়া মানুষের হারও বেড়েছে।
এই পরিবর্তন স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ফার্মেসি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা বাড়ার ইঙ্গিত দেয়। তবে শুধু সেবা গ্রহণের হার দিয়ে এর কারণ নিশ্চিত করা যায় না। মানুষের প্রয়োজন, স্থানীয়ভাবে চিকিৎসার সুযোগ, সেবার প্রাপ্যতা এবং ব্যয়ের ধরন—এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে পরিবর্তনের পূর্ণ চিত্র বোঝা প্রয়োজন।
স্বাগত বক্তব্যে স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের পরিচালক এস এম আবু হোরায়রা বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে সাধারণ মানুষকে পকেট থেকে অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে হচ্ছে। অসুস্থতার সময় চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। কোনো কোনো পরিবারে দরিদ্রতা নেমে আসে।’
উন্নয়নের আশ্বাস প্রতিমন্ত্রীর
অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবার খরচের এই ফলাফলের দায় বা কৃতিত্ব কোনোটাই আমাদের নয়। এই দায় ফ্যাসিস্ট সরকারের। এই চিত্র বলে দিচ্ছে ২০০৫ সালে বিএনপি স্বাস্থ্য খাতকে কেমন অবস্থায় রেখে গিয়েছিল, আর ১৭ বছরে ফ্যাসিস্ট সরকার কী বেহাল দশা করেছে।’
তবে এই গবেষণার ফলাফলকে ভিত্তি করে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন এবং মানুষের পকেট থেকে স্বাস্থ্য ব্যয়ের চাপ কমাতে বর্তমান সরকার কাজ করছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে স্বাস্থ্য ব্যয়ের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক দায় নির্ধারণের বিষয়টি উঠে এসেছে। অন্যদিকে গবেষণার পরিসংখ্যান স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়জনিত সংকটের ব্যাপ্তি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা তুলে ধরেছে। এ সংকট মোকাবিলায় গবেষণার ফলাফলকে নীতিনির্ধারণ, সেবার মানোন্নয়ন এবং আর্থিক সুরক্ষা বাড়ানোর কাজে কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
গবেষণার ফলাফল থেকে নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব
অনুষ্ঠানে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ৩.৮.২ সূচক পরিমাপের ওপর তথ্য উপস্থাপন করেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বাংলাদেশের এনপিও মো. তৌহিদুল ইসলাম। গবেষণার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বাংলাদেশের জাতীয় পরামর্শক সায়েম আহমেদ। স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক মো. এনামুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলমগীর হোসেন এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ রাজেশ নারওয়ালসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
কালের আলো/ওয়াইএ/এমকে
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]