ঋণ শোধেই গেল ১৩৫ কোটি
নতুন বৈদেশিক সহায়তা হিসেবে দেশে যে ডলার আসছে, তার দ্বিগুণেরও বেশি চলে যাচ্ছে পুরোনো ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ৬৬ কোটি ২৩ লাখ ডলার পেয়েছে সরকার। অথচ আগের নেওয়া ঋণের আসল ও সুদ শোধ করতেই ব্যয় হয়েছে ১৩৫ কোটি ১২ লাখ ডলারের বেশি। অর্থাৎ, নতুন সহায়তার চেয়ে ঋণ পরিশোধে প্রায় ৬৯ কোটি ডলার বেশি খরচ হয়েছে। এর মধ্যে আরও উদ্বেগের দিক হলো, গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বৈদেশিক সহায়তার অর্থছাড় কমেছে ৪২.৩ শতাংশ। নতুন সহায়তার প্রতিশ্রুতি বাড়লেও বাস্তবে অর্থ আসছে কম—ইআরডির সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বৈদেশিক অর্থায়নের এই বিপরীত চিত্র।
- তিন মাসে বৈদেশিক সহায়তার অর্থছাড় কমেছে ৪২.৩ শতাংশ
- বিপরীতে আসল-সুদ পরিশোধ বেড়েছে ৫.৬ শতাংশ
- নতুন অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ
ঋণ পরিশোধে বাড়ছে ব্যয়অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বিদেশি ঋণের আসল পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ৮৫ কোটি ৮৯ লাখ ২০ হাজার ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ ব্যয় ছিল ৮১ কোটি ৬৯ লাখ ৯০ হাজার ডলার। এক বছরের ব্যবধানে আসল পরিশোধের ব্যয় বেড়েছে ৪ কোটি ১৯ লাখ ৩০ হাজার ডলার।
সুদ পরিশোধেও ব্যয় বেড়েছে। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে এ খাতে সরকারকে দিতে হয়েছে ৪৯ কোটি ২৩ লাখ ১০ হাজার ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে সুদ বাবদ ব্যয় ছিল ৪৬ কোটি ২৯ লাখ ৬০ হাজার ডলার। অর্থাৎ, এক বছরে সুদ পরিশোধের ব্যয় বেড়েছে ২ কোটি ৯৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার। আসল ও সুদ মিলিয়ে তিন মাসে মোট পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩৫ কোটি ১২ লাখ ৩০ হাজার ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এই ব্যয় বেড়েছে ৫.৬ শতাংশ।
সহায়তার অর্থছাড়ে বড় পতন
ঋণ পরিশোধের ব্যয় বাড়লেও নতুন বৈদেশিক সহায়তার প্রকৃত অর্থছাড়ে দেখা গেছে উল্টো প্রবণতা। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে উন্নয়ন সহযোগীরা ছাড় করেছে ৬৬ কোটি ২৩ লাখ ১০ হাজার ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ১১৪ কোটি ৮৫ লাখ ৯০ হাজার ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে অর্থছাড় কমেছে ৪৮ কোটি ৬২ লাখ ৮০ হাজার ডলার। শতাংশের হিসাবে পতন ৪২.৩।
চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে পাওয়া অর্থের মধ্যে ৫৪ কোটি ১৭ লাখ ৪০ হাজার ডলার ঋণ এবং ১১ কোটি ৫ লাখ ৭০ হাজার ডলার অনুদান। অর্থাৎ, প্রকৃত সহায়তার বড় অংশই ঋণ হিসেবে এসেছে। ফলে নতুন অর্থায়নের ক্ষেত্রে অনুদানের তুলনায় ঋণের ওপর নির্ভরতা বেশি থাকছে।
তবে এক প্রান্তিকের এই পরিসংখ্যান দিয়ে উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থসংকট তৈরি হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। অর্থছাড়ের পতন কতটা প্রকল্প বাস্তবায়ন বা সরকারি ব্যয়ে প্রভাব ফেলছে, তা বুঝতে প্রকল্পভিত্তিক অর্থপ্রাপ্তি ও ব্যয়ের তথ্যও প্রয়োজন।
প্রতিশ্রুতি বেড়েছে, অর্থ আসছে কম
বৈদেশিক সহায়তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, উন্নয়ন সহযোগীদের নতুন অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি বাড়লেও বাস্তবে অর্থছাড় কমেছে। ইআরডির হিসাবে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ১২৭ কোটি ৩০ লাখ ডলারের ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৯১ কোটি ৬ লাখ ৭০ হাজার ডলার। এক বছরে প্রতিশ্রুতি বেড়েছে ৩৬ কোটি ২৩ লাখ ৩০ হাজার ডলার, যা প্রায় ৪০ শতাংশ। নতুন প্রতিশ্রুতির মধ্যে ১১৪ কোটি ৭৫ লাখ ডলার ঋণ এবং ১২ কোটি ৫৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার অনুদান হিসেবে দেওয়ার কথা রয়েছে।
বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা
প্রথম প্রান্তিকের তথ্য তিনটি প্রবণতা সামনে এনেছে। প্রথমত, পুরোনো ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে ব্যয় বাড়ছে। দ্বিতীয়ত, নতুন বৈদেশিক সহায়তার প্রকৃত অর্থছাড় কমেছে। তৃতীয়ত, নতুন সহায়তার প্রতিশ্রুতি বাড়লেও সেই অর্থ বাস্তবে ছাড় হওয়ার গতি একই হারে বাড়েনি।
এই পরিস্থিতিতে প্রতিশ্রুত অর্থ দ্রুত ছাড় করানো এবং ঋণের অর্থ কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা বা ব্যয় বৃদ্ধি হলে ঋণের অর্থ থেকে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল পেতে দেরি হতে পারে, অথচ ঋণ পরিশোধের দায় বহাল থাকে।
এ ছাড়া বৈদেশিক ঋণ ডলারের মতো মুদ্রায় পরিশোধ করতে হয় বলে টাকার অবমূল্যায়ন হলে একই পরিমাণ ঋণ শোধে স্থানীয় মুদ্রায় বেশি অর্থ প্রয়োজন হতে পারে। তবে ঋণ পরিশোধ ও সহায়তার অর্থছাড়ের ব্যবধানকে দেশের সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রার নিট প্রবাহের পূর্ণাঙ্গ চিত্র হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয়, বিদেশি বিনিয়োগসহ অন্যান্য বৈদেশিক লেনদেনও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
কালের আলো/টিইকে/এমকে
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]